শৈলারোহনে হাতেখড়ি ও চূড়ান্ত পরীক্ষা

পুরুলিয়াতে তিলাবনী পাহাড় বেসক্যাম্পে অন্যদিনের মতো, পায়ের দিকটায় খুব ঠাণ্ডা অনুভব করলাম। মুহুর্তের মধ্যে ঘুম ভেঙে গেল। উঠে দেখি ক্যাম্পের চারদিকে তখনও ঘন কুয়াশায় ঘেরা অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ। স্লিপিং ব্যাগ থেকে বের হয়ে ক্যাম্পের মাঠের মাঝখানে এসে দাড়ালাম। চাঁদের আলোয় তখনও চারদিকটা উজ্জ্বল হয়ে আছে, মোহগ্রস্ত লাগছিল নিজেকে।

গত তিন দিন যাবত এই ক্যাম্পে থাকতে থাকতে নিজের বাড়ির মতো মনে হচ্ছিল। কিন্তু আজ ক্যাম্পিংয়ের শেষ দিন। ফিরে যেতে হবে আবার যার যার বাড়িতে, যার যার দেশে। তাই উঠে প্রাতঃরাশ সেরে একটু হালকা হয়ে নিলাম। এরপর চা পর্ব চলাকালীন সময়ে দেখলাম অন্য দিনের তুলনায় সবাই আজ একটু তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে পড়েছে।

পাহাড়ে ওঠার লাইন। ছবিঃ স্বর্ণ কোমল শাহা

চা পান শেষে লাইনআপ করা হলো প্রথমেই। তখন সকাল ছয়টা বাজে। সূর্যের আলো তখনও ভালোভাবে ক্যাম্পে এসে পৌঁছায়নি। অন্যদিনকার মতো আজকে পিটি ছিল না। শেষ দিনে ছিল তিলাবনি পাহাড়ের শিখরে ওঠা, ট্রেকিং করা আর ছিল বাদবাকি ২ থেকে ৩টা এক্টিভিটিস। তাই এর জন্য আলাদা করে পিটি করানো হলো না।

সাতটার মধ্যে সকালের খাবার শেষ করে আমরা ট্রেকিং শুরু করলাম তিলাবনি পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার জন্য। গত কয়েকদিন যাবত পাহাড়ের নিচের বোল্ডারগুলোতে আমরা আরোহন করতে করতে পাহাড়ের উপরের দিকে তাকাচ্ছিলাম কবে উঠবে চূড়ায়। কবে পাহাড়ের চূড়া থেকে চারদিকের বিশাল মালভূমিকে দেখতে পাবো। আজ আমাদের সকলের সেই সুপ্ত বাসনা পূরণ হতে চলেছে।

ক্লান্ত তবুও অনেক খুশী

পাহাড়ের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যখন প্রধান ট্রেইলের কাছে এসে ৬০ থেকে ৭০ জন মানুষ উপরের দিকে উঠতে শুরু করলাম, বুঝতে পারলাম উপরে ট্রেইলের অবস্থা খুব বেশি সুবিধার নয়। কারণ ক্ষণে ক্ষণে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়তে হচ্ছিল। আর দশ মিনিট মতো করে দাঁড়িয়ে থাকা লাগছিলো। ট্রেলের মাঝখানে যেন জ্যাম বেঁধে গিয়েছে। যত উপরের দিকে উঠছে নিচের মালভূমিগুলো তত স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

পুরুলিয়ার পাহাড়গুলোর অবস্থান একটি থেকে আরেকটির প্রায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার দূরে। কিছু কিছু পাহাড়ের অবস্থান তার থেকে বেশি দূরে। মাঝখানে যে বিস্তীর্ণ পাথুরে ভূমি রয়েছে এটাকে মালভূমি বলা হয়। এখানকার পাথরগুলো মাটির নিচে থেকে বছরের পর বছর ধরে উপরে উঠেছে। হাজার হাজার বছর আগে থেকেই এই পাহাড়গুলো আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে।

শান্তির বিশ্রাম। ছবিঃ লেখক

পাহাড়ের মাঝে একটি জায়গায় এসে আমরা প্রথম দলটি বিশ্রাম নিতে শুরু করলাম। বেশ কিছু বাংলাদেশি গান গাওয়া হলো সেখানে। ভারতীয়দের মধ্যে একটা জিনিস খেয়াল করলাম বাংলাদেশ থেকে যে গানগুলো গাওয়া হয় সেই গানগুলো তাদের খুব প্রিয়। প্রায় দেড় ঘণ্টা ট্রেকিং করার পর আমরা তিলাবনী পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছাতে সক্ষম হলাম। এখান থেকে চারদিকটা অসাধারণ দেখায়। মাটি থেকে অনেক উপরে তখন আমরা।

পুরো মালভূমিটাই চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম। পাহাড়ের ঢাল প্রায় ৫০০ থেকে ৮০০ ফিট মতো গভীর। এর কাছে যাওয়া আমাদের জন্য নিষেধ ছিল। তাই দূর থেকে আমরা উপভোগ করতে লাগলাম অসাধারণ এই প্রকৃতি। প্রচণ্ড বাতাস বইছিলো তিলাবনি পাহাড়ের চূড়ায়। আমরা সবাই দাঁড়িয়ে ছবি তোলার পর্ব শেষ করলাম। খুব বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার মতো ছিল না, কারণ নামার পর আরো দুটো অ্যাক্টিভিটি বাকি ছিল।

এভারেস্ট জয়ী কুন্তল কারার দাদার বাংলাদেশী উন্মাদনা। ছবিঃ জাবেদুল ইসলাম

পাহাড়ে উঠতে যতটা সময় লেগেছিল পাহাড় থেকে নামার সময় সময় লাগলো তার অর্ধেক। এই সময়টায় আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো একটি চিমনির কাছে। ফাটল অনুযায়ী পাথরে তিনটি ভাগ আছে। প্রথমটির নাম হচ্ছে ক্র্যাক। ক্র্যাক মানে দুটি পাথরের মাঝখানে সামান্য ফাটল। এরপরে যে ব্যাপারটি আসে সেটি হচ্ছে চিমনি। অর্থাৎ একটি মানুষ কোনোভাবে ভেতর দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে এবং ইচ্ছা করলে সেখানে ক্লাইম করতে পারবে। সর্বশেষ ধাপটি হচ্ছে গালি। যেটার মধ্য দিয়ে একজন থেকে দুজন মানুষ অনায়াসে চলাচল করতে পারবে। এই বৃহৎ ফাটলকে গালি বলা হয়।

স্বাভাবিকভাবেই চিমনি ক্লাইম্ব আমাদের এতদিনে শেখানো হয়নি। তাই শেষ দিনে শেখানো হলো কীভাবে দুটি পাথরের ফাটলের মাঝখান দিয়ে পা এবং কোমরের পেছনের অংশটার উপর শক্তি প্রয়োগ করে উপরের দিকে উঠতে হয়। এই প্রশিক্ষণটি খুবই মজাদার। এটা শেষ করার পর আমাদের ফাইনাল পরীক্ষা নেওয়া হলো। গত চার দিনে আমরা যারা ক্লাইম্ব শিখেছি, তাদের মধ্যে এই পরীক্ষাটি নেয়া হলো।

এই বোল্ডারেই নেয়া হচ্ছিলো চূড়ান্ত পরীক্ষা। ছবিঃ জাবেদুল ইসলাম

এখানে ৯০ ডিগ্রী অ্যাঙ্গেলে এবং সামান্য ওভার হ্যাং যুক্ত একটি বোল্ডার বাছাই করে দুই প্রান্তে দাগ কাটা ছিল। পরীক্ষার নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষার্থীদের ওই দুই দাগের মাঝখান দিয়ে আরোহন করতে হবে। খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম প্রথমে। কিন্তু এরপর যখন দেখলাম বুঝে শুনে করলে ক্লাইম্ব করা সম্ভব, তখন নিজের মতো সাহস সঞ্চয় করতে লাগলাম। অধিকাংশই এই বোল্ডারটা ক্লাইম্ব করতে পারেননি। বেশ কঠিন ছিল এই ফেইজটি।

আমরা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া দুই থেকে তিনজন খুব ভালো ক্লাইম্ব করে উপরে উঠে যেতে পেরেছি। ৫৫ জন প্রশিক্ষণার্থীদের ভেতর আমরা তিনজনই বাংলাদেশি যারা ভালো ক্লাইম্ব করতে পেরেছি। এটা আমাদের জন্যে বেশ গর্বের ছিল। পরীক্ষা ভালো হওয়ার পর মনটাও বেশ খুশি খুশি লাগছিল। এরপর আমাদের আরো দুটো জিনিস দেখানো হলো।

Rope4 থেকে যাওয়া বাংলাদেশি দলটি। ছবিঃ আবদুল্লাহ আল মাহমুদ

একটি হচ্ছে অ্যাসেন্ডিং অর্থাৎ পাহাড়ে আরোহণ করার সময় যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে যে জুমারিং করা হয় সেটাকে অ্যাসেন্ডিং বলে। এর পর দেখানো হলো রিভার ক্রসিং। অর্থাৎ যখম কোনো পাহাড়ে পাহাড়ে অভিযানে যাবেন, তখন যদি পারি নদী পথ আটকে ফেলে তাহলে কীভাবে যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে সাবধানতার সাথে নদী পার হওয়া যায়, সেই প্রশিক্ষণ আমাদের দেয়া হলো।

দুপুরের আগেই ক্যাম্পে ফিরে এসে খাবারের সাথে চললো ক্যাম্পসাইট পরিষ্কার করার কাজ। সব কাজ শেষ হওয়ার পর ঘরে ফেরার জন্য যার যার ব্যাকপ্যাকগুলো গুছিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লাম সবাই।

ফেরার পথের কুয়াশা সন্ধ্যা। ছবিঃ লেখক

আমাদের গাড়ি ছাড়লো। ক্যাম্প থেকে যত দূরে যাচ্ছি মন যেন তত খারাপ হয়ে উঠছে। চারদিকের মালভূমি অঞ্চলগুলো কমতে লাগলো। একটা সময় তিলাবনি পাহাড় ও চোখের আড়ালে চলে গেল। আমরা চলে আসলাম আদ্রা রেলওয়ে স্টেশনে। রাত এগারোটার ট্রেনে আমরা উঠে পড়লাম কলকাতার উদ্দেশ্যে। পরদিন সকালে কলকাতা পৌঁছানোর সাথে সাথে আমাদের সম্পূর্ণ কোর্স সফলভাবে সমাপ্ত হলো।

রুট ও খরচের খসড়া

কলকাতা থেকে আগ্রা অথবা আনারা চলে আসতে হবে ট্রেনে অথবা বাসে করে। এখান থেকেই মিনি ট্রাক অথবা সি এন জি ভাড়া করে চলে আসা যাবে তিলাবনি পাহাড় বা তিলাবনি ক্যাম্প সাইটে। কোনো গ্রুপের সাথে গেলে এই কোর্সের খরচ পড়বে হাওড়া টু হাওড়া ৩,৫০০ – ৮,০০০ টাকা পর্যন্ত।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

একদিনে বৌদ্ধমন্দির, শুভলং ও বালুখালি ভ্রমণের গল্প

বসবাসের জন্য উপযোগী শীর্ষ ১০ টি দেশের তালিকা