রিছাং ঝর্ণা: উচ্ছ্বাস ও উৎকণ্ঠা যেখানে হাত ধরে চলে

তৃতীয়বারের মতো সাজেক যাচ্ছি, একটি বিশেষ আমন্ত্রণ উপেক্ষা করতে না পেরে। বাসে খাগড়াছড়ি শহরে না গিয়ে, মধ্যপথে রিছাং ঝর্ণা যাওয়ার গেটেই নেমে পড়লাম সবাই। আসলে নেমে গেলাম না বলে, নামিয়ে দেয়া হলো বলাই যুক্তিযুক্ত হবে!

মেঘ-পাহাড়-ঝর্ণা আর সবুজ প্রকৃতি দেখতে আসা সবাই বেশ খানিকটা অবাক যে হলো সেটা বোঝাই গেল, চোখে-মুখে আর অভিব্যক্তিতে। কিন্তু প্রকাশ কেউই করেনি। একটু পরেই মন মাতানো ঝর্ণা দেখতে পাবে বলে। ক্ষীণ ক্ষোভ আড়াল করে, পাহাড়ি ঝর্ণার নেশায় নিজেকে নিমজ্জিত করল।

রিছাং এর পথে। ছবিঃ লেখক

অনেক অনেক সবুজ, হালকা শীতের শিহরণ, কাছে-দূরের পাহাড় আর শিশির জড়ানো ঘাস ও পথ পেরিয়ে, একটি টং ঘরের ছায়ায় সাময়িক বিশ্রাম। হালকা খাবার, পানি আর কাপড় পরিবর্তন করে আবারো এগিয়ে চলা। এবার পাহাড়ের গায়ে গায়ে বানানো সিঁড়ি বেয়ে নামতে হবে, নিচে অনেক নিচে। বেশ কিছুটা নামার পরেই দূরে, পাহাড়ের সুখের কান্না হয়ে ঝরে পড়া রিছাংয়ের উচ্ছ্বাস আর আহ্বান শুনতে পেলাম। আমি যেহেতু আগেও দুই-দুইবার দেখেছি, ছুঁয়েছি ও সিক্ত হয়েছি আর অনুভব করেছি মন-প্রাণ দিয়ে তাই এবার আর আগের মতো অতটা ব্যাকুল ছিলাম না।

কিন্তু যারা এবারই প্রথম পাহাড় ও ঝর্ণা দেখতে এসেছে, তারা সিঁড়ি দিয়ে নেমে নয় পারলে পাখি হয়ে উড়ে যায়! বা বাতাস হয়ে ছুটে যায়! ঝর্ণাকে কাছে থেকে দেখার, ছোঁয়ার আর অবগাহনের আকুলতা তখন এমনই। হ্যাঁ এমনই ছিল, আমি দেখেছি সবার চোখে-মুখে সেই উচ্ছ্বাস আর অমোঘ আকুলতা। সুতরাং এবার সবাই নামতে শুরু করলো যে যেভাবে আর যত দ্রুত পারে। নিমেষেই রিছাং ঝর্ণাতে যাওয়ার সিঁড়ি ফাঁকা হয়ে গেল!

ছুটে চলা… ছবিঃ লেখক

আমরা কয়েকজন দূর থেকে দেখতে লাগলাম, যে আমরা সিঁড়ি বেয়ে নামার আগেই অনেকে ঝর্ণার কাছে পৌঁছে গেছে এবং ঝর্ণার কাছে যেতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। একেবারেই অনভিজ্ঞ আর আনকোরাভাবে। ঘটনাগুলো এত দ্রুতই ঘটেছিল যে ঝর্ণাতে নামা, ভেজা ও উচ্ছ্বসিত হবার আগে কিছু সাধারণ সতর্কতা জানার, শোনার বা বোঝার ছিল। সেটা বলার বা জানানোর সময়টাই পাওয়া যায়নি। যে কারণে যা ঘটার নয় তাই ঘটলো, ভ্রমণের শুরুতেই। এবং সে কী বীভৎসতা! উহ, অবর্ণনীয়!

তবুও বলবো অন্য এবং আগামী দিনে যারা নতুন যাবেন তাদের সতর্কতা ও সাবধানতার জন্য।

সবাই নিচে নেমে গেলাম। কেউ কেউ নেমেই ঝর্ণার শীতল জলে আর্দ্র হতে নিজেকে সঁপে দিয়েছে। আবার কেউ কেউ অতটা উপরে না উঠে নিচে জমে থাকা লেকের মাঝে হেঁটে বসে আর ভিজেই তৃষ্ণা মেটাচ্ছে। আর কেউ কেউ ছবি তুলে স্মৃতি ধরে রাখতে একাকার করে দিচ্ছে নিজেকে। দুই-একজন শুধু দূর থেকে ঝর্ণা আর ঝর্ণা নিয়ে উন্মাদনা দেখেই খুশি আর খুশি। এরই মধ্যে কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘটে গেল অনাকাঙ্ক্ষিত একটা দুর্ঘটনা আর হয়ে গেল একজনের জীবনের অপূরণীয় একটা ক্ষতি। কী?

দূর থেকে উচ্ছ্বসিত রিছাং ঝর্ণা। ছবিঃ লেখক

বেশ কয়েকজন অনেকক্ষণ থেকেই ঝর্ণা থেকে স্লাইডিং করছেন উচ্ছ্বাসে আর উন্মাদনায়। এরই মধ্যে একজন স্লাইডিং করতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে ফেললেন এবং তার একটি হাত শরীরের নিচের অংশে পড়ে গেল, তাৎক্ষণিক দেখতে পেলাম ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে! কী ব্যাপার? কয়েক মুহূর্তের মধ্যে নিচের লেকে এসে পড়লেন আর দেখতে পেলাম উনার বাম হাতের মধ্য আঙুলের সামনের একটি কর নেই! কী বীভৎসতা! ঝুলে পড়ে রয়েছে ক্ষীণ চামড়ার সাথে! ওটাকে কোনো রকমে আবারো আঙুলের সাথে ধরে রাখার ব্যর্থ প্রয়াস। সাথে আরও একজনের হাত, হাঁটু থেতলে গেল!

এরপর কয়েকজন মিলে ধরাধরি করে তাকে কাছের খাগড়াছড়ির একটা ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হলো। ডাক্তার কোনো রকম সেলাই করে জোড়া লাগিয়ে দিয়েছে কিন্তু ওটা আর জোড়া লাগবে না বলেই জানিয়ে দিয়েছে। ওটা শরীর থেকে পড়েই যাবে বা ফেলেই দিতে হবে! শেষ পর্যন্ত যে কী হয়েছিল কে জানে? অচেনা ছিল বলে আর জানার সুযোগ হয়নি। একবার ভেবে দেখুন যার এই অবস্থা হয়েছিল তার এবং তার অন্যান্য ভ্রমণসঙ্গীদের কী অবস্থা হয়েছিল পরে? তাদের মানসিক, আর্থিক আর পুরো ভ্রমণের?

ঝর্ণার শেষ জলাশয়। ছবিঃ লেখক

সুতরাং ভাইয়েরা-বোনেরা যতরকম উচ্ছ্বাস, উন্মাদনা আর উম্মত্ততা যে যেভাবে আর যতই করুন না কেন, ভেবে রাখবেন নিজের নিরাপত্তা কিন্তু একেবারেই নিজের কাছে। আমরা বা আপনার সঙ্গীরা শুধুমাত্র একটু উহ, আহ আর হায়হায়-ই করতে পারবো। আর পারবো কথা দিয়ে সামান্য সমবেদনা জানাতে মাত্র। এর বেশি কিছু নয়। আসলেই নয়। আর সেই সাথে নষ্ট হবে সময়, অর্থ, পুরো ভ্রমণ পরিকল্পনা আর কারো এমন শারীরিক ক্ষতি? সে তো অপূরণীয়! কোনো কিছুর বিনিময়ে ফিরে পাওয়ার মতো নয়।

তাই যখন, যেখানে, যাদের সাথেই কোথাও যান না কেন, নিজের উদযাপন, উচ্ছ্বাস, উন্মাদনা আর উপভোগ নিজের কাছে আর নিজের মতো করে। নিরাপত্তা আর নির্ভাবনায় থাকাটাও একেবারেই নিজের কাছে এবং নিজের মতো করে জেনে-বুঝে আর ভেবে নেবেন। আর সেভাবেই পরিমিত উচ্ছ্বাস আর উন্মাদনায় ভাসলে এমন করুণ ক্ষতির সম্ভাবনা কম বা নেই বললেই চলে। সবার সকল ভ্রমণ নিরাপদ, আনন্দময় আর উপভোগ্য হোক নিজেদের মতো করে এবং…

ঝর্ণার উন্মাদনায়। ছবিঃ লেখক

সবাই ভালো থাকুন আর নিরাপদে পৃথিবী উপভোগ করুন।

হ্যাপি ট্র্যাভেলিং।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পাহাড়িকন্যা বান্দরবানের বুকে পাঁচদিনের বাজেট ট্যুর

বিদেশের মাটিতে বাজেট ট্রিপ: দিল্লি ও আগ্রা ভ্রমণ