রাইস টেরেস, তির্তা টেম্পল এবং তানাহ লট মন্দিরের গল্পগাথা

ইন্দোনেশিয়া দেশটি ছোট বড় প্রায় ৫,০০০ দ্বীপ নিয়ে গঠিত, আয়তনের দিক থেকে বাংলাদেশের ১৩ গুণের চেয়েও বড় এই দেশে জনসংখ্যা মাত্র ২৫ কোটির কিছু বেশি। ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দ্বীপ বালিতেই মূলত বেশিরভাগ টুরিস্টের আনাগোনা। বালি দ্বীপের আয়তন ৫,৭৮০ বর্গ কিলোমিটার এবং এখানে বসবাসকারী স্থানীয় জনসংখ্যা ৪৫ লাখের মতোন।

জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বালি’র সুনাম রয়েছে। প্রাচীন ও আধুনিক নৃত্যকলা, ভাস্কর্য, চিত্রকলা, চামড়া, ধাতবশিল্প ও সঙ্গীতের ন্যায় উচ্চ পর্যায়ের শিল্পকলা এ শহরে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রত্যেক বছর ইন্দোনেশীয় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব এখানে অনুষ্ঠিত হয়। বিংশ শতকের গোড়ার দিকে পর্যটন শিল্পের দিকে ঝুঁকে পড়ে এ শহরটি। সাম্প্রতিককালে বালিতে ২০১১ সালের আসিয়ান সম্মেলন, ২০১৩ সালে এপেক সম্মেলনসহ মিস ওয়ার্ল্ড সুন্দরী প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

রাইস টেরেস হলো আমাদের দেশের ধান ক্ষেত আর চা বাগানের মিলিত রূপ। সোর্স: cultural spot

ইন্দোনেশিয়ার বালিতে অনেকগুলো জায়গা আছে ঘোরার মতোন, যেখানে ৮-১০ দিন সময় নিয়ে গেলেও ভালোমতো ঘুরে আসা সম্ভব নয়। তেমনই তিনটি জায়গা হলো রাইস টেরেস, তির্তা টেম্পল এবং তানাহ লট।

রাইস টেরেস

ইন্দোনেশিয়ায় বেশ কয়েকটি রাইস টেরেস আছে। কফিফার্ম ঘুরে বৃষ্টি আপুরা রওনা দিয়েছিল কাছাকাছি রাইস টেরেসের দিকে। যাবার পথে গাড়িতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল আপু। তাই কিছু দেখা হয়নি রাস্তার।
রাইস টেরেস হলো আমাদের দেশের ধান ক্ষেত আর চা বাগানের মিলিত রূপ। চা বাগানের মতো পাহাড়ের ধাপে ধাপে তৈরী করা হয় ধান ক্ষেত। চা বাগানে যেমন কিছুক্ষণ পর পরই বড় কোনো ছায়াবতী বৃক্ষ থাকে, রাইস টেরেসেও ধাপগুলোর মাঝেমাঝেই থাকে নারকেল গাছ। এগুলো অবশ্য ছায়াদায়িনী হিসেবে কাজ করে না। নারকেল গাছ ছাড়াও কিছু কুড়ে ঘর থাকে এই রাইস টেরেসের মধ্যে। যারা এই ক্ষেতের দেখাশোনা করে, তারা হয়তো থাকে বাঁশ ছন দিয়ে তৈরি এই কুঁড়েঘরে। বিশাল এরিয়া নিয়ে ধাপে ধাপে গাঢ় সবুজের ছটা, তার মাঝে বাদামী কুঁড়েঘরগুলো মিলে অন্যরকম এক সৌন্দর্য। বৃষ্টি আপু রাইস টেরেস দেখে খুবই আশাহত হয়েছিল। তবে, আমার কাছে মনে হয়েছে খুবই দারুণ একটা দর্শনীয় স্থান এই রাইস টেরেস।

নারকেল গাছ ছাড়াও কিছু কুড়ে ঘর থাকে এই রাইস টেরেসের মধ্যে। সোর্স: cultural spot

তির্তা টেম্পল

কিন্তামনির  থেকে ৩৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ‘তির্তা এম্পুল’ বা ‘তির্তা টেম্পল’ বাংলায় যাকে বলা হয় পবিত্র প্রস্রবণের মন্দির। মন্দিরটি খুবই সুন্দর। মন্দিরের এক পাশে রয়েছে বিস্তৃত সবুজ পাহাড়, আর অন্য পাশে রয়েছে কয়েকটি ছোট ছোট জলাশয় যার উৎস পাহাড় থেকে বেরিয়ে আসা এক প্রস্রবণ। আবার অনেকের মতে আগ্নেয়গিরি থেকে লাভা চুইয়ে এই জলাশয়ে এসে জমা হয়। স্থানীয় লোকগাথা অনুযায়ী, এ স্থানে দেবরাজ ইন্দ্রের সঙ্গে দানবদের প্রবল যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে আহত, ক্লান্ত সৈন্যসামন্তদের পুনরুজ্জীবিত করতে দেবরাজ একটি বাণ নিক্ষেপ করায় মাটি থেকে সৃষ্টি হয় ওই প্রস্রবণের। তাই স্থানীয়দের কাছে তির্তা মন্দির সংলগ্ন জল অতি পবিত্র। অনেক দর্শনার্থীই এ স্থানে ভ্রমণ করেন এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রস্রবণের জল মাথায় ছোঁয়ান। মন্দিরের চত্বরে রয়েছে অনেকগুলো ছোট মন্দির ও দীর্ঘ মহীরুহের দল।

তানাহ্ লট

তানাহ লট টেম্পলের সূর্যাস্ত দেখতে যাওয়া হলো এরপর। সমুদ্রের পাদদেশে পাথুরে পাহাড়ে ঘেরা তানাহ লট পর্যটকদের জন্য আরেকটি আকর্ষণের জায়গা। স্থানটি রাজসিক প্রস্তরশৈলী, যা প্রকৃতপক্ষে তীর্থযাত্রীদের জন্য পবিত্রতম একটি জায়গা। পাহাড়ের তিনটি চূড়ায় রয়েছে আলাদা করে তিনটি মন্দির। মন্দিরের দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশিল্প, নির্মল ও শান্ত পরিবেশ মনকে স্নিগ্ধ করবে। মন্দিরগুলো প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরনো। এর কোনো কোনোটি আবার সমুদ্রের জোয়ারে ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সমুদ্রের জোয়ারের পানিতে পদ্মফুলের মতো ভাসতে থাকে এ মন্দির।

সমুদ্রের জোয়ারের পানিতে পদ্মফুলের মতো ভাসতে থাকে এ মন্দির। সোর্স: বৃষ্টি

সমুদ্রের মাঝের এই মন্দিরের কাছে যেতে যেতে সাড়ে পাঁচটা বেজে গেল। এখানে প্রবেশ মূল্য ৬৫,০০০ IDR, বাংলাদেশি টাকায় ২৬০ করে প্রতিজন। আপুর বাপি তাই রেগে গেল এই ভেবে যে, টাকা দিয়ে মন্দির কেন দেখতে যাব! সমুদ্র সৈকত আল্লাহর তৈরি, প্রকৃতির দান, সেসব দেখতে টাকা লাগবে কেন?
যাই হোক, টিকিট কেটেই ওরা ভেতরে গেল। এই প্রথম বালি এসে সমুদ্র দেখা হলো, সমুদ্র সৈকত দেখা হলো। সূর্যাস্ত আর দেখা যায়নি, কারণ সূর্য ছিল না। তারপরেও এত অসহ্য সুন্দর! অনেক ছবি তোলা হলেও যেন কিছুই ক্যাপচার করা যায়নি। একদম ক্রিস্টাল ক্লিয়ার পানি আছড়ে পড়ছিল, তা দেখে মনে হবে অনন্তকাল ধরে যদি দেখা যেত!
তানাহ লটের সৈকত। সোর্স: বৃষ্টি

মেঘবালিকার মনে অনেকদিন ধরেই সমুদ্র আর পাহাড়ের মধ্যকার দ্বন্দ্ব চলে। আজো মেঘে ঢাকা আগ্নেয়গিরি দেখে তার মনে হয়েছিল এটাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দর। আবার এখন তানহা লট মন্দিরের সামনের এই বীচ সেই ধারণা ভেঙে দিল। মনে হচ্ছে নাহ, সমুদ্রই জিতে গেল শেষে। চমৎকার একটা বিকেল কাটলো সমুদ্রের মাঝের মন্দিরের সাথে।
সমুদ্রের মাঝের মন্দির। সোর্স: বৃষ্টি

তবে কোনো বিশেষ বন্ধে বিকেলের দিকে তানাহ লট যেতে হলে খুব ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয়। সাগরের মাঝখানে ভাসমান এই মন্দির দেখতে হলে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ জ্যাম পাড়ি দিতে হয়। সেই সাথে বিশাল জনসমুদ্র পেরিয়ে যেতে হয় সেই সৌন্দর্যের কাছে। অসম্ভব সুন্দর প্রকৃতি তখন পর্যটকের ভারে যেন ত্রাহী ত্রাহী অবস্থায় পৌঁছে যায়। কাজেই ঈদের ছুটি বা পুজোর ছুটিতে তানাহ লটে গেলে উপভোগ করা যাবে না কিছুই।
অসম্ভব সুন্দর প্রকৃতি পর্যটকের ভারে যেন ত্রাহী ত্রাহী অবস্থায়। সোর্স: বৃষ্টি

তানাহ লটেই একটা মার্কেট আছে, যেখানে শপিং করার জন্য অনেক কিছুই পাওয়া যায়। মোটামুটি কেনাকাটা করে নিলো সবাই। এরপর সৈকত থেকে টুকটাক স্যুভনির কিনে হোটেলের দিকে রওনা দিলো ওরা। বিশাল জ্যাম পাড়ি দিয়ে রুমে আসতে আসতে রাত নয়টা বেজে গেল।
দশটায় ডমিনাস পিৎজা থেকে এক্সট্রা লার্জ চিকেন তান্দুরী ফ্লেভার আর চিজি ব্রেডের পিৎজা আর কে এফ সি থেকে ক্রাশার কিনে খেতে খেতে বেজে গেলো রাত বারোটা। আসার পথে মার্ট থেকে টুকটাক কেনাকাটা করা হলো। ওরিও বিস্কিট মাত্র ৬০ টাকা। সত্যিই এখানে জিনিসপাতির দাম তুলনামূলক কম। এরপর হোটেলে ফিরে আসা। এভাবেই শেষ হলো বৃষ্টি আপুদের বালি ভ্রমণের দ্বিতীয় দিন।
ফিচার ইমেজ: আনিকা তাবাসসুম বৃষ্টি

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মেঘালয়ে মেঘবিলাস (উমক্রেম এবং বপহিল ঝর্ণা)

ট্রেকিং নিয়ে যত বিখ্যাত চলচ্চিত্র