দায়িত্বশীল ভ্রমণ সম্পর্কে যে বিষয়গুলো জানতে হবে

পর্যটন সারা বিশ্বব্যাপী বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান পর্যটকদের জন্য পরিবেশগত দূষণ এবং স্থানীয় সম্প্রদায়গুলোর উপরও পড়ছে বিপুল পরিমাণে প্রভাব। আমরা হয়তো কোথাও ভ্রমণের সময় দায়িত্ব গ্রহণের গুরুত্ব সম্পর্কে খুব বেশি ভাবি না। তাই টেকসই এবং দায়িত্বশীল ভ্রমণ নীতির ক্ষেত্রে যদি আমরা নজর রাখি সেক্ষেত্রে ভ্রমণ হয়ে উঠতে পারে আনন্দদায়ক এবং আপনার ভ্রমণের জন্য আরো অনেক মানুষ হতে পারে উপকৃত।

তাই সারা পৃথিবীর যেখানেই ভ্রমণে যাওয়া হোক, ভ্রমণের যে ন্যূনতম দায়িত্ব থাকা উচিত সেটি নিয়ে আমাদের বিস্তারিত জানার প্রয়োজন। সেই বিষয় নিয়ে আজ ভ্রমণের দায়িত্ব-জ্ঞান সম্পর্কে কিছু ধারণা দেবার চেষ্টা করব।

Source: growinguptwo

কেন আমাদের দায়িত্বশীল ভ্রমণ সম্পর্কে চিন্তা করা উচিত?

বর্তমান পৃথিবীর সমস্ত ট্রাভেল ডেসটিনেশনগুলোতে প্রায় এক মিলিয়নেরও বেশি ট্রাভেলার ঘুরে থাকেন, যা দিনের পর দিন ক্রমশ বেড়ে চলেছে। তাই ট্রাভেল ডেসটিনেশনগুলো সম্পর্কে যদি আমাদের সম্যক ধারণা থাকে এবং সেই ধারণা যদি আমরা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারি, তাহলে পরিবেশ এবং মানুষ সকলেই একইসাথে উপকৃত হবে। কোথাও ভ্রমণে গিয়ে আমরা আমাদের যে চিহ্ন ফেলে আসি সেই চিহ্নগুলো সাহায্য করতে পারে আরো হাজার হাজার ভ্রমণার্থীদের। আমাদের একটি মাত্র ভ্রমণই হয়তো অনেক দুর্গম এলাকার স্থানীয়দের জন্য অর্থনৈতিক সংস্থানের ভালো একটি ব্যবস্থা হতে পারে। এইসব কারণেই আমাদের দায়িত্বশীল হয়ে ভ্রমণ করার কথা চিন্তা করতে হবে।

Source: The Common Wanderer

জাতিসংঘ ২০১৭ সালকে ট্যুরিজমের একটি নবযুগ বলেই স্বীকৃতি দিয়েছিল। কারণ এই সালে পৃথিবীর সবথেকে বেশি দর্শনার্থী বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঘুরেছে। স্থানীয়দের সর্বোচ্চ উপকার ঘটেছে। এতে করে উন্নয়নশীল ট্যুরিজম সমৃদ্ধ দেশগুলোতে ভ্রমণ খাতে আয়ের পরিমাণ বেড়েছে। পরিবেশের ক্ষতি কম হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ভ্রমণের নিয়মকানুন সম্পর্কে সচেতনতা বেড়েছে।

আবার কিছু কিছু জায়গায় পর্যটনের ক্ষতিকর দিকগুলোও কমে এসেছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা গিয়েছে ভ্রমণার্থীদের মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ দায়িত্বশীলতার অভাবের জন্য বিশাল পরিমাণ হলেও পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি দেখা গেছে সামাজিক বিশৃঙ্খলা। তাই একজন দায়িত্বশীল ভ্রমণার্থী হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে হলে নিচের বিষয়গুলো ভেবে দেখতে পারেন।

এজেন্সি সম্পর্কিত রিসার্চ সম্পন্ন করুন

কোথাও ভ্রমণে যাওয়ার সময় আপনি যে ট্রাভেল এজেন্সি দ্বারা ভ্রমণের জন্য চিন্তা করছেন সেই এজেন্সি সম্পর্কিত তথ্য রিসার্চ করা উচিত। খেয়াল রাখতে হবে বাছাইকৃত এজেন্সি যেন স্থানীয় কমিউনিটির সাথে যুক্ত হয়। এর ফলে স্থানীয় মানুষজন আপনার জন্য কাজের সুযোগ পাবে। আপনার ভ্রমণের গাইড, পোর্টার, স্থানীয় থাকার জায়গা এবং খাবার-দাবারের ব্যবস্থা যেন স্থানীয় সোসাইটিগুলো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এর ফলে ভ্রমণ স্থানের সম্প্রদায়গুলো আপনার ভ্রমণের ফলে আর্থিকভাবে উপকৃত হবে।

Source: Contours Travel

পরিবেশ রক্ষাকারী গ্রিন-রুলস মেনে চলুন

ভ্রমণের সময় পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান বহন করুন এবং ব্যবহার করুন। যে উপাদানগুলো পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর সেগুলো নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলুন। যেমন, যদি আপনি ভ্রমণের সময় পলিথিন ব্যবহার করেন সে ক্ষেত্রে পলিথিনগুলো সাথে করে বহন করার চেষ্টা করবেন, যা পুনর্ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব হবে।

কিন্তু আপনি যদি সেগুলোকে বন্য অঞ্চলে ফেলে আসেন তাহলে আপনার দ্বারা পরিবেশ দূষিত হবে। প্রাকৃতিক পরিবেশের সৌন্দর্যের মধ্যে থাকার চেষ্টা করুন এবং সেগুলোকে যথাসম্ভব রক্ষা করার চেষ্টা করুন। সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি মনে রাখতে হবে, আপনারা দ্বারা আশেপাশের পরিবেশ যেন কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

Source: NRDC

হোমস্টেতে থাকার চেষ্টা করুন

বিভিন্ন দুর্গম এলাকার স্থানীয় মানুষজন এক – দুই দিন ভ্রমণার্থীদের কাছে তাদের থাকার ঘর ভাড়া দিয়ে তাদের জীবিকা নির্বাহ করার চেষ্টা করে। সেক্ষেত্রে আপনি হোটেলের পরিবর্তে যদি সম্ভব হয় হোমস্টেগুলোতে থাকার ব্যবস্থা করুন। এতে করে আপনি তাদের জীবন এবং জীবিকা নির্বাহের পদ্ধতির অভিজ্ঞতা পেয়ে যাবেন।  আপনার দ্বারা স্থানীয় কমিউনিটি উপকৃত হবে আর্থিকভাবে উপকৃত হবে।

বোতলজাত পানি ব্যবহারের চেষ্টা কম করুন

প্লাস্টিকের বোতলজাত পানিগুলোর প্লাস্টিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এবং প্লাস্টিক সহজে পুনরুদ্ধার করা যায় না। এক্ষেত্রে প্রতিদিন খনিজ পান করার চেষ্টা করুন। এতে করে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমবে। সবুজ প্রকল্পগুলো ভালোভাবে ধরে রাখতে হলে প্লাস্টিকের ব্যবহার যথাসম্ভব কমানো ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। পানি বিশুদ্ধকরণ যে কোনো উপাদান, মেডিসিন যদি বাড়তি থেকে যায়, সেগুলো নিকটবর্তী দুর্গম অঞ্চলগুলোতে দিয়ে আসার চেষ্টা করুন। তাহলে কোনো রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত অবস্থায় স্থানীয়রা সেটা থেকে সাহায্য পাবে।

Source: seabase

অতিরিক্ত পানি ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন

বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণের সময় আমি দেখেছি, হোটেলে প্রতিদিন জনপ্রতি প্রায় ২০০ লিটার পানি ব্যবহার হয়। যে পানিটি পুনরুদ্ধার করার জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে যদি আপনি এবং আপনার সাথে আসা সকলে পানির ব্যবহার কমাতে পারেন এবং বিলাসবহুল ঝরনা এড়িয়ে চলতে পারেন সে ক্ষেত্রে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব থেকে স্থানীয়রা মুক্তি পাবে। তাই ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিলাসিতা এবং অতিরিক্ত যেকোনো কিছুর অপচয় থেকে বিরত থাকা উচিত।

স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখার চেষ্টা করুন

প্রতিটি জায়গায় আলাদা আলাদা স্থানীয় শিল্প-দ্রব্য সামগ্রী পাওয়া যায়। সেগুলো নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া অন্য কোনো স্থানে পাওয়া যায় না। যেমন, নেপাল বা তিব্বতের কোনো দুর্গম গ্রামে আপনি যদি স্থানীয় কিছু দ্রব্য সামগ্রী নিজের পয়সায় কিনে সেগুলোকে সাথে আনেন, এতে আপনার সাথে আপনার ভ্রমণের স্মৃতি হিসেবে সেগুলো থাকবে আর স্থানীয় কারিগরদের অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটবে। আপনি ভাবতে পারেন আমি একা কিনলেই কি সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? কিন্তু আপনি ভাবুন আপনি শুরু করছেন। এরপর স্থানীয় অর্থনীতিতে দর্শনার্থীদের সমর্থন তাদের পুরো সমাজের অর্থনৈতিক মুক্তির কারণ হতে পারে।

Source: TCS World Travel

স্থানীয়দের উপর শ্রদ্ধাশীল হোন

কোথাও ভ্রমণ করতে যাওয়ার পর, আঞ্চলিক সংস্কৃতি, ধর্ম এবং যদি পারেন স্থানীয় পোশাক-আশাকের আচরণবিধি মেনে চলার চেষ্টা করবেন। কারো ছবি তোলার আগে তার অনুমতি নেবেন। স্থানীয় মানুষদের সাথে সৌজন্যমূলক আচরণ করবেন। স্থানীয়দের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হলে নিজের সহ দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হতে পারে।

Source: Epicure & Culture

স্থানীয় জীব বৈচিত্র সম্পর্কে সতর্ক থাকুন

ভ্রমণের সময় যদি খাবারের ব্যবস্থা প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে করতে হয়, এক্ষেত্রে বিপন্ন প্রজাতির প্রাণীগুলো সম্পর্কে আগে থেকে ভালো ধারণা থাকা প্রয়োজন। কিছু অঞ্চল থেকে কিছু কিছু প্রাণী প্রায় বিপন্ন এবং সংরক্ষিত অবস্থায় রাখা হয়েছে। আপনার অসতর্কতাবশত যদি একটি প্রাণীও মারা যায়, তবে তার জন্য আপনাকে দায়ী থাকতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে পারে। তাই স্থানীয় পরিবেশ এবং প্রাণী সম্পর্কিত বিধি-বিধানগুলো ভালোভাবে জেনে রাখা রাখতে হবে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

হাওর এক্সপ্রেসের গল্প

দার্জিলিংয়ের লালমোহন, সাদাটা!