সোলো ট্রাভেলিংয়ের পরিকল্পনা কীভাবে করবেন?

Young woman with backpack standing on cliff's edge and looking to a sky with raised hands

নতুন ট্রাভেলারদের মাথায় সবসময় একটি চিন্তা থাকে, ট্রাভেল ডেস্টিনেশন সম্পর্কে কীভাবে রিসার্চ করবে? এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ কীভাবে নতুন কোনো জায়গায় সম্পূর্ণ একা একা যাওয়া যায়। তার আগে কিছু প্রশ্ন মাথায় আসে, আপনি কোথায় যাবেন? আপনার কী করা উচিৎ? আপনার পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে, কোথায় এবং কার কাছে গেলে আপনি সঠিকভাবে উত্তরগুলো পাবেন?

বিগত কয়েক বছর ধরে আমি সোলো ট্রাভেলিং নিয়ে মোটামুটি রিসার্চ করেছি। আমার অভিজ্ঞতা থেকে যতটুকু মনে হয়, ট্রাভেলিং করার আগে কিছু স্টেপ যদি ফলো করা যায় তাহলে সব কিছু সহজে পরিকল্পনা করা সম্ভব।


Source: Bing Travel

অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় ট্রাভেলার, ভ্রমণের জায়গা সম্পর্কে অতিরিক্ত চিন্তা করতে করতে অস্থির হয়ে যান। যদি স্টেপগুলো ফলো করা যায় তবে, আমার মনে হয় ট্রাভেলারের কিছুটা হলেও সময় বাঁচবে, টাকা বাঁচবে, মাথা ব্যথাও কম হবে এবং কনফিউশনগুলো দূর হবে। তো একটা চার্ট করা যাক এ ব্যাপারে।

  • জায়গা সম্পর্কে অনলাইন রিসার্চ।
  • জায়গাটা কি সোলো ট্রাভেলারদের জন্য উপযোগী কিনা সেটা রিসার্চ।
  • ভ্রমণের দেশের ভিসা পরিস্থিতি।
  • সেখানে গিয়ে আপনি কী দেখতে চান বা কী করতে চান ।
  • অফলাইন ম্যাপ ডাউনলোড।
  • হোটেল বুক করা।
  • সব থেকে সহজে হোটেলে পৌঁছানোর উপায়।
  • সেখানকার সম্ভ্যব্য বিপদ আপদ সম্পর্কে রিসার্চ।
  • বাড়িতে যোগাযোগের উপায়।
  • পরিচিতদের মধ্যে কেউ সেখানে গিয়েছে কিনা।

অনলাইন রিসার্চিং

প্রথমেই আসি অনলাইন রিসার্চ নিয়ে। প্রথমত যেখানে যেতে চান, সেই জায়গা সম্পর্কে অনলাইনে বিভিন্নভাবে তথ্য নেয়ার চেষ্টা করতে হবে। যেমন ফেসবুক ইনস্টাগ্রামের মতো বিভিন্ন ধরনের সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রাভেল ডেস্টিনেশনগুলো সম্পর্কে তথ্য দেওয়া থাকে। সেখান থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন।


Source: Giograph Net

অথবা বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং মিডিয়া ফলো করে সেখান থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করে তারপর সময় ও সুবিধার কথা মাথায় রেখে নিজের বাজেট নির্ধারণ করতে হবে। এখন ইন্টারনেটে সব ধরনের জায়গা সম্পর্কে প্রায় সব ধরনের তথ্যই দেওয়া থাকে। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন।

জায়গাটি কি সোলো ট্রাভেলারদের জন্য নিরাপদ?

নিরাপত্তা সব সময় একটি বড় বিষয়। ইচ্ছামতো যেখানে খুশি সেখানে চলে গেলেই সোলো ট্রাভেলের সফলতা আসে না। বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বিভিন্ন রকম সোলো ট্রাভেলাররা অনেক রকম বিপদে পড়ে থাকেন। তাই অবশ্যই আপনাকে ট্রাভেলের ক্ষেত্রে বিপদের সম্ভাবনাকে এড়িয়ে চলতে হবে। এক্ষেত্রে কিছু ব্যাপার মাথায় রাখা উচিৎ।

যেমন, জায়গাটা কী ধরনের কার্যক্রমের জন্য জনপ্রিয়? মাথায় রাখতে হবে আপনি যেখানে ঘুরতে যাবেন, সেখানে অবশ্যই কোনো একটিভিটি থাকার কথা। সেখানে কি রক ক্লাইম্বিং হয়? আইস ক্রাফটিং বা স্কুবা ডাইভিং করা যায়? নাকি অন্য কোনো জায়গা যেখানে স্বাভাবিকভাবে সবাই ঘুরতে যায়?


Source: World Solo Travel

আরেকটি ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে সেটি হচ্ছে কোনো ফেস্টিভ্যালের জন্য বিখ্যাত জায়গা হতে পারে। যদি কোনো জায়গা ফেস্টিভেলের জন্যে বিখ্যাত হয়ে থাকে। তবে সেই জায়গায় সোলো ট্রাভেলিং করা সম্পূর্ণরূপে নিরাপদ বলে আমার মনে হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেক ধরনের মানুষ থাকবে তাই আপনার কখনো একা লাগবে না।

এরপরের বিষয়টি হচ্ছে জায়গাটা জনপ্রিয় কিনা? এখন আপনি হুট করে নতুন একটা জায়গা আবিষ্কারের নেশায় বের হয়ে পড়তে পারেন। সেখানে আপনার নিরাপত্তা সম্পর্কে আপনি বা অন্য কেউ নিশ্চিত হতে পারবে না। হতে পারে এমন একা একা চলে যাওয়ার পর দেখলেন হোটেলের ভাড়া অনেক বেশি অথবা একা একা গিয়ে আপনি দুর্ঘটনার শিকার হলেন। এসব খুঁটিনাটি বিষয়ে রিসার্চ করে পরিকল্পনা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

ভিসা পরিস্থিতি

আপনার ট্রাভেল ডেস্টিনেশন যদি দেশের বাইরে হয়, তাহলে অবশ্যই আপনাকে ভিসার ব্যাপারটা ভাবতে হবে। কারণ আপনি কোথায় ভ্রমণ করতে যাচ্ছেন সেখানকার ভিসার পরিস্থিতি কী, কত দিনে ভিসা পাবেন বা ভিসার ফিস কত এগুলো মাথায় রেখে আপনাকে প্লান করতে হবে।


Source: Schengen

যেমন ধরা যাক বাংলাদেশ থেকে কেউ ভারতে যেতে চায়। তার সকল কাগজ জমা দিলে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভিসা পাবার নিশ্চয়তা থাকে। কিন্তু যদি ধরেন থাইল্যান্ড অথবা ইন্দোনেশিয়া এমন কোনো দেশ যে দেশে ভিসা প্রসেস হতেই তিন থেকে চার মাস সময় লাগে, অথবা ভিসা ফিস ব্যয়বহুল, সেখানে ট্রিপ করার জন্য অবশ্যই আপনাকে দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পনা করতে। হবে তাই ভিসার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।   

সেখানে গিয়ে কী করবেন?

এর পরের ব্যাপার হচ্ছে সেখানে আপনি কী করবেন। এটি অবশ্য জানা থাকার কথা, কারণ আপনি এই জায়গাটি যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন সেখানে গিয়ে কী করবেন সেটা নির্ধারণ করে।


Source: World Solo Travel

এছাড়া কিছু ব্যাপার থাকে, যেমন ধরেন আপনার কিছুটা বাড়তি সময় হাতে থেকে গেছে। সেই সময় আপনি কী করবেন? একটি নির্দিষ্ট প্লান করে ফেলতে পারেন। কোনদিন কী করবেন, কোন দিনের খরচ কত হবে- এগুলো পরিকল্পনা করে রাখা জরুরি।

অফলাইন ম্যাপ ডাউনলোড

বর্তমান সময়ে গুগল ম্যাপের সুবিধার্থে আমরা অনেক কিছুই সহজে পেয়ে যাই। সেরকম একটি জিনিস হচ্ছে অফলাইন ম্যাপ। যেখানে যাবেন সেখানকার একটি অফলাইন ম্যাপ যদি আপনি আপনার ফোনে ডাউনলোড করে রাখেন, সেক্ষেত্রে আপনি ইন্টারনেটের কানেকশন ছাড়াই চারপাশটা ভালোভাবে দেখতে পারবেন।

ট্রাভেল ডেস্টিনেশনের আশেপাশে কোথায় দোকান আছে, কোথায় হোটেল আছে বা কোথায় বিস্তীর্ণ প্রান্তর সেগুলো আপনি ইন্টারনেটের কানেকশন ছাড়াই পেয়ে যাবেন। তাই অফলাইন ম্যাপ ডাউনলোড করে নিলে সুবিধাই হবে।

হোটেল বুকিং

যখন থাকার জায়গার ব্যাপারটা মাথায় আসে তখন প্রথমে মনে হয় হোটেল বুকিং কীভাবে করব। অনেকে প্রথমেই বিভিন্ন রকম ওয়েবসাইটে ঢুকে হোটেল বুক করে ফেলে। কিন্তু কোথায় হোটেল বুক করছেন, কম খরচ দেখেই দূরে হোটেল বুক করে ফেলছেন কিনা?


Source: Hotelnet

এ ব্যাপারগুলো নিশ্চিত হওয়ার জন্য প্রথমে ম্যাপে ঢুকে আপনার নির্ধারিত জায়গার আশেপাশে কোন হোটেল ভালো হবে, খরচ, মান, খাবার ব্যবস্থা, হোটেল থেকে যানবাহনের দূরত্ব এই ব্যাপারগুলো মাথায় রেখে হোটেল বুক করলে সহজেই আপনি আপনার কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাতে বা সেখান থেকে বের হতে পারবেন।

সব থেকে সহজে হোটেলে পৌঁছানোর উপায়

এরপরের বিষয়টি হচ্ছে কীভাবে সহজে হোটেলে পৌঁছাবেন। ট্রান্সপোর্টেশনের ব্যাপার যখনই আসে তখন মাথায় আসে, হয় আপনি উবার নিতে পারেন, নাকি একটি ট্রেন নিলে আপনার জন্য বেশি সুবিধাজনক হবে? আপনার খরচ কমে যাবে অথবা পাবলিক বাসগুলো সচরাচর হোটেলে আশপাশ দিয়ে যায় কিনা? আপনার হোটেল যে কোনো যাতায়াত ব্যবস্থা থেকে অধিক দূরে কিনা? এই সম্পর্কিত রিসার্চের ফলে পৌঁছানোর পর যাতায়ত ব্যবস্থা নিয়ে মাথাব্যথা থাকবে না।


Source: lonely planet

সেখানকার সম্ভ্যব্য বিপদ আপদ ও দালাল সম্পর্কে রিসার্চ

এবার আসি ভ্রান্ত ধারণা, দালাল এবং সেখানকার বিপজ্জনক পরিস্থিতি নিয়ে। অবশ্যই কোথাও যাওয়ার আগে সেখানকার পরিবেশ, রাজনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থা বিচার-বিবেচনা করে তারপর সেখানে যাওয়া উচিৎ। এই ধরুন একজন মানুষ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশনে নামার পর সে কমপক্ষে ১০-১৫ জন দালালের মুখোমুখি হয়ে পড়বেন। অনেকেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দালালের হাতে নিজের মালামাল তুলে দেন, অথবা দালাল দিয়ে কোনো কাজ করান।

সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত খরচ হয় এবং মালামাল হারিয়ে যাওয়ার ভয় থাকে। আবার কোথাও যাবার পর, সেখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা সামাজিক পরিস্থিতিতে যদি অস্থির অবস্থা বিরাজ করে তাহলে আপনার ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে। তাই যাবার আগে সেখানকার সম্ভাব্য বিপজ্জনক বিষয়গুলো নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে ভুলবেন না।

বাড়িতে যোগাযোগের উপায়

আপনি কোথাও যাবার পর বিশেষ করে যদি অন্য দেশে হয় তাহলে একটি সিম কার্ড কিনতে হবে। রিসার্চ করতে হবে সিমের দাম এয়ারপোর্টের কাছে বেশি নাকি সেখান থেকে একটু দূরে সরে গেলে আর কম দামে পাবেন। সেই দেশ অন্য কোনো দেশের বাসিন্দাদের কাছে সিম বিক্রি করে কিনা এটাও দেখে যেতে পারেন। কীভাবে বাড়িতে যোগাযোগ করবেন সেটা নিশ্চিত হয়ে তারপর দেশ ত্যাগ করা উচিৎ।


Source: Caetravelaruk

আপনি যেখানে ঘুরতে যেতে চান সেখানে কোনো ধরনের নেটওয়ার্ক আছে কিনা, সেখান থেকে আপনি বাড়িতে যোগাযোগ করতে পারবেন কিনা এই ব্যাপারে বিশেষ নজর দিতে হবে। এছাড়া জরুরী অবস্থায় আপনি কীভাবে পরিচিতের সাথে যোগাযোগ করতে পারবেন এই ধরনের তথ্যও জেনে নিতে হবে।

আপনার পরিচিতদের মধ্যে কেউ সেখানে ঘুরে এসেছে কিনা

সর্বশেষ ব্যাপারটি হলো, আপনার পরিচিত কেউ সেখানে ঘুরে এসেছে কিনা। অনেক সময় হয়তো দেখা যাবে আপনি কোনো কোনো জায়গায় ঘুরতে গিয়ে খুব বাজে পরিস্থিতির শিকার হয়ে যখন ফিরে এসেছেন, তখন দেখলেন আপনার বন্ধু সেখান থেকে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে এসেছে। সেক্ষেত্রে আপনার মনে হবে বন্ধুর সাহায্য পেলে আপনার হয়তো এই অবস্থা হতো না।

যাবার আগে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে খোঁজ খবর নিয়ে দেখুন আপনার পরিচিত কেউ গিয়েছে কিনা। যদি গিয়ে থাকেন তবে, তার থেকে সব ধরনের তথ্য নিতে পারেন। তাহলে সহজেই তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে, আপনার ভ্রমণ নিরাপদ এবং স্বাচ্ছন্দময় হয়ে যাবে। একা একা ভ্রমণের ক্ষেত্রে আমি এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করে তারপর ভ্রমণে বের হই। আমার মনে হয় এই বিষয়গুলো অনুসরণ করলে, যে কেউই একা একা এবং স্বাচ্ছন্দে কোনো জায়গা থেকে ঘুরে আসতে পারবেন।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্কিয়িং এবং স্নো-বোর্ডিংয়ের জন্য সেরা ৭টি স্থান

গোমুখ অভিযান: ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ও চিরবাসা