ইথিওপিয়া-কাঁচা মাংস যেখানে সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার

ইথিওপিয়ার নাম শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে আসে ক্ষুধা-দারিদ্রে নিমজ্জিত আফ্রিকার একটি দেশ। অনেকে আবার দুর্ভিক্ষের বিকল্প শব্দ হিসেবেও ইথিওপিয়া শব্দটা ব্যবহার করে। আমি যখন ইথিওপিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেই তখন কিন্তু এসব চিন্তা মাথা থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করেছি। এর কারণ হচ্ছে আমার কয়েকজন সহকর্মী ইথিওপিয়ায় চাকরি করেছে। বিভিন্ন সময় ফেইসবুকে তাদের দেয়া ছবি আমি দেখেছি। পরিচিত একজন পাইলটকেও দেখেছি ইথিওপিয়ায় প্রশিক্ষণ নিতে যেতে। এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য আমি জানতাম। বিশ্বব্যাংকের হিসেব অনুযায়ী, ২০১৭ সালে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করার গৌরব ইথিওপিয়ার দখলে। আদ্দিস আবাবার বোলে এয়ারপোর্ট নেমেই কিছুটা বুঝতে পারলাম ইথিওপিয়ান এয়ারের বিশাল বহর দেখে।

বোল এয়ারপোর্ট-আদ্দিস আবাবা: ছবি লেখক

প্রথমদিন আমি আমার মতো হোটেলের কাছে একটা রেস্টুরেন্টে ডিনার করলাম। পরেরদিন দুপুরে যখন প্রশিক্ষণে অংশ নিতে যাই, দুপুর বেলায় খাবার টেবিলে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল চমক। ইনজেরা ইথিওপিয়ার সবচেয়ে প্রচলিত খাদ্য। তেফ নামে একধরনের শস্য থেকে রুটির মতো করে তৈরী করে ইনজেরা বানানো হয়। অনেকটা আমাদের চিতই পিঠার মতো, তবে বেশ নরম আর একটু টকযুক্ত স্বাদ। এই ইনজেরা ইথিওপিয়ানরা খায় প্রধানত গরুর মাংস দিয়ে। সেটাও আমার কাছে কোনো বিষয় না, আঁতকে উঠলাম যখন শুনলাম এক্ষেত্রে কাঁচা মাংস দিয়ে ইনজেরা খাওয়াটাই ইথিওপিয়ায় সবচেয়ে জনপ্রিয়! আমার তো চোখ কপালে উঠে গেল, কী ভয়াবহ কথা কাঁচা মাংস।
ইথিওপিয়ান বন্ধুরা জানালো তাদের দেশে এটা খুব স্বাভাবিক ব্যপার। ইথিওপিয়ার একসময় মূল জীবিকাই ছিল গবাদি পশু পালন করা। এখনও দেশটির একটি বড় অংশ গবাদি পশু পালন করে জীবন ধারণ করে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে মাংস রপ্তানি করে আরব আমিরাত, সৌদ আরবসহ বেশ কয়েকটি দেশে। দেশটির মাথাপিছু গরুর মাংস খাওয়ার পরিমাণ বছরে ১৪ কেজির বেশি।
অভিজাত রেস্তোরাঁয় সাজিয়ে রাখা কাঁচা মাংস-ছবি লেখক

জানলাম বিভিন্ন ধরনের কাঁচা মাংস খায় তারা। একেবারে কুচি কুচি করে কিমার মতো তৈরী করা কাঁচা মাংসটাই সবচেয়ে জনপ্রিয়, যার নাম কিটফো। কাঁচা মাংসের সাথে মিটমিটা নামের এক ধরনের মরিচের গুড়ো আর নিতের কিব্বে নামের এক ধরনের মাখন দিয়ে মেরিনেট করে তৈরী করা হয় এ কিটফো। এরপর ইনজেরা দিয়ে জড়িয়ে খাওয়া হয়। যারা একেবারে কাঁচা খেতে পারে না, তাদের জন্য সামান্য সেদ্ধ করা মাংস দেয়া হয়। ভয়াবহ ব্যপরাটা ঘটে বিয়ে বাড়িতে। সেখানে গরুর একটা রান ঝুলানো থাকে, বিয়েতে আগত অতিথিরা সেই রানের পাশে রাখা ছুরি দিয়ে পছন্দমতো অংশ কেটে নিয়ে কাঁচায় সেটা খায় ইনজেরা দিয়ে। শহরের অনেক মাংসের দোকান বা রেস্তোরাঁয়ও আছে একই ব্যবস্থা। প্রথমদিন দেখে আজ আমাদের রান্না করা মাংস দেয়া হয়েছে। তবে অচিরেই দেয়া হবে কাঁচা মাংস সেটা বলে দিতে ভুললো না আমাদের প্রশিক্ষণ সমন্বায়ক ইংগাদা।
পরের দিন দুপুরে খাবার সময় দেখলাম ইথিওপিয়ান সব বন্ধুরা ভীড় করেছে একটি আইটেমের সামনে। লাল রঙের একেবারে কিমার মতো মাংস দেখেই আমার মনে হলো এই সেই কিফটো। ইথিওপিয়ান এক বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করতেই হেসে সায় দিলো এবং সেই সাথে আমার পাতে উঠিয়ে দিলো। আমি বললাম খুব অল্প পরিমাণে দাও দেখি সহ্য করতে পারি কিনা। মনে মনে চিন্তা করছিলাম, খোদা না করুক কোনো অ্যাডভেঞ্চারে গিয়ে এমন পরিণতি হতে পারে যে কাঁচা মাংস না খেলে জীবন বাঁচানো দায় হবে, সেদিনের জন্য আজকের এ খাওয়াটা হয়তো কাজে লাগবে। খেতে যখন বসলাম আমার টেবিলে ছিল ঘানার মেয়ে প্যাট্রিসিয়া। ওর প্লেটেও দেখলাম কিটফো রয়েছে। যাক, দলের লোক আরেকজন পাওয়া গেছে ভেবে খুশিই হলাম।
ইথিওপিয়ান দুপুরের খাবার-এক কোনে আছে কিটফো-ছবি লেখক

খেতে বসে প্যাট্রিসিয়াকে বললাম, আমি আজ প্রথম কিটফো খেয়ে দেখতে চাচ্ছি কেমন লাগে। কাঁচা মাংস আমি জীবনে খাইনি। প্যাট্রিসিয়া অবাক হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল, কাঁচা মাংস কোথায় পেলে? আমি ততোধিক অবাক হয়ে ওকে বললাম তুমিওতো নিয়েছে। সাথে সাথে সে চিৎকার দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে গেল, আর তার প্লেট থেকে কিটফো আমার প্লেটে ঢেলে দিল। তারপর ছুটলো তার চামচগুলো পাল্টিয়ে আনতে। ফিরে এসে আমাকে বললো সে কিটফোকে সালাদ মনে করে প্লেটে নিয়েছিল, আমি তাকে বাঁচিয়েছি। পাশে বসা লিপি আপার পাতেও একটু করে ছিল কিটফো, আমাদের আলোচনা শুনে উনিও সেটা ঢেলে দিলেন আমার প্লেটে! বোঝানোর চেষ্টার করলাম, একটু করে নিয়েছিলাম, শুধু কেমন টেস্ট বোঝার জন্য। কে শোনে কার কথা। এবার ভয়াবহ পরীক্ষা দিতে বসলাম, কাটা চামচের মাথায় সামান্য পরিমাণ মাংস লাগিয়ে মুখে দিলাম। স্বাদ খারাপ একথা বলবো না, তবে পেটের নাড়িভুড়ি মোচড় দিয়ে উঠলো।
নিজেকে বুঝালাম, শক্ত হতে হবে, এর মধ্যে ইথিওপিয়ান আরেক কাসিম বললো ইনজেরা দিয়ে খাও ভালো লাগবে। এবার ইনজেরার মধ্যে দিয়ে খাওয়া শুরু করলাম। টক স্বাদের ইনজেরার মধ্যে কিটফো বেশ মানানসই একটা স্বাদ মনে হচ্ছে। কষ্ট করে পুরোটাই শেষ করলাম। কিন্তু তারপর থেকেই পেটে অস্বস্তি শুরু হলো, মনে হচ্ছিল গলার কাছে উঠে আসছে মাংসের চর্বির গন্ধ। আসলে মেরিনেট করা এই মাংসে এ ধরনের কোনো গন্ধই ছিল না। বুঝতে পারলাম পুরো বিষয়টাই মানসিক। রাতে যখন রুমে ফিরে গেলাম তখন আমার পেট খারাপ হয়ে গেল।
প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী দলের সাথে লেখক-নিচ ডানদিক থেকে ২য়-ছবি কাসিম

দুই সপ্তাহ ট্রেনিংয়ে অন্তত ৭ দিন দেয়া হয়েছিল বিভিন্ন ধরনের কিটফো। কোনোদিন আধা সেদ্ধ, কোনোদিন পুরোপুরি কাঁচা। ইথিওপিয়ায় বন্ধু-বান্ধবরা ওটার কাছেই ভিড় করছিল প্রতিদিন। একদিন খেয়ে আমার যে শিক্ষা হয়েছে, পুরো ট্রিপে আর ধারে কাছে যাইনি কিটফোর।
ফিচার ইমেজ: cooksipgo.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অপরূপ রূপের সমাহার জার্মানির ন্যাশনাল পার্ক আইফেল

অ্যানিমেশনের জগতে সত্য ভ্রমণ!