তিলাবনী পাহাড়ে জুমারিং-র‍্যাপ্লিং ক্লাসের বৃত্তান্ত

তিলাবনী পাহাড়ে রক ক্লাইম্বিং কোর্সের তৃতীয় দিনটি ছিল সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এই দিন রক ক্লাইম্বিংয়ের পাশাপাশি উঁচু উঁচু পর্বতগুলোতে ওঠা ও নামার জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন কলাকৌশল আমাদের দেখানো হয় এবং সেটা প্র্যাকটিক্যালি করানো হয়। এর মধ্যে অন্যতম দুটি ব্যাপার হচ্ছে জুমারিং এবং র‍্যাপ্লিং। এর ক্ষেত্রে বেশ কিছু কলা কৌশলও ব্যবহার করা হয় ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে। যেমন যখন এই যন্ত্রপাতিগুলো ছিল না, সে সময়ের মানুষ কীভাবে র‍্যাপ্লিং করে পর্বত থেকে নামতো সেটি আলাদাভাবে দেখানো হয়।

এছাড়া জুমারিংয়ের বেশ কিছু কলাকৌশল দেখানো হয়। যার সাহায্যে মূলত পর্বতে উপরের দিকে উঠতে হয়। অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও খুব ভোর সকালে শুরু হলো আমাদের পিটি। ৬টা থেকে সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত একটানা পিটি করার পর স্বাভাবিকভাবেই শীতের সকালে ঘাম নেমে আসে দরদর করে সারা শরীরে। শীতের কাপড়গুলো খুলতে খুলতে কোনোমতে ক্যাম্পে এসে পৌঁছাই। যত দ্রুত সম্ভব সকালের খাবার খেয়ে পাহাড়ের পাশটাতে যেতে হবে। কারণ তখন দ্রুত আমাদের এক্টিভিটিগুলো সম্পন্ন করতে হবে।

জুমারিং ক্লাসের জন্য লম্বা লাইন। ছবিঃ লেখক

সেদিন খাবার খাওয়ার পর কম সময় পেলাম হাতে। মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে যার যার ব্যাগ রেডি করে আমরা রওনা দিলাম রক সাইটের উদ্দেশ্যে। আজ সাথে রয়েছে অনেক ভারি ভারি যন্ত্রপাতি। যেগুলো ব্যবহার করে আমরা শিখব কীভাবে যন্ত্রপাতিগুলো ব্যবহার করে পাহাড়ে উঠতে হয় এবং সহজে পাহাড় থেকে নামতে হয়।

যখন পাহাড়ের নিচে গিয়ে পৌঁছেছি তখনও আমাদের ইনস্ট্রাক্টরগণ রোপ ফিক্স করে পারেননি। এটা করতে তখনো বেশ খানিকটা সময় লাগবে তাই আমাদের নির্দেশ দেয়া হলো পাহাড়ের নিচে বসেই গল্প, আড্ডা করার জন্য। আমরা নিচে বসে আধা ঘণ্টা সময় ধরে বিভিন্ন বিষয়ে সবাই মিলে কথা বলতে লাগলাম। ৫৩ জন মানুষ বাংলাদেশ এবং ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে এসেছে। তাই কথার ফুলঝুরি যেন ফুরায় না। আমরা কথা বলতে বলতে হঠাৎ সিনিয়র ইনস্ট্রাক্টর আমাদের ডাক দিলেন উপরে যাওয়ার জন্য, তার মানে দড়ি ঠিকঠাকভাবে জায়গা মতো বসানো হয়ে গিয়েছে।

জমাট আড্ডা ভেঙে গেলো। ছবিঃ স্বর্ন কোমল শাহা

প্রথমে আমাদের চার রকম র‍্যাপ্লিং দেখানো হলো। এর বিষয়টি হচ্ছে ডিসেন্ডিং অর্থাৎ পাহাড় থেকে নিচের দিকে নামা। দড়ি ব্যবহার করে পাহাড় থেকে যখন নিচের দিকে নামা হয় সেই পদ্ধতিকে তখন র‍্যাপ্লিং বলে। আমাদের চার রকম র‍্যাপ্লিং দেখানো হলো। তার মধ্যে তিনটি যন্ত্রপাতি ছাড়া করা হয় অর্থাৎ যখন যন্ত্রপাতিগুলো আবিষ্কার হয়নি তখন মানুষ এভাবে পর্বত পাহাড় থেকে নিজেদের নামাত। এদের মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে সোল্ডার র‍্যাপ্লিং। যেটি আমাদের সবাইকে করতে দেয়া হয়েছিল।

এই মালভূমিতে বাস করে অজস্র হনুমান। ছবিঃ লেখক

কোনো রকম কোনো যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করে পায়ের ফাঁক দিয়ে এবং ঘাড়ের উপর দিয়ে দড়িকে নিয়ে আস্তে আস্তে নিচের দিকে নামতে হয়। প্রথমেই আমাদের সকলকে সোল্ডারিং করতে দেওয়া হলো। সোল্ডারিং করার সময় সব থেকে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে মোটা একটি প্যান্ট পরিহিত থাকতে হয়। না হলে দড়ির ঘষায় প্রচণ্ড ব্যথা লাগে পেছন দিকটায়। অনেকেই যারা বাড়তি প্যান্ট নিয়ে যায়নি বা পরতে ভুলে গেছে তাদের অবস্থা দেখার মতো ছিল।

ওই নিচে চলছে শোল্ডার র‍্যাপ্লিং। ছবিঃ লেখক

শোল্ডার র‍্যাপ্লিং শেষ হওয়ার পর আমরা যারা সোল্ডারিং শেষ করে ফেলেছি তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় ওভার হ্যাং করার জন্য। ওভার হ্যাং বলতে বোঝায় যেখানে পাথর ৯০ ডিগ্রীর বেশি বাঁকা হয়ে নিচের দিকে চলে গেছে সেটিকে। ওভার হ্যাং করার জন্য আমাদের একটি ২০০ ফিট উঁচু দেয়াল বাছাই করে সেখানে রোপ সংযুক্ত করা হয়। এরপর সেখান থেকে আমরা যন্ত্রপাতিগুলো ব্যবহার করে নিচের দিকে নামতে শুরু করি।

অনেকেই ওভার হ্যাং ব্যাপারটা ভয় পাচ্ছিল করার জন্য। কারণ ১০ ফিটের মতো একটি হ্যাং ছিল যেখানে। সামান্য ভুল ত্রুটির জন্য মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে যেতে পারে। কিন্তু ইনস্ট্রাক্টরগণ অতি সতর্কতার সাথে আমাদের সকল ইনস্ট্রাকশন দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাই কোনো রকম কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই আমরা সকলে ওভারহ্যাং র‍্যাপ্লিং বিষয়টি আয়ত্ত করে ফেলি।

উপর থেকে নামার সময় এই হ্যাংটাই লাফ দিয়ে পেরোতে হয়। ছবিঃ লেখক

আজকের সারাদিন তো শুধু র‍্যাপ্লিং দিয়েই কাটানো হলো। এছাড়া তিন-চারটি রোপ বাদে বাকি দলের সদস্য যারা অপেক্ষমান ছিলেন অধিকাংশই ছিল গল্পে মশগুল। সেদিন রাতে ছিল ক্যাম্প ফায়ার। তাই দলের সবাই মিলে পরিকল্পনা করছিল ক্যাম্প ফায়ারে কীভাবে একটি সুন্দর রাত্রি উপহার দেওয়া যায় সকলকে।

অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করতে করতে আমাদের মনে হলো একটি স্মারকলিপি বানানো দরকার। যেটি হাওড়া মাউন্টেনিয়ার অ্যান্ড ট্রেকিং এসোসিয়েশনকে ইনভাইট করতে ব্যবহার করা হবে। বিভিন্ন ধরনের বুদ্ধির মাঝখানে জিয়া ভাই একটি বিশেষ বুদ্ধি দিলেন সকলকে।

জিয়া ভাই নিজেই করছিলেন স্মারক তৈরির কাজ। ছবিঃ লেখক

আমরা একটি পাথরের স্লেটের উপর ৩৬তম রক ক্লাইম্বিং কোর্স লিখে সেটিকে স্মারকলিপি হিসেবে ব্যবহার করবো। সারাদিন র‍্যাপ্লিং এবং জুমারিং শেখার পর আমাদের সন্ধ্যার সময় আবার ক্যাম্প সাইটে নিয়ে আসা হলো। সাইট থেকে আমরা সমগ্র অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা শেষ করে ফেললাম। এরপর রাতের বেলা আমাদের ক্যাম্পে কাঠ খড় এবং জ্বালানি জোগাড় করে বিশাল আগুন জ্বালানো হলো। চারদিক ঘিরে আমরা সবাই বসে আছি মাঝখানে জ্বলছে দাও দাও করে আগুন। একের পর এক সবাই এসে তাদের ক্রিয়েটিভিটি দেখিয়ে যাচ্ছে।

জ্বলছে ক্যাম্প ফায়ার, চলছে গান। ছবিঃ স্বর্ন কোমল শাহা

কেউ গান গাইলো, কেউ কবিতা আবৃতি করল, কেউ বা নাটক করল, কেউ আবার দেখাল অরিগ্যামি শো। সব শেষ হতে হতে প্রায় রাত দশটা বেজে গেছে। নিয়ম অনুযায়ী খাবারের বাঁশি পড়ল। এই নিয়মের থেকে বাইরে ছিলেন না কোনো ইনস্ট্রাক্টর বা ক্যাম্পের কোনো কর্মচারী কর্মকর্তা। সকলেরই নিয়ম মেনে চলতে হতো তাই আমরা দ্রুত টেন্টের দিকে চলে গেলাম।

তারপর রাতের খাবার খেতে গেলাম। রাতের খাবার খাওয়ার পর অন্যান্য দিনের মতোই হাতে খুব বেশি সময় ছিল না। যার যার টেন্টে ফিরে গেলাম কারণ আগামীকাল শেষ দিন। একটি বিশেষ পরীক্ষা হবে আমাদের রক ক্লাইম্বিং নিয়ে। সকলের মনে তখন একটা লুকোনো উত্তেজনা বিরাজ করছে।

রুট ও খরচের খসড়া:

কলকাতা থেকে আগ্রা অথবা আনারা চলে আসতে হবে ট্রেনে অথবা বাসে করে। এখান থেকেই মিনিট্রাক অথবা সি এন জি ভাড়া করে চলে আসা যাবে তিলাবনি পাহাড় বা তিলাবনি ক্যাম্প সাইটে। কোনো গ্রুপের সাথে গেলে এই কোর্সের খরচ পড়বে হাওড়া টু হাওড়া ৩,৫০০ – ৮,০০০ টাকা পর্যন্ত।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নৈনিতালের অভিজাত নানক হোটেল

হাওর এক্সপ্রেসের গল্প