দুর্গম ধুপপানি ঝর্ণা ভ্রমণের আদ্যোপান্ত

পৃথিবীতে যে কয়টি অদ্ভুত ও রূপ বৈচিত্র‍্যে অনন্য প্রাকৃতিক নিদর্শন রয়েছে তার মধ্যে ঝর্ণা বা জলপ্রপাত অন্যতম। সুউচ্চ পাহাড় কিংবা উঁচু স্থান হতে বেয়ে পড়া অবিরাম জলধারা খুব সুন্দর দৃশ্যের সৃষ্টি করে।

তাই ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে ঝর্ণা বরাবরের মতোই আকর্ষণীয় স্থান। দেশের নানা প্রান্তে বহু ছোট বড় ঝর্ণা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পাহাড়ি এলাকায় ঝর্ণার দেখা পাওয়া যায় সবচেয়ে বেশি।

উলুছড়িতে ট্রলার বদলে ছোট ডিঙ্গি নৌকায় চড়ে বসতে হয়; সোর্সঃ লেখক

বাংলাদেশের প্রধান তিনটি পাহাড়ি জেলার একটি রাঙ্গামাটি। পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এর আনাচে কানাচে বহু ঝর্ণার খোঁজ পাওয়া যায়। আবার, প্রতিনিয়ত এখানে নতুন নতুন ঝর্ণা আবিষ্কার হচ্ছে। এই জেলারই অন্যতম সুন্দর ঝর্ণাটির নাম ধুপপানি ঝর্ণা।

সারা বছরই পানি থাকা এই ঝর্ণা বর্ষাকালে ফুলে ফেঁপে উঠে স্বমহিমায়। ঝর্ণা ভ্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় বর্ষাকাল হলেও এসময়টায় ঝর্ণাগুলোর দানবীয় রূপ অনেক সময় ভ্রমণকারীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যাই হোক, আজকের লেখা সাজিয়েছি রাঙ্গামাটির এই ধুপপানি ঝর্ণা নিয়ে।

ধুপপানি ঝর্ণায় যাওয়ার ঝিরিপথ; সোর্সঃ লেখক

ধুপপানি ঝর্ণা

রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলার অন্তর্গত উলুছড়ি নামক স্থানে অবস্থান প্রকৃতির এই অদ্বিতীয় সৃষ্টির। রাঙ্গামাটি জেলা সদর হতে বিচ্ছিন্ন এই উপজেলায় যাওয়ার কোনো স্থলপথ নেই। ধর্মীয় দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জায়গাটি বৌদ্ধ ধর্মের তীর্থভূমি হিসেবে বিবেচিত।

ধুপপানি ঝর্ণায় যাওয়ার পথে আশেপাশের সবুজ প্রকৃতি; সোর্সঃ লেখক

যেভাবে যাবেন

অত্যন্ত দুর্গম এই ঝর্ণাটিতে কাপ্তাই ঘাট হতে ট্রলার যোগে যাওয়া যায়। ট্রলারে প্রায় চার থেকে সাড়ে ঘণ্টার পানিপথ পাড়ি দিয়ে যেতে হবে উলুছড়ি নামক স্থানে। সেখান থেকে গাইড সাথে নিয়ে সরু ও অগভীর পানিতে ছোট কোষা বা ডিঙ্গি নৌকা করে যেতে হবে ধূপপানি ঝর্ণার মূল হাঁটার রাস্তায়।

সেখান থেকে আড়াই ঘণ্টার পাহাড়ি উঁচুনিচু হাঁটার রাস্তা অতিক্রম করে ধূপপানি পাড়া। ধূপপানি পাড়া থেকে আরও ২০০ মিটার নিচে নামলেই পৌঁছে যাবেন কাঙ্ক্ষিত ধুপপানি ঝর্ণায়। যাওয়ার পরেই বুঝবেন, প্রকৃতির কী এক অপরূপ মহিমা সেই ধুপপানি ঝর্ণা।

ধুপপানি পাড়া; সোর্সঃ লেখক

এখানে বলে রাখা ভালো, দুর্বল হৃদয় কিংবা উচ্চতাভীতি থাকা মানুষদের এই ঝর্ণাটায় না যাওয়াই ভালো। কারণ হাঁটার সম্পূর্ণ পথটাই পাহাড়ি রাস্তা যা ভীষণ উঁচুনিচু। কোথাও কোথাও পাশে বিশাল খাদ। পা পিছলে একটু এদিক সেদিক হলেই পাহাড়ের নিচে।

পড়ে গেলে বেঁচে আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। বৃষ্টির দিনে এই রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে আরও দুর্গম হয়ে যায়। প্রায় সাত থেকে আটবার পাহাড় বেয়ে উঠতে ও নামতে হয়। শারীরিক পরিশ্রমের চরম পরীক্ষা দিতে হবে এখানে। পাহাড়ে ওঠার জন্য বাঁশের লাঠি গাইডই যোগাড় করে দেবে।

ধুপপানি পাড়ায় ব্র‍্যাক প্রাথমিক বিদ্যালয়; সোর্সঃ লেখক

প্রায় আড়াই ঘণ্টার অমানুষিক পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যাবেন আদিবাসীদের ছোট্ট একটি পাড়ায়, যার নাম ধুপপানি পাড়া। মূলত এই ধুপপানি পাড়ায় ঝর্ণাটি অবস্থিত বলেই ঝর্ণাটি ধুপপানি ঝর্ণা নামে পরিচিতি লাভ করে।

এই পাড়ায় ছোট একটি দোকান রয়েছে যেখানে বিশ্রাম নিয়ে হালকা পাতলা নাস্তা সেরে নেয়া যায়। দাম কিছুটা বেশি হলেও এতটা উঁচুতে এরকম দোকানের দেখা পাওয়াটাই ভাগ্যের ব্যাপার।

ঝর্ণায় প্রবেশের পূর্বে সতর্কবাণী; সোর্সঃ লেখক

এখানকার পাহাড়ি কলার কথা না বললেই নয়। ফর্মালিনমুক্ত পাহাড়ি পাকা কলার অসাধারণ স্বাদ, যা আমাদের মতো শহুরাঞ্চলে বসবাসকারীদের জন্য অমৃতের কাছাকাছি। জোড়া মাত্র পাঁচ টাকা। আমরা আঠারো জন কেবল কলা খেয়েই আড়াইশ টাকা বিল তুলে ফেলেছিলাম।

সবচেয়ে বেশি অবাক ও একইসাথে খুব খুশি হই এত দুর্গম একটি আদিবাসীদের পাড়ায় BRAC (ব্র‍্যাক) এর আওতাধীন “ব্র‍্যাক প্রাথমিক বিদ্যালয়” দেখে। তাদের কার্যক্রম এতটা বিস্তৃত ভেবে অবাক লাগে।

যাই হোক, ধুপপানি পাড়া থেকে নিচের দিকে একটা বেশ চওড়া একটি রাস্তা ধরে হাঁটলে পৌঁছে যাবেন ধুপপানি ঝর্ণায় যাওয়ার জন্য মাটির তৈরি সিঁড়িপথে।

ধুপপানি ঝর্ণা; সোর্সঃ লেখক

এই সিঁড়িপথ ধরে নিচে নামলেই ধুপপানি ঝর্ণা। তবে সিঁড়িপথ বেয়ে নিচে নামাটা আরেকটি চ্যালেঞ্জ। এবড়োথেবড়ো পিচ্ছিল সিঁড়ি পাড়ি দিয়ে সরু পাথরের রাস্তা ধরে কিছুদূর আগালেই চোখে পড়বে অনেক উঁচু থেকে পতিত ধুপপানি ঝর্ণার। এতটা কষ্টের পর চোখের সামনে এই অতিপ্রাকৃত দৃশ্য দেখে পরিশ্রমটাকে নেহাতই কম মনে হবে।

ধুপপানি ঝর্ণার এই অপার লীলায় মুগ্ধ হয়ে মন প্রাণ উতলা হয়ে যাবে। তবে নিজেকে স্থির করুন। কারণ ধুপপানি ঝর্ণার সামনের কিছু অংশের গভীরতা খুব বেশি। তাই গাইডের সাথে সাথে পাহাড়ের ধার ধরে ধীরে ধীরে ঝর্ণায় কাছে যেতে হবে।

প্রশান্তিময় ধুপপানি ঝর্ণা; সোর্সঃ লেখক

ধুপপানি ঝর্ণার বিশেষ দিকটি হলো এই ঝর্ণাটির পাদদেশে খাঁজের মতো জায়গা রয়েছে। অনায়াসেই সেখানে গিয়ে বসে থেকে ঝর্ণার রূপ-বৈচিত্র‍্য ও হিংস্রতা উপভোগ করা যায়। এখানে বসে স্লো মোশনের ভিডিও করা একটি ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সর্বশেষ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে শেষ করছি। ধুপপানি পাড়া হতে নিচে নেমে ঝর্ণার সিঁড়িপথের শুরুতে একটি সতর্কতাবাণী লেখা রয়েছে। সতর্কতাবাণীটি হুবহু তুলে ধরছি,
“সম্মানীত ভ্রমণকারী, ধুপপানি ঝর্ণাটি কোনো পর্যটন কেন্দ্র নয়। এখানে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও শ্রমণগণ ধ্যান সাধনা করেন। এ এলাকা ধুপপানি সার্বজনীন বৌদ্ধ বিহারের জন্য সংরক্ষিত এবং বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের তীর্থভূমি। তাই ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষা করুন এবং উচ্চস্বরে চিৎকার চেঁচামেচি হৈ চৈ না করার জন্য বিনীতভাবে অনুরোধ রইলো।”

ধুপপানি ঝর্ণার ঠিক নিচে এখানে ছবি তোলা যেন আবশ্যক হয়ে উঠেছে; সোর্সঃ লেখক

বিঃদ্রঃ অন্যান্য ঝর্ণার মতো ধুপপানি ঝর্ণাটি এখনো মানুষের অরুচিপূর্ণ আচরণের শিকার হয়নি। তাই এই ধারা অব্যাহত রেখে এখানে কোনো প্রকার ময়লা আবর্জনা ফেলবেন না। প্লাস্টিক জাতীয় আবর্জনা ব্যাগে সংরক্ষণ করুন।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভারতের সেরা ৫টি টাইগার সাফারি পার্ক

বাউল সম্রাট লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবসে আখড়াবাড়ির হাল হকিকত