প্রিয় শীত, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আর কালাই রুটি!

এই গল্পটা জিভে টসটসে জল আনার! তাই সাবধান! আগে মন আর জিভকে শান্ত করুন, তারপর গল্প পড়ুন!

রাজশাহীতে যারা থাকেন, তাদের তো আর বলে বা লিখে বোঝাবার কিছু নেই, যে রাজশাহীর শীত, কেমন শীত। এছাড়া যারা কোনো না কোনো শীতে রাজশাহী গিয়েছেন বা থেকেছেন তারাও কম-বেশী উপভোগ করেছেন, শরীর কামড়ে ধরা শীতে আর সবকিছু ভেদ করে হাড়ে কাঁপন ধরানো দুঃসহ সেই শীতের ছোবল।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ছবিঃ beshto.com

আর এই শীতের মরণ কামড় আরও বেশী টের পেয়েছে তারাই, যারা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে। এটা আরও এক কাঠি সরেস হয়েছে তাদের জন্য যারা অরণ্যের ভেতরের আবাসিক হলে থেকেছে। তারা আরও বেশী করে টের পেয়েছে শীত কাকে বলে আর কত প্রকার।

এমনিতেই রাবি এক অরণ্যে ভরপুর বিশ্ববিদ্যালয়, তার উপর অরণ্যের শীত যেন আরও গভীর আর দুঃসহ হয়ে ওঠে আবাসিক হলগুলোর ভেতরে। চারদিকে গাছপালায় আচ্ছাদিত থাকার কারণে হলগুলোতে সূর্যের তাপ তেমন একটা পাওয়া যেত না, যেটার প্রভাব পড়তো শেষ বিকেল থেকে সন্ধ্যায়, রাতে তো প্রায় সাইবেরিয়ার অবস্থা হতো সবার।

তো সেই শীতের মধ্যে হলের বা মেসে থাকা ছেলেদের বিশেষ করে একটু উষ্ণতা আর আরাম পাবার অন্যতম উপায় ছিল স্টেশন বাজারের গরম-গরম, মোটা-মোটা কিন্তু নরম-নরম কালাই রুটি! সাথে দুর্দান্ত স্বাদের বেগুন আর কাঁচা মরিচের ভর্তা। তবে সেই পাওয়া-খাওয়া আর বসে-বসে রসিয়ে রসিয়ে গল্পের ছলে সেসব অমৃত উপভোগ এত সহজ ছিল না আদৌ।

উষ্ণ উনুনের পাশে, কালাই রুটির অপেক্ষা। ছবিঃ সংগ্রহ

কারণ স্টেশন বাজারে গিয়ে না পাওয়া যেত বেঞ্চিতে বসার জায়গা, না পাওয়া যেত কালাই রুটি চাহিদা মতো। আর সেই সুস্বাদু বেগুন-কাঁচা মরিচের ভর্তা, সে তো ছিল আরও দুর্লভ ব্যাপার। তাই আমরা অনেক সময় নিয়ে যেতাম বন্ধুরা মিলে। দূরে দাঁড়িয়ে, যারা বেঞ্চিতে বসে সেসব উপভোগ করতো তাদের উদ্ধার করতাম সেই সাথে অপেক্ষা ছিল সীমাহীন, সেই হাড় কাঁপানো শীতের রাতগুলোতে।

সেই সময়ে রাতে যারা মেসে থাকতো তারা সেই ভর সন্ধ্যায় খালার (বুয়া) হাতের অমৃতে তৃপ্ত হতে না পেরে ছুটে আসতো এদিকে, আর যারা হলে থাকতো তারা সেই সন্ধ্যার ভাত রাতে খেতে গিয়ে দেখত চাল হয়ে গেছে, আর ডাল? ওহ সে তো ছিল কোন বরফ গলা জলের নোনতা স্বাদ!

উপরে কালো হয়ে যাওয়া এক বা আধটা পেঁয়াজ ভাজা, ডালের কোনো কিছু খুঁজতে হলে কারেন্ট জালের মতো কিছু দরকার হতো অথবা নিজেদের নামতে হতো ডালের গামলায় ডুবুরি হয়ে! আর তাই সেই সব বিস্বাদ রাতকে একটু উষ্ণতায় রাঙাতে সবাই এসে জুটতাম স্টেশন বাজারের খালা-মামাদের কালাইরুটির দোকানের আশেপাশে।

জিভে জল আনা জলপাই। ছবিঃ সংগ্রহ

সবাই মিলে বেঞ্চিতে জায়গা না পাওয়া পর্যন্ত রসিয়ে রসিয়ে দেখতাম কীভাবে কালাই রুটি তৈরি হচ্ছে আর সেই সাথে মুখে লেগে থাকা সেই ঝালের ভর্তা। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল দোকানের ভর্তা বানানোর প্রক্রিয়াটা। যেটা আমি খুব উপভোগ করতাম।

তরতাজা, কালো কালো বিশাল সাইজের বেগুন রাখা হতো জলন্ত উনুনের পাশে, সেগুলো পুড়তো ধীরে ধীরে, ঘুরিয়ে দেয়া হতো একপাশ পুড়ে গেলে, ঠিকঠাক পুড়ে গেলে উপরের লাল-কালো চামড়াটা ছাই রঙা হয়ে যেত শুকিয়ে। তারপর ধীরে, খুব ধীরে অনেক আদর মাখা স্পর্শে ওর গায়ের চামড়া তুলে ফেলা হতো, ভেতরে একদম সেদ্ধ হয়ে নরম তুলতুলে বোটার সাথে ঝুলে থাকা ধোঁয়া ওঠা বেগুন, উহ কী যে অদ্ভুত একটা গন্ধ নাকে এসে লাগতো, সুখে চোখ দুটো বুজে আসতো আবেশে। তারপর সিলভার বা মাটির গামলায় সেটাকে রাখা হতো পিষে আরও মিহি করার জন্য।

পোড়া বেগুনে আলতো পরশ। ছবিঃ সংগ্রহ

তার উপর দেয়া হতো কাঁচা/পোড়া শুকনো মরিচ-ধনে পাতা-অনেক অনেক পেঁয়াজ কুচি আর খাঁটি সরিষার তেল। এরপর সেই সবকে একত্রে একটা কাঠের হাতল দিয়ে ঘোঁটা হতো গায়ের জোর দিয়ে, সেই সব উপাদানের যে ঘ্রাণটা নাকে এসে লাগতো, সে যেন কোনো খাবারের ঘ্রাণ ছিল না, সে তখন মাদক! নেশায় মাতাল তখন চারপাশ। কখন দেবে কালাই রুটি আর সেই বেগুনের অমৃত ভর্তা? অপেক্ষা আর অপেক্ষা!

কিন্তু না, তখনই পাওয়া যেত না সেই অমৃত, আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হতো আরও বিশেষ কিছুর জন্য! কী সেটা বলছি।

কচকচে তাজা কাঁচা মরিচ, যার গায়ে তখনও গাছ থেকে ঝরে পড়া শিশির লেগে আছে, হাত দিলেই লাজে কপোল বেয়ে পড়বে, ঘন সবুজের উপরে দুই একটি কালো ছোপ যুক্ত ভীষণ টক জলপাইয়ের স্তূপ, যার মাংস আলাদা করে রাখা হয়েছে, পাশেই সদ্য ধুয়ে রাখা হালকা সবুজ ধনে পাতার অপেক্ষা, ওদের মিলমিশ হবে খুব দ্রুত।

বেগুনের অমৃত ভর্তা। ছবিঃ সংগ্রহ

সেই কাঁচা মরিচ, জলপাই আর ধনে পাতার মিশ্রণে তৈরি হতো আর এক পাগল করা চাটনি। যার ঘ্রাণ আর আকর্ষণ এতই ছিল যে, বেঞ্চি ফাঁকা না থাকা সত্ত্বেও মনের অজান্তেই সবাই চলে যেতাম খালার চুলার পাশে, যেন চাটনি আর বেগুন ভর্তার গন্ধটা দূরে সরে না যায়, যেন ওই মাদকের আকর্ষণ নাকে লেগেই থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত চেখে দেখার ভাগ্য না হয়।

উহ আর অপেক্ষা অসম্ভব। জিভে জল তো সেই বেগুন ভর্তা বানানোর সময় থেকেই চলে এসেছে, আর একটু হলে গড়িয়েই পড়বে প্রায়। কেউ কেউ তো মাদকের নেশায় মাতাল হয়ে মেজাজ হারিয়ে বলেই বসতো, ওই খালা যা হইছে দেন, একটাই দেন, সবাই মিলেই ভাগ করে শুরু করি। আর ভর্তা দেন বেশী বেশী, সাথে চাটনি। আচ্ছা চাটনির সাথে একটু কাঁচা পেঁয়াজ আর সরিষার তেল দেন তো! খালাও তার দোকানকে এই উৎপাতের হাত থেকে রেহাই দিতে একটি কালাই রুটি আর ভর্তা, চাটনি সাথে পেঁয়াজ আর সরিষার তেল দিয়ে ঠাণ্ডা করতেন।

কালাই রুটি আর ভর্তা। ছবিঃ সংগ্রহ

আর এরপর সেই এক কালাই রুটির উপরেই ঝাঁপিয়ে পড়তো কয়েকজন মিলে, কাড়াকাড়ি অবস্থা, আর কে কয় টুকরো নিল সেই বেহিসেবি হিসেব মেলানো, কারণ যখন সবাই যার যার আলাদা রুটি পাবে তখন যেন আগের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারে, সেজন্য! সেই সাথে চলতো ঝালের তোড়ে মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়া উহ-আহ!

আর চোখ দিয়ে অনবরত জল। চরম ঝাল, অনেক কাঁচা পেঁয়াজ আর খাঁটি সরিষার তেলের ঝাঁজের সমন্বিত মিশ্রণের প্রভাব। তবুও চলতো সেই নিদারুণ ঝালের দারুণ উপভোগ, যে যতক্ষণ পর্যন্ত পারতো। পেট-মন আর প্রাণের তৃপ্তি হলে সবাই মিলে উঠে পড়তো বিল দিয়ে। সাথে শরীরে চলে এসেছে উষ্ণতা।

তরতাজা কাঁচা ঝাল। ছবিঃ সংগ্রহ

এরপর সেই অরণ্যের পথ ধরে, নিকষ কালো অন্ধকারে কয়েকটি গলা মেলাতো গানের সুর, হেঁটে যেত যেতে বহুদূর। রাতকে দিনের আলোয় আলোকিত করে, ওদের আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে ভরা উদ্দামতা দিয়ে। আবার কবে আসবে এই ঝাল আর ঝাঁজের অমৃত উপভোগে সেই আলোচনায় মগ্ন হয়ে, বিলীন হতো গভীর রাতের অন্ধকারে।

এমন একটি শীতের রাত, অন্ধকার, কালাই রুটি, বেগুন ভর্তা, আর কাঁচাঝাল-জলপাই-ধনেপাতার মাদকতার স্বাদ নিতে হলে চলে যেতে হবে রাজশাহী, বা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেশন বাজারে বা হলের আশেপাশের যে কোনো ছোট ছোট কাঠের চুলা জ্বলছে এমন দোকানে। বাসে বা ট্রেনে একদিনেই গিয়ে, ঘুরে-বেড়িয়ে আর এমন নেশাতুর ভর্তা ও চাটনি দিয়ে কালাইরুটি উপভোগ করে চাইলে ফিরেও আসতে পারবেন। তবে একটি রাত থেকে আসাই শ্রেয় হবে বলে আমি মনে করি।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মহানন্দা নদীর ধারের কাশফুলের চর ও অন্যান্য

শীতকালীন ভ্রমণের জন্য একদম আদর্শ স্থান মধ্য ও পূর্ব ইউরোপ