এক নজরে একটি জেলা: অতীতের পাতা থেকে রাজশাহী জেলা

রাজশাহীর অতীতের পাতায় ঢুঁ মারতে গিয়ে গত পর্বে বেশ বেকায়দায় পড়ে গিয়েছিলাম আমরা। এক পুঠিয়া শেষ করতে করতেই কম্ম কাবার হয়ে গেছিলো। তাই বলে পুঠিয়াই রাজশাহীর একমাত্র দর্শনীয় স্থান-  ভাবলে কিন্তু বড্ড ভুল করবেন। আরো অ-নে-ক স্থাপনা রয়েছে রাজশাহীতে যেগুলো আপনার মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তাহলে চলুন পাঠকেরা আরেকবার ডুব দেই প্রাচীন রাজশাহীর খোঁজে।

বাঘা মসজিদ:

বাঘা মসজিদ; Source: আরাফাত

রাজশাহী জেলা সদর থেকে ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে বাঘা উপজেলায় অবস্থিত অসাধারণ একটি মসজিদ হলো এই বাঘা মসজিদ। বাংলাদেশে মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর একটি অপূর্ব নিদর্শন মসজিদটি। মসজিদের মাঝখানের দরজার ওপর ফার্সি ভাষায় লেখা একটি শিলালিপি পাওয়া গেছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, হোসেন শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা আলাউদ্দিন শাহের পুত্র সুলতান নাসিরুদ্দিন নসরত শাহ এই মসজিদ নির্মাণ করেন। নির্মাণকাল আনুমানিক ১৫২৩-১৫২৪ খ্রিস্টাব্দ। পরবর্তীতে মসজিদটিকে বিভিন্ন সময়ে সংস্কার করা হয়েছে। একসময় মসজিদের গম্বুজগুলো ভেঙে যায়। ১৮৯৭ সালে নতুন করে ছাদ নির্মাণ করা হয়। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক সংরক্ষিত বাঘা মসজিদ ২৫৬ বিঘা জমির ওপর অবস্থিত।

বাঘা মসজিদে মোট দশটি গম্বুজ রয়েছে। আর ছাদকে ধরে রাখার জন্য মসজিদের অভ্যন্তরে রয়েছে ছয়টি স্তম্ভ, প্রবেশের জন্য রয়েছে পাঁচটি দরজা। ভেতরে রয়েছে চারটি কারুকার্যখচিত মেহরাব। বাঘা মসজিদের দৈর্ঘ্য ৭৫ ফুট প্রস্থ ৪২ ফুট, উচ্চতা ২৪ ফুট ৬ ইঞ্চি। দেয়ালের পুরুত্ব ৮ ফুট, গম্বুজের ব্যাস ৪২ ফুট, উচ্চতা ১২ ফুট। চৌচালা গম্বুজের ব্যাস ২০ ফুট উচ্চতা প্রায় ৩০ ফুট।

বাঘা মসজিদটিকে যে বিষয়টি অনন্যতা দিয়েছে তা হলো এর সর্বত্র সুনিপুণ নকশাদার টেরাকোটা। এসব টেরাকোটার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে আমগাছ, শাপলা ফুল, লতাপাতাসহ প্রভৃতি। বাঘা মসজিদের নির্মাণে ফারসি স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব রয়েছে। সম্পূর্ণ মসজিদটি পোড়ামাটির ইট দিয়ে তৈরি করা। ইটগুলোর গাঁথুনি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে চুন সুরকি।

নকশা; Source: অপু সাদাত

মসজিদের সামনেই রয়েছে একটি প্রকাণ্ড দীঘি। দীঘিটি প্রায় পঞ্চাশ বিঘা জমি নিয়ে বিস্তৃত। সুলতান নাসিরুদ্দিন নসরত শাহ তার পিতা আলাউদ্দিন হুসাইন শাহর মতোই প্রজাদরদী শাসক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি স্থানীয় জনগণের পানীয় জলের সমস্যা দূর করার জন্য এই দীঘিটি নির্মাণ করেন।

দীঘির চারপাশে রয়েছে নারিকেল গাছের সারি। প্রতিবছর শীতকালে অসংখ্য পরিযায়ী পাখি এখানে এসে আশ্রয় নেয়। তাদের কলকাকলিতে এই এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে। মসজিদের পাশেই আছে জহর খাকী পীর নামে একজন ধর্মীয় প্রাজ্ঞ মানুষের মাজার। ১৯৯৭ সালে মাজারের পশ্চিম পাশে খনন করা হয়।

তখন এখানে মাটির নিচে পাওয়া যায় ৩০ ফুট বাই ২০ ফুট আয়তনের একটি বাঁধানো মহল পুকুর। পুকুরটি একটি সুড়ঙ্গপথ দিয়ে অন্দরমহলের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এখানে প্রতিবছর ঈদুল ফিতরের দিন থেকে ৩ দিন পর্যন্ত ‘বাঘার মেলা’র আয়োজন করা হয়। প্রায় পাঁচশ বছর ধরে চলছে এই ঐতিহ্যবাহী মেলা।

বাঘা মসজিদের দেয়ালে অঙ্কিত টেরাকোটা নকশা 

কিসমত মারিয়া মসজিদ:

ব্যতিক্রমী স্থাপনার একটি অনিন্দ্যসুন্দর মসজিদ কিসমত মারিয়া মসজিদ। এটি রাজশাহী শহরের অদূরে দূর্গাপুর উপজেলায় মারিয়া গ্রামে অবস্থিত। কিসমত শব্দের অর্থ শহর বা নগর। ধারণা করা হয়, এই মারিয়া গ্রাম একদা জৌলুসে পরিপূর্ণ নগর ছিল।

রাজশাহী সদর হতে রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়ক ধরে প্রায় ১৩ কি.মি. গেলে শিবপুর বাজারে দেখতে পাবেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি নীলচে সাইনবোর্ড। সেই সাইনবোর্ডের নির্দেশনা ধরে আরো এগিয়ে ৪-৫ কি.মি. অতিক্রম করলে আমবাগান আর ফসলের ক্ষেতের মাঝে পাবেন এই অনন্য সাধারণ মসজিদটি।

এই মসজিদ সম্পর্কে স্থানীয় জনগণের মধ্যে অনেক কিংবদন্তি কাহিনী প্রচলিত আছে। ইতিহাসের পাতায় এই অসাধারণ মসজিদ সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। ধারণা করা হয়, ১৫০০ সালের দিকে এখানে কোনো মুসলিম দরবেশ বা সুফি সাধক আস্তানা গেড়েছিলেন। তিনি বা তার কোনো অনুসারী এই মসজিদটি নির্মাণ করেন।

মসজিদটির তিনটি প্রবেশদ্বার আছে। প্রত্যেকটি দ্বারের ঠিক সমান্তরালে উপরে ছাদের উপর মাঝামাঝি একটি করে মোট তিনটি গম্বুজ রয়েছে। মসজিদের দক্ষিণে একটি দ্বিতল চৌচালা স্থাপনা আছে। এটিকে স্থানীয় মানুষ বিবির ঘর বলে ডাকে। যেখানে মসজিদে নারীদের নামাজ পড়া নিষিদ্ধ সেখানে সাতশো বছরের পুরনো একটি মসজিদের সাথে বিবির ঘর- ব্যাপারটি কৌতূহলের দাবিদার। পুরো স্থাপনাটি পোড়ামটির ইট দিয়ে নির্মিত। সাথে ব্যবহৃত হয়েছিল চুন আর সুরকি।

কিসমত মরিয়া মসজিদ; Source: ফরিদ আক্তার পরাগ

একটি অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে এই মসজিদের আশেপাশে তেমন কোনো দীঘি অথবা পুকুর নেই। তাহলে মুসল্লিরা ওজু করতো কোথায়? এ এক রহস্য বটে!

কালের বিবর্তনে মসজিদটি ক্ষয়ে গিয়েছিল। পরে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এটিকে পুনরায় সংস্কার করেছে। ফলে হারানো জৌলুসের অনেকটাই ফিরে পেয়েছে সে। তার গায়ে ঠাঁই পেয়েছে পোড়ামাটির নিখুঁত টেরাকোটা যাতে রয়েছে গাছ-ফুল-লতা ইত্যাদি। আকারে বেশ ছোট হওয়া সত্ত্বেও রূপেগুণে অনন্য এই মসজিদটি।

বিহারৈল ঢিবি:

বিহারৈল ঢিবি স্থানীয়ভাবে রাজবাড়ি ঢিবি নামে পরিচিত। তবে এখানে কোনো রাজবাড়ী ছিল না। বরং এটি ছিল একটি বৌদ্ধ বিহার। রাজশাহী জেলার তানোর উপজেলার মাদারীপুর গ্রাম থেকে দেড় কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত প্রাচীন বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসস্তূপটি অবস্থিত। পুরো বিহারটি খনন করা হয়নি এখনো। তাই এর পরিসীমা সম্পর্কে সঠিত তথ্য এখনো জানা যায়নি। তাছাড়া মতভেদ রয়েছে এর সময়কাল নিয়েও।

এখানে অনেক পুরাতন ইট ও বেলে পাথরের তৈরি একটি বুদ্ধ মূর্তি পাওয়া গেছে। মূর্তিটি রাজশাহীর বরেন্দ্র মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে। প্রাপ্ত নিদর্শন থেকে অনুমান করা হয় যে, বহু কাল আগে বৌদ্ধযুগে এই বিহারৈল গ্রামে একটি নগরী গড়ে ওঠে। গ্রামের নামের মধ্যে এখনো সেই নগরী তার চিহ্ন লুকিয়ে রেখেছে। এখনো বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে তার ধ্বংসাবশেষ আছে পাওয়া যায়।

বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর:

বাংলাদেশের প্রথম জাদুঘর কোথায় স্থাপিত হয় জানেন?

বরেন্দ্র রিসার্স মিউজিয়াম; Source: মাসুম আল হাসান

রাজশাহীর কেন্দ্রস্থলে ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্থাপিত হয়েছিল একটি সংগ্রহশালা। নাটোরের দিঘাপাতিয়া রাজপরিবারের জমিদার শরৎ কুমার রায়, আইনজীবী অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় এবং রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক রামপ্রসাদ চন্দ্রসহ আরো অনেক বিজ্ঞ ব্যক্তি ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে নিজেদের ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য একত্রিত হয়ে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

এর ফলে স্থাপিত হয় বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি। ঐ বছরে তারা রাজশাহীর বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করে ৩২টি দুষ্প্রাপ্য নিদর্শন সংগ্রহ করেন। এই নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ করার জন্য শরৎ কুমার রায় জমি দান করেন। এই জমিতে জাদুঘরটির নিজস্ব ভবন নির্মিত হয়। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের ১৩ নভেম্বর বাংলার তৎকালীন গভর্নর কারমাইকেল জাদুঘরটি উদ্বোধন করেন। বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরটির পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে।

এছাড়া রাজশাহীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আরো অনেক ভ্রমণ স্থান। সুতরাং আর দেরী কেন? সামনের ছুটিতে ঘুরেই আসুন রাজশাহী থেকে।

Feature Image: ফরিদ আক্তার পরাগ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুর্দান্ত সব ট্রেকিং রুটের আদ্যোপান্ত

লাকসামে নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীর নওয়াব বাড়ি