রাজধানী এক্সপ্রেসে আমাদের দুঃসহ রাত!

১ জানুয়ারি ২০১৫, আমরা ট্রেন থেকে নেমেই ৭ দিনের জন্য জীপ এবং হোটেল বুক করে নিলাম। চণ্ডীগড়, শিমলা, মানালি হয়ে দিল্লী ফেরায় বেশ খুশি ছিলাম আমরা সবাই। কারণ, অনেক তৃপ্তিদায়ক টাকাতেই এই প্যাকেজ পেয়েছিলাম আমরা। কিন্তু সামান্য সন্দেহ ছিল যে, ওরা কীভাবে আমাদের এত কম বাজেটে প্যাকেজ দিল? ওই দিনই আমরা ফেরার টিকেট কাটার জন্য বললাম, কিন্তু তারা বিষয়টিকে তেমন পাত্তা দিল না। বলল যে ফিরে আসি, তখন টিকেটের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কোনো সমস্যা হবে না। কোথায়, কতদিন থাকবেন, তা তো জানেন না। যদি বেশী থাকেন, তখন? আসুন হয়ে যাবে।  

সেভাবেই চললাম, আবার যথা সময়ে ফিরেও এলাম দিল্লীতে। এবার রাজধানী এক্সপ্রেসের টিকেট কাটার পালা। কিন্তু যাদের কাছ থেকে প্যাকেজ নিয়েছিলাম, তারা প্রায় দ্বিগুণ দাম চাইল টিকেটের! তাও আসন নির্ধারিত নয়! এখন কী করি? আমাদের কাছে তো রয়েছে কমলার পাহাড়! (যারা কমলার গল্প পড়েছেন তারা জানেন) এখানে, ওখানে টিকেট খুঁজি, কোথাও নেই। যে দু-এক জায়গায় পাওয়া যাবে বলে শোনা যায়, তারাও দ্বিগুণ দাম হাকে! এভাবে কেটে গেল প্রায় অর্ধেক দুপুর! এবার আবার শুরু হলো নিজেদের মধ্যে দোষ দেয়া আর না নেয়ার পুরনো খেলা!

রাজসিক রাজধানীর দুঃস্বপ্ন! ছবিঃ সংগ্রহ

অবশেষে সেই আগের জায়গা থেকেই যেখান থেকে গাড়ি আর রুমের প্যাকেজ নিয়েছিলাম সেখান থেকেই টিকেট নিতে হলো, বাধ্য হয়েই! কারণ? পিছনে দালাল লেগে গেছে! ওখান থেকে ছাড়া উপায় নাই! সুতরাং টিকেট আছে, কিন্তু নির্ধারিত সিট নেই! ওয়েটিং থেকে যদি কেউ বাদ দেয়, তবেই জুটবে বসার ভাগ্য! আর সোয়া! “সে তো দূর কি বাত!” ঘুম? সে তো “মুশকিলই নেহি, না মুমকিন হ্যায়”।

কমলার স্তূপ নিয়ে গেলাম স্টেশনে, ট্রেন দাঁড়িয়েই আছে। আমরাও দাঁড়িয়ে আছি। কারণ নির্ধারিত আসনের যাত্রীরাই শুধু উঠছেন! আমরা এক-একজন, এক-এক কামরার পাশে সাটা লিস্টে নাম বা পাসপোর্ট নাম্বার খুঁজতে মরিয়া! খুঁজে পাচ্ছি না কেউ কোথাও, কারো নাম বা পাসপোর্ট নাম্বার! হায়… এবার? আসনও নেই, টাকাও নেই! সাথে ব্যাগ-আর? আর কমলার বিভীষিকা! যদি উঠতেই না দেয়? সে আশঙ্কাই এখন সবার চোখে মুখে!

প্লাটফর্মে উদ্বিগ্ন ঘোরাফেরা। ছবিঃ সংগ্রহ

এবার শুরু হলো, টিটি আর কামরার অ্যাটেন্ডেন্টদের কাছে দৌড়াদৌড়ি! কাউকে যদি বোঝান যায়! অবশেষে একজন একটি কামরাতে উঠতে বললেন এবং আশার কথা, আমাদের নামেই একটি আসন পাওয়া গেল যা আমাদের কারো চোখেই পড়েনি! কারণ? টেনশন আর উদ্বেগ!

যাই হোক, উঠলাম ওই কামরাতেই, সবাই মিলে, সাথে কমলার স্তূপ! এবার আর কমলার কথা না বলে, নির্ঘুম রাতের দুঃসহ কষ্ট আর আত্মসম্মানের হানাহানির কথা বলি।

কোনোমতে বসলাম, ঠেসেঠুসে, সবাই মিলে। ভাগ্য বোধহয় কিছুটা ভালো আর উপরওয়ালা বোধহয় কিছুটা সহায় ছিলেন যে কারণে আমাদের পাশেই দুই বাংলাদেশী ভাই ছিল, যারা আমাদের অনেক সহায়তা করেছে, তারা তাদের সিট দুটো থেকে একটা আমাদেরকে দিয়ে, দুজনে এক সিটে গিয়ে বসল। এবার আমরা আর একটা সিট পেলাম!

অন্যের খাবারে তাকিয়ে থাকার কষ্ট! ছবিঃ লেখক

দুই সিটে ছয়জন! খাবার সরবরাহকারী এলেন অর্ডার নিতে, (শুধুমাত্র যাদের আসন নির্ধারিত, তাদের!), আমাদের একজন বলে উঠলেন, “আমাকে মাটন কারী!” এবার খাবার সরবরাহকারী বললেন, “আগে, আপনারা সিট পেয়ে নিন, তারপরে! সবার খাবার দেয়া হলে যদি সম্ভব হয়, অবশ্যই দেব!” অবশ্য একজনকে দিয়ে গেলেন। কারণ, একটি নির্ধারিত সিট আছে! তবে কি একটাই ছয়জন খাব? সেই দুঃখে, কষ্টে, অপমানে আমাদের টিম লিডার রাতে আর খাবারই খেলেন না! একেবারে কলকাতায় গিয়ে খাবে! (উল্লেখ্য, পরে সবাইকেই খাবার দিয়েছিল, অন্য সকল যাত্রীদের খাবার শেষে! সে কি অপমান!) 

এরপর যখন অন্য আসনের সবাই ঘুমিয়ে পড়লেন, নিচের সিটে তো তবুও তিন বা চারজন বসা যাবে, কিন্তু উপরের সিটে? ওখানে তো মাথাই সোজা করা যায় না! তাহলে বসবে কীভাবে? তাও দুইজন? অ্যাটেন্ডেন্টকে ধরে আর একটা সিট ম্যানেজ করা গেল। ওখানে একজন চলে গেল। এরপর দুইজন উপরের সিটে আর তিনজন নিচের সিটে। না যায় বসা, না যায় শোয়া আর না যায় হেলান দেয়া। তার উপর পায়ের নিচে, সিটের আশেপাশে রয়েছে আমাদের কমলার স্তুপ! সেই নিয়ে অন্যান্য যাত্রীদের কত রকম পরোক্ষ কটাক্ষ। সবকিছু মিলে যেন নিজেরা নিজেদের কাছেই মরমে মরে যাই। এভাবে কেউ বসে, কেউ একটু হেলান দিয়ে, কেউ আধশোয়া হয়ে এক ভয়াবহ, দুঃসহ রাত পার করলাম রাজধানী এক্সপ্রেসে।

রাজধানী এক্সপ্রেস। ছবিঃ সংগ্রহ

প্রথম প্রথম ভারত ভ্রমণ ছিল বলে এমন বিড়ম্বনায়, ঝামেলায় আর বিভীষিকায় মুখোমুখি হয়েছিলাম। এরপর থেকে আর নয়। কারণ হয় টিকেট তিন থেকে চারমাস আগে থেকেই করে রাখি, নয়তো দিল্লি গেলে ওদের এক নাম্বার প্লাটফর্মের ফরেন টিকেট অফিস আর কলকাতা হলে সোজা ফেয়ারলি প্যালেসে চলে যাই টিকেট করতে বা খোঁজ নিয়ে। কিন্তু কোনো দালাল বা এজেন্সিতে কিছুতেই না। কারণ যদি ফেয়ারলি প্যালেস বা দিল্লীর ফরেন কোটার অফিসে গিয়ে টিকেট না পাওয়া যায়, তাহলে বুঝতে হবে আসলেই আর টিকেট নেই। কেউ দিতে পারবে না লিগ্যাল আর নিশ্চিত সিটের টিকেট। সেটা সম্ভবই নয়।  

টিকেট যদি থাকে তবে এখানে সেটা শো করবেই। দিল্লীর ফরেন কোটার অফিস প্রতিদিন আর ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে এটা মনে রাখবেন।  

বিদেশীদের জন্য প্লাটফর্ম এক এর টিকেট কক্ষ।

আর সবচেয়ে ভালো হয় ভারত ভ্রমণে গেলে বা যেতে চাইলে, ট্রেনের টিকেট ও নির্ধারিত আসন, অবশ্যই আগে থেকেই নিশ্চিত হয়ে নেবেন।

Loading...

One Comment

Leave a Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কার্জন হলে শেষ বিকেলে…

একদিনে ঘুরে আসুন চট্টগ্রামের মিনি বাংলাদেশ থেকে