১০ রুপির বিড়ম্বনা!

লেহ থেকে যেদিন তুরতুক যাই সেদিন ঈদ-উল-আযহা বা আমাদের কোরবানির ঈদ। নুব্রা হয়ে তুরতুক পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর গড়িয়ে পড়েছে। ব্রিজ পেরিয়ে ওপারে গিয়ে উঁচু পাহাড়ের এক বেলকনিতে উঠতে উঠতেই ঝিরঝির করে বৃষ্টি ঝরতে শুরু করল। উপায় না দেখে সেখানে বসেই লাঞ্চ করে সময়টাকে কাজে লাগাতে চাইলাম। তাই পাশের হোটেলেই সবার জন্য ৪০ রুপী করে ম্যাগির অর্ডার করে চুপচাপ পাহাড়ের বৃষ্টি আর পাশের টেবিলের বিদেশিদের নিয়ে বাঙালির স্বভাবমত মনগড়া গল্প ফাঁদলাম কিছুক্ষণ।

২০ মিনিট পরে গরম গরম ম্যাগি চলে এলো, মাঝারি সাইজের গোল বাটিতে করে। কেউ ইচ্ছায় আর কেউ অনিচ্ছায়, কেউ জোর করে আর কেউ টাকা উসুল করতে ম্যাগি খাওয়া শুরু করলাম। দুই বা একজন বোধহয় পুরো ম্যাগি শেষ করতে পেরেছিলাম। ততক্ষণে বৃষ্টি কমে যাওয়াতে বিল দিয়ে আর ঠাণ্ডা পানিতে গলা ভিজিয়ে তুরতুকের মূল গ্রামের মেঠো পথ ধরেছিলাম, গ্রামের বাসা-বাড়ির গলি ঘুপচি ভিতর দিয়ে।

ছুটন্ত পথে বিচ্ছু দলের ছবি!

কয়েকটা বাড়ি পেরিয়ে একটু ফাঁকা জায়গায় একটা মাঠের কাছে পৌঁছেছি। সামনে অবারিত সবুজ আর সাদা ফুলের অসাধারণ আকর্ষণ, পাশে আপেলের বাগান, মরিচের ক্ষেত, ধান আর যবের মাঠ পেরিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলছি ধীরে ধীরে, ক্যামেরায় ক্লিক করতে করতে। একটু পরে দেখি এক বাড়ির ছোট গলি দিয়ে দুটি বাচ্চা ছেলে-মেয়ে পিছু নিল। বেশ মজাই লাগছিল, নতুন জায়গার একদম নতুন মুখের নিষ্পাপ শিশুদের দেখে, সঙ্গ পেয়ে আর ওদের সাথে দুই-একটি কথা বলে।

একটু পরে দুই ছেলে-মেয়ের একটি দুই রুপী চাইল। নাহ, অবাক হইনি। কারণ ওদের মুখ, কাপড় আর সামগ্রিক প্রতিচ্ছবিই বলে দিচ্ছিল যে ওরা ভীষণ ভীষণ দরিদ্র। হয়তো তিন বেলা ঠিক মতো খেতেই পায় না, এটা ভেবেই মনটা খারাপ হয়ে গেল আর সেই সাথে, ঠিক তখনই মনে পড়ল, কয়েক হাজার মাইল দূরে নিজের ছেলের কথা আর ওর মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠল। ঠিক ওর (আমার ছেলের) মতোই বয়স হবে। যে কারণে মনটা আরও বেশি খারাপ হয়ে গেল। আহারে, আমি যদিও দূরে আছি, কিন্তু আল্লাহর রহমতে এমন ওভাবে ও তো নেই। আর ওরা ঠিক মতো খেতেই পায় না এখানে।

তুরতুকের সবুজ গ্রাম! ছবিঃ লেখক

তাই মনটাকে একটু শান্ত করতে দুই রুপীর জায়গায় ওকে ১০ রুপীর একটি চকচকে নোট দিলাম। নিজের ছেলে বা অনেক ছোটদেরকে তো দিতাম আজকে ঈদের দিনে দেশে থাকলে, এই ভেবে। ওকে দেবার পরে ভাবলাম একজনকে দিলে আর একজনকে না দেবার কোনো কারণ নেই, তাই সাথের মেয়েটিকেও দিলাম ১০ রুপী। যদিও মেয়েটি ছেলেটির চেয়ে একটু বড়ই ছিল। ভেবেছিলাম নেবে না হয়তো কিন্তু নিল এবং নিয়ে দুজনেই চলে গেল। বেশ প্রফুল্ল লাগছিল ওদের দুজনকে ১০ রুপী করে দিয়ে। একটা প্রশান্তি অনুভব করছিলাম। কিন্তু কে জানতো যে এই সাময়িক প্রশান্তিই একটু পরে ভীষণ অশান্তি হয়ে দেখা দেবে? সত্যি ভীষণ অশান্তির মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম কিছু সময়ের মধ্যেই। মাত্র ১০ রুপীর কারণে।  

ওরা চলে গেলে নিজের মতো করে আবার হাঁটতে শুরু করলাম গ্রামের মেঠো পথের আইল ধরে। সামনে দেখি কয়েকটি ছোট ছোট ছেলেমেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তাকিয়ে আছে। একটু অবাক লাগছিল ওদের দিকে তাকিয়ে থেকে। কাছাকাছি যেতেই ঘিরে ধরল টাকার জন্য! আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। বলে কি রে? পাগল নাকি এরা? খবর পেল কীভাবে? তাকিয়ে দেখি যে দুটোকে ১০ রুপী করে দিয়েছিলাম দূরে আড়ালে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে! আমি তাকাতেই বাড়ির আড়ালে লুকিয়ে গেল। বুঝতে আর বাকি রইল না ওরা দুজন এদেরকে পাঠিয়েছে। কি মুশকিল।

আর একটা বিচ্ছু! ছবিঃ পার্পল ড্রিম টিম

তবে যেহেতু এত আশা করে এসেছে তাই ওদের কাউকে কাউকে দুই রুপী আর কাউকে কাউকে চকলেট, বাদাম আর বিস্কিট দিতে চাইলাম। কিন্তু অবাক ব্যাপার সেগুলো নিলেও আবারো ১০ রুপীর আবদার করতে লাগল! ভীষণ বিপদে পড়লাম তখন। কোনো রকমে সেখান থেকে পালালাম। কিন্তু না নিস্তার নেই, সামনে আর একটু এগোতেই দেখি আরও একদল ঘিরে ধরল ১০ রুপী, ১০ রুপী করে! কি তাজ্জব ব্যাপার রে বাবা, দুইজনকে ১০ রুপী দিয়ে কি ফ্যাসাদেই না পড়লাম। ওদেরকে চকলেট আর বিস্কিট দিতে চাইলাম, কিন্তু কিছুতেই নেবে না। ওদের ১০ রুপী চাই, প্রত্যেকের!

তখন মনে পড়ল, আমাদের সাজেকের কথা। আমাদের সাজেকেও ঠিক একই পরিস্থিতি তৈরি হয় চাঁদের গাড়িতে করে যাওয়া-আসার সময়। ঠিক তেমনই। তাড়াতাড়ি করে দেখান থেকে পালালাম কোনো রকমে। ফেরার পথ ধরলাম। কিন্তু সামনে আসতেই দেখি সেই ছেলে-মেয়ে দুটি দাঁড়িয়ে আছে আর তাকিয়ে তাকিয়ে হাসছে। ওদের আবার ডাকলাম। নাম জিজ্ঞাসা করলাম একজন ফাতেমা, আর অন্যজন রুস্তম। ওদের সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখে দূরে যেসব ছেলে-মেয়েগুলোকে ফাঁকি দিয়ে কোনো রকমে পালিয়ে এসেছিলাম দেখি ওরা আবার এদিকে ছুটে আসতে লাগল ১০ রুপী, ১০ রুপী করে চিৎকার করতে করতে!

তুরতুক। ছবিঃ পার্পল ড্রিম টিম

আর দেরি না করে পড়িমরি করে পালিয়ে গ্রাম ছেড়ে নিচের দিকে নামতে শুরু করেছিলাম। আর ওরাও থেমে গিয়েছিল। বাপরে বাপ, একটু সহানুভূতি দেখাতে গিয়ে কি মুশকিলেই না পড়তে হয়েছিল। কোনোরকমে পালিয়ে বেঁচেছিলাম তুরতুকের বিচ্ছু বাচ্চাদের হাত থেকে। ১০ রুপীর বিড়ম্বনার শিকার হয়ে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কোণার্ক সূর্য মন্দিরে…

রাজা মনোহরের জমিদারির প্রতীক চাঁচড়া শিব মন্দির