দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গের সাম্প্রতিক ভার্সন!

কালকা মেইল যখন কালকায় থামে তখনও নিশ্চিত নই যে আদৌ অনেক দিনের লালিত স্বপ্নের টয় ট্রেনে সিমলা যেতে পারবো কি পারবো না। কারন গত দুই দিনে ভারতে দিল্লী, চণ্ডীগড় ও কালকা গামী প্রায় ৪০০ ট্রেন বাতিল হয়েছে। রাম-রহিমের কারনে! ওদিকে আমাদের সিভালিক ট্রেন এর টিকেটও বাতিল করা হয়েছে আগের দিনেই। স্টেশনে নেমে সেখানকার লোকজনকে জিজ্ঞাসা করতেই জানতে পারলেম অন্য পাশের প্লাটফর্মের বাইরে গিয়ে টয় ট্রেনের টিকেট কাটতে হবে।

সবাইকে বসিয়ে রেখে দুজন মিলে ছুটলাম টয় ট্রেনের টিকেট কাটতে। লাইনের দুজন পরেই আমরা আমাদের অনেক কাঙ্ক্ষিত টয় ট্রেনের টিকেট পেয়ে গেলাম। আর সাথে সাথেই গত প্রায় তিন দিনের ট্রেন জার্নির ক্লান্ত উধাও হয়ে গেল আনন্দে। যে যার ব্যাগ নিয়ে পড়িমরি করে ছুটলাম জানালার পাশে সিট পেতে। কারন এই ট্রেনের কোন সিট নাম্বার নেই। যে যার সুবিধামত সিটে বসতে পারে, টিকেট কাটা থাকলেই। তাই সিট দখলের একটা ব্যাপার রয়েই গেছে। যাক সবাই মিলে নিজেদের আটটি সিট নিয়ে নিলাম একই যায়গায়।

টয় ট্রেনের সে…! ছবিঃ লেখক

সবাই বসে পরতেই চোখ গেল সামনের দিকে। বাহ এক অপরূপা বসে আছে নিজের আপন খেয়ালে। তার বর্ণনা কিভাবে দেয়া যায় ঠিক বুঝতে পারা যায়নি পুরো সাত ঘণ্টা ট্রেন ভ্রমণের মধ্যেও। এতটাই রহস্যময়ী চেহারার অধিকারিণী সে! কখনো ভীষণ আদুরে, কখনো আহ্লাদী, কখনো রাগী তো কখনো দারুণ অভিমানী। এই হাসে তো এই গাল ফুলিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে থাকে। টকটকে গায়ের রঙের সাথে ঠিক গোলাপি আপেলের মত গাল! ঠোঁটের মাঝে তিল যেন বাড়তি আকর্ষণ, চোখ তো নয় যেন, গভীর কোন জলাশয়! যে যার মত করে তাকে দেখছে সেটা স্পষ্ট করেই বুঝলাম।

কেউ চোখে কালো চশমা পরে, কেউ পেপারের ফাঁক গলে, কেউ দরজায় ঝুকে পরে, তো কেউ যেতে-আসতে ফিরে ফিরে। এবং সেও সেটা বেশ মন প্রান দিয়ে উপভোগ করছে বোঝা গেল। দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে।

একটি যায়গায় আমাদের টয় ট্রেন বেশ অনেকক্ষণ থেমে রইলো। যেখানে প্রত্যেকেই চা বা অন্য কোন কিছু খেল। সেই দুলহান ধরনের মেয়েটিও সেখানে নেমে একটু পায়চারী করতে লাগলো।

এখানে প্রশ্ন আসতে পারে হুট করে সেই রূপবতী দুলহান হল কিভাবে?

কারন এখানেই যে ঘটেছিল দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গের সাম্প্রতিকতম ভার্সনের শুটিং! তো সেই ঘটনা বলি আর কি?

টয় ট্রেনের ছুটে চলা। ছবিঃ লেখক

ট্রেন থেমে থাকাতে অনেকের সাথে সেই মেয়েটিও নিচে নেমে পায়চারী করতে লাগলো। এরই মাঝে হুট করে হুইসেল দিয়ে ট্রেন ছেড়ে দিল! সবাই যে যার মত করে দৌড়ে ট্রেনে ওঠার চেষ্টা করতে লাগলো। সাথে সাথে মেয়েটিও পড়িমরি করে দৌড় দিয়ে ট্রেনের কাছে চলে আসতে চেষ্টা করলো, তার বগির দরজার কাছে। যেখানে তার হাত ধরে তোলার জন্য অসংখ হাত অপেক্ষা করে আছে আগে থেকেই  

কেউ কেউ ট্রেনের দরজায় দাড়িয়ে আছে হাত বাড়িয়ে! কেউ কেউ ট্রেনের নিচেই দৌড়ে দৌড়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে! কেউ কেউ দূর থেকে দৌড়ে আসছে তাকে তুলে নেবার জন্য! আমি দূরে দাড়িয়ে তখন মজা দেখছি! কি ঘটে শেষ পর্যন্ত সেটা উপভোগ করার জন্য। কারন এই ট্রেনের পুরো গতির সাথে পাল্লা দিয়ে কয়েকবার ট্রেনে লাফ দিয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা ততক্ষণে আমার নেয়া হয়ে গেছে! তাই নিশ্চিন্তে বসে মজা দেখছি…

এরই মাঝে দেখালাম, আমাদের টিমের সবচেয়ে বড় যিনি, তিনি তার সিট থেকে পড়িমরি করে দৌড়ে ছুটে আসছেন দরজার কাছে মেয়েটিকে উদ্ধার করার জন্য! অথচ আগেই বলেছি যে, তাকে সাহায্য করার জন্য দরজায় কয়েকজন আগে থেকেই অপেক্ষায় অপেক্ষমান, কেউ ট্রেনের সাথে সাথেই দৌড়াচ্ছে! কেউ প্লাটফর্ম থেকে মেয়েটির সাথে সাথে আছে, ওঠার সময় সাহায্য করার জন্য! এরই মাঝে ব্যাতিক্রম আমাদের সেই টিমমেট, যিনি কিনা নিজের সিট ছেড়ে, সবাইকে হটিয়ে ট্রেনের দরজার কাছে চলে গেছেন মেয়েটিকে প্রানপণ সাহায্য করার জন্য! দরজায় দাড়িয়ে, এক হাতে হাতল ধরে, আর এক হাত বাড়িয়ে দেবেন ঠিক এমন সময়…

পথের মধ্যে স্টেশনে। ছবিঃ লেখক

হ্যাঁ ঠিক সেই সময় ট্রেন গেল হুট করে থেমে!

্যাঁ ঠিক সেই সময় ট্রেন গেল হুট করে থেমে!

কারন ট্রেন এতটাই ছোট যে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবটুকুই চালক দেখতে পারেন বসে থেকেই! তাই তিনি ট্রেন না চালিয়ে মেয়েটিকে উঠতে সাহায্য করার জন্য ট্রেন থামিয়ে দিলেন মুহূর্তেই! আহ সাথে সাথে সেই আমাদের বেচারা দিলওয়ালের চেহারাখানা হয়েছিল দেখার মত!

ট্রেনের পা দানিতে দাড়িয়ে, হাতল ধরে, ঠিকই একটি হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল কিন্তু ট্রেন হঠাৎ থেমে যাওয়াতে সেই হাতে আর একটি কুমারী হাত এসে পৌছাতে পারেনি, সেই দুঃখে, কষ্টে, হতাশায় তার মুখমণ্ডল শুকিয়ে গিয়েগিল মুহূর্তেই! সেই মুহূর্তে অনেক কষ্ট করে আমরা আমাদের হাসি চেপে রেখেছিলাম।

পরে তাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হল ভাই কি দিলওয়ালে দুলাহানিয়া লে জায়েঙ্গের কথা মনে পরে গিয়েছিল এই বয়সে এসে?

তিনি এরপর যে উত্তর দিয়ে ছিলেন সেটা শুনে আমরা কেউ আর আমাদের চেপে রাখা হাসি ধরে রাখতে না পেরে উগড়ে দিয়েছিলাম। আর পরবর্তী পথটুকু সেই কথা দিয়েই তাকে খেপিয়ে ছিলাম।

দিলওয়ালের দুলহানিয়া… ছবিঃ লেখক

তিনি কেন সিট থেকে উঠে ওই মেয়েকে উদ্ধার করতে গেলেন? তাকে জিজ্ঞাসা করাতে তিনি যেটা বললেন, সেটা হল…

আরে ভাই মানবিক দিক থেকে গিয়েছি একটু সাহায্য করতে!

ওহ রিয়েলি, মানবিকভাবে? তাহলে যারা ওই মেয়ের আসে পাশে অপেক্ষা করছিল তারা কি জন্য অপেক্ষা করছিল?

ওরা তো সব দিলওয়ালে মিয়া, দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গেকে লিয়ে দাড়িয়ে দিল, হ্যাংলার মত করে!

আমি একদম মানবিক ভাবে গিয়ে হাত বাড়িয়ে ছিলাম!

ওহ আচ্ছা, তাই না, তবে তো আপনার কাছে এটা একটা মানবিক গল্প!

আপনারা কি বলেন?

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অলস শহর মানালি…

কোণার্ক সূর্য মন্দিরে…