অলস শহর মানালি…

খুব ভোঁরে ঘুম ভেঙে গেল সবার। আগের রাতে মন ভরে সিমলার মল রোড দেখা আর রাতে চমৎকার ডিনার শেষে, শীতের ভিতরে উষ্ণ কম্বলের নিচের আরামে। তিনজন মিলে গেলাম শিমলা থেকে মানালি যাবার গাড়ি ঠিক করতে। গাড়ি ঠিক করার পাশপাশি একটু সিমলার বাজার, বাসস্ট্যান্ড, লোকালয়ও দেখা হয়ে গেল হেঁটে হেঁটে। শিমলা বাসস্ট্যান্ড টা ঠিক একটা পাহাড়ের বেলকোনিতে বেশ অগোছালো ভাবে দাড়িয়ে আছে। টিপটপ আর গোছানো শিমলা শহরের সাথে বাস স্ট্যান্ডটা আমার কাছে বেশ বেমানান লেগেছে। অগোছালো, অতটা পরিচ্ছন্নও নয় আর তাছাড়া তেমন একটা শৃঙ্খলাও চোখে পড়েনি যেটা ভারতের অন্যান্য শহরে পেয়েছি বা দেখেছি।

মিহি পথে, সিমলা থেকে মানালি। ছবিঃ লেখক

সে যাই হোক শিমলা বাস স্ট্যান্ড ছাড়াও আশেপাশে গাড়ি বা জীপ দাড়িয়ে আছে এমন বেশ কয়েক যায়গায় খোঁজ খবর নিয়ে দেখা গেল শিমলা থেকে মানালি যাওয়ার জন্য রিজার্ভ জীপ ৫৫০০ রুপীর নিচে কোন ভাবেই পাওয়া সম্ভবনয়। তাই দেরি না করে অবশেষে নিয়ে নিলাম ৫৫০০ দিয়েই। গাড়ি আসতে আসতে সবাই প্রস্তুত হয়ে গেছে শিমলা থেকে মানালি যাবার জন্য। গাড়িতে সবার ব্যাকপ্যাক তুলে নিয়ে পাশের ছোট্ট চায়ের দোকান থেকে চা আর বিস্কিট দিয়ে হালকা খাওয়া দাওয়া করে নিলাম। পথে নান্দনিক কোন যায়গা পেলে সেখানে থেমে ভালো করে সকাল আর দুপুরের খাবার একসাথে খাবো বলে। এটা আমাদের একটা অলিখিত নিয়ম। তবে যায়গাটা অবশ্যই হতে হবে পাহাড়ে-নদীতে বা পাহাড়ে পাহাড়ে মিতালী করেছে সবুজের সাঁজে সেজে।  

গাড়িতে ৯ জনের কিছুটা কষ্ট হলেও, মনে ভীষণ আনন্দ থাকার কারনে একটু কষ্টকে কেউই তেমন পাত্তা দিলামনা। চারপাশের যতটা পাহাড় আর নানা রকম রূপ দেখতে দেখতে, মুগ্ধ রাস্তা আর মসৃণ রাস্তা দিয়ে যাবো ভেবেছিলাম ততটা আর পেলামনা। যেটা পেয়েছিলাম প্রথমবার শিমলা থেকে মানালি যাবার সময়। রাস্তা বেশ ভাঙা-চোরা, জ্যামও ছিল বেশ শিমলা থেকে বের হবার সময়। আর ছিল খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত ধুলোবালি, বেশ কিছুটা পথে। কারন সেবার যে পাহাড়ি হাইওয়ে দিয়ে গিয়েছিলাম এবার সেই পথে না গিয়ে অন্যপথে গিয়েছিল গ্রাম ও শহরের মাঝখান দিয়ে। কিন্তু ঘণ্টা খানেক যাবার পরেই দারুণ রাস্তা, চারপাশের অপরুপ পাহাড় আর অরণ্যের প্রকৃতি দেখে সবাই মুগ্ধ হতে শুরু করলো।

যেতে যেতে পথে… ছবিঃ লেখক

ক্যামেরার ক্লিক আর ক্লিক চলছেই অবিরত। আমি নিজের মত দেখছিলাম চারপাশটা মনের আশ মিটিয়ে। ছবি তোলা একদম বাদ। কারন সবাই তো ছবি তুলছেই, একই ছবি আর কতই তুলবো? তাছাড়া ওদের কাছ থেকে তো সব ছবিই পাবো, দুদিন আগে বা পরে। তাই একটি মুহূর্তও নির্মল আর দুর্লভ প্রকৃতির কাছ থেকে নিজেকে বিচ্যুত করিনি। আবার কখনো শিমলায় আসা হয় কি না হয় সেই আশঙ্কায়। দেখার সাধ মিটিয়েছি মনের ইচ্ছে মত। চুপচাপ পিছনে বসে থেকে।

তবে, চুপচাপ এই পিছনে ঘাপটি মেরে বসার পিছনেও একটা সুক্ষ কারন ছিল বৈকি! আমি যেটার নাম দিয়েছি ভ্রমণ রাজনীতি! সেটার কথা একটু না বললেই নয়, যেটা অন্য একজনের সাথে শেয়ার করেছিলাম। সেটা হল…

এর আগে যেহেতু সিমলায় এসেছি, এই পথে মানালিতে গিয়েছি তাই আবার জানালার পাশে পছন্দের সিটে নিজে না বসে অন্যদেরকে বসতে দিলাম, যেন যখন মানালি থেকে লেহ যাবো সেই সময় নিজের পছন্দের সিটে বসতে চাইলেও কেউ আপত্তি করতে না পারে! আগে নিজ থেকে ওদের সুযোগ দিয়েছি, ওরা কি পরে আর না করতে পারবে? পারবেনা আর পারেওনি। এবং সেটাতে সফলও হয়েছিলাম মানালি থেকে লেহ যাওয়ার দুর্লভ সেই পথে!

পাহাড়ি নদী। ছবিঃ লেখক

মাঝে বেশ কয়েকবার নিজেদের ইচ্ছামত বিরতি দিয়ে শেষ বিকেলে পৌঁছে গিয়েছিলাম কুল্লু। তবে সেখানে রাস্তা ভীষণ খারাপ থাকায় কুল্লুতে আর থামা হলনা। থামার মত পরিবেশ না পাওয়ায়। সোজা চলে এসেছিলাম প্রায় মানালি। কুল্লু থেকেই সবার নজরে প্রথমবার পড়তে লাগলো, আপেলের গাছ, বাগান আর লাল-সবুজ-গোলাপি আপেলের থোকা থোকা ধরে থাকা। এক একটি বাগান ছাড়িয়ে গাড়ি এগিয়ে চলে আর সবাই মিলে চিৎকার করে উঠি, আপেল বাগান, আপেল বাগান বলে! এক সময়তো ড্রাইভারের উপরে সবাই বেশ বিরক্তই হয়ে পড়লো কোন আপেল বাগানে থামছেনা!

অবশেষে ড্রাইভার থামলো, বিশাল এক আপেল বাগান ঘেঁসে তেলের পাম্পের কাছে। সেখানে বেশ অনেক সময় নিয়ে আপেল দেখা, ছবি তোলা, গাছের তলায় ঝরে পরে থাকা আপেল কুড়িয়ে খেয়ে উপভোগ করেছিলাম সেই অপূর্ব গোধূলিটা। এক একজন যায় আর কয়েকটি করে আপেল কুড়িয়ে নিয়ে আসে নিজের ইচ্ছামত। কিন্তু কটা আপেলই বা খাওয়া যায়? একটির বেশী আপেল কেউই একবারে খেতে পেরেছে বলে আমার মনে হয়না। দুই একজনকে তো দেখলাম বড় একটি আপেলে বিশাল একটি বা দুটি কামড় বসিয়ে দিব্বি ছুঁড়ে ফেলে দিল পাশের পাহাড়ের খাঁদে! যেন ঢেল ছুড়ছে আপেল দিয়েই! আহারে সেটা দেখে বেচারা দুর্লভ আপেলের জন্য একটু মন খারাপই হল।

বাঁক পেরোলেই মানালি। ছবিঃ লেখক

আপেল কুড়িয়ে, খেয়ে, ছুঁড়ে ফেলে, ছবি তুলে তৃপ্ত হয়ে আবারো চড়ে বসলাম আমাদের গাড়িতে। প্রায় ২০-৩০ মিনিট পরে পৌঁছে গেলাম আমার ভীষণ প্রিয় এক অলস শহর মানালিতে। এখন নিজেদের পছন্দমত হোটেল খুঁজে নেবার পালা। তবে সবার একটাই আবদার, ভাই হোটেলটায় যেন ওয়াইফাই থাকে! কয়েকদিন হল ঠিকঠাক মত কোন আপডেট নেই। তেমন কোন যোগাযোগও নেই, তাই ইন্টারনেট সংযোগকে বাধ্যতামুলক করা হল হোটেলের রুম খুঁজে নেবার ক্ষেত্রে!

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শিমলা: একহাতে সুখ যার অন্য হাতে দুঃখ!

দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গের সাম্প্রতিক ভার্সন!