শিমলা: একহাতে সুখ যার অন্য হাতে দুঃখ!

মল রোডের মাদকাতা যখন ভাঙল ততক্ষণে বেশ রাত হয়ে গেছে। রাত বাড়ার সাথে সাথে বেড়েছে শীতের ঠাণ্ডা বাতাস, মেঘের জড়িয়ে থাকা আর ঘন কুয়াসা। এবার হোটেলে ফেরার আগে ডিনার করতে হবে। কোথায় ডিনার করবো আর কি ডিনার করবো এসব নিয়ে আলাপ চলছিল টিমমেটদের সাথে। আলাপের মাঝে একজন বলল, মল রোডের একটু নিচের দিকে জামা মসজিদ/জামে মসজিদ নামক একটা যায়গা আছে, সেখানে ভাত আর বেশ ভালো খাসির মাংস পাওয়া যায়।

ভাত আর খাসির মাংসর কথা শুনে তো সবার ক্ষুধা বেড়ে গেল কয়েকগুণ! আবার কবে, কোথায়, কিভাবে ভাত আর খাসির মাংস খেতে পারবে না পারবে সেই আশংকায় সবাই মিলে চলেছি মল রোডের জামা মসজিদের খোঁজে। বেশ কয়েক যায়গায় জিজ্ঞাসা করে করে, অনেকটা নিচে নামতে হল ডানের বামে। প্রায় ২০/৩০ মিনিট পরে খুঁজে পেলাম জামা মসজিদ এলাকা। আসলে এটা একটা মসজিদ। যার ভিতরেই আছে সুখের সিমলার সাথে একরাশ চিরন্তন দুঃখ!

জামা মসজিদ সিমলা। ছবিঃ লেখক

সুখের শহর শিমলা এসে যে এমন দুঃখ, কষ্ট আর অসহনীয় কিন্তু অব্যাক্ত যন্ত্রণার মুখোমুখি হতে হবে ভাবতেই পারিনি। ভিতরে ঢুঁকেই দেখি এ এক অন্য সিমলা। উপরে তাকিয়ে দেখলাম জরাজীর্ণ পুরনো বিল্ডিং থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা, এখানে-সেখানে ঝুলে আছে নোংরা, ছেড়া আর বিবর্ণ কাপড়ের টুকরো, কোথাও ঝুলে আছে ময়লায় কালো হয়ে যাওয়া মশারির কোন অংশ, ছেড়া শার্ট বা প্যান্ট এসব। সিঁড়ি গুলো চিকন, জীর্ণ, স্যাঁতস্যাঁতে, আর ভয়ানক ঝুঁকিপূর্ণ, যেন যে কোন মুহূর্তে ধসে পরবে! নিচের মেঝেতে বিছিয়ে রাখা হয়েছে চটের বিছানা, ছাদ থেকে চুইয়ে পরা পানিতে যেন মেঝে ভেসে না যায়?

এরপর যা জানলাম আর শুনলাম সেটা আমার “কলকাতার কষ্ট” আর “কাশ্মীরের অনন্ত কষ্টর” চেয়েও কষ্টের। মসজিদের সাথে লাগোয়া একটি বিশাল গুদাম ঘরের মতন। যেটাকে ওনারা নাম দিয়েছে মুসাফিরখানা। ওখানকার পুরনো বাসিন্দাদের মুখ থেকে যতটুকু জানলাম সেটা এমন…

মুসাফিরখানার বাসিন্দারা। ছবিঃ লেখক

১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের সময় কিছু কাশ্মীরি আর অন্যকিছু মুসলমান এখানে আটকা পরে যায়। কোন না কোন কারনে বেশ কিছুদিন তারা এখানে আটকে পরে থাকে। সেই সময় তাদের সাময়িক থাকার ব্যাবস্থার জন্য গড়ে তোলা হয় এই মুসাফিরখানা। আর যারা আঁটকে পরেছিল তাদের একটি তালিকা করা হয়, যেটা পরে রেজিস্ট্রি খাতার মাধ্যমে নথিবধ্য করে রাখার ব্যাবস্থা করা হয়। সেই সময়ে জীবিকার তাগিদে ওখানকার বাসিন্দারা বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত থাকে।

কেউ গাইড, কেউ সুভেনির বিক্রেতা, কেউ কম মুলের গরম কাপড় বিক্রেতা, কেউ খুচরা প্রসাধনী ফেরি করে, কেউ ঘোড়ার সহকারী, কেউ মুচি, কেউ নাপিত, কেউ সেলাইয়ের কাজ বা সহকারি, আর যারা একটু ভালো কাজ জোটাতে পেরেছিল তারা খাবার বানিয়ে বিক্রি করতো অল্প আয়ের মানুষদের মাঝে। আর একটি ব্যাবসা আছে বা কাজ, কেউ কেউ নিজেকে হোটেল বা গাড়ির মধ্যাস্ততাকারী হিসেবে নিয়োজিত করেছে। কিন্তু জীবিকার সন্ধান আর কালের বিবর্তনে তারা কেউই আর এই মুসাফিরখানা থেকে বেরিয়ে যেতে পারেনি। কোন না কোন কারনে, যেটা তারা কেউই স্বীকার করেনি বা করতে চায়নি।

এভাবেই কাটে ওদের মানবেতর জীবন। ছবিঃ লেখক

এই মুসাফির খানায় তারা সবাই একই সাথে। দিনে যে যার কাজ করে রাতে ফিরে ভিতরেই তারা গাদাগাদি করে থাকে, এক অমানবিক পরিবেশে। যেখানে অন্তত ১৫০/২০০ ব্যাগ ঝোলানো আছে চারপাশ জুড়ে! পুরো মেঝেতে বিছানো আছে চটের বস্তা আর একটা করে বেডিং, আর আছে সবার জন্য একটি ছোট্ট টিভি সবার একটু বিনোদনের জন্য। ভিতরেই কেউ কেউ সেলাই মেশিন নিয়ে কাজ করে চলেছে তার আপন মনে। কেউ টিভি দেখছে, কেউ শুয়ে বসে আছে নিজের মত করে।

এখানে কারো মনে বা মুখে কোন আনন্দ নেই, দেখিনি। এদের অব্যাক্ত বেদনা যে কাউকে স্পর্শ করবে মুহূর্তেই, এরা হাসতে জানেনা বা পারেনা, এদের নিজেদের কোন আনন্দ নেই, সব সময় একটা চাপা কষ্ট নিয়ে বসে থাকে, প্রত্যেকের চোখেমুখে কিসের যেন আর্তনাদ আর হাহাকার মেশানো! কলকাতার টানা গাড়ির বৃদ্ধরা তবুও দিন শেষে নিজের ভাঙা ঘরে হলেও ফিরে গিয়ে নিজের একান্ত আর প্রিয়জনের মুখ দেখে হলেও কিছুটা সান্তনা পায়।

আঁধার জীবনের ছবি। ছবিঃ লেখক

কাশ্মীরের অনন্ত কষ্টের মানুষেরা ছেলে-মেয়েয়া যতই না খেয়ে থাকুক না কেন, নিজের মা-বাবার কাছে অন্তত থাকে, জীর্ণ কাপড় পরলেও একটু হলেও আদর-মমতা বা প্রিয়জনের সান্নিধ্যে থাকতে পারে।

কিন্তু এরা? চাইলেও নিজের ইচ্ছামত তাদের একান্ত জনের কাছে ছুটে যেতে পারেনা, কারো সাথে নিজের কষ্ট শেয়ার করতে পারেনা, প্রিয়জনের সাথে কষ্ট গুলোকে ভাগাভাগি করতে পারেনা, নিজের সাথেই নিজে কথা বলে, নিজের কাছেই নিজের কষ্ট লুকিয়ে রেখে জীবন চালিয়ে দেয়। এমনকি এখানে কাজের কথা ছাড়া নিজেদের মধ্যে নিজেদের দুঃখ-কষ্ট ভাগ করার কেউই নেই! করবে কি করে এক এক জনের কষ্টের পাহাড় এতোই উচু যে একটা আর একটাকে ছাড়িয়ে যায় প্রতি নিয়তই!

সবটুকুই দুঃখ যাদের! ছবিঃ লেখক

ঠিক যেমন আমরা এক পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়ালে দূরের অন্য পাহাড়কে মনে হয় ওটা বেশী উচু! আর একদিকে তালাকে মনে সেটা বেশী উচু, মোট কথা যেদিকেই তাকাইনা কেন মনে হয় যেন আমি যে পাহাড়ের দাড়িয়ে আছি সেটার চেয়ে দূরের গুলো যেন একটু বেশী উঁচু! এদের এক এক জনের কষ্টের পরিমাণ এরকম। কার যে কি পরিমাণ কষ্ট মেপে শেষ করা যায়না আকাশের উচ্চতার মত!   

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সৈনিকদের স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত যুদ্ধ সমাধি

অলস শহর মানালি…