লাদাখের পথে যাত্রা শুরু

mde

ঈদ আর সেমিস্টার ব্রেকের ১৬ দিনের লম্বা একটা ছুটি একসাথে পেতেই আমি একটুও দেরি করিনি। কারণ একই সাথে এত দিনের লম্বা ছুটি চাকুরী আর সংসার জীবনে আর পাবো কি না সেটার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই ঝটপট টিকেট করে ফেললাম দুজনে। কারণ আমার প্ল্যান শুনে এক ফেসবুক বন্ধু সাথে যাবে বলে নিশ্চিত করেছিল।

এরপর দিন যত ঘনিয়ে এল, একে একে তিন, চার থেকে নয়জন মিলে একটা বেশ বড় গ্রুপ হয়ে গেলাম লেহ-লাদাখ ভ্রমণে। তারপর শুধু ছুটি শুরুর অপেক্ষা আর অপেক্ষা। অবশেষে সেই দিন এসে গিয়েছিল ২০১৭ সালের আগস্ট মাসের ২৩ তারিখে। আমাদের সবকিছু ঠিকঠাক ছিল।

আলো আধারির যাত্রা শুরু। ছবিঃ লেখক

বুকের মধ্যে নানা রকম সুখ দুঃখের উত্তেজনা নিয়ে, আমাদের পার্পেল ড্রিম লাদাখের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হলো সন্ধ্যা ৭টার তিস্তা এক্সপ্রেস ট্রেনে। অফিসের শেষ দিনে এমনিতেই অফিসে সবচেয়ে বেশি কাজের ব্যস্ততা থাকে কেন যেন, সব সময়ই! তবুও বসকে বলে-কয়ে ম্যানেজ করে দুপুরের পর পরই বের হলাম, বাসায় একটু সময় দেব, ব্যাগটা আর একবার দেখে নেব। পাসপোর্ট,  টিকেট, ডলার-রুপী আর একবার ভালো করে গুছিয়ে নেব বলে। আর তাছাড়া ১৫/১৬ দিন থাকবো না বলে, বাসার পরিস্থিতি বেশ থমথমে। তাই একটু আগেভাগে গিয়ে বাসায় একটু থাকা আর নিজের একটু বিশ্রাম নিয়ে নেয়া।

৭টায় ট্রেন, তাই ৫:৩০ এ বের হব। কিন্তু বের হতে হতে প্রায় ৫:৪৫। পয়সা বাঁচাতে রিকশার বদলে একটু হেঁটে গিয়ে বাসে উঠতে উঠতে ৬টা। কিন্তু বাসে ওঠার পর থেকেই নানা রকম অনাকাঙ্ক্ষিত জ্যামে পড়তে শুরু করলাম, মিরপুর ২ থেকেই। যেটা কখনোই হয় না, সেটাই ঘটতে শুরু করলো। এই সময় জ্যাম হয় অফিস থেকে ফেরত রাস্তায় আর এই পাশ থেকে ওদিকে যাবার রাস্তা সব সময়ই ফাঁকা থাকে। কিন্তু কেন যেন আজকে মহা জ্যাম পুরো রাস্তা জুড়েই।

ট্রেনে চলার পথে। ছবিঃ লেখক

বাসে বসে বসে ভাবছিলাম, মিরপুরটা ছাড়িয়ে কালসি রোডে উঠতে পারলেই আর চিন্তা নেই, একটানে এয়ারপোর্ট। কিন্তু সেই কালসি রোডে উঠতেই সন্ধ্যা ৬:৩০! আরও যদি ২০ মিনিট লাগে তবেও, পৌঁছে ১০ মিনিট হাতে থাকবে। কিন্তু হায়, কালসি গিয়ে দেখা গেল জ্যাম আরও বেশি! কোনোমতে ইসিবি পৌছাতে পৌছাতে প্রায় ৬:৫০! তার মানে ট্রেন মিস শুরুতেই! এরই মধ্যে ভেবে রাখলাম ট্রেন মিস হলে, ফিরে আসবো গাবতলি। ওরা ট্রেনে যশোর যাক, আমি বাসে করে কোনো না কোনোভাবে বেনাপোল পৌঁছে ওদেরকে নাহয় হাওড়া স্টেশনেই খুঁজে নেব! ৫০০ টাকা অতিরিক্ত খরচ হবে, কী আর করার?

ট্রেনের যে একটু খোঁজ নেব ওদের কারো কাছ থেকে, সেই উপায়ও দেখছি না। কারণ মোবাইলে নেট নেই, আর ওদের নাম্বারের কথা একদম মনে ছিল না। বেশ কিছু সময় পরে নেট না নিয়েই নগদ টাকার উপরেই খরচ করতে শুরু করলাম শুধু খোঁজ নেবার জন্য। যাক, কিছুটা শান্তি পাওয়া গেল এই জেনে যে ট্রেন এখনো কমলাপুরে পৌছায়নি! সবে মাত্র বিমানবন্দর থেকে যাচ্ছে ওদিকে। তার মানে নিশ্চিত হওয়া গেল। ট্রেন আর মিস হবে না আশা করি।

অতঃপর ভোর, নতুন সকাল। ছবিঃ লেখক

তারও প্রায় ৩০ মিনিট পরে ৭:৩০ এ পৌঁছালাম বিমানবন্দর! যদি ট্রেন সঠিক সময়ে ছাড়ত, তবে তো আমার ১২টা বেজে যেত, শুরুতেই! উপরওয়ালা বড় বাঁচা বাঁচিয়েছে। শুকরিয়া আদায় করে অন্য দুই সহকর্মীকে খুঁজে বের করলাম, স্টেশনে। অপেক্ষা করতে লাগলাম, তিস্তা এক্সপ্রেস ট্রেন এসে আমাদেরকে নিয়ে যাত্রা শুরু করার। প্রায় ৩০ মিনিট অপেক্ষা করার পরে কাঙ্ক্ষিত তিস্তা এক্সপ্রেস বিমানবন্দর স্টেশনে চলে এলো। আমাদের কয়েকজন সেই কমলাপুর থেকে উঠেই জানালা দিয়ে অপেক্ষা করছিল আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য।

ওদের দেখা পেয়ে সবাই দারুণ উচ্ছ্বসিত। ঝটপট ভিড় ঠেলে উঠে পড়লাম ট্রেনে। নিজেদের আসনে বসে দারুণ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। আর যোগাযোগ করলাম জয়পুরহাটের বড় ভাই বা বন্ধুর সাথে। হ্যাঁ, তিনিও তার ট্রেনে উঠে পড়েছেন ততক্ষণে। এরপর নানা রকম কথা, গল্প, গান, আড্ডা, ইয়ার্কি, ফাজলামি একই সাথে সমবয়সী অনেকে ভ্রমণে বের হলে যা হয় আর কি। সেসব নানা রকম কাণ্ড-কারখানা করতে করতে শেষ রাতে গিয়ে পৌঁছে গেলাম যশোর স্টেশনে। আমাদের অন্য বন্ধু ততক্ষণে যশোর পৌঁছে স্টেশনে অপেক্ষা করতে লাগলেন।

স্বর্ণালী দিনের শুরু। ছবিঃ লেখক

ট্রেন থেকে নেমেই তার দেখা পেয়ে গেলাম। সবাই সবার সাথে পরিচিত হয়ে, ফ্রেশ হয়ে বেনাপোলের বাসে উঠে বসলাম। তবে তখনো একজনের আসা বাকি ছিল। যিনি কাজ থাকায় দিল্লী বা শিমলাতে আমাদের সাথে যোগ দেবেন বলে সব ঠিক করে রেখেছেন। তাই আপাতত আটজন মিলেই শুরু করলাম স্বপ্নের পথে যাত্রা। আমাদের পার্পল ড্রিম টিমের, লেহ-লাদাখের স্বপ্নিল পথের স্মরণীয় যাত্রার মূল পর্ব শুরু হলো প্রায়। শুধু বর্ডার পার হয়ে, দিনটি এদিকে ওদিকে কাটিয়ে কালকা মেইলে উঠতে পারলেই হয়।     

প্রায় নির্বিঘ্নেই দুই বর্ডারের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে, অটোতে করে চলে গেলাম বনগাঁ লোকাল ধরতে। বনগাঁ গিয়ে সবাই স্টেশনেই সকালের নাস্তা করে নিলাম লুচি-মিষ্টি আর আলুর তরকারী দিয়ে। এরপর ২০ রুপীর টিকেট করে সবাই একটি করে সিট নিয়ে বসে পড়লাম। বলা বাহুল্য, বনগাঁ লোকালে যেতে হলে অধিকাংশ সময়ই অর্ধেক পথ বসে আর বাকি অর্ধেক পথে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের বসতে দিয়ে দাঁড়িয়ে যেতে হয়। এটা ওদের অলিখিত নিয়ম হয়ে গেছে। আমরাও সেভাবে অর্ধেক বসে আর বাকি অর্ধেক দাঁড়িয়ে থেকে শিলাদহ স্টেশনে পৌঁছে গেলাম।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিয়েতনামের যত পুরোনো মুখ

কালকা মেইলের দিন-রাত্রি