লাদাখের পার্পল ড্রিম!

সব রঙেরই আলাদা আলাদা অর্থ আছে বলে আমার কাছে মনে হয়। লাল উচ্ছ্বাসের, সাদা শান্তির, সবুজ প্রশান্তির, নীল ভালোবাসার, ধূসর বেদনার, হলুদ তারুণ্যের, গোলাপি প্রেমের, কালো শোকের। কখনো কখনো সময়, অবস্থান আর পরিস্থিতি ভেদে প্রতিটি রঙের অর্থ আলাদা আলাদাভাবে প্রকাশ পেতে পারে। তবে পরিবর্তন যাই হোক, সেটা একটিই। একটি রঙ, একটিই তার অর্থ।

কিন্তু একটি রঙের অর্থ আমার কাছে একটু ভিন্নভাবে ধরা দেয়, যে রঙটির কোনো একক বা মাত্র একটিই অর্থ আছে বলে আমার কখনো মনে হয় না। আমার মনে হয় এই রঙটির একই সাথে অনেক অর্থ, অনেকগুলো আবেগ-অনুভূতি, ভালো লাগা-মন্দ লাগা, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, স্বপ্ন-বাস্তবতা, সত্যি-মিথ্যা, চাওয়া-পাওয়া আর সবগুলো রঙের সবগুলো আলাদা আলাদা অর্থ মিলে একটি যে রঙটি আছে সেটি পার্পল বা বেগুনি।

স্বপ্নের এই পথে ছুটে যাবো। ছবিঃ লেখক

কিন্তু বেগুনি বললে ঠিক সুখটুকু যেন পাওয়া যায় না, তাই পার্পল শব্দটি আমার কাছে খুব যথাযথ মনে হয়। পার্পল বেশ ভালো লাগার, আদুরে আর আহ্লাদি একটা শব্দ মনে হয় আমার কাছে। আর এসব কিছু মিলেই আমাদের অন্যতম আর নতুন স্বপ্ন, পার্পল ড্রিম বা লাদাখ ভ্রমণ।

২০১৪ সালের একদম প্রথমে ছিলাম স্বপ্নের এক অলসপুরী মানালিতে। প্রথম দুদিন ইচ্ছামতো আর স্বাদ মিটিয়ে বরফে দাপাদাপি করে কাটালাম। পরদিন রোথাংপাস যাবো মনে মনে ভেবে রেখেছিলাম। কিন্তু জানা গেল খুব বেশী তুষারপাত হবার কারণে রোথাংপাস যাবার রাস্তা বন্ধ। ওদিকে যেতে হলে আরও দুই-একদিন মানালিতে থাকতে হবে। কিন্তু আমাদের সেই সময় ছিল না বলে বাধ্য হয়েই দিল্লীর পথ ধরেছিলাম সেবার। সেবারই প্রথম এই পার্পল ড্রিম বা লাদাখ ভ্রমণের স্বপ্নটা দেখেছিলাম।

রুক্ষ সুখের পাহাড়! ছবিঃ লেখক

কিন্তু এই কল্পনা আর স্বপ্ন বিলাসী মন সেই ২০১৪ থেকে কিছু রঙিন সুতোর বর্ণীল গিট ফেলে ফেলে এক বিশাল জাল তৈরি করে ফেলল নিজের মাঝেই। মনে মনে ভাবতে লাগলো, একদিন এই বিশাল জাল ফেলবো উচু নীল আকাশ থেকে, যেখানে নিচে থাকবে শুধু রোথাং পাসের বরফের দীঘিই নয়, সেখানে থাকবে লেহ-লাদাখের মতো বিশাল বিশাল লেক আর নদীর অপার বিস্ময়। আর সেই বিস্মিত জলাশয়ে থাকবে আমার মতো পুঁটি বা ছোট ছোট শিং-কই মাছের সুখের দাপাদাপি।

কিন্তু সেই স্বপ্ন যে স্বপ্নই থেকে যাচ্ছিল বছরের পর বছর। সব কিছুর পরে ২৫/৩০ হাজার টাকার সংস্থান অসম্ভব হয়ে ওঠে। কখনো ধারকর্জ করে টাকার জোগাড় করার মতো অবস্থা হলেও টানা ১৪/১৫ দিন সময় বের করার মতো দুঃসাহস করে উঠতে পারি না। আবার কখনো টাকা-সময় দুটোর ব্যবস্থা করে ফেলার পরেও নানা রকম বাঁধায় আটকে যেতে হয়েছে বার বার। কখনো অফিস, কখনো পরিবার, কখনো নানা রকম সামাজিকতার বন্ধনে। হয়েই উঠছে না সেই লেহ-লাদাখের স্বপ্নের নদীতে, কল্পনার রঙিন জাল ফেলা।

আহ, লাদাখ! ছবিঃ লেখক

ভেবে রেখেছিলাম কল্পনার রঙিন জালটা যখন উপরে সাদা মেঘ আর নীল আকাশ থেকে নিচের পাথুরে পাহাড়ের লেহ-লাদাখের অববাহিকায় পড়বে তখন আমি সেখানের একটা ছোট মাছ হব। যে জালের ছোট ছোট বাঁধনে আটকা পড়লেও যেন থেকে যেতে পারে আর একটু সময়ের জন্য। জালটা ফেলার পরেই যেন তুলে নেয়া না হয় তেমন আকাঙ্ক্ষা মনে মনে। বেশ সময় নিয়ে যেন উপভোগ করা যায় লেহ-লাদাখের নানা রকম রূপ-বৈচিত্রকে একই সাথে আর ভিন্ন ভিন্ন আবেগে আর আবেশে।

মনে মনে একটা রুট প্ল্যানও কল্পনা করে রেখেছিলাম, কলকাতা থেকে কালকা মেইলে যাবো কালকা পর্যন্ত। সেখান থেকে টয় ট্রেনে চড়ে সিমলা, সিমলায় গিয়েও সিমলা দেখতে না পারার ক্ষতে প্রথমে প্রলেপ লাগাব। তারপর সিমলা থেকে লোকাল বাসে করে মানালি যাব। একদিন অলস শহর মানালি থাকবো। হেলে দুলে বিয়াসের তীরে কাটাবো ভীষণ আলসেমিতে। পরের দিনের লোকাল বাস বা শেয়ার জীপের টিকেট কাটবো কয়েক বছরের স্বপ্ন বোনা লেহ-লাদাখ যাবার জন্য।

বর্ণীল পাথুরে পাহাড়! ছবিঃ লেখক

এর পরদিন বাস বা জীপের সিটের সামনে বসে দেখবো পাথুরে পাহাড়, বিয়াসের বয়ে চলার উম্মত্ততা, ঝুঁকিপূর্ণ ঝুরো পাথরের রাস্তা, উপরে সাদা সাদা মিহি মেঘেদের উড়ে বেড়ানো, কখনো কখনো ছুঁয়ে যাবে আমাকে, আরও উপরে ঝকঝকে নীল আকাশ পাগলের মতো ডাকবে হাতছানি নিয়ে, করে দেবে উন্মাদ, কাছে দূরে পাহাড়ের রঙ বেরঙের খেলা, কোথাও একটু সবুজ, কোথাও কালো, কোথাও সোনালী রঙের কোনো পাহাড়, পাহাড়ের শত রঙের রঙ বদলের খেলা।

একটু পরে শুরু হবে পাহাড়ের মাঝ দিয়ে এক মিহি পিচ ঢালা বিশাল রাস্তা। তখন জীপ বা বাসের সিটের সাধ্য থাকবে না আমাকে ভেতরে বসিয়ে রাখার। উঠে যাবো জীপ বা বাসের ছাদে। উপভোগ করতে লেহ-লাদাখের বহু বছরের লালিত স্বপ্নের সবটুকু তারিয়ে তারিয়ে, নিজের মতো করে শুষে নিতে। যেন ফিরে এসে যখন পরের বইয়ের জন্য লেখা শুরু করবো তখন যেন লিখতে লিখতেই আবার হারিয়ে যেতে পারি স্বপ্ন-কল্পনা বাস্তবে ধরা দেয়া সেই লেহ-লাদাখের দিনগুলোতে।

ধূসর পাহাড়। ছবিঃ লেখক

পুরো একটি বই-ই হবে শুধু লেহ-লাদাখের ভ্রমণ, অভিজ্ঞতা, ভালো লাগা, সুখ-দুঃখের, হাসি আর আনন্দের স্মৃতি নিয়ে। নিজের একান্ত আর আত্ম-অনুভূতি নিয়ে। সেই স্বপ্নে বিভোর থেকে থেকে অপেক্ষা করতে করতে অবশেষে সেই দিনের দেখা পেয়েছিলাম ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর অক্টোবরে মধ্যে ঈদ উল আযহার ছুটিতে। তারপর ছুটি পেতেই যাত্রা শুরু করেছিলাম সেই পার্পল ড্রিমের পথে। লেহ-লাদাখের উদ্দেশ্যে।

২০১৪ সালে দেখা সেই স্বপ্নের শেষ হয়েছিল ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে। পূরণ হয়েছিল আমাদের এই স্বপ্ন পার্পল ড্রিম সত্যি সত্যি হাতের মুঠোয় ভরে ফেলার স্বপ্ন! সেই ভ্রমণ নিয়ে লিখেছি ৫০+ গল্প, বলবো ধারাবাহিকভাবে।  

স্বপ্নের বাঁক। ছবিঃ লেখক

ঠিকঠাক স্বপ্নটাকে দেখতে পারলে, স্বপ্নের পেছনে অবিরত ছুটতে পারলে, হাল ছেড়ে না দিয়ে লেগে থাকলে, হাজারো বাধা উপেক্ষা করে নিজের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে থাকতে পারলে, সফলতা আসবেই, হ্যাঁ আসবেই।

আজ, কাল বা পরশু, অল্প, অনেক বা পুরোটুকুই। এটা আমার বিশ্বাস, আমি বিশ্বাস করি।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শীলবাঁধা পাড়া: দেবতাখুম যাওয়ার পথে পথে

শাহাজাদপুরের পথে রবীন্দ্রনাথের সাথে: মখদুমিয়া জামে মসজিদ