পদব্রজে ঐতিহ্যের পুরান ঢাকা: ফ্রেন্সগঞ্জের লালকুঠি

হেঁটে চলছি আমরা ফরাশগঞ্জের রাস্তায়। লালকুঠি আহসান মঞ্জিল থেকে বেশি দূরে নয়। ফরাশগঞ্জের পূর্ব নাম ফ্রেন্সগঞ্জ ছিল। শুনে অবাক হতে পারেন। তবে ইহা সত্য। আঠারো শতকে ঢাকায় ফরাসি বণিকদের প্রাণকেন্দ্র যে ছিল এই ফরাশগঞ্জে। ফরাসিদের গঞ্জ সেই ফরাশগঞ্জ এখন ঘিঞ্জি এলাকা। আজকে সাপ্তাহিক ছুটির দিন, ফরাশগঞ্জ অনেকটাই নিষ্প্রাণ। হলুদ, আদা, রসুন, মরিচ, পেঁয়াজের সুবাসে চারদিক ম ম করছে। বন্ধ আড়তের দুয়ারও আটকে রাখতে পারেনি। ফরাশগঞ্জে এখন মসলা-পেঁয়াজ-রসুনের আড়ত বেশি দেখা যায়। যে হলুদ, আদা, রসুন, মরিচের ব্যবসার ভিত্তি প্রস্তর তৈরি করেছিল ফরাসিরা। আজ তাদের অস্তিত্বই নেই।

১৭৪০ সালে ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ঢাকায় তাদের যাত্রা শুরু করে। নওয়াজিশ মোহাম্মদ খানের অনুমতি নিয়ে নবাব বাড়ির নিকটে তাদের কুঠি স্থাপন করে। সে সব দিনে আহসান মঞ্জিল সংলগ্ন জায়গা ও ফরাসিদের কুঠি ছিল। ১৭৫০ সালের দিকে ব্রিটিশদের মালিকাধীন একটি কারখানা দখল নিয়ে ছোটখাটো দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে ফরাসি বণিকদের দল। তখন কী তারা জানতো পুরো বাংলা জাঁকিয়ে বসতে যাচ্ছে ব্রিটিশ রাজ? সেই কারখানার জায়গা দখল করে ফরাসিরা নিজেদের জায়গায় বসতি স্থাপন করে।

নায়েব নাজিম জসরত খানের মধ্যস্থতায় দু’পক্ষের ক্ষোভ প্রশমিত হলেও এক প্রকার স্নায়ুযুদ্ধ ফরাসি ব্রিটিশদের মধ্যে বিরাজমান দেখা যায়। ১৭৫৭ সালে বাংলায় ইংরেজ শাসন শুরু হওয়ার পূর্বেই এই কারখানার নাম ঢাকা কারখানা করা হয়। ১৭৮০ সালে এই অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয় ফরাসিদের বাজার যা তৎকালীন সময় ফ্রেন্সগঞ্জ নামে বেশ প্রচলিত ছিল। ফরাসিরা সর্ব প্রথম এখানে হলুদ, আদা, রসুন, মরিচের ব্যবসার পাইকারি বাজার প্রতিষ্ঠিত করে যা আজও চলমান। আর সেই ফরাশগঞ্জ বাজারেই তো দাঁড়িয়ে আছে ফরাসিদের এককালের স্মৃতি রুপলাল হাউস। সেই ইতিহাস না হয় সামনে বলা যাবে।

নর্থব্রুক হল, ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দ। ছবিঃ উইকিপিডিয়া।

এখন আমরা এসে পড়েছি লালকুঠির সামনে। ক্লান্ত পথিকদের ক্লান্তি যেন সাময়িক কেড়ে নিল কলোনিয়াল পিরিয়ডের এই স্থাপনা। আজ থেকে ১৪৫ বছর আগে বাংলার জমিনে পা পড়েছিল ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল জর্জ ব্যারিং নর্থব্রুকের। তার সফরকে কেন্দ্র করে ঢাকার হোমরা-চোমরারা এই টাউন হল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ইংরেজ সাহেবদের তেল দিতে কেউ পিছ পা হতে চায় না। ব্রুক সাহেবের সফরকে স্মরণীয় করতে এই মহাকার্যক্রম শেষ হয় ১৮৭৯ সালের শেষের দিকে। মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় টাউন হল।

ভাওয়াল রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী এই টাউন হল নিমার্ণে সে সময় দশ হাজার টাকা অনুদান দেয়। আজ দেড়শ বছর সে টাকার পরিমাণ গুনতে গেলে হয়তো ভিমড়ি খেতে হবে। তবে ভবনটি ১৮৮০ সালের ২৫ মে তৎকালীন ঢাকার কমিশনার শুভ উদ্ধোধন করেন। জর্জ ব্যারিং নর্থব্রুকের নাম অনুসারে টাউন হলটি নাম পায় নর্থব্রুক হল। তবে দালানটি লাল রঙয়ের হওয়ায় স্থানীয় মানুষদের কাছে লালকুঠি নামেই বেশি পরিচিতি পায়। আর এ লালকুঠি সংলগ্ন রোডের নামকরণ হয় নর্থব্রুক হল রোড।

১৮৮২ সালে সবার প্রিয় লালকুঠিকে পরিণত করা হয় পাঠাগারে এবং এর সাথে জনসন হল নামক একটি ক্লাবঘরের সংযোজন হয়। স্বল্প সংখ্যক বই দিয়ে এই পাঠাগারের যাত্রা শুরু হলেও ধীরে ধীরে এর সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি ছাড়িয়ে যায় এবং লোক শ্রুতিতে শোনা যায় সে আমলে এই পাঠাগারের জন্য বিলেত থেকে বই আনা হতো।

ফরাশগঞ্জ ক্লাব – নর্থ ব্রুক হল ৩। ছবিঃউইকিপেডিয়া।

ইতিহাসে ডুবে থাকার ক্লান্তিতে ভুলেই গিয়েছিলাম বর্তমান লালকুঠির করুণ অবস্থা। ঈসমাইল ভাই বাকি অতিথিদের ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে আর আমার দেহে ক্লান্তি জাঁকিয়ে বসেছে বিধায় লালকুঠির ক্ষুদে বাগানের সেই নর্দমাময় ফোয়ারার সামনে বসে দেখছি লালকুঠি। আমার মুখ বরাবর ফরাশগঞ্জ ক্লাব আর ডানদিকে ওয়ার্ড কমিশনারের অফিস ও কমিউনিটি সেন্টার। কমিশনার অফিসের সাথে লাগোয়া মেইন গেট।

আর সেই গেট দিয়ে ঢুকেই চোখে পড়ল বিশালকার ডেকচি আর বাঁশ সামনে পড়ে আছে। এক কালের ইতিহাসের সাক্ষী এখন নীরবে নিভৃতে হয় মানুষের বিয়ের সাক্ষী। ভাড়াটে কমিউনিটি সেন্টারের ভিড়ে ইতিহাসের করুণ আর্তি কী মানুষ শুনতে পায়, নাকি উপলব্ধি করতে পারে? ভেসে আসে লঞ্চের সাইরেন আমার আবেগ দুলিয়ে দেয়। লাকড়ির চুলোয় ধোঁয়া উড়ছে, উদাসি কিছু পাখি দিন শেষে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। চারদিকে গড়ে ওঠা নতুন স্থাপনার ভিড়ে লাল রঙের এ দালানটি এখনও পথিকের চোখ জুড়ায়। আমার বেড়ে ওঠা এই পুরান ঢাকায়। বিশেষ করে সূত্রাপুর, ফরিদাবাদ এরিয়ায় কেটেছে আমার কৈশোরের দূর্দান্ত দিনগুলো। সে সব দিন লালকুঠি অসংখ্যবার আসা পড়েছে।

নর্থব্রুক হল। ছবিঃ উইকিপেডিয়া।

ধীরে ধীরে আমার চোখের সামনেই তো লালকুঠি তার জৌলুস হারালো। তার লাল রঙ আজ মলিন, ভবনগুলোর জীর্ণশীর্ণ দশা। জানালার কোটরে ঘর বেঁধেছে কোনো চড়ুই দম্পতি। জায়গায় জায়গায় লাল টালির ইট ক্ষয়ে ক্ষয়ে উন্মুক্ত হয়ে জানাচ্ছে শেষ নিঃশ্বাস নেবার আকুতি। এর মাঝেও লালকুঠি তার জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে কারণ কমিউনিটি সেন্টারের পিছনে সেই জনসন হল যে এখনও টিকে আছে, আর তার সাথে টিকে আছে শতবর্ষী সেই পাঠাগার।

যেন জানান দিচ্ছে আগের জৌলুসের সামান্য ছিটেফোঁটা। নির্মাণশৈলিতে ইন্দো ইসলামিক স্থাপত্য রীতির সঙ্গে ইউরোপীয়-রেনেসাঁ উত্তর স্থাপত্য রীতির চমৎকার মিশেল ঘটেছে। চমকা লালে রাঙা ভবনের দুই পাশে দুটি করে মোট চারটি সুশোভিত মিনার আজও আছে তার মতো যেমনটি ছিল, শতবর্ষ আগে।


ঢাকার লালকুঠির গ্রন্থালয়। ছবিঃ উইকিপেডিয়া।

শতবর্ষ কথার ফাঁকে মনে পড়ে গেল, রবী ঠাকুরের পদধুলি পড়েছে এই লালকুঠির প্রাঙ্গণে সেও তো প্রায় শতবর্ষ হয়ে গেল। ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঢাকায় আসা নিয়ে তৎকালীন ঢাকাইয়া সমাজে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়। শহরের গণমান্যদের মধ্যে শুরু হয় এক প্রচ্ছন্ন প্রতিযোগিতা। উঠবেন কোথায় তিনি? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নাকি বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী নবাবদের তুরাগ বোট হাউস? প্রকৃতির প্রেমে ডুবে থাকা গুরুদেব তুরাগ বোট হাউস বেছে নেন।

ঢাকা সফরের রবী ঠাকুরের রাতগুলো কাটে নবাবদের ভাসমান বোট হাউসে। আজ সে বোট হাউস নেই তবে স্মৃতি হিসাবে যেন রয়ে গেছে কিছু ভাসমান হোটেল। কবি কাটিয়েছেন কিছুটা সময় সেই বোট হাউসে, এরপর ১৯২৬ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি নাগরিক সংবর্ধনা গ্রহণ করতে তিনি আসেন নদী তীরবর্তী এই লালকুঠিতে। তাই তো বাইরে সুন্দর করে লেখা আছে তার আগমন সম্পর্কে কিছু কথা। ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না কিন্তু ছেড়ে যেতে যে হয়। আমাদের অতিথিদের দর্শন পর্ব শেষ। দিনের শেষ আলো যে নিভু নিভু। আমরা পা বাড়াই রুপলাল হাউজের পথে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পদব্রজে ঐতিহ্যের পুরান ঢাকা: রূপলাল হাউজ

পদব্রজে ঐতিহ্যের পুরান ঢাকা: ঢাকাইয়া নবাব