পদব্রজে ঐতিহ্যের পুরান ঢাকা: ঢাকাইয়া নবাব

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তার কোন প্রবন্ধে ঢাকার নবাবদের কাগুজে নবাব উপাধি দিয়েছিলেন। তার কোনো ক্ষোভ ছিল কি না নবাবদের প্রতি তা জানা যায়নি। তবে ঢাকার নবাব বলতে আমরা যাদের চিনি তারা ছিল নায়েবে নাজিম। সেই নায়েবে নাজিমের দরবার থেকে তো আমরা ঘুরে এসেছি। তাদের শেষ বংশধরের মৃত্যু হয়েছিল ১৮৪৩ সালে। এরপর ব্রিটিশ সরকার আবদুল গণিকে নবাব উপাধি দেবার মাধ্যমে শেষ পর্বের শুরু করে দিয়ে যায়। তারা বংশানুক্রমে সেই নবাব উপাধি ব্যবহার করে থাকেন। ইতিহাসের পাতায় তাই আবদুল গণির বংশধররা ঢাকার শেষ নবাবের বংশধর হিসাবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। আর এই নবাব পরিবারের গোড়া পতন করেছিল খাজা আলিমুল্লাহ বা আলি মিয়া।

হেঁটে চলছি আমরা আমাদের শেষ কয়েকটি স্থাপনা দেখার অভিপ্রায়ে। শীতের প্রায় শেষ। আজ শুক্রবার, জানুয়ারি মাসের ২৫ তারিখ। হাঁটতে হাঁটতে চিকন ঘামের রেখা শিশির ফোঁটার মতো জুলফি বেয়ে নিচে নেমে আসছে। এই সব দিনে প্রকৃতি উপভোগ করতে হয়। তা না করে আমরা জ্ঞান পিপাসা মিটাতে ঘুরে বেড়াচ্ছি পুরান ঢাকার অলিগলিতে। এত বড় দলের সবার পরিচয়, সবার স্মৃতিচারণ করা তো সম্ভব নয়। তবে এদের মধ্যে মামুন ভাইয়ের কথা বলতেই হয়।

কোনো এক অজানা পাহাড়ের পথে দেখা হয়েছিল তার সাথে। অম্ল মধুর সম্পর্কটা আরও ঝালাই হয় ভোলা ট্রিপে গিয়ে। আর আজ শেকড় সন্ধানীদের সাথে হাঁটতে এসে মামুন ভাইকে বড় আপন লোক মনে হয়। ক্ষণে ক্ষণে আলাপের ফাঁকে ছবি তোলার টিপস দিচ্ছেন। মামুন ভাইয়ের ছবি তোলার হাত অসাধারণ। তার সাথে আসা আমীর হামজা ভাই বেশ চুপচাপ মানুষ। তবে আমাদের এই কর্মযজ্ঞকে তারা বেশ ভালোভাবে নিয়েছেন। শেকড় সন্ধানীর মটোও তাদের বেশ পছন্দ হয়েছে।

আদিরুপে আহসান মঞ্জিল। ছবিঃ উইকিপিডিয়া।

আজকে ইসলামপুর মার্কেট বন্ধ। খোলা থাকলে এখানে লোকে লোকারণ্য হয়ে যেত। আজকে যেন ইসলামপুর বোবা হয়ে গেছে। ইসলামপুর কাপড়ের পাইকারি মার্কেট হিসাবে বেশ পরিচিত ঢাকাবাসীর কাছে। বলতে গেলে পুরো দেশের সব পাইকারের হাট বসে ইসলামপুরে। তবে শুনলে হয়তো অবাক হতে পারেন, ইসলামপুরের কাপড়ের ব্যবসারও আছে বেশ বড় সমৃদ্ধশালী ইতিহাস।

আজ থেকে প্রায় আড়াইশো বছর আগে ১৭৭৩ সাল থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে শুরু হয় এখানকার কাপড়ের পাইকারি ব্যবসা। এর আগে এখানে ফলের ব্যবসা হতো। তৎকালীন আমলে এই এলাকা আমপট্টি নামেও বেশ সুপরিচিত ছিল। সুবাদার ইসলাম খাঁ চিশতির সেই ইসলামপুর দিয়ে আমরা হেঁটে যাচ্ছি, গন্তব্য ঢাকার শেষ নবাবদের স্মৃতিচিহ্ন আহসান মঞ্জিল। বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর তীরে পুরান ঢাকার ইসলামপুর এলাকায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সেই নবাব বাড়ী।

তৎকালীন ঢাকা শহরে নবাবদের প্রতাপ ছিল দেখার মতো। উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে এ শতকের দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত একটা লম্বা সময় পর্যন্ত ঢাকাবাসীর উপর প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল আহসান মঞ্জিল। ইংরেজ সৃষ্ট এই নবাব পরিবারের আভিজাত্যের প্রতীক ছিল এই অট্টালিকা। নতুন নবাবদের আদি পুরুষ আলি মিয়ার কথা হয়তো আগেই বলেছি। সেই আদি পুরুষ আলি মিয়া ওরফে খাজা আলীমুল্লাহ ১৮৩৫ সালের দিকে বুড়িগঙ্গার তীরে ফরাসি কুঠিয়ালদের কয়েকটি কুঠিবাড়ি ক্রয় করে।

ফরাসীরা সেই কুঠিগুলো কিনেছিল তৎকালীন জালালপুর পরগনার (বর্তমান ফরিদপুর-বরিশাল) জমিদার শেখ ইনায়েত উল্লাহর পুত্র শেখ মুতিউল্লাহর কাছ থেকে। সেই কুঠিগুলোর একটির নাম হয়তো ছিল রঙমহল। সেই কুঠি ফরাসীরা বাণ্যিজিক কাজে ব্যবহার করতো। পরবর্তীতে আলি মিয়া সে কুঠি সংস্কার করে নিজেই থাকা শুরু করেন। গোড়াপত্তন হয় আহসান মঞ্জিলের।

লোকের ভীড়ে আহসান মঞ্জিল। ছবিঃ লেখক।

তবে মজার ব্যাপার হলো নবাব আবদুল গণির পিতা আলি মিয়া ছিলেন রসিক লোক। তিনি সে সময়কার রঙমহলে একটি ঘড়ি বসিয়েছিলেন যা কখনও ঠিকমতো সময় দেখাতো না। তৎকালীন সমাজে এ নিয়ে হাসি ঠাট্টা হতো, সে সময়কার এই ছড়াই তার প্রমাণ-

আলি মিয়ার বাড়ি

নীলাম্বর সেনের বড়ি

গোকুল মুন্সির গোঁফে তাও

গল্প যদি শুনতে চাও

তবে মৃত্যুজ্ঞয় মুন্সির কাছে যাও

আলি মিয়া হচ্ছে আবদুল গণির পিতা যার বাড়ির ঘড়ি কখনও ঠিক সময় দেখাতো না, নীলাম্বর সেন হচ্ছে সেই কবিরাজ যার জড়িবুটি, বড়িতে কোনো কাজ হত না। সাহিত্যিক দীনেশচন্দ্র সেনের নাম শোনেনি এমন লোক হয়তো কম হবে। তার নানা গোকুল মুন্সির গোঁফ ছিল তখনকার দিনে দর্শনীয় বস্তু। তাই হয়তো দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসতো তার গোঁফে তাও দেওয়া দেখতে। আর মৃত্যুজ্ঞয় মুন্সি ছিল সেই আজগুবি গল্প বলিয়ে যে এ সব গল্প ছড়াতো।

১৮৭২ সালে সেই পুরনো রঙমহল নতুন করে নির্মাণ করেন নবাব আবদুল গণি। এর ফলে পুরনোর কিছুই রইলো না। পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের মধ্যে দিয়ে শেষ হলো রঙমহলের ইতিহাস, শুরু হলো আহসান মঞ্জিলের নতুন অধ্যায়। নবাব আব্দুল গণি সেই রঙমহলের জায়গায় গড়ে তোলেন অট্টালিকা। আর সেই অট্টালিকার নাম তার পুত্রের নাম অনুসারে হয় আহসান মঞ্জিল।

অবশ্য ঢাকাবাসীর কাছে আগে থেকে এটা নবাববাড়ী হিসাবে পরিচিত ছিল। উল্লেখ্য সে সময় বাড়িটিতে কোনো গম্বুজ ছিল না। ১৮৮৮ সালের টর্নেডোতে আহসান মঞ্জিল ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই প্রলয়রুপী টর্নেডোর পর আহসান মঞ্জিল আবার সংস্কারের মুখ দেখে এবং সংযোজন হয় আহসান মঞ্জিলের বিখ্যাত সেই গম্বুজ।

এক কোনা দিয়ে তোলা নবাববাড়ী। ছবিঃ লেখক।

ডুবে ছিলাম ইতিহাসের পাতায়। দেখতে দেখতে কখন যে আহসান মঞ্জিলের গেটের সামনে এসে পড়লাম খেয়ালই ছিল না। আজ শুক্রবার আহসান মঞ্জিলে প্রচুর ভিড়। ঢাকাবাসী ফিরে এসেছে তাদের ইতিহাসের প্রাণকেন্দ্রে। এক কালের সেই ঢাকা তো দাঁড়িয়ে ছিল নবাবদের অবদানের বদৌলতে। দিলকুশা থেকে শুরু করে শাহবাগ, ঢাকা ভার্সিটির বেশির ভাগই নবাবদের এস্টেট ছিল। আমাদের সাথে আসা নাজিম রাব্বি ভাইয়ের এই প্রথম নবাববাড়ী আসা। তাকে বেশ উত্তেজিত দেখলাম। আর আমার যে কতবার নবাব বাড়ী আসা হয়েছে তা তো গুণে শেষ করা যাবে না। টিকেট কেটে ঢুকে পড়লাম সবাই।

বেশির ভাগ মানুষের জাদুঘরে যাবার ইচ্ছে নেই। তাই আমরা দুভাগে ভাগ হয়ে গেলাম। রাব্বি ভাই আগে কোনোদিন আসেনি। তার জন্য দেখা ফরজ হয়ে গেছে। এক দল প্রবেশ করলো জাদুঘরের ভিতরে। আমরা চলে এলাম আহসান মঞ্জিলের দক্ষিণ দিকে, যেখানে বুড়িগঙ্গার দিকে মুখ করা সিঁড়ি আছে। এখন দিয়ে দেখা যায় নবাব বাড়ির বারান্দা। এক সময় বুড়িগঙ্গার ঘাটে নৌকা ভিড়লে এই সিঁড়ি দিয়েই উঠেই আহসান মঞ্জিলে প্রবেশ করতো নবাবরা।

আহসান মঞ্জিলের ডাইনিং রুম। ছবিঃ উইকিপেডিয়া।

বসে পড়লাম দলের সবাই ঘাস ভরা নবাব বাড়ির উঠানে। দিন শেষে সবাই ক্লান্ত। তবে মরে যায়নি পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা। ঘাসে বসেই যেন দেখতে পেলাম নবাব বাড়ির পিছনের অংশ। সমগ্র আহসান মঞ্জিল দু’ভাগে বিভক্ত। পূর্ব পাশের গম্বুজ বিশিষ্ট অংশকে রঙ মহল আর পশ্চিম পাশের অংশ আন্দরমহল যা এখন যথাক্রমে জাদুঘর ও অফিস হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পূর্বাংশে দোতলায় বৈঠকখানা, গ্রন্থাগার, কার্ডরুম ও তিনটি মেহমান কক্ষ এবং পশ্চিমাংশে একটি নাচঘর, হিন্দুস্তানি কক্ষ এবং কয়েকটি আবাসিক কক্ষ রয়েছে বলে জানা যায়। ভবনের নিচতলায় পূর্বাংশে আছে ডাইনিং হল, পশ্চিমাংশে বিলিয়ার্ড কক্ষ, দরবার হল ও কোষাগারসহ প্রাসাদ ভবনের উভয় তলায় উত্তর ও দক্ষিণে সুপ্রশস্ত বারান্দা লক্ষ্য করা যায়।

আমরা বসে আছি অপর দলের অপেক্ষায়। এই ফাঁকে আহসান মঞ্জিলের জাদুঘরের বৃত্তান্ত জেনে নিলে বোধহয় মন্দ হয় না। রঙমহলের ৩১টি কক্ষের ভিতর ব্যবহারযোগ্য ২৩টি কক্ষে প্রদর্শনী উপস্থাপন করা হয়েছে। ৯টি কক্ষ ফ্রিৎজকাপের তোলা ১৯০৪ সালের আলোকচিত্রের সাথে মিলিয়ে সাজানো হয়েছে। আহসান মঞ্জিলের তোষাখানা ও ক্রোকারীজ কক্ষে থাকা তৈজসপত্র ও নওয়াব এস্টেটের পুরোনো অফিস এডওয়ার্ড হাউজ থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন সামগ্রী সংগ্রহ করে এই জাদুঘরে প্রর্দশনের জন্য দেওয়া হয়েছে। আহসান মঞ্জিল জাদুঘরে এখন পর্যন্ত সংগৃহীত নিদর্শন সংখ্যা মোট ৪,০৭৭টি।

নিচতলার সিড়িঘর। ছবিঃ উইকিপিডিয়া।

জমিদারি উচ্ছেদ আইনে ১৯৫২ সালে ঢাকার নবাবরা হারায় তাদের সম্পত্তি। নবাব এস্টেট চলে যায় সরকারের অধিগ্রহণে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর নবাব পরিবারের অনেকেই বিদেশে পাড়ি জমায়। দেশে যারা রয়ে গেলেন তারা এই বিশাল প্রাসাদের রক্ষণাবেক্ষণে আর্থিকভাবে সক্ষম ছিল না, এক কালের প্রতাপশালী নবাবরা হয়ে যায় আমাদের মতোই সাধারণ মানুষ। ক্রমেই ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয় আহসান মঞ্জিলসহ নবাবদের অনেক সম্পত্তি।

দোতলার সিড়িঘর। ছবিঃ উইকিপিডিয়া।

১৯৭৪ সালে নবাব পরিবারের উত্তরসূরীরা আহসান মঞ্জিল নিলামে বিক্রি করে দেওয়ার পরিকল্পনা করে, কিন্তু তা সফল হয়নি। দূরদৃষ্টি সম্পূর্ণ আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আহসান মঞ্জিলের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন করেন। তিনি ১৯৭৪ সালের ২ নভেম্বর, আহসান মঞ্জিল নিলামে বিক্রির সিদ্ধান্ত রদ করে দিয়ে এর সংস্কার করে এখানে জাদুঘর নির্মাণের নির্দেশ দেন।

এরপর ১৫ আগস্টের সেই ভয়াল রাত জাতি হিসাবে আমাদের অনেক পিছিয়ে দেয়। অনেক বছর আলোর মুখ দেখেনি জাদুঘর প্রকল্প। এরপর ১৯৫ সালের ৩ নভেম্বর এরশাদ সরকারের আমলে আহসান মঞ্জিল প্রাসাদ ও তৎসংলগ্ন চত্বর সরকার অধিগ্রহণ করে সেখানে জাদুঘর স্থাপনের কাজ শুরু করে। ১৯৯২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আহসান মঞ্জিল জাদুঘর আনুষ্ঠানিকভাবে আলোর মুখ দেখে।

ইতিহাসের কানাগলিতে যেন আটকা পড়ে গিয়েছিলাম। এক নিষিদ্ধ টাইম জোনে বন্দী ছিলাম যেন। মামুন ভাইয়ের ধাক্কায় সংবিৎ ফিরলো। আহসান মঞ্জিলকে বিদায় দেবার সময় হয়ে গেছে। দিনের আলো ছিটেফোঁটা বাকি আছে। এই আলোই পথ দেখাবে শেকড় সন্ধানীদের পরবর্তী গন্তব্যের। এবার যেতে হবে এক টাইম ডাইমেশন থেকে আর এক টাইম ডাইমেশনে। ভ্রমণটা অবশ্যই উত্তেজনাপূর্ণ হবে। ফরাশগঞ্জের পথে পা বাড়ালাম আমরা।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পদব্রজে ঐতিহ্যের পুরান ঢাকা: ফ্রেন্সগঞ্জের লালকুঠি

পদব্রজে ঐতিহ্যের পুরান ঢাকা: আর্মেনিয়ান গির্জা