পদব্রজে ঐতিহ্যের পুরান ঢাকা: আর্মেনিয়ান গির্জা

আর্মেনিয়ান চার্চের আছে এক সমৃদ্ধ ইতিহাস, চার্চ হবার আগে এখানে ছিল কবরস্থান। তাই এখন গির্জার আশেপাশে এবং বারন্দায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আর্মেনিয়ানদের কবর দেখা যায়। এই গির্জার জন্য জমি দান করেন আগা মিনাস ক্যাটচিক। ১৭৮১ সালে আর্মেনীয় জমিদার নিকোলাস পোগোজ স্থানীয় মানুষের কাছে যিনি পরিচিত ছিলেন নিকি সাহেব নামে সে জমিতে গড়ে তোলেন ঢাকার এতিহ্যে পালক লাগা আরেক গর্ব, আর্মেনিয়ান চার্চ।

এছাড়া মাইকেল সার্কিস, অকোটাভাটাসেতুর সিভর্গ, আগা মিনাস এবং মার্কার পোগজ গির্জার নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এই চার্চটি পুনরুত্থানের চার্চ নামেও বেশ পরিচিত। আর্মেনিয়ান জাতি দুইটি কারণে খ্রিস্টান সমাজে বেশ পরিচিত। পুরো আর্মেনিয়ান জাতি এক সাথে যিশুকে গ্রহণ করেছে এবং তারা ৬ জানুয়ারী বড়দিন ও ১৩ এপ্রিল পুনরুত্থানের অনুষ্ঠান পালন করে আসছে যুগ যুগ ধরে। বর্তমানে এই চার্চের দায়িত্বে আছেন ব্রাদার ইয়াং। তবে তিনি বোধহয় বছরের বিশেষ দুই দিন বাদে বাকি সময় লোকচক্ষুর আড়ালেই থাকেন।

পুরো চার্চ বলতে গেলে সংকর’দা আর কিছু সেচ্ছাসেবক রক্ষণাবেক্ষণ করে। এছাড়া চার্চটির জন্য একজন ব্রাদার এবং তিনজন সিস্টার নিয়োগ দেওয়া আছে। বড়দিন আর পুনারুত্থান দিবস ছাড়া চার্চটিতে ধর্মীয় কার্যক্রম ৩৬৩ দিনই বন্ধ থাকে। এই দুই দিনে হয়তো আর্মেনিয়ানদের বংশধরদের দেখা পাওয়া যায়।

চার্চ প্রাংগনে ঢুকে বাম দিকেই গির্জাটা দেখা যাবে। তবে এর আগে পথিকের দৃষ্টি আর্কষণ করবে গির্জার চারপাশ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য কবর। প্রতিটা কবরের মার্বেল পাথরের তৈরি এপিটাফ ও মৃত ব্যক্তি সম্পর্কিত স্মৃতিচারণ লেখা আর্কষণ করবে চুম্বকের মতো।

ফলকে লেখা সন। ছবিঃ nadiya chowdhury।

পুরনো কবরগুলো এক সোনালী ইতিহাস আমাদের সামনে তুলে ধরছে। পুরান সেই কবরের মাঝে দেখতে পেলাম আগা মিনাস ক্যাটাচিকের স্ত্রী সোফির কবর। ১৭৬৪ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। শতবর্ষী কবরের মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, দেখছি কবরের ইতিহাস। কত প্রেম, কত বিরহ, কত ইতিহাস এতিহ্য জড়িয়ে আছে এর সাথে। প্রতিটা কবরের এপিটাফে কিছু না কিছু আর্মেনিয়ান সিম্বল লক্ষ্য করা যায়।

প্রতিটা এপিটাফে ইংরেজি বা আর্মেনিয়ান ভাষায় কিছু না কিছু শ্লোক বাণী লেখা আছে কাব্যিক ভাষায়। এপিটাফের পাথরগুলো নাকি এসেছে সুদূর কলকাতার ওয়েলেসলি স্ট্রিট থেকে। শ্বেত, বেলে ও কষ্টি পাথরের ব্যবহারে পাথরগুলো হয়ে উঠেছে আরও দৃষ্টিনন্দন। তবে দুঃখের বিষয়, এই দামী পাথরের লোভে এখনও কিছু পাপিষ্ঠ ঘোরাফেরা করে। সে জন্য বোধহয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া এই চার্চে প্রবেশ করা যায় না।

এপিটাফের কাব্যে ডুবে আছি আমরা। এর মধ্যে দৃষ্টি আর্কষণ করলো ক্যাটাকিক এভাটিক টমাসের কবর। যিনি ১৮৭৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন। কবরের ওপরে বসানো এক হাত ভাঙা নারী মূর্তি। কবরের ওপর বেদীর মতো স্তম্ভকে সাধারণত ‘ওবেলিস্ক’ বলা হয়। আর্মেনিয়ান গির্জায় অবস্থিত এই একটি মাত্র কবরেই ওবেলিস্ক দেখা যায়। ওবেলিস্কের ওপরে অবস্থিত মাদার মেরীর সেই হাত ভাঙা মূর্তিটি আমদানি করা হয় সুদূর কলকাতা থেকে। সেই ওবেলিস্কের এপিটাফে লেখা ছিল অন্তরে দোলা দেবার মতো শ্লোক-

A fond wife’s tribute

To her deeply mourned

And best of husband.

ক্যাটাকিক এভাটিক টমাসের কবর। ছবিঃ উইকিপেডিয়া।

ঘুরতে ঘুরতে পেয়ে গেলাম জোয়াকিম গ্রেগরি নিকোলাস পোগোজের কবর। তার সমাধিলিপিতে লেখা রয়েছে “Till the day break and Shadows flee away”। প্রভাবশালী আর্মেনিয়ানদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এই নিকোলাস পোগোজ। তিনিই ছিলেন পোগোজ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা। শিক্ষা জীবন তিনি সম্পূর্ণ করেন তৎকালীন কলেজিয়েট স্কুল এবং ঢাকা কলেজ থেকে। ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১২ই জুন তিনি প্রতিষ্ঠা করেন এংলো ভার্নাকুলার স্কুল। পরবর্তী সময়ে সেটি পোগোজ স্কুলে রূপান্তরিত হয়।

এটি ছিল ঢাকা শহরের প্রথম বেসরকারি স্কুল এবং নিকি পোগোজ ১৮৫৫ সাল পর্যন্ত এই এংলো ভার্নাকুলার স্কুলের দায়িত্ব পালন করে যান। ১৮৬৮ সালে তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে জমিদারী বুঝে পান এবং হয়ে ওঠেন ঢাকার পাঁচজন আর্মেনিয়ান জমিদারদের মধ্যে একজন। তিনি ছিলেন ঢাকা ব্যাংকের একজন অংশীদার। সদরঘাট যাবার পথে বুলবুল ললিতকলা একাডেমি প্রধান কার্যালয় অনেকের দৃষ্টি আর্কষণ করে থাকবে। এইটা ছিল পোগোজ ওয়েস হাউস। তিনি ঢাকা পৌরসভার কমিশনার হিসাবে ১৮৭৪- ৭৫ সাল পর্যন্ত নিরলসভাবে কাজ করে যান তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।

আর্মেনিয়ান জমিদারদের কথা যখন উঠে এসেছে আরও কিছু প্রভাবশালী আর্মেনিয়ান জমিদারদের কথা না বললেই নয়। তৎকালীন সময়ে ঢাকার পরিচিত ও প্রভাবশালী আর্মেনিয়ানদের মধ্যে ছিলেন পোগোজ, আরাতুন, পানিয়াটি, কোজা মাইকেল, মানুক, হারনি। এরা মূলত ছিল জমিদার ও ব্যবসায়ী। এদের মধ্যে আরাতুনের নাম বেশ শোনা যায়। তিনি ছিলেন জার্নাল স্কুলের অধ্যক্ষ। আরামানিটোলায় তিনি শৌখিন আরাতুন নামেও বেশ পরিচিত ছিলেন।

ঘুড়ি উড়ানো আর কবুতর পালা তার কাছে ছিল নেশার মতো। এক কালের বাংলা একাডেমির পাশে পারমাণবিক শক্তি কমিশন ভবনের স্থলে ছিল শৌখিন আরাতুনের বাগান বাড়ি। তার জমিদারিও বেশ বড় ছিল। দক্ষিণ শাহবাজপুর [ভোলা] ও ময়মনসিংহের হোসেনশাহী ছিল আরাতুনের বিশাল জমিদারির অংশ। তার মৃত্যুর পর তার মেয়েরা সব কিছু বিক্রি করে কলকাতার পথে পাড়ি জমায়। সে যে গেল আর ফিরে এল না আরাতুনের শেষ বংশধর।

ঐতিহ্যের হাতছানি দিয়ে ইতিহাস শুনায় সে। ছবিঃ উইকিপিডিয়া।

পুরনো কবরের এপিটাফের মাঝে ইতিহাসের হাতছানি দেখতে এতটাই ব্যস্ত ছিলাম, খেয়াল ছিল না বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে। এখন বাজে ৩.৪৫ এর মতো। চারটায় চার্চ বন্ধ হয়ে যাবে দর্শনার্থীর জন্য। শেকড় সন্ধানীদের সদস্যরা যেন গির্জা প্রাঙ্গণ জুড়ে কবরগুলোর এপিটাফের আর্তনাদ পড়তে পড়তে ফিরে গিয়েছিল ১০০-২০০ বছর পিছে।

পা বাড়ালাম চার্চের দিকে। চার দরজা বিশিষ্ট চার্চটিতে ৭২টা দরজা দেখা যায়। লম্বায় সাতাশ ফুট গির্জার জানালা সংখ্যাও সাতাশ, গ্রীক স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত চার্চটি অপূর্ব কারুকার্যময় প্রবেশ পথ যেন ক্ষণে ক্ষণে পথিককে স্বাগত জানাচ্ছে ভিতরে প্রবেশ করার জন্য। গির্জার তিন দিকে ঘিরেই রয়েছে বারান্দা। আর্চ সহ কলামের সারি লক্ষ্য করা যায় চারপাশে। আর গির্জা ভবনের শেষ মাথায় দেখা যায় একটি ষড়ভূজ টাওয়ার। ঈশ্বরের মন যেমন সাদা, পুরো গির্জাই যেন ঈশ্বরের মনের প্রতিচ্ছবি। পুরো গির্জা সাদা রংয়ে রঙিন। আর তার মাঝে হলুদ রংয়ের নকশা করা কলাম রেলিং এর ধারগুলোতে।

গির্জার ভিতর। সোর্সঃ www.viator.com।

গির্জায় প্রবেশ করার সাথে সাথে বেঞ্চের সারি নজর কাড়লো। সারি সারি বেঞ্চ অতিক্রম করে কক্ষের শেষ মাথায় আসলাম। দেখতে পেলাম উঁচু বেদীতে যিশুখ্রিস্টের চিত্র ও ধাতব ক্রস রয়েছে। গির্জার প্রবেশ মুখের বাঁ দিকে আমরা একটা প্যাঁচানো সিঁড়ি লক্ষ্য করি। যে সিঁড়ি দিয়ে গির্জার দোতলায় যাওয়া যায়। খ্রিস্টান ছাড়া বাকি সব দর্শনার্থীদের দোতলায় প্রবেশ নিষেধ। দ্বিতীয় তলাটা নারী শিশুদের জন্য সংরক্ষিত সেটা সংকর’দা মুখে শুনেই সন্তুষ্ট থাকতে হলো।

গির্জা থেকে বের হবার পর কবরগুলোর মাঝে একটা সূর্যঘড়ি দেখতে পেলাম আমরা। কালের বির্বতনে সেকেলে হয়ে গেছে। এর ঠিক পাশেই একটি বাড়ি দেখা যায়। গায়ে ১৯২৯ সালের তকমা লাগিয়ে বেশ গাম্ভীর্যের সাথে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে হয়তো এখন গির্জার কর্মীরা থাকে। আর গির্জার মাদার মেরীর হাত ভাঙা মূর্তির পাশের একটা লাল ইটের বিল্ডিং দেখা যায়। সেখানে গির্জার ওয়াডেন বা তত্ত্বাবধায়কেরা থাকতেন কোনো এক সময়ে। মাইকেল জোসেফ মার্টিন শেষ আর্মেনিয়ান এবং সর্বশেষ ওয়াডেন যে এই গির্জার তত্ত্বাবধায়নে ছিলেন। ২০০৫ সালে স্ত্রী মৃত্যুর পর এ দেশের মায়া ছেড়ে চলে যান কানাডায় মেয়েদের কাছে। ঢাকা চূড়ান্তভাবে সে বছর আর্মেনিয়ান শূন্য হলো।

সূর্যঘড়ি। ছবিঃ রোর মিডিয়া।

হঠাৎ একটা ঈগলকে যেন গির্জার সেই ষড়ভুজ টাওয়ারের ওপর দিয়ে উড়ে যেতে দেখলাম। ১৮৩৭ সাল নাগাদ গীর্জাটিতে ঘড়িসহ এই ষড়ভুজ টাওয়ার নির্মাণ করা হয়। টাওয়ারের বাইরে ঘড়ি এবং ভিতরে একটা ঘণ্টা দেখতে পেলাম। এই গির্জার ঘণ্টা সে সময় ঢাকাবাসীর কাছে বেশ বিখ্যাত ছিল। কারণ তৎকালীন সময়ে আরমানিটোলায় ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে এই টাওয়ারের ঘণ্টার আওয়াজেই যে সময় গণনা করতো। বলা হয়ে থাকে, প্রায় চার মাইল দূর থেকে এই ঘড়ির ঘণ্টার আওয়াজ মানুষ শুনতে পেত। তবে আর্মেনিয়ান জৌলুস যখন পড়তির দিকে, ১৮৮০ সালের দিকে ঘন্টাবাদককে অবসর দেওয়া হয়। এরপর শত বছর ধরে নীরবেই পড়ে রয়েছে ঘণ্টাটি, কোনো নীরব অভিমানে।

সময় বয়ে যাচ্ছে। এবার যে যেতে হবে। দিনের শেষ আলো অবশিষ্ট থাকতে দেখতে হবে বাকি স্থাপনাগুলো। এবার হাঁটা ধরলাম নবাবপুর রোড হয়ে আহসান মঞ্জিলের দিকে। আজ আর্মেনিয়ান গির্জা, আরমানিটোলা নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শ্রদ্ধেয় মুনতাসির মামুন স্যারকে একটা ধন্যবাদ দিতেই হয়। তার ঢাকা : স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী গবেষনামূলক গ্রন্থ আমার স্মৃতিচারণকে আরও ক্ষুরধার করেছে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পদব্রজে ঐতিহ্যের পুরান ঢাকা: ঢাকাইয়া নবাব

ভাটিয়ারি জাহাজ ইয়ার্ড ও লেকের ঝটিকা সফর