পদব্রজে ঐতিহ্যের পুরান ঢাকা: আর্মেনিয়ানদের আরমানিটোলা

ঢাকা ১১০০, পুরান ঢাকার আরমানিটোলা। হেঁটে চলছি আমরা। গায়ে সোনা রোদ মেখে, ঘামে ভিজে একাকার হয়ে থামছি না পথিকের পথে। আজ সবাই পরিব্রাজক হয়েছে। আর পরিব্রাজককে কোনো এক ফ্রেমে বন্দী করা যায় না। আরমানিটোলার নাম কীভাবে এল এ নিয়ে অনেকে ঢাকার আর্মেনিয়ামদের আগমনের যোগসূত্র খুঁজে। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন বহু যুগ আগে এখানে বসবাস ছিল আর্মেনিয়ানদের। তাদের কারণেই পুরো এলাকার নাম হয়ে যায় আরমানিটোলা। সেই আর্মেনিয়ানদের পদচরণে এক সময় ঢাকা শহর ছিল মুখরিত। আর আজ তাদের স্মৃতি চিহ্ন আর্মেনিয়ান চার্চ, আর আরমানিটোলা হাই স্কুল ছাড়া কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই।

পারস্যের সাফাভি রাজবংশ যখন জাঁকিয়ে বসেছিল পাহাড় ঘেরা সেই পশ্চিমের দেশ আর্মেনিয়া তখন থেকেই আর্মেনিয়ানরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়া শুরু করে। মোগলদের সময় ঢাকার মাটি প্রথম আর্মেনিয়ানদের পদধূলি পায়। ব্যবসায় চৌকস আর্মেনিয়ান সর্দাররা অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। হয়ে ওঠে তারা শহরের এলিট শ্রেণী। সম্ভবত মোগল সম্রাট আকবরের সময় থেকে আর্মেনিয়ানরা এই ভারতবর্ষে আসা শুরু করে।

সম্রাট আকবর তাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য, ঘর-বাড়ি স্থাপনাসহ অনুমতি দেন গির্জা স্থাপনের। প্রথম দিকে তারা পশ্চিমবঙ্গের পাটনা, মুর্শিদাবাদ, কলকাতা ইত্যাদি জায়গায় ব্যবসা ও বসতি গড়ে তুললেও ক্রমশ তারা ঢাকার দিকে আগ্রসর হওয়া শুরু করে। সম্রাট জাহাঙ্গীর ১৬০৮ সালের দিকে ঢাকাকে বাংলার রাজধানী হিসাবে গোড়াপত্তন শুরু করেন। ধীরে ধীরে বিভিন্ন জাতির মানুষ ব্যবসার-বাণিজ্যের উদ্দ্যেশে ঢাকামুখী হতে থাকে। পর্তুগিজ, ডাচ, ফরাসি, গ্রিক, চীনা বণিকদের সাথে পাল্লা দিয়ে আসা শুরু করে আর্মেনিয়ানরাও।

স্কুলের প্রবেশ তোরণ। ছবিঃ উইকিপিডিয়া।

আঠারো দশকের গোড়ার দিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লবণ ব্যবসার বদৌলতে স্থায়ীভাবে এই এলাকায় থিতু হয়ে বসে আর্মেনিয়ানরা। কারণ এই লবণ উৎপাদন এবং বিতরণের জন্য ঠিকাদারের বেশির ভাগ ছিল চৌকস আর্মেনিয়ান ব্যবসায়ীরা। লবণের ঠিকাদারি ছাড়াও কাপড়, পাট ও পানের ব্যবসায় আর্মেনিয়ানরা একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার শুরু করেছিল। পাটের সোনালী আশের সুবাসে এত উজ্জ্বল ভবিষৎ হয়তো আগেই টের পেয়েছিল আর্মেনিয়ানরা। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ঢাকায় আর্মেনিয়ান বসতি। তখন ঢাকার যে স্থানে তারা সংঘবদ্ধভাবে বসবাস শুরু করে সে জায়গার নামই হয়ে যায় আরমানিটোলা।

বর্তমান আরমানিটোলায় আর্মেনিয়ানদের পদধূলি পড়ে কালে ভদ্রে। আর যাই হোক চার্চের কারণে আর্মেনিয়ান সর্দারদের বংশধর প্রায়শ ঢাকায় আসেন। ধীরে ধীরে আমরা এসে পড়লাম আবার তারা মসজিদের সামনে। আর তারা মসজিদের সামনে আসার পরই মনে পড়লো সেই বিখ্যাত লাল বিল্ডিংয়ের কথা। শতবর্ষী এই লাল ভবনটি যে আরমানিটোলা হাই স্কুল। মুফতে যদি কোনো স্থাপনার সংযোজন ঘটে তাহলে ক্ষতি কী? আমরা আমাদের দল নিয়ে পা বাড়ালাম আরমানিটোলা হাই স্কুল দেখতে।

আর্মেনিয়ান স্মৃতি বিজড়িত গির্জার গেট। ছবিঃ উইকিপিডিয়া।

আর্মেনিয়ানদের স্মৃতি বিজড়িত এই হাই স্কুলটি প্রায় আড়াই একর জমি উপর দাঁড়িয়ে আছে। তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার তাদের টিপিক্যাল স্থাপত্য শিল্পের নির্দশন হিসেবে গড়ে তুলেছে এই আরমানিটোলা হাই স্কুল। এই লাল ইটের ভবনের সাথে সমসাময়িক কার্জন হল, লাল কুঠির বেশ গঠন তান্ত্রিক মিল দেখা যায়।

বিদ্যালয়টি ব্রিটিশ সরকার ১৯০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত করে। আর এর প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন জে ই হুইটেকার। পূর্ববঙ্গের একমাত্র শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়ের পরীক্ষামূলক বা এক্সপেরিমেন্টাল স্কুল হিসেবে আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয় এই হুইটেকার সাহেবের হাত ধরেই। এই স্কুলের সামনে ও পিছনে রয়েছে খেলার মাঠ।

লাল ইটের সেই ঐতিহ্যের নির্দশণ। ছবিঃ উইকিপিডিয়া।

শতবর্ষী এই বিদ্যালয়ের প্রাচীন সেই কাঠে সিড়ি, মনোমুগ্ধকর গ্যালারি, তথ্য সমৃদ্ধ লাইব্রেরি শোনায় সোনালী অতীতের সুখ স্মৃতি। আর পাশে ছায়াদায়ী দেবদারু গাছটি আজও সে সোনালী অতীতের সাক্ষী দেয়। সময়ে আরমানিটোলায় বিভিন্ন ব্রাক্ষণ সমাজ ও ব্রাক্ষণ মন্দির এবং পূর্ব বাংলার বিখ্যাত কয়েকটি মুসলিম ও হিন্দু জমিদার বাড়ীর অবস্থানের কারণে আরমানিটোলা হাই স্কুল ছিল ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে আভিজাত্যের মোড়কে মুড়িয়ে। সে সময় সেন্ট গ্রেগরি, মুসলিম হাই স্কুল, কলেজিয়েট স্কুলের পাশাপাশি আরমানিটোলা হাই স্কুলকে স্মরণ করা হতো এর আভিজাত্যের জন্য। তাই তো এই স্কুলের ইতিহাস পরিণত হয়েছে এক ঐতিহ্যের প্রবাদে।

২০১৬ সালে বর্ণিল সাজে আরমানিটোলা স্কুল। ছবিঃ ইউটিউব।

আর সে জন্যই তো বিদ্যালয়ের এই প্রাচীন ভবন পরিণত হয়েছে গুরত্বপূর্ণ প্রত্নসম্পদে। তাই তো আরবান স্টাডিস গ্রুপ ২০১৬ সালের ১৮ই এপ্রিল আরমানিটোলা হাই স্কুলের এ্যালামনাই এসোসিয়েসন এর উদ্যোগে ঐতিহ্যবাহী লাল ইটের তৈরি মূল ভবনটিতে (ভবন-১) বর্ণিল আলোক সজ্জা বা লাইট শো এর আয়োজন করে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল এই ঐতিহ্যবাহী ভবনটিকে সংরক্ষনের ব্যাপারে উচ্চ মহলে আলোকপাত করা।

আরমানিটোলা স্কুল দেখার পর আমরা এগিয়ে যাচ্ছি আর্মেনিয়ান চার্চের উদ্দেশ্যে। আর্মেনীয় গির্জাটি আরমানীটোলা ও মিটফোর্ড হাসপাতাল এর মাঝে চার্চ রোডে অবস্থিত। দেখতে দেখতে চলে এলাম সেই আর্মেনিয়ানদের স্মৃতিঘেরা চার্চে। গেটে তালা ঝুলানো। পূর্ব অনুমতি ছাড়া ভেতরে ঢোকা নিষেধ। আমরা এই চার্চের রক্ষনাবেক্ষনের কাজে নিয়োজিত সংকর’দা কে ফোন দিলাম। এর আগেও আরবান স্টাডিস এর সাথে বহুবার এখানে ঢুকেছেন শরীফ আর ঈসমাইল ভাই। তবে এবারে ঢোকাতে আছে একটু অন্য রকম ভালো লাগা কাজ করা। কারণ এবার আমরা নিজেদের ট্র্যাভেল গ্রুপ শেকড় সন্ধানীদের সদস্য নিয়ে ঢুকছি।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যে ১০ টি সহজ উপায়ে ভ্রমণের পূর্বে নিজের ব্যাগ গুছিয়ে নিতে পারেন

পাহাড় ট্রেকিংয়ে মনে রাখবেন যে বিষয়গুলো