পদব্রজে ঐতিহ্যের পুরান ঢাকা: টাকা কথা বলে

হাঁটছি শেকড় সন্ধানীর দল বেচারাম দেউড়ির পথে। সেখানেই যে আছে আদি হাজী নান্না। আর কে না জানে নান্নার মোরগ পোলাও পুরান ঢাকার সেরা। ঢাকার ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় মোগল আমল থেকেই এই অঞ্চলের মানুষ মুখরোচক খাবার পছন্দ করতো। এক কথায় বলতে গেলে বর্তমান পুরান ঢাকাকে বিরিয়ানির রাজধানীও বলা যায়। বিরিয়ানি খেতে হলেও আসতে হবে প্রাণের পুরান ঢাকায়।

পুরান ঢাকার বিরিয়ানির স্বাদ আর ঐতিহ্যের সুনাম ছড়িয়ে পড়ছে দেশ থেকে দেশান্তরে। শুনলে মনে হবে এ কেমন চাপা। কিন্তু যখন শুনবেন আমাদের ভ্রমণ জাদুকর মাহমুদ হাসান খানের একটি লেখা পড়ে সুদূর আমেরিকা থেকে ৯২ বছরের বৃদ্ধা এসে পড়েছে ঢাকার বিরিয়ানির স্বাদ নিতে তখন ব্যাপারটা আর দেশের গণ্ডির ভেতর থাকে না।

টাকা কথা বলে। ছবিঃ লেখক।

আমরা ছুটে যাচ্ছি হাজী নান্নার আদি দোকানে। ঢাকা শহর আজ নকল নান্নাতে সয়লাব। আদি ও অকৃত্রিম নান্নার মোরগ পোলাওয়ের স্বাদ নিতেই তো তাই বেচারাম দেউড়ি ছুটে আসা। ১৯৬২ সালের দিকে পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারের বার্বুচি নান্না মিয়ার হাত ধরে গুটি গুটি পায়ে চলা হাজী নান্নার বিরিয়ানি আজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ঢাকায় শাখা প্রশাখা হয়ে। নকল আসলের ভিড়ে হাজী নান্নার বিরিয়ানির জন্মস্থানে আজ ভিড়েছে শেকড় সন্ধানীর দল। ক্ষুধার রাজ্যে শুকান্তের কবিতা না শুনিয়ে আজ শোনাচ্ছে মোরগ পোলাওয়ের গদ্য। সবাই খুব তৃপ্তি সহকারে মোরগ পোলাও খাওয়ার পর আমুদে আরামে গল্প শুরু করলো। খানিকটা জিরিয়ে আবার শুরু করলাম ঐতিহ্যের সন্ধান।

বেচারাম দেউড়ি থেকে খুব কাছেই তারা মসজিদ। হেলে দুলে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম। পিছনে দেখা যায় কিছু সিগারেট পিপাসী মুরব্বীদের ভয়ে কচ্ছপের গতিতে সিগারেট টানতে টানতে আসছে। এই তো পুরান ঢাকার প্রাণের মসজিদের সামনে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। ভেবে অবাক হই, সুলতানি মোগল আমলের স্থাপত্য শিল্পের নির্দশন না হয়েও কীভাবে পথিকের নজর কেড়ে রেখেছে জমকালো সাজে।

শত বছর বয়সী মসজিদটি যেন আজও উজ্জ্বল। আগের জৌলুস হয়তো কিঞ্চিত হারিয়েছে তবুও টাকায় কথা বলে তারা মসজিদ। মসজিদের গেটের সামনে আসার পর সবাইকে নতুন ১০০ টাকার নোট বের করতে বললাম। মানুষ সচরাচর যা দেখে মনে রাখে না। নোটটা বের করে তাই অনেকে অবাক হলো। টাকা যে আজ তাদের সাথে কথা বলছে।

তারা মসজিদের ভিতরের কারুকার্য। ছবিঃ লেখক।

সুন্দর স্থাপত্য শিল্পটি শুধু মাত্র দেশী বিদেশী পর্যটকদের হৃদয়ে নয়, স্থান করে নিয়েছে বাংলাদেশের টাকায়। নয়নাভিরাম স্থাপনাটি প্রচলিত ১০০ টাকার নোটে সচরাচর দেখা যায়। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সরকার এই স্থাপনাটি কেন্দ্র করে ৫ থেকে ৫০০ টাকা সিরিজের ব্যাংক নোট মুদ্রণ করে। পুরান ঢাকার আবুল খয়রাত সড়কে অবস্থিত স্থাপনাটি নির্মাণ করেন তৎকালীন ব্যবসায়ী জমিদার মির্জা গোলাম পীর।

সাদা মার্বেলের গম্বুজের ওপর নীলরঙা তারায় খচিত এ মসজিদ নির্মিত হয় আঠারো শতকের প্রথম দিকে। মির্জা গোলাম পীরের মৃত্যুর পর ১৯২৬ সালে মসজিদটি প্রথমবারের মতো সংস্কার করা হয়। আলী জান বেপারী নামক স্থানীয় ব্যবসায়ী মসজিদটির সংস্কার করেন। তখন এই মসজিদের মোজাইকের কারুকার্যে জাপানের রঙিন চিনি-টিকরি পদার্থ ব্যবহৃত হয়। মোগল স্থাপত্য শৈলীর প্রভাব রয়েছে এ মসজিদে। ১৯৮৭ সালে শেষবারের মতো সংস্কারের সময় মসজিদটিকে তিন গম্বুজ থেকে পাঁচ গম্বুজ করা হয়।

তারা মসজিদের ভেতর বাহির দেখার পর এর ডান প্রান্তে কসাইটুলির গলির ভিতর ঢুকে পড়লাম আরেকটি ঐতিহ্যের খোঁজে। ১৯০৭ সালে নির্মিত মসজিদটি পুরান ঢাকার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী মসজিদ। মসজিদটি পুরোটাই নানা রংয়ের চিনা মাটির কাঁচ দ্বারা আবৃত। দেখতে অনেকটা চিনির টুকরার মতো ঝকঝকে। তাই এলাকাবাসী এই মসজিদকে চিনি মসজিদ বলেও ডাকে।

১৯৭৯ সালে মূল ভবনের কারুকাজের পরিবর্তন না করে এটি সংস্কার করা হয়। ফলে মূল ভবনের ভেতরটা আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। এই মসজিদের সুনাম আগে এতটাই ছিল যে বিটিভির আযানের সময় এই মসজিদের ছবি দেখানো হতো। সে সঙ্গে ‘কাস্বাবটুলী মসজিদ’-এর ছবি দিয়ে বের হয়েছে ‘ভিউকার্ড’। ফলে এর সুনাম অক্ষুণ্ন রয়েছে। 

তারা মসজিদের ভিতরে দর্শনার্থী। ছবিঃ লেখক।

হেঁটে চলছে শেকড় সন্ধানীর দল পুরান ঢাকার কসাইটুলি এলাকার পিকে ঘোষ স্ট্রিট রোডের উদ্দেশে। দেখতে দেখতে চলে এলাম চিনি মসজিদের কাছে। তিন দিকে চলে গেছে তিন রোডের সংযোগ। আর এক কোনায় দাঁড়িয়ে আছে শত বছরের গ্লানি নিয়ে চিনি মসজিদ। বলতে হবে আগের থেকে এর রং কিছুটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।

শতবর্ষী মসজিদের দেয়ালের কিছু অংশ উঠে গিয়ে উঁকি দিচ্ছে ধূসর লাল ইটের আভা। কোথাও ফিকে হয়ে গেছে কাঁচের নীল সবুজ রং। এরপরও সে যে আমাদের পুরান ঢাকার শোভা। এর পাশেই গড়ে ওঠা নতুন মসজিদ এর জৌলুস অনেকটাই ফিকে করে দিয়েছে। মসজিদের শহরে ঢাকায় কি কিছু মসজিদ রক্ষা করা যেত না এক্সটেনসন না করে?

তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদের নির্মাতা আবদুল বারী বেপারী, তবে এর নির্মাণ সাল নিয়ে আছে বিভ্রান্তি। মসজিদের গায়ে ১৯০৫ লেখা থাকলেও অনেকের ধারণা এটি ১৯১৯ সালে নির্মাণ করা হয়েছে। সে হিসেবে তার শততম জন্মবার্ষিকী আমাদের প্রজন্ম দেখতে পেল। তবে কাটা হলো না শুভেচ্ছা কেক। এর বদলে পুরান ঢাকাবাসী ভীত এই মসজিদ টেকানোর যুদ্ধে।

কাস্বাবটুলি জামে মসজিদ। ছবিঃ লেখক।

শত বছর আগের কথা চিন্তা করলে তখন ছিল না মানুষের কোলাহল। আজ ঢাকার এই অংশের ঘনবসতি বেড়েছে কয় গুণ তা হিসাব করতে হলে ক্যালকুলেটর নিয়ে বসতে হবে। ছোট হলে ধরে রাখতো ভালোবাসা দিয়ে। আজ মানুষ বেড়েছে বেশ, সময়ের চাহিদায় পুরোনোকে রেখে নতুন কুড়ি এসেছে ফুলে। মূল মসজিদটি একতলা হলেও বর্ধিত অংশটি তিনতলা। বর্তমানে এটি প্রায় পাঁচ কাঠা জায়গায় অবস্থিত।

চিনি মসজিদের টিকরির সৌন্দর্য। ছবিঃ লেখক।

পর্যবেক্ষকের বিরাট দল এসেছে আজ তার রূপসুধা পান করতে। উইকিপিডিয়ায় এর গঠনশৈলী নিয়ে যা বলা হয়েছে হুবুহু তুলে ধরলামঃ

“মূল মসজিদটির ভবনে সমতল কোনো ছাদ নেই। ছাদবিহীন মসজিদের প্রতিটি পিলারের মাথায় রয়েছে গম্বুজ। মূল অংশের ছাদে রয়েছে তিনটি গম্বুজ। তিনটি গম্বুজের মাঝের গম্বুজটি বড় আর দুপাশের দুটির আকার মাঝারি। এছাড়া চার কোণায় রয়েছে চারটি বুরুজ, চারটির কারুকাজ একই ধরনের। গম্বুজ ও বুরুজগুলোর মাথায় পদ্মফুলের নকশা করা তীর রয়েছে। ছাদের চারদিক ঘিরে আছে অনেকগুলো টারেট।

এছাড়া ছয়টি ছোট ও দুটি জোড়া পিলারের দুটি গম্বুজ রয়েছে। গম্বুজগুলোর উচ্চতা ৫-১২ ফুট।[

মসজিদটির মূল বৈশিষ্ট্য ‘চিনিটিকরির কারুকাজ’। মূল ভবনের ভেতরে ও বাইরের দেয়ালসহ সম্পূর্ণ জায়গায় চিনিটিকরি পদ্ধতির মোজাইক দিয়ে নকশা করা হয়েছে। চিনামাটির ভাঙা টুকরা আর রঙিন কাঁচ দিয়ে গোলাপ ঝাড়, আঙুরের থোকা, ফুলদানির ছবি মসজিদের দেয়ালে-খিলানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মসজিদের ভেতরের মেহরাব ও মেহরাবের আশপাশের নকশাগুলো হচ্ছে সবচেয়ে রঙিন ও জমকালো।”

দিন যে প্রায় শেষের পর্যায়ে, দেখতে হবে আরও ঐতিহ্য। চিনি প্রিয়তমাকে রেখে তাই হাঁটা ধরলাম আর্মেনিয়াম চার্চের উদ্দেশে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পথে পথে পটুয়াখালী থেকে বরগুনা

শাহজাদপুরের পথে রবীন্দ্রনাথের সাথে: কাছারি বাড়ি