পদব্রজে ঐতিহ্যের পুরান ঢাকা: রূপলাল হাউজ

ফরাশগঞ্জ আসলে আহসান মঞ্জিলের কথা বললে সবাই এক আংগুলে দেখিয়ে দেবে। কিন্তু যদি বলেন রূপলাল হাউজটা কোথায়? সে আংগুল দিয়ে মাথা চুলকাবে। হ্যাঁ, বলছি সেই রূপলাল হাউজের সেই রূপলাল দাশ, রঘুনাথ দাশ বাবুদের কথা। কালের বির্বতনে হারিয়ে গেছে ইতিহাস। হয়তো একদিন হারিয়ে যাবে এই বাড়িখানাও। কথিত আছে এক কালে ব্রিটিশরা ঢাকা আসলে রূপলাল হাউজে রুম ভাড়া নিয়ে থাকতো। তৎকালীন আমলে রুম ভাড়া ছিল ২০০ টাকা। ঢাকার নবাব আর রূপলাল বাবুদের মধ্যে একটা ঠাণ্ডা যুদ্ধ সব সময় লেগে থাকতো।

সে সময় ঢাকা শহরে নাচ ঘর বা বল রুম ছিল শুধু আহসান মঞ্জিল আর রূপলাল হাউজে। ১৮৮৮ সালে কোনো এক সময় লর্ড ডাফরিন ঢাকায় আসলো। তার সম্মানে নাচ গানের আসর বসবে এই নিয়ে প্রতিযোগিতায় নামে ঢাকার নবাব আর রূপলাল বাবুরা। সে সময় অনেক বেশি ভোটে বিজয়ী হয় রূপলাল হাউজ। পান মসলার আড়তের ভিড়ে হারিয়ে গেছে তার পুরোনো আধিপত্য। দেবত্তর সম্পত্তি এখন জামাল বাবু আর নূরজাহান বেগমের দখলে। সে আর এক ইতিহাস। রূপলাল হাউজ যে আমাদের ঐতিহ্য ছিল, সে কথাও হয়তো কিছুদিন পর মানুষ মনে রাখবে না। খাতা কলমে রূপলাল হাউজ এখনও টিকে আছে।

রূপলাল হাউজের পার্শ্ব দৃশ্য। ছবিঃ লেখক।

আর সে রূপলাল হাউজ টিকে আছে জামালপুর আর নূরজাহান হাউজের দুই এক্সটেনসনে। লালকুঠি থেকে বেশ কাছে এই রূপলাল হাউজ। ইতিহাস যে একটার সাথে আর একটা লিংক করা- সেটা এই পদব্রজে না আসলে হয়তো টের পেতাম না। আগেই বলেছি আর্মেনিয়ান জমিদার আরাতুনের কথা। সেই আরাতুনের হাতেই ১৮২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বর্তমানের রূপলাল হাউজ।

আরাতুনের কাছ থেকে ১৮৩৫ সালে রূপলাল দাস এবং তার ভাই রঘুনাথ দাস বাড়িটি কিনে নেয়। তখন থেকেই নাম হয়ে যায় রূপলাল হাউজ। তৎকালীন সময় ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান, ওস্তাদ ওয়ালী উল্লাহ খান এবং লক্ষী দেবী সহ অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের সংগীতের মূর্ছনায় ডুবে থাকতো রূপলাল হাউজ। আজ সবই স্মৃতি।

ঢাকার রূপলাল হাউজ। ছবিঃ উইকিপিডিয়া।

হলুদ মরিচ রসুনের তীব্র সুবাসে বাস্তবে ফিরলাম। হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন রুপলাল হাউজ এখন মসলার আড়ত। আর ভবনের দুতলা দখল করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। আর আমরা দাঁড়িয়ে আছি প্রিয়তমার শেষ হৃদয়ভাঙা রূপ দেখতে। এ প্রিয়তমা তার রূপ হারিয়ে ফেলেছে অনেক আগে, দিনের শেষ নিভু নিভু আলোতে সে জেগে উঠেছে যেন নতুন কিছু পথিক দেখে। ছাদে কার্নিশে বটগাছ গজিয়ে যেন দেখিয়ে দিয়েছে আমায় প্রিয়তমার শেষ পর্বের শুরু।

জায়গায় জায়গায় ভেঙে পড়ছে। তবে দাম্ভিকতার সাথে যেন শেষ ঝলক দেখানোর জন্য মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর শেষ প্রচেষ্টায় লিপ্ত রূপলাল হাউজ। আজ তোমায় সংরক্ষণের কোনো প্রেমিক আসবে না। দখলকারী দানবরা কী বুঝবে শিল্পের মর্ম? হতাশ হই প্রতিবার এখানে আসলে। এরপর দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে তো পিছে ফিরতে পারি না। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগলাম রূপলাল হাউজ।

রূপলাল হাউজের জানালা। ছবিঃ উইকিপেডিয়া।

মোটামুটি দেখা শেষে সবাই চলে এলাম শ্যামবাজার ঘাট থেকে রূপলাল হাউজের শেষ ঝলক দেখতে। আহা সামনে নতুন স্থাপনা না থাকলে হয়তো আরও সুন্দর দেখা যেত। মার্টিন এন্ড কোংয়ের স্থপতি এই বাড়ির নকশা প্রণয়ন করেছিল। কী সুন্দর না হতো সে আমলে ডিজাইনগুলো, আজও এই ভবনে স্থাপত্য শৈলী চুম্বকের মতো মানুষ টানে। এর স্থাপত্য শিল্প নিয়ে বাংলা উইকিপিডিয়ার কিছু অংশ তুলে ধরলাম।

“এটি দুটি অসম অংশে বিভক্ত যার প্রতিটিতে কিছুটা ভিন্ন স্থাপত্য শৈলী দেখা যায়। এর ভিত্তিভূমি ইংরেজী E অক্ষরের ন্যায়, যার বাহুত্রয় শহরের দিকে প্রসারিত। মাঝের দীর্ঘতম বাহুটির দৈর্ঘ্য ১৮.৩৩ মিটার। ভবনটির ছাদ নির্মাণ করা হয়েছিল ‘কোরিনথীয়’ রীতিতে। এর উপরে রয়েছে রেনেসাঁ যুগের কায়দায় নির্মিত ‘পেডিমেন্ট’। রূপলাল হাউজে দ্বিতীয় তলায় দুটি অংশে বিভিন্ন আয়তনের মোট ৫০টিরও বেশি কক্ষ রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে কয়েকটি প্রশস্ত দরবার কক্ষ । ভবনের পশ্চিামংশে দোতলায় অবস্থিত নাচঘরটি আকর্ষণীয়ভাবে তৈরি। এর মেঝে ছিল কাঠ নির্মিত। পুরো বাড়ি জুড়ে উত্তর-দক্ষিণ পার্ম্বে রয়েছে প্রশস্ত বারান্দা। বারান্দা দুটি ইট-নির্মিত ‘সেমি-কোরিনথীয়’ স্তম্ভ বা সমায়ত ইটের স্তম্ভের ওপর সংস্থাপিত। [১] নদীর দিকে সম্মুখভাগে ভবনের চূড়াতে একটি বড় ঘড়ি ছিল যা ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ভূমিকম্পে ভেঙে পড়ার পড়ে আর ঠিক করা হয়নি।”
[কার্টেসি: বাংলা উইকিপেডিয়া]

শ্যামপুর ঘাটে খাদ্য অন্বেষী কুকুরটি। ছবিঃ লেখক।

সময় নয় এখন থমকে দাঁড়ানোর। আমাদের পদব্রজের ইভেন্টের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে আবার পিছনে। পথিকের পথ তো থেমে নেই। তবে মাঝে মাঝে যে থামতে হয়। এবার এই থামা হালকা নাস্তার টানে। নর্থব্রুক হল ধরে বাংলাবাজারের দিকে হেঁটে যাচ্ছি আমরা। পথেই পড়লো ক্যাফে কর্নার। আরেক শতবর্ষী ঐতিহ্য। ব্রিটিশ আমলে থেকে ব্যবসা করে যাচ্ছে ক্যাফে কর্নার। এদের ক্রাম্প চাপ, আলুর চপ, কাটলেট এর সুনামের কথা জাতীয় পত্রিকায় এসেছে বহুবার।

এ তো গেল সান্ধ্যকালীন নাস্তা। সকালের নাশতায় এখানে ডাল-ভাজি, হালুয়া, পরোটা, ডিম ও চা পাবেন। ক্যাফে কর্নারের কড়া লিকারের চা আসলেই আলাদা একটা আমেজ তৈরি করে। ক্লান্ত পথিক পদব্রজে বহুদূর হেঁটেছে আজ। তাই ঐতিহ্যের সাথে খানিকটা বিশ্রাম তো প্রাপ্য। নাস্তা পর্ব আলুর চপ, কাটলেট দিয়ে সেরে কড়া লিকারের চা পানে ব্যস্ত সবাই। এবার যে কদম ফেলতে হবে শেষ গন্তব্যের পানে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পদব্রজে ঐতিহ্যের পুরান ঢাকাঃ বিউটি বোর্ডিং

পদব্রজে ঐতিহ্যের পুরান ঢাকা: ফ্রেন্সগঞ্জের লালকুঠি