পদব্রজে ঐতিহ্যের পুরান ঢাকাঃ বিউটি বোর্ডিং

দুপুরের খাবার; source: Bhorer Kagoj

আমুদী আরাম জেঁকে বসেছিল দেহে। দিনের আলোও শেষ। তবে তাড়াহুড়ো নেই। ক্যাফে কর্নার থেকে দু কদম ফেললেই যে বিউটি বোর্ডিং। প্যারিদাস রোডের পাশে সেই শ্রীশদাস লেন সেখানেই তো কালের গ্লানি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিউটি বোর্ডিং। আমরা দু কদম বাড়ালাম বিউটি বোর্ডিং এর উদ্দ্যেশে। দিলের আলো শেষের ধরনী কে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে রাতের আধার। পুরান ঢাকা অলি গলিতে এখনও ঘুরে বেড়ায় ঐতিহ্যের স্বাদ নেওয়া কিছু পথিক। এসে পড়লাম বিউটি বোর্ডিং এর প্রধান ফটকে। সে ফটক দিয়ে ঢুকেই চোখে পড়লো সেই পুরানো দোতলা ভবন। হলুদ বর্ণের বিবর্ণ গ্লানিতে বয়ে যাওয়া সেই প্রাচীন ইটের গাথুনি মূর্হুতেও আপনাকে নিয়ে যাবে শত বছর পিছে। প্রশস্ত উঠোনে দাঁড়িয়ে দেখতে পাবেন ফুলের বাগান। পাশে খাবার ঘর, শোবার ঘর। পিছনের দিকে সিড়ি দিয়ে দোতলায় উঠা যায়। যেন গল্প হারিয়ে যাওয়া কোন প্রাচীন জমিদার বাড়ি।
জমিদার বাড়ি হবেই না বা কেন, এত সত্যি সত্যি ব্রিটিশ আমলে জমিদার বাড়ি ছিল। সেই জমিদার বাড়ি ছিল নিঃসন্তাম জমিদার সুধীর চন্দ্র দাসের। দেশ ভাগের পর যিনি চলে যান এ মাটির মায়া ত্যাগ করে পশ্চিমবঙ্গে। তবে বিউটি বোর্ডিং ভারত বিভাগের পূর্বে ছিল সোনার বাংলা পত্রিকার অফিস। কবি শামসুর রহমানের প্রথম কবিতা তো এই পত্রিকায় থেকে মুদ্রিত হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় পত্রিকা অফিসটি চলে যায় তার কাটাতারের জ্বালা নিয়ে কলকাতায়। দেশভাগের পর বাংলাবাজার হয়ে উঠে প্রকাশনা ও মুদ্রণশিল্পের স্বর্গরাজ্য। তখন থেকেই বিউটি বোর্ডিং এ ভীড় জমাতো শিল্পী-সাহিত্যিক, সাংবাদিকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ। বিউট বোর্ডিং যেন হয়ে সংস্কৃতি কেন্দ্রবিন্দু। তখন তো প্রতিদিনই জমতো এখানে প্রাণের আড্ডা। সে সব সোনালী সময় স্মরণ করে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বর্তমান বিউটি বোর্ডিং এর দুই কর্তা সময় সাহা, তারক সাহা।
তাদের পূর্বপুরুষই তো মালিক সুধীরচন্দ্র দাসের কাছ থেকে জায়গাটা বুঝে নেন। প্রহ্লাদচন্দ্র সাহা ও তার ভাই নলিনীকান্ত সাহা ১৯৪৯ সালে সাহা এই বাড়ি ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলেন বিউটি বোর্ডিং। নলিনী মোহনের বড় মেয়ে বিউটির নামেই এর নামকরণ করা হয়।
আমরা সবাই বিউটিং এর অফিস ঘরে ঢুকে তারক’দা কে পেলাম। সেই হাস্যজ্জল হাসি দিয়ে আমাদের ভিতরে আসার আমন্ত্রন জানালো। তার মুখে শুনতে পেলাম অনেক বিউটিসিয়ানের গল্প। অফিস ঘরের পাশেই বিউটিসিয়ানদের একটি লিস্ট দেওয়া আছে, কাদের পদধুলিতে মুখরিত ছিল এই আংগন তা সহজেই বুঝা যায়। আর পাশে কালো কাপড়ের সাদা অক্ষরে ফুটে উঠেছে যেন মুক্তিযুদ্ধে বিউটি বোর্ডিং ঘটে যাওয়া নারকীর হত্যা কান্ডের কাব্যগাথা। তারক’দার মুখে যেন সে বেদনা ফুটে উঠলো। ১৯৭১ সালের ২৮শে মার্চ পাক হানাদার বাহিনী হাতে নিহত হন প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহাসহ ১৭ জন। ভীত সাহা পরিবার পাড়ি জমায় ভারতে। এক সময় বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। ১৯৭২ সালে ফিরে আসে সাহা পরিবার। প্রহ্লাদ চন্দ্রের স্ত্রী শ্রীমতী প্রতিভা সাহা দুই ছেলে সমর সাহা ও তারক সাহাকে নিয়ে আবার নতুন করে যাত্রা শুরু করেন সেই পুরানো বিউটি বোর্ডি এর।
তারক দাদা যেন আজ স্মৃতিকাতর হয়ে গেছেন। আমাদের পুরানো ঢাকা নিয়ে কাজ করার মানুষিকতা কে প্রশংসা করলেন। কেউ তো এই পুরান বাড়ি ঘর গুলোর ইতিহাস জানতে চায়। ঘর বাড়ির ইতিহাসের সাথে যে মানুষের ইতিহাস ও জড়িতে। স্বাধীনতার আগে এখানে বহু নামীদামী মানুষে পদধুলিতে মুখরিত ছিল এই বিউটি বোর্ডিং। কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হকের ছবি তারক’দার অফিসে শোভা পাচ্ছে। আজ যেন তারক’দার কথা বলার রোগে পেয়েছে। তিনি বলেন আব্দুল জব্বার খানের কথা। আবদুল জব্বার খান এখানে বসেই যে লেখেন বাংলার প্রথম সবাক ছবি মুখ ও মুখোশের পাণ্ডুলিপি। সমর দাসের সুরের মূর্ছনায় দূর দূরান্ত থেকে এখানে লোক আসতো। সমর দাস তার অনেক বিখ্যাত গানের সুর তৈরি করেছেন এখানে বসে। ঐতিহাসিক বিউটি বোর্ডিংয়ে থেকেছেন জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ। আজ সবই যেন স্মৃতি।
এখানে এককালে আড্ডায় আসতেন কবি শামসুর রাহমান, রণেশ দাসগুপ্ত, ফজলে লোহানী, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, ব্রজেন দাস, হামিদুর রহমান, বিপ্লব দাশ, আবুল হাসান, মহাদেব সাহা, আহমেদ ছফা, হায়াৎ মাহমুদ, সত্য সাহা, এনায়েত উল্লাহ খান, আল মাহমুদ, আল মুজাহিদী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, ড. মুনতাসীর মামুন, ফতেহ লোহানী, জহির রায়হান, খান আতা, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সৈয়দ শামসুল হক, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, নির্মল সেন, ফয়েজ আহমদ, গোলাম মুস্তাফা, খালেদ চৌধুরী, সমর দাশ, ফজল শাহাবুদ্দিন, সন্তোষ গুপ্ত, আনিসুজ্জামান, নির্মলেন্দু গুণ, বেলাল চৌধুরী, শহীদ কাদরী, ইমরুল চৌধুরী, সাদেক খান, ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, শফিক রেহমান, মহিউদ্দিন আহমেদ, আসাদ চৌধুরী, সিকদার আমিনুর হক প্রমুখ থেকে শুরু করে আরও অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি।
বিউটি বোর্ডিং এর সেই আড্ডাটা আর নেই, ঠিক কফি হাউসের মতই। তবুও খাবার ঘরে ভীড় লেগে থাকে ভোজনরসিকদের। বইয়ের গন্ধে চলে আসা বইপোকারা বাংলাবাজার থেকে এখানে আসে খাবারের স্বাদ নিতে। এখানে এসে যেন এক মুঠো বিশুদ্ধ অক্সিজেন খুঁজে পায়। এখনও মাঝে মাঝে শিল্পী, কবি-সাহিত্যিকদের আড্ডা বসে বিউটি বোডিং এর ফুলেঘেরা বাগানবাড়িতে। তাই তো কবি শামসুর লিখেছেন – মনে পড়ে একদা যেতাম প্রত্যহ দুবেলা বাংলা বাজারের শীর্ণ গলির ভেতরে সেই বিউটি বোর্ডিং-এ পরষ্পর মুখ দেখার আশায় আমরা কজন।
ইতিহাসের মধ্যে যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম। আমাদের অতিথিদের এরই মধ্যে দোতলা দেখিয়ে নিয়ে এসেছে ঈসমাইল ও শরীফ ভাই। সবাই জড় হলাম বিউটি বোর্ডিং এর খাবার ঘরে। দইয়ের আশায় এসে আশা গুড়েবালি হয়ে গেল। একটি সংস্থার মিটিং ছিল আজ এখানে। তাই সব খাবারের ব্যাপক টান। দই তো এক প্রকার দুধই। তাই দই এর স্বাদ ঘোলে মিটাতে গ্রুপ ফটো তুলে ফেললাম সবাই।
এবার যে বিদায়ের পালা এসে গেল। যাদের জন্য আজ এই মহাকাব্য লেখার সুযোগ হল তাদের কি আর অল্পতে বিদায় দেওয়া যায়। গল্পে গল্পে অনেক দূর আসা হল। এবার থামার পালা। তবে থামবে না পুরান ঢাকা নিয়ে আমাদের অগ্রযাত্রা। অনেক সপ্ন নিয়ে শেকড় সন্ধানীদের পদব্রজে ঐতিহ্যের পুরান ঢাকা ইভেন্ট শেষ হল। সপ্ন আমার আদি ঢাকা কে চিনবে দেশের মানুষ, সপ্ন আদি ঢাকা কে ঘিরে গড়ে উঠবে ট্যুরিজম।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

তিনাপ সাইতার – এক রোমাঞ্চকর যাত্রা: পাহাড়ের রুক্ষতা

পদব্রজে ঐতিহ্যের পুরান ঢাকা: রূপলাল হাউজ