প্রথম বিপ্লবী নারী শহীদ প্রীতিলতার আত্মাহুতিস্থল ও রেলওয়ে স্কুল

কৈবল্যধাম ঘুরে পা বাড়ালাম বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আত্মাহুতিস্থল দেখার জন্য। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। এমন একজন বাঙালি, যিনি ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নারী মুক্তিযোদ্ধা ও প্রথম বিপ্লবী মহিলা শহীদ ব্যক্তিত্ব।
পাহাড়তলী রেলব্রিজ পার হয়ে রাস্তার লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে করতেই পেয়ে গেলাম জায়গাটি। একটা তেরাস্তার মোড়ে বীরকন্যার ভাস্কর্য স্থাপন করা আছে। ওটার পাশেই এক ধারে রয়েছে এম. এস. হক স্মৃতি মিলনায়তন। এটিই একসময় ইউরোপীয় ইউনিয়ন নামে পরিচিত ছিল। ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর প্রীতিলতার নেতৃত্বে এই ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করেন বিপ্লবীরা, যে ক্লাবের বাইরে লেখা থাকতো,

‘কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ’।

এম. এস. হক স্মৃতি মিলনায়তন ওরফে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। সোর্স: লেখিকা

ওই অভিযানে শত্রুর গুলিতে আহত হন প্রীতিলতা। পরে বিষপান করে তিনি আত্মাহুতি দেন। এই স্থলেই ২০১২ সালের অক্টোবরে চট্টগ্রামের সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয়।
কালচে ভাস্কর্যটি দেখে অবাক হয়েছিলাম খুব। ভাস্কর্য তো সবসময় সাদাটে হয়। কালো খুব কমই হয়। কারণটা পরে জানতে পেরেছি। প্রীতিলতা নাকি কালো ছিলেন। আত্মীয়স্বজনের বিরূপ মন্তব্যের উত্তরে মা প্রতিভাময়ী দেবী বলেছিলেন, ‘আমার কালো মেয়ে তোমাদের সবার মুখ আলো করবে।’
তাই করেছিলেন প্রীতিলতা।
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের কালচে ভাস্কর্য। সোর্স: লেখিকা

১৯১১ সালের ৫ই মে মঙ্গলবার চট্টগ্রামের ধলঘাট গ্রামে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার জন্মগ্রহণ করেন। পটিয়ার ধলঘাট ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের পীটস্থান, বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দাদারের জন্মগ্রাম। তাঁর পিতা ছিলেন মিউনিসিপ্যাল অফিসের হেড কেরানী জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার এবং মাতা প্রতিভাদেবী। মধুসূদন, প্রীতিলতা, কনকলতা, শান্তিলতা, আশালতা ও সন্তোষ- এই ছয় সন্তান নিয়ে তাঁদের পরিবার।
পরিবারের আদি পদবী ছিল দাশগুপ্ত। কোনো এক পূর্বপুরুষ নবাবী আমলে “ওয়াহেদেদার” উপাধি পেয়েছিলেন, এই ওয়াহেদেদার থেকে ওয়াদ্দেদার বা ওয়াদ্দার। শৈশবে পিতার মৃত্যুর পর জগদ্বন্ধু ওয়েদ্দেদার তাঁর পৈত্রিক বাড়ি ডেঙ্গাপাড়া সপরিবারে ত্যাগ করেন। তিনি পটিয়া থানার ধলঘাট গ্রামে মামার বাড়িতে বড় হয়েছেন। এই বাড়িতেই প্রীতিলতার জন্ম হয়। আদর করে মা প্রতিভাদেবী তাঁকে “রানী” ডাকতেন।
চট্টগ্রামের সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয়। সোর্স: লেখিকা

ডাঃ খাস্তগীর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ছিল প্রীতিলতার প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৯১৮ সালে তিনি এই স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন। প্রতি ক্লাসে ভালো ফলাফলের জন্য তিনি সব শিক্ষকের খুব প্রিয় ছিলেন।
সেই শিক্ষকের একজন ছিলেন ইতিহাসের ঊষাদি। তিনি প্রীতিলতাকে পুরুষের বেশে ঝাঁসীর রানী লক্ষীবাইয়ের ইংরেজ সৈন্যদের সাথে লড়াইয়ের ইতিহাস বলতেন। স্কুলে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন ছিলেন কল্পনা দত্ত। এক ক্লাসের বড় প্রীতিলতা কল্পনার সাথে ব্যাডমিন্টন খেলতেন।
সম্মুখভাগ। সোর্স: লেখিকা

তাঁরা তখন স্বপ্ন দেখতেন বড় বিজ্ঞানী হবেন। সেই সময়ে ঝাঁসীর রানী তাদের চেতনাকে উদ্দীপ্ত করে। নিজেদেরকে অকুতোভয় বিপ্লবী হিসাবে দেখতে শুরু করলেন। স্কুলে আর্টস এবং সাহিত্য প্রীতিলতার প্রিয় বিষয় ছিল। ১৯২৬ সালে তিনি সংস্কৃত কলাপ পরীক্ষায় বৃত্তি লাভ করেন। ১৯২৮ সালে তিনি কয়েকটি বিষয়ে লেটার মার্কস পেয়ে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন। অঙ্কের নম্বর খারাপ ছিল বলে তিনি বৃত্তি পেলেন না।
ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর বন্ধের সময় তিনি নাটক লেখেন এবং মেয়েরা সবাই মিলে সে নাটক চৌকি দিয়ে তৈরী মঞ্চে পরিবেশন করেন। পরীক্ষার ফলাফল দেওয়ার সময়টাতে তাঁর বাড়িতে এক বিয়ের প্রস্তাব আসে। কিন্তু প্রীতিলতার প্রবল আপত্তির কারণে বিয়ের ব্যবস্থা তখনকার মতো স্থগিত হয়ে যায়। আই.এ. পড়ার জন্য তিনি ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন।
এ কলেজের ছাত্রী নিবাসের মাসিক থাকা খাওয়ার খরচ ছিল ১০ টাকা এবং এর মধ্যে কলেজের বেতনও হয়ে যেত। এ কারণেই অল্প বেতনের চাকুরে জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার মেয়েকে আই.এ. পড়তে ঢাকায় পাঠান। ১৯৩০ সালে আই.এ. পরীক্ষায় তিনি মেয়েদের মধ্যে প্রথম এবং সবার মধ্যে পঞ্চম স্থান লাভ করে। এই ফলাফলের জন্য তিনি মাসিক ২০ টাকার বৃত্তি পান এবং কলকাতার বেথুন কলেজে বি এ পড়তে যান। ১৯৩২ সালে ডিসটিংশান নিয়ে তিনি বি.এ. পাশ করেন।
রেলওয়ে স্কুলের উপরতলা থেকে প্রীতিলতার ভাস্কর্য ও চত্বর। সোর্স: লেখিকা

বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদারের সহায়তায় ১৯২৮ সালে মাস্টারদার বিপ্লবী দলের সদস্য হন প্রীতিলতা। দলে ঢোকার শর্ত হলো, ‘প্রয়োজন হইলে দেশের মুক্তিসংগ্রামে আমার সর্বস্ব, আমার জীবন পর্যন্ত আমি ত্যাগ করিতে প্রস্তুত।’
চট্টগ্রামের নন্দনকাননে অপর্ণাচরণ উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষিকা প্রীতিলতা মাস্টারদার সঙ্গে বৈঠক করতে গিয়েছিলেন ধলঘাটের সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে। সেখানে ব্রিটিশ পুলিশ ও বিপ্লবীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সেটি এখন ধলঘাট যুদ্ধ হিসেবে খ্যাত।
গাছের আড়ালে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে রেলওয়ে স্কুল। সোর্স: লেখিকা

দক্ষিণ সমুরায় প্রীতিলতার ভিটেবাড়িতে বর্তমানে বাস করেন শোভা রানী দাশের পরিবার। তাঁরা সরকারের কাছ থেকে জমি লিজ নিয়েছেন। বসতভিটার পশ্চিম দিকে প্রীতিলতা ও অর্ধেন্দু দস্তিদার স্মরণে ১৯৭০ সালে একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করেন বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদার।
স্কুলের সম্মুখভাগ। সোর্স: লেখিকা

ধলঘাটের আরেক মহীয়সী নারীর নাম সাবিত্রী দেবী। যে দুজনকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল ব্রিটিশ সরকার, সেই বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেন ও নির্মল সেন এবং প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারসহ কয়েকজন বিপ্লবীকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন তিনি। পাশের কুখ্যাত ধলঘাট ক্যাম্প থেকে সাবিত্রীর বাড়িতে হানা দিয়েছিল ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন ক্যামেরন ও তাঁর সিপাহিরা। ব্রিটিশ পুলিশ আর বিপ্লবীদের সেই যুদ্ধে শহীদ হন বিপ্লবী নির্মল সেন আর অপূর্ব সেন। নির্মলের গুলিতে প্রাণ যায় ক্যামেরনের। ধলঘাট যুদ্ধ হয়েছিল ১৯৩২ সালের ১৩ জুন।
১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের মামলায় বন্দীদের মুক্তি দেন। বিপ্লবী নেতা অম্বিকা চক্রবর্তী, গণেশ ঘোষ ও অনন্ত সিংহ চট্টগ্রামে ফিরে আসার পর ছুটে এসেছিলেন ধলঘাটের সেই সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে। শ্রদ্ধা জানান শহীদ নির্মল সেন ও অপূর্ব সেনের স্মৃতির প্রতি।
ফিরে আসা বিপ্লবীদের উদ্দেশে সাবিত্রী তখন সজল নয়নে ধলঘাট সংঘর্ষের কথা সবিস্তারে বলেন, ‘আমি জানি, তোমরা যখন ফিরে এসেছ, এর প্রতিশোধ তোমরা নেবে।’
স্কুলের পিছনের দিক। সোর্স: লেখিকা

মাস্টারদা, প্রীতিলতা ও সাবিত্রীর স্বপ্ন সফল হয়েছে। তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি শোষকদের তাড়িয়েছেন দেশ থেকে। বুকের তাজা রক্তে ছিনিয়ে এনেছেন লাল-সবুজ পতাকা।
প্রীতিলতার স্মৃতিরক্ষার কাজ করে যাচ্ছেন স্থানীয় পংকজ চক্রবর্তীর মতো কয়েকজন দেশপ্রেমিক।
রেলওয়ে স্কুলের করিডর। সোর্স: লেখিকা

প্রীতিলতার আত্মাহুতিস্থল ঘুরে ঘুরে দেখছি, চট করে বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো। আশেপাশে তাকিয়ে দেখি চমৎকার লালচে রঙের একটি বিদ্যালয় দেখা যাচ্ছে। দৌড়ে ওখানে আশ্রয় নিই। এটি রেলওয়ে স্কুল। খুব সম্ভবত এই স্কুলঘরটি সেই ব্রিটিশ আমলেই তৈরি করা হয়েছিল। কারণ বিদ্যালয়টির স্থাপত্যকলার সাথে কার্জন হলের মিল পাওয়া যায়। বৃষ্টি বন্দি হয়ে স্কুলটিও ঘুরে ঘুরে দেখেছি। দৃষ্টিনন্দন এই বাড়িটির উপরতলা থেকে প্রীতিলতার ভাস্কর্য দেখা যায়। বৃষ্টি একটু ধরে আসতেই, বাংলার সকল বিপ্লবীদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে এখান থেকে ফিরে গেলাম পরবর্তী গন্তব্যে।
তথ্যসূত্র
http://archive.prothom-alo.com/detail
http://www.ittefaq.com.bd/print-edition/aunoshilon
ফিচার ইমেজ: মাদিহা মৌ

Loading...

2 Comments

Leave a Reply
  1. এম এস হক স্মৃতি মিলনায়তন ইউরোপীয় ইউনিয়ন নয়।প্রীতিলতা ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণ করেছেন সেটি এম এস হক স্মৃতি মিলনায়তন নয়।

  2. এম এস হক স্মৃতি মিলনায়তন ইউরোপীয় ইউনিয়ন নয়।প্রীতিলতা ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণ করেছেন সেটি এম এস হক স্মৃতি মিলনায়তন নয়।ইউরোপীয়ান ক্লাব হলো বর্তমানে রেলওয়ে স্কুলের পাশে রেলওয়ে বিভাগীয় প্রকৌশলীর কার্যালয় ১-২।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভারতের দুর্দান্ত সব রেলভ্রমণের ইতিকথা

ভারতীয় ট্রেন: ভ্রমণকারীদের জন্য কিছু টিপস