কলকাতার গর্ব ঐতিহাসিক ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল

কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ও দৃষ্টিনন্দন একটি স্থাপনার  নাম ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। এটিকে কেউ কেউ কলকাতার গর্ব বলেও উল্লেখ করেন। নানা স্থাপত্য রীতির সংমিশ্রণে নির্মিত এই স্থাপনাটি ব্রিটিশ স্থাপত্য শৈলীর একটি অনন্য নিদর্শন। এখানে ইতালিয় রীতির মূর্তি, মোঘল রীতির গম্বুজ, তাজমহলের ন্যায় সাদা মার্বেলের ব্যবহার ও সুউচ্চ উন্মুক্ত স্তম্ভ শ্রেণির ব্যবহার করা হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী এই ভবনটিতে রয়েছে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের স্মৃতিবাহী বিভিন্ন জিনিসের একটি বিশাল সংগ্রহশালা।

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল; Source: Kolkata24x7

নির্মাণকাল

ভারতে রানী ভিক্টোরিয়ার শাসনকাল সমাপ্ত হওয়ার পর তাঁর স্মৃতিতে নির্মাণ করা হয় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। এটি ১৯০৬ থেকে ১৯২১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে নির্মিত হয়েছিল।
১৮৫৭ সালে সিপাহীদের বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার সরাসরি দেশের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে এবং ১৮৭৬ সালে ব্রিটিশ সংসদ ভিক্টোরিয়াকে ভারতের শাসনকর্তা ঘোষণা করে। ১৯০১ সালে রানী ভিক্টোরিয়ার মৃত্যুর সাথে সাথে তাঁর শাসনকালেরও পরিসমাপ্তি ঘটে।
রানী ভিক্টোরিয়ার মৃত্যুর পর মূলত লর্ড কার্জনের উদ্যোগে নির্মিত হয় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল।

স্থাপত্য কলা

ভারতের মহান স্থাপত্যের তালিকায় তাজমহলের পরেই গণ্য করা হয় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালকে। তবে, বৈচিত্রপূর্ণ স্থাপত্য শৈলীর অপূর্ব নিদর্শনের উল্লেখ করতে গেলে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল সম্ভবত তাজমহলকেও ছাড়িয়ে যাবে। মেমোরিয়ালের নকশায় মুঘল, ভেনিসিয়, মিশরীয়, ডেকানি, ইতালিয় রেনেসাঁ রীতি এবং ইসলামী রীতির ব্যবহার লক্ষ করা যায়। এই সকল স্থাপত্যকলাকে এক সূতায় বেঁধে নির্মাণ করা হয়েছিল এই ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল।

ভাস্কর্য; Source: ইকরামুল হাসান শাকিল

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের নকশা করেন, বিখ্যাত স্থপতি স্যার উইলিয়াম এমারসন এবং এর প্রধান ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মার্টিন অ্যান্ড কোং।
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল সম্ভবত ব্রিটিশ রাজত্বের সবচেয়ে স্মরণীয় এবং বড় ভবন। এই বিশাল ভবনটি নির্মাণের জন্য সাদা মার্বেল পাথরগুলো রাজস্থানের মাকরানা থেকে আনা হয়েছিল। জানা যায়, তাজমহল নির্মাণের জন্য সম্রাট  শাহজাহানও ঐ একই স্থান থেকে মার্বেল পাথর আমদানি করেন।

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের আকর্ষণ সমূহ

৬৪ একর জায়গা জুড়ে লন, পুকুর, গুল্মরাজি ও লতাপাতায় ঘেরা বিশাল উন্মুক্ত অঙ্গনে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল স্থাপিত। ৩৩৮ ফুট লম্বা এবং ২২ ফুট প্রশস্ত বিশিষ্ট স্মৃতিসৌধটির বিরাট গম্বুজ তাঁর স্থাপত্যের মহিমা প্রকাশ করে। বিশাল আকৃতির এই মূল গম্বুজটি অনেকটা তাজমহলের গম্বুজের মতো দেখতে।
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল একটি বৃহৎ মুক্ত অঙ্গন। কলকাতায় এমন মনোরম ও মুক্ত অঙ্গন দ্বিতীয়টি নেই বললেই চলে। তাই প্রতিদিন অনেক যুগলের আনা-গোনা দেখা যায় এর আঙ্গিনায়।

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের অঙ্গন; Source: ইকরামুল হাসান শাকিল

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে মোট ২৫টি গ্যালারি রয়েছে। এর মধ্যে ‘কুইন্স হল’টি আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দু, যার অবস্থান ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মূল গম্বুজটির ঠিক নিচে এবং গম্বুজের চূড়ার দিকে রয়েছে ‘এঞ্জেল অব ভিক্টরি’র মূর্তি। ভিক্টরি নামে খ্যাত হাতে বিগলসহ ব্রোঞ্জের এই দেবী মূর্তিটি একটি কৌতূহলোদ্দীপক বস্তু। এর উচ্চতা ৪,৮৮ মিটার, এবং ওজন ৩,৫০০ কিলোগ্রাম। মূর্তিটির বেদিতে রয়েছে বল-বিয়ারিং-এর ব্যবহার। বাতাসের গতিবেগ বেড়ে গেলে এটি জায়গায় দাঁড়িয়ে শব্দ করে ঘুরতে থাকে। তবে এখন নাকি এটা আর কাজ করে না।
এখানকার আরেকটি আকর্ষণীয় ভাস্কর্য হলো সিংহ-মস্তক মূর্তি। এই মূর্তিটি থেকে পানির চারটি ধারা চারটি পথে প্রবহমান। এই ধারা চারটি ভারতের প্রধান চার নদী- সিন্ধু, গঙ্গা, যমুনা ও কৃষ্ণার প্রতীক।
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল মিউজিয়ামে আরও আছে বিভিন্ন সময়ে ভারতবর্ষে আসা বিখ্যাত ব্রিটিশ নাগরিকদের প্রতিকৃতি সম্বলিত মূর্তি; যেমন, মেকলে, বিশপ হেবার, প্রমুখ। এর মধ্যে ভারতীয় কিছু বিখ্যাত ব্যক্তিদের মূর্তিও এখানে সংরক্ষিত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কেশবচন্দ্র সেন, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তাঁর পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর। এছাড়াও এখানে রয়েছে কিছু দলিল ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের স্মৃতিবাহী বিভিন্ন নিদর্শনাদি, যেমন- রানী মেরী, পঞ্চম জর্জ ও অন্যান্যদের অাবক্ষ মূর্তি, পলাশীর যুদ্ধে দখলকৃত ফরাসি কামান ইত্যাদি।
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ভিতরের এক অংশ; Source: Tour My India

এখানে কিছু নাট্যকার এবং সাহিত্যিকদের অমূল্য পাণ্ডুলিপিও সংরক্ষিত আছে; যেমন, টিপু সুলতানের চিঠি, হাফিজের গজল, আকবরনামা, শাহনামা, উইলিয়াম শেক্সপিয়রের নাটক, অ্যারাবিয়ান নাইটস এবং রুবাইয়াৎ।
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে সংরক্ষিত বস্তুর মধ্যে প্রধান আকর্ষণীয় বস্ত্ত হলো রানী ভিক্টোরিয়ার বিশাল আকৃতির একটি মূর্তি। এর দুই পাশে রয়েছে দুটি সৃদুশ্য জলাশয়।
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে সব মিলিয়ে প্রায় ৩,৫০০টি নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। বর্তমানে কলকাতায় পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ কলকাতার বিখ্যাত গড়ের মাঠের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত এই স্মৃতিভবন।
বিশেষ আকর্ষণ দ্বাদশ চিত্রকলা
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মূল গম্বুজের ১২টি খোপ রয়েছে এবং সেখানে রয়েছে রানীর স্মৃতিতে আঁকা দ্বাদশ চিত্রকলা। এগুলো এঁকেছিলেন বিখ্যাত ব্রিটিশ চিত্রশিল্পী ফ্রান্স সালিস-বারি। তিনি অর্ধচন্দ্রাকৃতির এই চিত্রগুলোতে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন রানী ভিক্টোরিয়ার জীবনের দ্বাদশ আখ্যান। এর মধ্যে প্রথম চিত্রটিতে রয়েছে, রানীকে রাজা চতুর্থ উইলিয়ামের মৃত্যু সংবাদ জানাচ্ছেন ক্যান্টারবেরির প্রধান ধর্মযাজক লর্ড চেম্বারলেন। এরপর ১০টি চিত্রে ক্রমান্বয়ে চিত্রায়িত করা হয়েছে রানীর শাসনকালের নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার চিত্র। দ্বাদশ তম চিত্রে চিত্রায়িত করা হয়েছে শোকের আবহ, যেখানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ শয্যায় শায়িত মহারানী ভিক্টোরিয়া।
অর্ধ-চন্দ্র আকৃতির চিত্র; Source: আনন্দ বাজার পত্রিকা

মহারানীর এই ছবিগুলোতে শুধু যে রানীর জীবনকে তুলে ধরা হয়েছে তা নয়। ঐতিহাসিকদের মতে, এখানে ধরা পড়েছে সেই সময়কার রাজকীয় জীবনযাত্রা ও সামরিক বা রাজকর্মচারীর পোশাক পরিচ্ছদ।
অনেক দিন ধরে এই চিত্রকলাগুলো সাধারণের চোখের আড়ালে পড়ে ছিল, কিন্তু ২০১২ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে উৎসাহী দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয় এই প্রদর্শনীটি।

রাতের ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল

গোধূলি আলোয় সাদা মার্বেল পাথরে নির্মিত ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল সেজে ওঠে এক অপুর্ব সৌন্দর্যে। রাতের বেলা এখানে একটি আলোক ও ধ্বনি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়; যার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়, কলকাতার ইতিহাস।

কখন যাবেন?

এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এখানকার আবহাওয়া অত্যন্ত উষ্ণ থাকে, তাই এই মাসগুলোকে এড়িয়ে যাওয়াই উচিৎ হবে। আর বর্ষাকালে ঘুরতে গিয়ে বসে বসে নিশ্চয় বৃষ্টি দেখতে চাইবেন না! তাই কলকাতা ভ্রমণের উপযুক্ত সময় হিসেবে উল্লেখ করা যায়, শীতকালকে। তবে, কলকাতার বিশেষ আকর্ষণ দূর্গা পূজা উৎসব দেখতে চাইলে একটু আগে আসলেই ভালো।

গোধূলি আলোয় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল; Source: পাঠচক্র

Feature image: fi.wikipedia.org

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

প্রেমের শহর প্যারিসের যত বিখ্যাত ভ্রমণস্থানের কাহিনী

রোজ গার্ডেন প্যালেসের সৌন্দর্য ছুঁয়ে দেখা