পথে পথে পটুয়াখালী থেকে বরগুনা

নদীমাতৃক বরিশাল বিভাগ ঘুরে ফেলার পরিকল্পনা করেছিলাম গত ডিসেম্বরে। কিন্তু দূর থেকে পরিকল্পনা করলে সব কি আর পরিপূর্ণভাবে হয়? কোনো না কোনো ঘাপলা লাগেই। তাই ঘটেছিলো ডিসেম্বরে বরিশাল ভ্রমণ করার সময়ে। পরিকল্পনায় গোলমাল লাগায় বরগুনা আর ঘোরা হয়নি। সেই আফসোস গুমরে মরেছে মনের গহীনে। কারণ বরগুনার পাথরঘাটার যেসব ছবি দেখেছি আন্তঃজালে, মুগ্ধতা যেন চোখ থেকে সরছিলোই না। তাই সুযোগ পেয়েই ঠিক করলাম, বরগুনা যাব। পাথরঘাটার দুর্গম বনে ঘুরে আসব দুজন মিলেই।

পরিকল্পনাটি বরগুনা ঘুরে বেড়ানোর হলেও সদরঘাট থেকে বরগুনাগামী কোনো লঞ্চের টিকেট পেলাম না। তাই পটুয়াখালীর লঞ্চ ধরলাম। পাখি ডাকা ভোরে পটুয়াখালীর লঞ্চ আমাদের নামিয়ে দিলো ঘাটে। রিকশায় চেপে রওনা হলাম বড় চৌরাস্তায়।

শাহী মসজিদ; Image Source : মাদিহা মৌ

চৌরাস্তায় মোটামুটি চলনসই রেস্তোরাঁ পেলাম একটিই। নাম স্টার রেস্তোরাঁ ও মিনি চাইনিজ। এখান থেকেই সকালের খাবার খেয়ে নেওয়ার জন্য ঢুকলাম। মেনু দেখার আগেই খিচুড়ির সুবাসে পেটে খিদে মাথাচাড়া দিয়ে জানান দিলো।

সব জায়গার তেহারি খেতে ভালো না হলেও খিচুড়ি ভালোই হবে। তাই খাসির খিচুড়িই অর্ডার করলাম। ভুল ধারণা করিনি। খাসির মাংস দিয়ে এক গ্রাস খিচুড়ি মুখে তুলেই বুঝলাম, রান্না বেশ ভালো। যেহেতু পটুয়াখালী হয়েই বরগুনা যেতে হবে, তাই ঠিক করলাম, পথে কোনো দর্শনীয় স্থান ঘুরেই তারপর যাব বরগুনার পাথরঘাটায়। পেয়েও গেলাম।

পটুয়াখালী থেকে বরগুনা যাওয়ার পথে পড়বে মুঘলাই মজিদবাড়িয়া জামে মসজিদ। মসজিদটি না দেখে গেলে কি চলে? খিচুড়ি মাংস খেয়ে অটোয় চড়ে রওনা হলাম ফেরিঘাটের দিকে। অটো আমাদের নিয়ে চললো পায়রা নদীর ঘাটে। পায়রা নদী পেরুতে হবে ইঞ্জিনের নৌকায় চড়ে। নদীর তীরেই ম্যানগ্রোভ বনের আবহ পাওয়া গেলো। পায়রার ওপার পায়রাগঞ্জ হিসেবে পরিচিত। এখানে এসে আমরা রীতিমতো বিহ্বল হয়ে পড়লাম। এরপর কীভাবে মজিদবাড়িয়া শাহী মসজিদ যাবো? লোকে মসজিদটিকে শাহী মসজিদ নামে চেনে। শাহী মসজিদ পর্যন্ত সরাসরি কোনো গণপরিবহন নেই। রিজার্ভ যাওয়া যাবে, কিন্তু অনেক বেশি টাকা চাচ্ছে বলে আমরা ভেঙে ভেঙে গণপরিবহনেই যেতে চাইলাম।

পায়রা নদী; Image Source : মাদিহা মৌ

পায়রাগঞ্জ থেকে সুবিদখালি গেলাম অটোয়। সুবিদখালি থেকে ভয়ান যেতে হবে। ভয়ান যাওয়ার জন্য আবার সুবিদখালি থেকে উপজেলা মোড় রিকশায় যেতে হলো। উপজেলা মোড় থেকে ভয়ান যাওয়ার জন্য চড়ে বসলাম মাহিন্দ্রায়। মাহিন্দ্রার যাত্রীদের সাথে শাহী মসজিদে যাওয়ার ব্যাপারে অনেক আলাপ আলোচনা হলো। ভয়ান থেকে আবার চড়তে হলো রিকশায়।

ভয়ান থেকে মজিদবাড়িয়া শাহী মসজিদ যাওয়ার পথের রাস্তাটি নতুন করা হয়েছে। চমৎকার এই রাস্তাটির দুই ধারে ভাটফুলের গাছ। ভাটফুলের সুবাস ভেসে বেড়াচ্ছিল। রিকশায় করে প্রায় বছরখানেক আগে বানানো মসৃণ রাস্তায় যেতে খুব ভালো লাগছিলো। তবে মসজিদের সামনে গিয়ে আক্ষরিক অর্থেই হতাশ হয়ে পড়লাম। এত কষ্ট করে এই মসজিদ পর্যন্ত বেড়াতে আসাটাকে বৃথা মনে হলো। কারণ মসজিদটি মুঘল স্থাপত্য হলেও নির্মাণশৈলী খুবই সাধারণ। আর এত ভোগান্তি সহ্য করে এখানে এলে সত্যিই হতাশ হতে হবে।

পানের বরজ; Image Source : মাদিহা মৌ

তবে ফেরার পথে বরগুনার বাস ধরার জন্য রাস্তায় অপেক্ষা করছি, তখন অদূরেই মাঠে পানের বরজ দেখতে পেলাম। শিহানকে বসিয়ে রেখে জোর পায়ে হেঁটে গেলাম সেদিকে। বরজে উঁকি দিয়ে দেখে এলাম পানের উৎপাদন প্রক্রিয়া। কিছুক্ষণ বাদেই বরগুনার বাস এলে তাতে চড়ে বসলাম। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম শহরে।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ গবেষণায় বিশ্বের এক হাজার বিজ্ঞানী নিয়োজিত ছিলেন। এই দলে ছিলেন দুজন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ডক্টর সেলিম শাহরিয়ার ও দীপঙ্কর তালুকদার। দীপঙ্কর তালুকদারের বাড়ি বরগুনায়। বিজ্ঞানী সাহেবের জেলাশহরটি ঘুরে দেখা হলো না সময়ের অভাবে। তখনই আমাদের ছুট লাগাতে হবে পাথরঘাটার উদ্দেশ্যে। তবে হুট করেই বরগুনার লঞ্চঘাটটি চোখে পড়ে গেল। ভাবলাম, একট্য খোঁজ খবর নিয়ে যাই।

খবর নিয়ে জানতে পারলাম, বরগুনা থেকে যে চার দিন পর পর লঞ্চ ছাড়ে, সৌভাগ্যক্রমে আজই সেই দিন। আর দুর্ভাগ্যক্রমে লঞ্চ দুটো ছাড়ার সময় দুপুর তিনটা আর চারটা। যেহেতু এবারের ভ্রমণে আমাদের এখনো তেমন কিছুই দেখা হয়নি, তাই লঞ্চে করে ঢাকা ফেরার আশা ত্যাগ করে পাথরঘাটার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। পাথরঘাটা যাওয়ার বর্ণনা আরেকদিন লিখবো। এখানে অনেক কিছু বলার আছে।

বরগুনা সদর; Image Source : মাদিহা মৌ

বরগুনার পাথরঘাটা গিয়ে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য হরিণবাড়িয়ায় ঘুরতে ঘুরতেই দুপুরের খাবারের সময়ে পেরিয়ে যাচ্ছিল। ফিরে যাবার টিকিট নিয়ে বাসস্ট্যান্ডের কাছেই একটা টংমতোন হোটেলে নিয়ে গেলেন পাথরঘাটার বাইকচালক বেলাল ভাই। টঙের দুটো গায়ে গা লাগানো টেবিলে বসে কয়েকজন শ্রমিক ভাত খাচ্ছিলেন। দোকানদার চাচা ভেবেছেন, আমাদের ওখানে বসে খেতে সমস্যা হবে। তাই তিনি তার নিজের জন্য সংরক্ষিত জায়গাটিতে আমাদের বসতে বললেন। আমরা হেসে জানালাম, ওখানে বসে খেতে আমাদের কোনো সমস্যাই হবে না।

চাচা জানালেন, দুপুরে খাওয়ার জন্য গরুর মাংস, ব্রয়লার মুরগি আর রামসুস্না মাছ আছে। মাছের নাম শুনে আমার খুব আগ্রহ জাগলো। এই নামের মাছ সম্পর্কে আমার জানা নেই। বাইকচালক ভাইও বললেন ‘রামছোসনা মাছ দিয়েই খান। নদীর মাছ, খেতে খুব স্বাদ।’ তিনি এটাও জানিয়ে গেলেন রামছোসনা আসলে স্থানীয় নাম। একে তপসে মাছ হিসেবেই সবাই চেনে। নাম শুনে আমারো এই মাছ দিয়ে ভাত খাওয়ারই আগ্রহ হলো।

পাথরঘাটা যাওয়ার পথে; Image Source : মাদিহা মৌ

চাচা ভাত আর মাছ দিয়ে গেলেন। মাছের প্রতি পিরিচে দুটো বড় বেলে মাছের সাইজের মাছ। ঘন ঝোল নিয়ে শুয়ে থাকা মাছ দুটোর চেহারাই বলেই দিচ্ছে, খেতে খুবই সুস্বাদু হবে। সত্যিই তাই। স্বাদ অনেকটা বেলে মাছের মতোই। আমি মজা পেয়ে মাছের মাথাও চিবিয়ে খেয়ে নিলাম।

সবজির অভাবে ভাত শুকনো রয়ে গেল। চাচাকে জানাতেই উনি মাছের কড়াইয়ে চামচ দিয়ে সেঁচে ঝোল পাতে দিয়ে গেলেন। একদম যেন ঘরোয়া পরিবেশ। খেয়ে এত তৃপ্তি পেলাম, বলার মতো নয়। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, আমাদের দুজনের খাবার বিল এলো মাত্র ১২০ টাকা! অর্থাৎ প্রতি পিস মাছের দাম মাত্র ২৫ টাকা! ঠিক করেছি এরপর থেকে এই তপসে মাছ পেলে অবশ্যই খাব।

বরিশাল বিভাগ মানেই ডাবের সমাহার। পটুয়াখালী বরগুনার পথেঘাটে আমরা প্রচুর ডাব খেয়েছি। যতবার ডাবের পানি পান করেছি, ততবারই মিষ্টি পানি পেয়েছি। ঢাকার মতো পানসে নয়। ডাবের পানিটুকু পান করার পর মিষ্টি শাঁসও চেটেপুটে খেয়েছি। এখানে ঢাকার তুলনায় ডাবের দাম খুবই কম। কোথাও ২০ টাকা, কোথাও বা ৩০। এর বেশি চায়নি কোথাওই।

কীভাবে যাবেন

ঢাকা-পটুয়াখালী কিংবা বরগুনা যাতায়াতের জন্য লঞ্চে ভ্রমণই সবচেয়ে আরামদায়ক ও তুলনামূলকভাবে বেশি নিরাপদ। সদরঘাট থেকে সুন্দরবন, কাজল, সাত্তার খান, প্রিন্স আওলাদ ও এ আর খান লঞ্চযোগে পটুয়াখালী পৌঁছতে লাগবে ৩০০-১,০০০ টাকা।

পাশাপাশি সড়কপথেও পৌঁছানো যায় পটুয়াখালী। ঢাকার গাবতলি বাসস্ট্যান্ড থেকে সারাদিনই ঘণ্টায় ঘণ্টায় সাকুরা পরিবহনসহ অন্যান্য পরিবহনের বাস ছাড়ে পটুয়াখালীর উদ্দেশ্যে। অধিকাংশ বাসই যায় পাটুরিয়া ঘাট পার হয়ে, তবে কিছু বাস মাওয়া ঘাট হয়েও পটুয়াখালী পৌঁছায়। এক্সপ্রেস বাস সার্ভিসের প্রায় সবকটিই ফেরি-পারাপার।

হরিণঘাটা; Image Source : মাদিহা মৌ

বরগুনা যাওয়ার জন্য সুন্দরবন-২, ৫,পূবালী-১, সাতিল আরব, যুবরাজ-২, ৪, কিং সম্রাট লঞ্চগুলো চালু আছে। এগুলোতে বুকিং দিতে হলে কল করতে পারেন এই নাম্বারে ০৯৬৭৮৩৩০০৫৫।

আর শাহরুখ-১ লঞ্চটিও বেশ বড়, যা বরগুনায় চার দিন পর পর যাওয়া আসা করে। শাহরুখ-১ এ বুকিং দিতে হলে কল করতে পারেন এই নাম্বারে ০১৭৬২০৪৬২৮৪।

এছাড়া ঢাকার গুলিস্তান বা যাত্রাবাড়ি থেকে বিআরটিসি সহ অন্যান্য পরিবহনে মাওয়া এসে ফেরী, লঞ্চ বা স্পীড বোট যোগে নদী পার হয়ে কাওড়াকান্দি থেকে বিআরটিসি সহ অন্যান্য পরিবহনে বরিশাল বিভাগের যেকোনো জেলায় যাওয়া যায় ।

অতি সম্প্রতি ঢাকা থেকে বরিশালের বিভিন্ন জেলায় রুটে সাকুরা পরিবহন ও বিআরটিসি এসি সার্ভিস চালু  হয়েছে।

Feature Image : মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সবুজের ভিড়ে হারাতে লাউয়াছড়া জাতীয় বনে

পদব্রজে ঐতিহ্যের পুরান ঢাকা: টাকা কথা বলে