পতিসর: রবীন্দ্র কুঠিবাড়িতে এক দুপুরে

আমি আসলেই একটা গাধা! সত্যি সত্যি নিজেকে তাই-ই মনে হয়েছে, যখন জানলাম নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলায় বিশ্বকবির স্মৃতি বিজড়িত এক কুঠিবাড়ি আছে পতিসরে। এইদিকে এত এতবার গিয়েছি অথচ এমন দুর্লভ তথ্য কীভাবে আমার অজানা থেকে গেল? কী হবে আমাকে দিয়ে? গাধা না হলে কী এমন জায়গায় যাওয়া থেকে, রবীন্দ্র স্মৃতির স্বাদ পাওয়া থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখলাম কীভাবে? ওই যে বলেছি আমি একটা গাধা।

তাই অবশেষে নিজেকে নিজের কাছে গাধার তালিকা থেকে বাদ দিতে এক সকালে বের হয়ে গেলাম পতিসর, রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি যাবো বলে। নওগাঁ থেকে পতিসরের দূরত্ব ৬১ কিলোমিটার। দু’ভাবে যাওয়া যাবে। সরাসরি নওগাঁ থেকে সিএনজিতে করে আত্রাই আর আত্রাই থেকে আলাদা সিএনজিতে করে পতিসর। মোট সময় লাগবে ২:৩০ থেকে ৩ ঘণ্টা। এটা বেশ ঝক্কির একটা জার্নি বলে আমার কাছে মনে হয়েছে।

ক্যাপশন তো দেয়াই আছে!! ছবিঃ লেখক

আর দ্বিতীয় পথ হলো, নওগাঁ থেকে সিএনজিতে করে সান্তাহার, সান্তাহার থেকে ট্রেনে আত্রাইয়ের আহসানগঞ্জ আর সেখান থেকে সিএনজিতে করে ২০ কিলোমিটার পতিসর, রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি। আমি দ্বিতীয় পথ বেছে নিলাম, ট্রেন আমার ভীষণ ভালো লাগার বাহন বলে। সান্তাহার গিয়ে ট্রেনের টিকেট কেটে বসে রইলাম ট্রেন ৩০ মিনিট লেট বলে। এটা ট্রেনের একমাত্র সমস্যা। সিএনজিতে গেলে এই সময়টুকু নষ্ট হয় না। কিন্তু ওই যে ভালো লাগার দাম লাখ টাকা কথায় আছে না? তাই লেট হলেও ট্রেনই সই।

ঈদের ভিড়ে ট্রেনে জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। অসুবিধা নেই তেমন, কারণ মাত্র ২৫/৩০ মিনিটের পথ। ট্রেনে থেকে আহসানগঞ্জ নেমে রেল লাইন পার হয়ে আম গাছ তলা থেকে সিএনজিতে পতিসরের উদ্দ্যেশ্যে। রাস্তা একটু ভাঙা আর এবড়ো থেবড়ো হলেও দু’পাশের মনোরম দৃশ্য সেই অসুবিধা ভুলিয়ে দেবে নিমেষেই। দারুণ সে পথ, একদম নির্জন, নিস্তব্ধ।

পথের দু’পাশে তাল গাছের সারি, কাছে দু’প্রান্তে জলাশয়, স্থানীয় বিল, আর দূরে ধানের শীষের সবুজের দোল খেয়ে যাওয়া। দূরে কোথাও কোথাও দাঁড়িয়ে আছে ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন গ্রাম। কোথাও জলাশয়ে জেলেদের মাছ ধরার অপূর্ব দৃশ্য। এসব দেখতে দেখতে, সিএনজি একটা জায়গায়, নাম মস্কিপুর এসে থেমে বলে আর যাবে না! বাকি পথটুকু অটো রিক্সায় করে যান। বেশী না মাত্র ২ কিলোমিটার।

বর্ণীল। ছবিঃ লেখক

প্রথমে মেজাজ খারাপ হলেও পরে যখন অটোতে করে বাকি পথটুকু যাচ্ছিলাম তখন মনে মনে দারুণ খুশি হয়েছিলাম ফেলে আসা পথের চেয়েও অপূর্ব, নির্জন আর নিস্তব্ধ সে পথের চারপাশের অপরূপ প্রকৃতি দেখে। মস্কিপুর থেকে পতিসর মাত্র দুই কিলোমিটার, অটো রিক্সায় করে ১০ মিনিটেই পৌঁছে গেলাম।

পতিসরের প্রবেশ পথে ঢুকতেই চারদিকে ঘেরা দেয়া একটা মাঠের মাঝে ঈদ উৎসব পালনের সঙ্গীতের মূর্ছনা চলছে। সামনে খোলা মাঠের সাথে লাগোয়া সরু পথ ধরে সামনে এগোতেই রবীন্দ্র কুঠিবাড়ির দেখা মিলল।

প্রকৃতির মাঝ দিয়ে পতিসরের পথে। ছবিঃ লেখক

মুল ফটকের বাইরে দু’পাশে দুটি কাছারি ঘর। দুই কাছারি ঘরের সামনে সবুজ ঘাসের গালিচা আর ফুলের বাগান। একটু সামনে গেলেই প্রাচীন আমলের শান বাঁধানো সিঁড়ির পরেই টলটলে ঠাণ্ডা আর স্বচ্ছ জলের অপূর্ব এক পুকুর। যার পাড়ের উপরে ইট-পাথরের বেদী করা রয়েছে বসে বসে আরাম করার জন্য বট আর কৃষ্ণচূড়ার ছায়ায়। পুকুরের চারপাশে নানা রকম গাছের আচ্ছাদন যেন রোদ-ছায়ার লুকোচুরি থাকে সব সময়। আর আছে কবির স্মৃতি ধরে রাখতে তার একটি কালো পাথরের ভাস্কর্য।

স্বচ্ছ জলের পুকুর পাড়ে কবি ভাস্কর্য। ছবিঃ লেখক

পাশের বড় মাঠ পেরোলেই নাগর নদী। যে নদীর পথ পেরিয়ে পদ্মা নামক কাঠের বোটে করে কবি এখানে আসতেন তার প্রজাদের কাছে জমির আর জমিদারীর খাজনা আদায়ে। আর যে পথে যেতে আসতে তিনি রচনা করেছেন তার কালজয়ী শত শত, কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস আর নানা অনুভূতির ছিন্ন পত্রের পাণ্ডুলিপি। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে নাগর নদীর স্রোত পেরিয়ে তিনি এখানে আসতেন তা আর নেই বললেই চলে! দখলে বা প্রাকৃতিক কারণে নদী আজ প্রায় শুকনো নালায় পরিণত হয়েছে! তবে এক সময় যে বেশ বড় আর খুব প্রবাহিত নদী ছিল অবয়ব দেখে স্পষ্ট বোঝা যায়।

হারিয়ে যাওয়া নদীর দুঃখ লুকাতে প্রবেশ করলাম কবির কুঠিবাড়ির মূল ফটকে ১৫ টাকার সরকারী টিকেটের বিনিময়ে। ছোট্ট ছিমছাম একটি বাড়ি। চারপাশের দালানে ঘেরা ৭/৮টি ঘরের ঠিক মাঝের জায়গাটা অপূর্ব নান্দনিকতা নিয়ে তার মহিমা, আভিজাত্য আর ইতিহাসকে জানান দিচ্ছে প্রতি মুহূর্তে।

ছোট্ট চারকোনের একটি সবুজ চত্বর, যার দুপাশে ফুল আর পাতা বাহারের ক্ষুদ্র বাগান, একটি নারকেল গাছ আর কবির একটি সাদা রঙের ভাস্কর্য। চার মহলা বাড়ির প্রাচীন ছাদের উপরে তাকালেই ঝকঝকে নীল আকাশ। এটুকুতে মুগ্ধ হয়ে, কবির বসবাসের ঘর, অফিস ঘর, বিশ্রামের কক্ষ ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম।

চার মহলা বাড়ির খোলা বারান্দা। ছবিঃ লেখক

প্রতিটি ঘরেই কবির স্মৃতি জড়িয়ে আছে, তিনি ব্যবহার করেছেন এমন নানা রকম আসবাব যত্ন করে রাখা আছে। আছে কবির নানা রকম রচনা আর পাণ্ডুলিপি, ছবি, রেপ্লিকাসহ নানা সময়ের বেশ কিছু দুর্লভ সংগ্রহ। অনেক সময় নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবকিছু দেখছিলাম আর রোমাঞ্চিত হচ্ছিলাম ভেতরে ভেতরে। সেই সাথে স্মৃতিময় এই দুর্লভ সংগ্রহ আর স্থানের ছবি তুলে রাখছিলাম। খুব ছোট্ট কিন্তু দারুণ গোছানো, সবুজের ছোঁয়া আর কোমল শীতল জলের স্পর্শ মাখা পতিসরে একবেলা চুপচাপ বসে থাকতে পারলে বেশ হতো।

কবির আবাসে ব্যবহৃত আসবাব। ছবিঃ লেখক

কিন্তু সব জায়গা আর সব সময়ের মতো এখানেও আক্ষেপ অনুভূতি আর আবারো আসিবো ফিরে নিজের সাথে নিজেই কথা বলে, নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে ফেরার পথ ধরেছিলাম। পেয়েছিলাম একটি সার্থক দিনের স্বাদ, কিছু পূর্ণতা আর কবি গুরুর স্মৃতির স্পর্শ। সবকিছু মিলে একটি বেলা অনায়াসে কাটানোর জন্য অসাধারণ একটি জায়গা পতিসর আর তার যাওয়া আসার সবুজে ছড়াছড়িময় পুরো পথ।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সহস্রধারা ঝর্ণা, ঝরঝরি ট্রেইল,গুলিয়াখালী সী বীচে টিম বাউন্ডুলে

বোয়ালিয়া ট্রেইল এবং খৈয়াছড়া ঝর্ণা অভিযান