পোস্টম্যানের ঘন্টি: ব্রজযোগিনী পর্ব

শৈশবে দাদীর হাত ধরে গ্রাম যাবার দিনগুলো মনে পড়লে স্মৃতির কোণে ভেসে ওঠে পোস্টম্যান বা ডাক পিয়নের ঘন্টি। সময়টা ছিল ১৯৯৪-৯৫। তখনো প্রযুক্তি গ্রাস করেনি মানবীয় অনুভূতিগুলোকে। তখন আমার গ্রাম দক্ষিণ রাংগামালিয়া যেতে পাড়ি দিতে হতো ধলেশ্বর নদী। ছোট আমি দাদীর হাত ধরে আনমনে বসে থাকতাম। বাকি বাচ্চারা যখন বিরক্ত করতো আমি ছিলাম সেই ছোটবেলা থেকে উন্নাসিক। আমায় টানতো সৃষ্টির রহস্য। শৈশবের সে সব দিনে বাঁশিওয়ালা আর পোস্টম্যান ছিল আমার কাছে রহস্যময় চরিত্র। বাঁশিওয়ালা আমার আম্মার সৃষ্টি এক ভয়াবহ চরিত্র যার কাজ ছিল আমায় ঘুম পাড়ানো। সে সব গল্প তো অল্পতে শেষ হবে না। তা বাদ দিয়ে না হয় আমাদের পোস্টম্যানের গল্পের গভীরে প্রবেশ করি।

গ্রামে যখন চষে বেড়াতাম পাড়ায় পাড়ায় তখন খেয়াল করতাম দূর থেকে সাইকেলের ঘন্টি বাজাতে বাজাতে আসছে পোস্টম্যান। কাঁধে খাকী ব্যাগ। সাইকেল থামিয়ে ব্যাগের থেকে বের করতো যেন জাদুর খনি। কত অনুভূতির পসরা নিয়ে যে ঘুরে বেড়াতো এ পাড়া থেকে ও পাড়া। দূর থেকে সাইকেলের ঘন্টি শুনলেই বুঝতে পারতাম পোস্টম্যান আসছে।

শৈশবের সেই দুরন্ত দিন পেরিয়ে আমি এখন পুরুষ। তবুও এই ৩০ ঊর্ধ্ব দেহে যে বাস করে একটি ছোট শিশু। এই শিশু মাঝে মাঝে বড় ভাই ইমরান রশীদ খানকে সামনে পেলে আরও বেশি বের হয়ে পড়ে। এই ২০১৯ সালে এসে অনুভূতিগুলো সব ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপে ঘোরে। সে যুগে এসেও আমার মতো আর একজন মনে রেখেছে পোস্টম্যানের কথা। সে আমার স্ট্যাম্প বাতিক শ্রদ্ধেয় বড় ভাই ইমরান রশীদ খান।

নির্মাণাধীন ব্রজযোগিনী পোস্ট অফিস। ছবি –
আশিক সারওয়ার

স্ট্যাম্প বাতিক মানুষটি আমার আবার দেশী ভাই। জ্বী, দুইজনই বিক্রমপুরের পোলা। জ্বর কাতর হয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে যখন তারা গুনছিলাম তখনই পেলাম ইমরান ভাইয়ের ফোন। প্ল্যান হলো দুজন মিলে মুন্সিগঞ্জ যাব পোস্ট অফিস আর আশেপাশের স্থাপনা ঘুরতে। ইমরান ভাইয়ের সাথে বহু বছর পর আবার কোথাও বের হওয়া হলো। আগের বার উনি পোস্ট অফিস নিয়ে আমাকে বেশ জ্বালিয়েছেন। আবার সেই মধুর যন্ত্রনা নিতে এক সাথে বের হওয়া। আর নিজের জেলাটাকে আবার ভালোভাবে দেখা।

যে কথা সে কাজ। কোনো শীতের সকালে পোস্তগোলা ব্রীজ থেকে শুরু হলো আমাদের যাত্রা। আমার বাসা থেকে ব্রীজ একদম কাছেই। সকালে কাঁচা ঘুম থেকে উঠে ফোন পেলাম ইমরান ভাইয়ের। যথারীতি পোস্তগোলা ব্রীজের নিচে অপেক্ষা করছিলাম। ইমরান ভাইকে দেখতে পেলাম। দুই ভাই মিলে সিএনজি রিজার্ভ করে রওনা হলাম মুন্সিগঞ্জ সদরের উদ্দেশ্যে। ধুলোময় পথ আর পিনিকে থাকা ইমরান ভাইকে সাথী করে চলছে আমাদের সিএনজি।

ঢাকা থেকে একটু বের হবার পর বুঝতে পারলাম শীতের কাপুনি। ঢাকা নামক শহরে তো আজকাল শীতের বুড়ি আসে না। হু হু ঠাণ্ডা বাতাসে চিন্তায় ছেদ পড়লো। উপভোগ করতে লাগলাম শীতের সকাল। দেড় ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে যখন মুন্সিগঞ্জ সদরে এসে পৌঁছালাম তখন ঘড়ির কাঁটায় নয়টা বাজে। পেটে ছুঁচো দৌড়াচ্ছে বিধায় হোটেলে ঢুকে পড়লাম। নাস্তা সেরে ব্রজযোগীনি গ্রামের উদ্দেশ্যে অটো ঠিক করলাম। পোস্টম্যান তার ঘন্টি বাজাতে এসেছে প্রথম স্টপেজ ব্রজযোগিনী পোস্ট অফিস।

কর্মব্যস্ত গ্রামের বাজার। ছবি – আশিক সারওয়ার

ব্রজযোগিনীর মায়া ভোলা পথে কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম। এখানে আসলে আমি যেন কোথায় হারিয়ে যাই। যতদূর চোখে দেখা যায় সবুজ আর সবুজ। মাথার উপর শীতের মেঘলা আকাশ। পাশে চেয়ে দেখি দূর-দূরান্তে কুয়াশার হালকা আভা আপন ভুবনে খেলা করছে। তারই মাঝে এক চিলতে সবুজ বৃক্ষরাজির পরশ যেন নিয়ে এলো রাস্তার দু’পাশ। আঁকাবাকা পথ বেখেয়ালো মন। পাকা সরু রাস্তার ভেতর দিয়ে চলছে আমাদের অটো। দেখতে দেখতে এসে পড়লাম ব্রজযোগিনী গ্রামে।

অতীশের গ্রাম নিয়ে কিন্তু আছে মজার গল্প। সে বহু বছর আগের কথা। সম্রাট শের শাহ সুরির যুদ্ধের সময় পরাজিত এক হিন্দু রাজা বরজ নামে এক মেয়ে নিয়ে এই অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন। এই বরজ এক সময় বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে সে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করলে বরজ সন্ন্যাসী বা বরজ যোগিনী নাম ধারণ করে। বরজ নামটি কালের বিবর্তনে পরিবর্তিত হয়ে বজ্র হয় আর এই গ্রামের নাম হয় ব্রজযোগিনী।

ইতিহাসের পাতা থেকে ফিরে এলাম বাস্তবে। ব্রজযোগিনী পোস্ট অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে আছি দুই পথিক। নতুন পোস্ট অফিস হচ্ছে বিধায় অস্থায়ী পোস্ট অফিস স্থানান্তর করা হয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ অফিসে। দশটা বাজতে এখনও দশ মিনিট বাকি। নেই কোনো তাড়া।

লাউয়ের আড়ত। ছবি – আশিক সারওয়ার

পাশেই দেখতে পেলাম গ্রাম্যবাজার। সেখানে কর্মচঞ্চল মানুষের মাঝে আমাদেরকে নিয়ে চাঞ্চল্যতা পরিলক্ষ করলাম। ভাবছে আমরা সাংবাদিক। ভাবার কারণ থাকতে পারে, গলায় যে আমার ডিএসএলআর ঝুলানো। গ্রামের বাজারে কচি লাউয়ের আড়ত দেখলাম। ভ্যানে দেখতে পেলাম ফুলকপির পসরা। এক সাইডে হরেক রকম মাছ নিয়ে বসেছে জেলেরা। পুরো মুন্সিগঞ্জ ট্যুরে কয়বার যে সাংবাদিকের তকমা গায়ে নিতে হলো তার কোনো হিসেব নেই।

তবে যখনই শোনে ‘উই আর দেশী’, ভালবাসা যেন উথলিয়ে পড়ে। এত ভালবাসা কোথায় রাখি? টং এর দোকান দেখে চা তৃষ্ণা পুনরায় জেগে উঠলো। গ্রামের একটা ব্যাপার খুব ভালো লাগে। যেখানে যাব খাঁটি গরুর দুধের চা পাব। হাতে কিছু সময় বাকি আছে আর সরকারি অফিস এত তাড়াতাড়ি খোলে না বিধায় নবাবী চালে চা পান করতে থাকলাম। আর উপভোগ করতে লাগলাম গ্রামের দৃশ্য।

কর্মব্যস্ত পোস্ট অফিসের কর্মকর্তা। ছবি – আশিক সারওয়ার

ঠিক ১০টা বেজে ১০ মিনিটে হাজির হলাম পোস্ট অফিসে। কর্মকর্তা তাদের ডেস্কে বসে আছে। আমাদের দেখে মধু মাখানো হাসি দিয়ে আসার কারণ জানতে চাইলো। ইমরান ভাই দরাজ গলায় বললো ভাই রেজিস্টার চিঠি পাঠাবো ঢাকায়। আমি স্ট্যাম্প সংগ্রহ করি তো, আপনাদের পোস্ট অফিস থেকে চিঠি পাঠাবো। আমার চিঠিতে ব্রজযোগিনীর সিল চাই। কর্মকর্তা বাবু হাঁ করে চেয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। ধাতস্থ হতে এক মিনিট সময় নিলেন।

এরপর বললেন, আসেন আসেন, টেক ইওর সিট। আজকাল চিঠি লেখার চল তো একেবারে উঠে গেছে। চিঠির প্রতি শব্দে যে আবেগ লুকিয়ে আছে সেটা আমাদের এই প্রজন্ম ধারণ করতে পারে না। ধারণ করতে পারে আমাদের পোস্টম্যান ইমরান ভাই। উনি উনার ব্যাগ থেকে জাদুর চিঠি যেন বের করলেন। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে আছে।

ইউনিয়ন পরিষদ অফিসের বারান্দা। ছবি – আশিক সারওয়ার

কর্মকর্তাদের কাজ ইমরান ভাই হালকা করে দিল। সিল মারার মহান দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। শিল্পীর সুনিপুণ হাতে সিল পড়ছে প্রতিটি চিঠিতে। চিঠিতে প্রাপকের ঠিকানায় আবার আমার নাম দেওয়া। এত আবেগ কোথায় রাখি?

পোস্ট অফিসের কাজ সেরে হালকা সুখ-দুঃখের প্যাচাল পেড়ে বের হয়ে এলাম ব্রজযোগিনী পোস্ট অফিস থেকে। পোস্ট অফিস থেকে বের হলেও এখানকার কাজ তো শেষ হয়নি। ঠিক করলাম এখান থেকে হেঁটে হেঁটে নাস্তিক পন্ডিতের ভিটায় যাব।

গৌতম বুদ্ধ ধ্যানে আছেন। ছবি – আশিক সারওয়ার

বিক্রমপুর এক প্রাচীন নগরী। বঙ্গের আদি রাজধানী। এই গ্রামেরই সুশীতল বাতাসে একদিন শ্বাস নিতেন মহামতি অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। অতীশের স্মৃতি বিজড়িত ব্রজযোগিনী গ্রাম। উনার জ্ঞানের আলোয় শুধু এই ব্রজযোগিনী আলোকিত হয়নি। এই জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পড়েছিল সুদূর তিব্বত পর্যন্ত। বজ্রযোগিনীর পথ ঘাটে, ধুলো মাখা রাস্তা, ধু ধু প্রান্তরে, আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়ায় অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের গন্ধ। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে নাস্তিক পন্ডিতের ভিটার প্যাগাডো। সাদা প্যাগাডোটি যেন জানান দিচ্ছে এক মহামতির গল্প।

তবে সামনে এসে হতাশ হলাম, ভেতর দিয়ে তালা মারা। ভেতরে ঢুকতে হবে দেয়াল টপকিয়ে। আশেপাশে তাকাতে থাকলাম। লক্ষ্য করলাম একটি ছেলে সাইকেল চালিয়ে আসছে। কৈশোরের চঞ্চলতা তার মাঝে খেয়াল করলাম। এসেই জিজ্ঞেস করলো, মামা আপনারা কি রিপোর্টার? আমরা বললাম, নাহ, ঢাকা থেকে এখানে ঘুরতে এসেছি। সে বললো, একটু দাঁড়ান, খুলে দিচ্ছি।

দেয়াল টপকিয়ে ভেতর থেকে গেট খুলে দিল কিশোরটি। ভেতরে ঢুকে কেমন জানি শান্তি অনুভব করলাম। মন বলে উঠলো, আশিক তুমি কি নাস্তিক হয়ে গেছ? আমি জানি না কেন প্রতিটা ধর্মীয় উপসানালয়ে ঢুকলে শান্তি খুঁজে পাই। চারদিক শান্ত, পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখরিত আর তারই মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সাদা প্যাগাডো। মন্দিরের প্রবেশ মুখে দুইটি সিংহ পাহারা দিচ্ছে বিনিন্দ্র প্রহরীর মতো। এর পাশেই লাল যাত্রী ছাউনির মতো একটা স্থাপনা লক্ষ্য করলাম। কীসের জন্য ইহা তৈরি হয়েছে বুঝতে পারলাম না।

নাস্তিক পন্ডিতের ভিটা থেকে প্যাগাডো। ছবি – আশিক সারওয়ার

আমাদের কিশোরের কথায় বুঝতে পারলাম সে চট্টগ্রামের মানুষ। কথার ছলে জিজ্ঞেস করলাম, বাড়ী কোথায় তোমার? সে বললো চট্টগ্রাম বাড়ি মামা। মামার সাথে এখানে থাকি। প্যাগাডো রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নিয়োজিত কিশোর আমাদের জানালো তালা মারার রহস্য। ধর্মীয় উপাসনালয় আমাদের কিউট বাঙালিদের খুশিতে ঠ্যালায় ঘোরতে হয়ে গেছে ডেটিং স্পট। ইমরান ভাই প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে টয়লেটে গেল, তখনই লক্ষ্য করলাম এক কিউট কাপলের আগমন।

আমাদের কিশোর তাদের ঢুকতে না দেওয়ায় আমাদের দেখিয়ে বললো উনারা তাহলে কী করে। মুখ থেকে বের হয়ে গেল, ভাই, রিপোর্টার। ঢাকা থেকে এসেছি। এরপর কী আর কথা চলে? ইমরান ভাই বাথরুম থেকে হয়তো সব শুনছিলেন মৃদু হাসি লক্ষ্য করলাম তার মুখে। আমাদের ব্রজযোগিনী পর্ব শেষ হয়ে গেল এখানেই। এর পরের পোস্ট অফিস রামসিং অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য নতুন গল্প নিয়ে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নাইন গোল্ডেন রুলস অফ রক ক্লাইম্বিং

অভিযান কেওক্রাডং