প্রথম বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত কিছু স্থান

আমরা অনেকেই জানি যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোতে একজন অস্ট্রিয়ান আর্চডিউকের খুনের মধ্য দিয়ে। অথচ ইতিহাস ভ্রমণে কতটুকু জায়গা জুড়ে থাকে এই ঘটনা? ইউরোপের ইংরেজি ভাষাভাষীদের কাছে যুদ্ধের প্রারম্ভিক ঘটনায় ঠাঁই পায় ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট, গালিপলি এসব জায়গার যুদ্ধ। কেননা, এসব জায়গাতেই ব্রিটিশ এবং আমেরিকান ফোর্সগুলো যুদ্ধের ভয়াবহতা বেশী আকারে দেখেছে। অথচ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে অনেকেই ভুলে যান সেন্ট্রাল ও নর্দার্ন ইউরোপের উপর দিয়েও বয়ে যাওয়া যুদ্ধের যত স্মৃতিচিহ্ন, যার স্মৃতি আজও বয়ে বেড়াচ্ছে এই অঞ্চলের মানুষগুলো।

আজ লিখছি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত সাতটি জায়গা নিয়ে যেগুলোর কোনো কোনোটির অস্তিত্ব এখন প্রায় হুমকির সম্মুখীন।

মিউজিয়াম অফ সারায়েভো, বসনিয়া

ছবিসূত্র: Vermont Public Radio

অস্ট্রিয়ান সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্ডকে যেখানে খুন করা হয়েছিল, সে জায়গাটির ঠিক পাশেই এই মিউজিয়ামটির অবস্থান। মিউজিয়ামটিতে ১৯১৪ সালের ২৮শে জুন আর্চডিউচকে খুন করার সেই ঘটনাবহুল দিনটির অনেকগুলো ছবি সাজিয়ে রাখা হয়েছে; যে ঘটনা থেকেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত। এছাড়াও ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্ডের অনুকরণে বানানো ডামি মূর্তি রয়েছে, সাথে তার স্ত্রী সোফিরও। সেগুলোর গায়ে জড়ানো রয়েছে তাদের সত্যিকার জামার অনুকরণে বানানো জামাও।

ছবিসূত্র: National WWI Museum

এখনও বসনিয়ার কোনো রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে এই ডামি মূর্তিগুলোর সামনে মানুষজন সহানুভূতি প্রকাশ করে যায়। আর তাদের খুনি, বসনিয়ায় বসবাসকারী বিদ্রোহী গ্যাভ্রিলো প্রিন্সিপকে একজন স্বাধীনতা যোদ্ধার বদলে সন্ত্রাসীর দৃষ্টিতে ফুটিয়ে তোলার প্রচলন রয়েছে এখানে। 

মিলিটারি হিস্টরি মিউজিয়াম, ভিয়েনা, ইতালি

ছবিসূত্র: Vienna

এটি ভিয়েনার Heeresgeschichtliches Museum এ অবস্থিত। এখানে সেই Gräf & Stift গাড়িটি রয়েছে যেটিতে ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্ড এবং তার স্ত্রীকে গুলি করে খুন করা হয়েছিল। গাড়িটিকে এতটাই যত্নের সাথে সংরক্ষণ করা হয়েছে যে বোমাবর্ষণের ফলে এটির গায়ে লেগে থাকা ক্ষতচিহ্ন ও গুলির ফলে সৃষ্ট গর্ত এখনো রয়েছে অক্ষত।

ছবিসূত্র: euro-t-guide

আর্চডিউকের রক্তমাখা নীল ইউনিফর্মটিও তাদের সংরক্ষণে রয়েছে। সবসময় সেটির দেখা না মিললেও বিশেষ বিশেষ উপলক্ষে সেই ইউনিফর্মটিও জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয় কিছুদিনের জন্য।    

শেমিজল দুর্গ, পোল্যান্ড

ছবিসূত্র: Europe between East and West

পার্শ্ববর্তী রাশিয়ান সাম্রাজ্যের প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অস্ট্রিয়ানরা এই দুর্গটি নির্মাণ করেছিল। দুর্গের তুলনায় প্রতিরক্ষার জন্য এর বাইরের দেয়ালটা বেশ বিশাল। শেমিজল দুর্গের অবস্থান পোল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্বের শেমিজল শহরেই। যদিও রাশিয়ান সাম্রাজ্য থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দুর্গটি নির্মিত হয়েছিল, তবুও ১৯১৫ সালে দুর্গটি রাশিয়ানদের অধিকারে চলে গিয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই অস্ট্রিয়ান-জার্মানদের মিলিত চেষ্টায় দুর্গটি আবার ফিরে পাওয়া যায়।

বর্তমানে দুর্গটি টুরিস্টদের জন্য আকর্ষণীয় একটি গন্তব্য। এটি ছাড়াও প্রায় ধ্বংসের মুখে পড়ে যাওয়া কয়টি দুর্গ যেমন, সালিস সগলিও, বোরেক কিংবা সান রিদেয়াও এগুলোতে ঘুরে আসার মাধ্যমেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অস্ট্রিয়-হাঙ্গেরিয়ান মিলিটারি জীবনযাপনের সাথে পরিচিত হওয়া যায়।

হিস্টরিক্যাল এন্ড ম্যারিটাইম মিউজিয়াম, পুলা, ক্রোয়েশিয়া

ছবিসূত্র: Monuments – Turistička zajednica grada Pule

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সবচেয়ে বড় নৌ-ঘাঁটি ছিল ক্রোয়েশিয়ার পুলা নামক শহরটিতে। শত্রুদের যৌথ বাহিনীর চাপে আটকে থাকায় এই দিকটায় যুদ্ধের ভয়াবহতা খুব একটা টের পাওয়া যায়নি। Pride of the Fleet নামক ব্যাটলশিপটির ক্যাপ্টেন জেন্ট ইস্তেভান ১৯১৮ এর জুন মাস পেরিয়ে গেলেও এই জায়গা থেকে জাহাজটিকে নিয়ে সমুদ্র অভিযানে বের হননি। আর পরে একটি দশ জনের ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন ইটালিয়ান টর্পেডো বোট, এই পুরো যুদ্ধ জাহাজটিকে ডুবিয়ে দেয়।

পুলা শহরটির হিস্টরিক্যাল এন্ড ম্যারিটাইম মিউজিয়াম এইসব ঘটনার নানা রকম ঐতিহাসিক সংগ্রহ সংরক্ষণ করে আসছে। তবে শুধু মিউজিয়ামটি নয়, শহরটির ভূ-প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং শহর জুড়ে সমুদ্রের তীরবর্তী অনেকগুলো প্রাচীন অস্ট্রিয়ান দুর্গও এই শহরটিতে ঘুরে বেড়াতে পর্যটকদের বাধ্য করে।

কোবারিদ, স্লোভেনিয়া

অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির বাছাই করা বেশ কিছু লোককে ইতালিয়ান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ইসোঞ্জো ফ্রন্টে যুদ্ধে পাঠানো হয়। ইতিহাসে ঘটনাটিকে Battle of Isonzo নামে অভিহিত করা হয়। এই ইসোঞ্জো ফ্রন্ট জায়গাটি ছিল বেশ দুর্গম, পাহাড়ি, সীমান্তরেখা জুড়ে।

যোদ্ধাদেরকে পাহাড়ের উপর বরফ ঢাকা উঁচু জায়গা খুঁড়ে সেখানে থাকতে হতো, নিজেদের নিরাপত্তার জন্য। এছাড়া বিপজ্জনক পাহাড়ি ঢালের উপরেও অবস্থান করতে হয়েছিল দিনের পর দিন।

ছবিসূত্র: www.100letprve.si

এই ইসোঞ্জোর যোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা হয়েছে কোবারিদ মিউজিয়ামটিতে। স্লোভেনিয়ার শহর কোবারিদেই এই অবস্থান। জায়গাটির নামও অমর হয়ে আছে এর ইটালিয়ান নাম ‘কারপোরেত্তো’ এর জন্য। কারণ বিখ্যাত লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে তাঁর ‘অ্যা ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’ উপন্যাসের এই জায়গাটির ইতালিয়ান নামটির উল্লেখ করেছিলেন।

জাদুঘরটি এমনিতেও ইউরোপের যুদ্ধভিত্তিক জাদুঘরগুলোর মধ্যে শুরুর দিকেই থাকবে। জাদুঘরটির সংগ্রহে যুদ্ধটি রয়েছে সমতা আর সহানুভূতির মিশেলে। ইসোঞ্জোর যুদ্ধের প্রত্যেকটি মুহূর্ত ছিল একইসাথে ভয়ংকর এবং মানবতার অনুপস্থিতিতে ভরপুর। ঠিক যেন ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টের যুদ্ধগুলোর মতোই। 

সি-প্লেন হারবার, তালিন, এস্তোনিয়া

তালিনের মনোমুগ্ধকর নৌ জাদুঘরটি প্রতিবছর বহু পর্যটক আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। এছাড়া পুরনো সি-প্লেন সাজিয়ে রাখার জন্য এখানে রয়েছে দারুণ স্থাপত্যের একটি পোতাশ্রয়ও, যেটিতে দর্শনার্থীরা টিকেট কেটে ঘুরে আসতে পারেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ার ব্যবহৃত সি-প্লেনগুলো সাজিয়ে রাখা আছে এখানে। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের গঠন কৌশল এবং ছাদের দিকে অনেকগুলো গম্বুজ আকৃতির বর্ধিত অংশ দেখে অনেকেই এই ভবনটিকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রচুর যন্ত্রপাতি, বিমান এবং বিমানের অংশবিশেষ এখানে সাজানো রয়েছে দর্শনার্থীদের জন্যে। তবে কেবল এই অসাধারণ স্থাপত্যশৈলীর ভবনটিই প্রচুর পর্যটকের ভ্রমণের প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠছে।

ছবিসূত্র: In Your Pocket

মনুমেন্ট টু দ্য ভিক্টর, বেলগ্রেড, সার্বিয়া

ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্ডকে খুনের ঘটনায় অস্ট্রিয়া এবং হাঙ্গেরি দোষারোপ করে সার্বিয়াকে। আর সেই দোষারোপের ফলস্বরূপ সার্বিয়াকে সহ্য করতে হয় যুদ্ধ, খাদ্যাভাব, অর্থনৈতিক দুরাবস্থা থেকে আরও অনেক সমস্যা; তাও চার বছর ধরে!

ছবিসূত্র: Freepik

এইসব শোষণের প্রতিবাদ হিসেবে নির্মিত হয়েছিল মনুমেন্ট টু দ্য ভিক্টর। এটির অবস্থান সার্বিয়ার বেলগ্রেডের ক্যালেম্যাগডান পার্কে। এটির ভাস্কর ছিলেন ক্রোয়েশিয়ান ইভান মেস্ত্রভিচ। অস্ট্রিয়া-বুলগেরিয়ার সৈন্যদের আগ্রাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার দশম বছর পূর্তিতে ১৯২৮ সালে এটির নির্মাণ কাজ শেষ হয়।

ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী দানুবের অবস্থান এটি থেকে বেশ দূরে হলেও, সেই দানুব নদী থেকেও দেখা যায় এই মনুমেন্টটি; যেন নিত্য নতুন কোনো শোষণকে তিরস্কার জানিয়ে যাচ্ছে নীরবে অথবা নতুন কোনো চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় দৃঢ়।

ইউরোপ ভ্রমণের সাথে সাথে পূরণ হোক ইতিহাসকে কাছ থেকে জানার, দেখার, উপভোগ করার ইচ্ছেগুলোও।

ফিচার ইমেজ: Smithsonian Magazine

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পাহাড়ঘেঁষা টলটলে জলের মহামায়ায় হারাতে

টাইগার হিল থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার শ্বাসরুদ্ধকর রূপ