চট্টগ্রামে আড্ডাবাজি করার মতো কিছু জায়গা

বাটালি হিল ঘুরে জিলাপির প্যাঁচে মাথা না ঘুরে গেলেও খিদে পেয়ে গেল। কী খাওয়া যায়? নিলয় বললো, ‘কাছেই হাইওয়ে সুইটস সহ আরো কয়েকটা হালকা খাবারের দোকান আছে। খাবি নাকি?’

বললাম, ‘অবশ্যই।’

গিয়ে দেখা গেল, ঈদের তৃতীয় দিন হওয়ায় খাবার নেই বললেই চলে। থাকার মধ্যে আছে বেকারির বিস্কিট আর কেক-পেস্ট্রি। বিস্কিট খাওয়ার প্রশ্নেই আসে না, তাই কেক নিলাম। দাম পড়লো প্রতি পিস ৩৫ টাকা। বেশ মজাদার পেস্ট্রি। ঢাকায় এই মানের পেস্ট্রির দাম এরচেয়ে অনেক বেশি।

বিন্না ঘাস প্রকল্প

পেস্ট্রি খেয়ে টাইগার পাসের রাস্তা ধরে হাঁটছি। নিলয় বললো, ‘এখানে একটা জায়গা দেখাই, তুই হয়তো পছন্দ করবি। থাইল্যান্ডের রাজকুমারী বাংলাদেশকে এক বিশেষ জাতীয় ঘাসের চারা উপহার দিয়েছে। চল, দেখবি।’

বিন্না ঘাস। সোর্স: মাদিহা মৌ

আমি সত্যিই আগ্রহ পেলাম। বাটালি পাহাড়ের ঢালেই ঘাসের চারা রোপন করা হয়েছে সারিবদ্ধভাবে। নাম, বিন্না ঘাস। প্রকল্পের সামনে একটা সাইনবোর্ডে থাইল্যান্ডের রাজকুমারীর উপহার দেওয়ার ব্যাপারটাও উল্লেখ করা আছে। এই ঘাসের সুবিধা হলো, উচ্চ ফলনশীল। এবং এটি গবাদি পশুর জন্য খুবই উপকারী।

সি আর বি

হাঁটতে হাঁটতেই সি আর বি’র দিকে গেলাম। বেশ অনেকখানি পথ। বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় রাস্তাঘাট একদম পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে আছে। সি আর বি যাওয়ার রাস্তাটা খুব ভালো লাগলো। পাহাড় কেটে রাস্তা বানানো হয়েছিল অনেক বছর আগেই। রাস্তার দুই ধারে ছোট ছোট টিলা। টিলার উপর বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন ভবন আছে। তার আশেপাশে উঁকি দিচ্ছে সবুজ গাছপালা।

সবুজ বৃক্ষ। সোর্স: মাদিহা মৌ

মোড় ঘুরলাম হাঁটতে হাঁটতেই। রাস্তার একপাশে রেলওয়ের লাল ভবন। বাংলাদেশে রেলওয়ের মূল নিয়ন্ত্রক অফিস দুই শহরে, রাজশাহী আর চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের মূল কার্যালয়টি এই সি আর বিতেই। পুরাতন লাল ভবন মানেই আভিজাত্য। এটিও তার ব্যতিক্রম নয়।

একটু পরেই একটা চত্বর। এটি তিন রাস্তা নয়, চার রাস্তাও নয়, মোট সাতটি রাস্তার সঙ্গমস্থল। চত্বরের ঠিক মাঝখানে সাত রাস্তার সাত দিকে গেলে কী পাওয়া যাবে, তা লেখা আছে। তীর চিহ্ন দিয়ে নির্দেশ করাও আছে। এখানটায় লোকে বিকেলে হাঁটতে আসে। আড্ডা দিতেও আসে ছাত্র ছাত্রীরা।

আমরাও চত্বর পেরিয়ে সোজা সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। ওখানে বেশ বড় সড় কিছু গাছ আছে। এখানে অনেকগুলো ফুচকার ভ্রাম্যমাণ দোকান আছে। গাছগুলোকেই অবলম্বন করে দোকান খুলে বসেছে এরা। আমরা গিয়েই দাঁড়ানোর আগেই বিভিন্ন দোকানের ফুচকা বিক্রেতার ছোট ছোট বাচ্চাগুলো এসে বলতে শুরু করলো, ‘চটপটি ফুচকা খাবেন? আমাদেরটায় খান! আমাদেরটায় খান!’

আমরা গিয়ে বসলাম গাছের নিচে। এক প্লেট ফুচকা অর্ডার করলাম। ভালো লাগেনি তেমন। এখানটায় কিছুক্ষণ ঘুরে ফিরে রেলওয়ে অফিসের সামনে গেলাম। ওটাও একটা টিলার উপর। ঢালু একটা রাস্তা উঠে গেছে উপরের দিকে। ওই টিলার একধারে একটা স্মৃতিস্তম্ভ আছে। স্মৃতিস্তম্ভটি রেলওয়েতে চাকরি করে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছে তাদের স্মরণে এটি তৈরি করা হয়েছে। রেলের একটা অংশও রাখা আছে ওখানে।

সাতটি রাস্তার সঙ্গমস্থল। সোর্স: মাদিহা মৌ

চেরাগি

চেরাগি পাহাড়ের একটা কিংবদন্তী আছে। অনেক কাল আগে সুফি সাধক বদর আউলিয়া (রা:) ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামে এসেছিলেন। কিন্তু তখন চট্টগ্রাম ছিল গভীর পাহাড়-পর্বতে ঘেরা এবং জন-মানবহীন। এখানে ছিল জ্বীন-পরিদের আবাসস্থল। জ্বীন পরীরা তো এখান থেকে যাবেই না। সাধকের সাথে জ্বীন পরিদের যুদ্ধ হলো। কোনো পক্ষই জেতেনি। কী করা যায়? তিনি তাদের সাথে সন্ধি করলেন। সন্ধিতে ছিল বদর আউলিয়া একটা বাতি জ্বালাবেন, বাতির আলো যতদূর পর্যন্ত যাবে, ততদূর সীমানায় জ্বীন পরিরা থাকতে পারবে না। তারা মেনে নিলো।

হযরত বদর আউলিয়া একটি অলৌকিক চেরাগ সাথে নিয়ে এসেছিলেন। সেটি হাতে নিয়ে তিনি যখন একটি পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করেন রাতের অন্ধকার। তারপর তিনি তার অলৌকিক চেরাগটি জ্বেলে দেন। আর তখন এই চেরাগের তীব্র আলো ছড়িয়ে যায় চট্টগ্রাম বহুদূর পর্যন্ত। সন্ধি মোতাবেক জ্বীন-পরিরা চট্টগ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়।

চেরাগি চত্বর। সোর্স: মাদিহা মৌ

এখন আর সেই পাহাড় নেই। এখন আছে কেবল একটি চত্বর। চত্বরে একটি ভাস্কর্য করা আছে। বেশ সুন্দর একটি ভাস্কর্য। দুপুর পেরিয়ে যাচ্ছে। সকাল থেকেই হাঁটাহাঁটি করে যাচ্ছি। ক্ষুধাও পেয়েছে খুব। এখানে একটা সাধারণ মানের হোটেল পেয়েই ঢুকে পড়লাম।

মাছের ডিম, মাছ ভর্তা, শাকভাজি আর মুরগির ঝোল দিয়ে ভরপেট ভাত খেয়ে নিয়েছিলাম। প্রত্যেকটা পদই অসাধারণ স্বাদ। বের হয়ে তাই হোটেলটার নাম দেখলাম। একটা ছেঁড়া ব্যানারে নাম লেখা – “চেরাগি রেস্তোরাঁ”। আরোও খেয়াল করে দেখলাম, আশেপাশের সব দোকানের নামেই চেরাগি লেখা।

চেরাগি রেস্তোরা। সোর্স: মাদিহা মৌ

ডিসি হিল

চেরাগি চত্বর ঘুরে একটু সামনে গেলেই ডিসি হিল। এই পাহাড়ে ফুলের গাছের নার্সারি আছে। এখানে মুক্ত মঞ্চও আছে। পানির একটা ফোয়ারা আছে খুব সুন্দর। যখন পানি ছড়ায়, তখন নিশ্চয়ই আরোও ভালো দেখায়।

ডিসি হিলটা আসলে পাহাড়ের উপর একটা পার্কের মতো। কিছুক্ষণ পর পরই বসার জন্য বেঞ্চি বানানো আছে ইট সিমেন্টের। লোকে এখানে হাঁটতে, আড্ডা মারতে আসে। আবার বিভিন্ন অনুষ্ঠানও হয় মাঝে মাঝেই।

ডিসি হিলের মঞ্চ। সোর্স: মাদিহা মৌ

শহীদ মিনার

ডিসি হিলের কাছেই চট্টগ্রামের শহীদ মিনার। ওতে লেখা,

“শহীদ স্মৃতি অমর হোক
রক্তাক্ত একুশের শহীদ স্মরণে”

শহীদ মিনারটিও খুব সুন্দর।

শহিদ মিনার। সোর্স: মাদিহা মৌ

এখানে কাছাকাছি আরো আছে দুটো মন্দির, শিল্পকলা একাডেমি ও থিয়েটার।

ফিচার ইমেজ: মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিদেশের মাটিতে বাজেট ট্রিপ: স্বপ্নময়ী গন্তব্য মানালি ভ্রমণ

একদিনে সীতাকুণ্ডের সহস্রধারা-২ ও গুলিয়াখালী বীচ ভ্রমণের খুঁটিনাটি