পিক৬৯ একটি অ্যাডভেঞ্চার আড্ডার গল্প

কিছুদিন থেকেই শুনে আসছি ঢাকা শহরের এই জ্যাম, ধুলো আর ইট পাথরের মাঝেই কোথায় নাকি অ্যাডভেঞ্চারের রোমাঞ্চকর অনুভূতি পাওয়া যায়? এখানে গেলেই নাকি ভ্রমণে না গিয়েও ভ্রমণের ভিন্ন রকম আর নান্দনিক একটা স্বাদ পাওয়া যায়! দূরে কোথাও ভ্রমণে না গিয়েও নাকি ভ্রমণের অনুভূতি ঘিরে ধরে, একটা ভ্রমণের আবেশ নাকি আঁকড়ে ধরে সবাইকে। বিশেষ করে যারা ভ্রমণ, রোমাঞ্চ বা অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় তাদের কাছে। এটি হলো পিক৬৯, একটি অ্যাডভেঞ্চার ক্যাম্প বা অ্যাডভেঞ্চারের আড্ডাস্থল বলাটাই বোধহয় বেশী ভালো।    

পিক৬৯ এর ভ্রমণ অনুষঙ্গ। ছবিঃ লেখক 

অনেক দিন থেকেই সেই অ্যাডভেঞ্চার আড্ডায় অ্যাডভেঞ্চারের সন্ধানে যাবো যাবো করেও যাওয়া হয়ে উঠছিল না। অফিস, সংসার আর লেখালেখির পরে অন্য কোথাও যাওয়ার জন্য এই যান্ত্রিক শহরে সময় বের করা খুব কঠিন। ছুটির দিনে তো আরও বেশি কঠিন, বাসায় হাজারো রকম কাজ থাকায়।

তে সেদিন হুট করেই অ্যাডভেঞ্চার আড্ডার এমডি ম্যাডামকে ফোন দিলাম, সন্ধ্যায় থাকবেন কিনা? জানালেন থাকবেন। জিজ্ঞাসা করে জানলাম সিইও সাহেবও আসবেন অফিস শেষ করে। যাদের দুজনের প্যাশন আর নিজেদের পাশাপাশি এই প্যাশন, আড্ডা, রোমাঞ্চ এবং অ্যাডভেঞ্চার অন্যদের সাথে ভাগাভাগি করার জন্য এই অভাবনীয় উদ্যোগ।

অ্যাডভেঞ্চারের দেয়াল চিত্র। ছবিঃ লেখক 

তাই ঠিক করলাম আজকে নাহয় ঘুরেই আসি ঢাকার ব্যস্ততার মধ্যেই, এর মাঝেই খুঁজে নেই কিছু রোমাঞ্চ আর নতুন কোনো অ্যাডভেঞ্চার। যে কারণে অফিস শেষ করেই বেরিয়ে পড়লাম পিক৬৯ এর নতুন রোমাঞ্চে রোমাঞ্চিত হতে।

ভাগ্য আমার বরাবরের মতোই ভালো বলে কোনো রকম জ্যাম ছাড়াই শাহবাগ পৌঁছে গেলাম। বাকি পথটুকু হেঁটে হেঁটেই চলে গেলাম শাহবাগ থেকে বাটার মোড়। বাটার মোড় থেকে হাতিরপুলের পথে দুই এক মিনিট হেঁটেই পেয়ে গেলাম ঢাকা শহরের মধ্যেই কাঙ্ক্ষিত সে অ্যাডভেঞ্চার আড্ডার জায়গার সাইন বোর্ড, পিক৬৯ অ্যাডভেঞ্চার ক্যাম্পের। সিঁড়ি বেয়ে চার তলায় পৌঁছেই চোখ চড়ক গাছে উঠে গেল আমার। এ যে রীতিমত রাজকীয় আয়োজন যেন! বিশাল একটা ফ্ল্যাটের সবটুকু জুড়ে যে রোমাঞ্চ আর অ্যাডভেঞ্চারের ছড়াছড়ি।

অ্যাডভেঞ্চার আড্ডা চলছে। ছবিঃ লেখক 

যে কোনো ভ্রমণ প্রেমী, পাহাড় প্রেমী বা রোমাঞ্চ প্রিয় মানুষ মুহূর্তেই বুঁদ হয়ে যাবে চারদিকে চোখ বুলিয়ে। ঝকঝকে টাইলসের চকচকে মেঝেতে পা রাখতেই একটা সুখ সুখ শিহরণ বয়ে যাবে মনে প্রাণে। কাঁচের গেট খুলে ভেতরে ঢুকতেই সবুজ গাছের ছায়ায় লাল হ্যামকে ঝুলে বই পড়ার অপূর্ব একটি ওয়াল পেপারে চোখ আটকে যাবেই যাবে। যা দেখেই আমার দু’চোখ জুড়িয়ে গেল। দারুণ নান্দনিকতায় সাজানো রিসেপশন, কাঠ, বেত আর আলো আধারির এক অদ্ভুত সমন্বয়। মন ভরে যেতে বাধ্য।

নান্দনিক অভ্যর্থনা। ছবিঃ লেখক  

এরপর বামে চোখ ফেরাতেই নিজের অজান্তেই যেন সেদিকে চলে গেলাম রঙ-বেরঙের ট্রাভেলিংয়ের সরঞ্জাম দেখে। কী দারুণ দারুণ স্লিপিং ম্যাট, স্লিপিং ব্যাগ, ব্যাকপ্যাক, রেইন কভার সহ ট্রাভেলিংয়ের নানা রকম ছোটবড় অনুষঙ্গ ঝুলে আছে পুরো ফ্ল্যাটের চার দেয়াল জুড়ে। যা দেখে অভিভূত না হবার কোনো কারণই নেই। এসব ছুঁয়ে-ছুঁয়ে, দেখে-দেখে শেষ প্রান্তে গিয়ে থমকে যেতে বাধ্য হলাম, পাখির কিচিরমিচির ডাক শুনে।

কিন্তু পাখির ডাক কোথা থেকে আসছে বুঝতে না পেরে সামনের রকি মাউনটেইন আর জলের প্রবাহের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে, সবুজ গাছ আর ঘাসের মাঝের কোনো একটা জায়গা থেকে পাখির কিচিরমিচির শব্দ ভেসে আসছে বুঝতে পারলাম। সবকিছু মিলে একটা অদ্ভুত আচ্ছন্নতা যেন পুরো ফ্ল্যাটের চারপাশ জুড়ে।

অ্যাডভেঞ্চার ডামি, পাহাড়, ঝর্ণা, আর অরণ্যে! ছবিঃ লেখক 

এরই মাঝে আগত সকল অতিথি ও অন্যদের জন্য চা চলে এলো। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে, কেউ হ্যামকে দুলে, কেউ জলের বোটে ভেসে যাওয়ার অনুভূতি নিয়ে, নানা রকম ভ্রমণের রোমাঞ্চকর সব গল্পে গল্পে চায়ের উষ্ণতায় শীতের সুখানুভূতি অনুভব করছিলাম। চা শেষ হতে হতেই, ফ্ল্যাটের অন্যপাশে গেলাম সবাই মিলে।

সেখানে গিয়ে তো আমি হতবাক হয়ে গেছি। এখানে রয়েছে একদম নিখাদ আডডা, ভ্রমণ পরিকল্পনা, আলাপ-আলোচনা, গল্প-গুজব করার জন্য বিছানা, কুশন, নান্দনিকতার ছোঁয়ায় ভরপুর কাঠ আর কাঁচের ছোট টেবিল, বুক শেলফ আর নানা রকম ভ্রমণ ও রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার অভিজ্ঞাতার বইয়ের সমাহার, ম্যাগাজিন। ভ্রমণের, পাহাড়ের রোমাঞ্চকর লিখিত দলিল বা বইপত্র।

শুয়ে, বসে আড্ডা দিতে… ছবিঃ লেখক 

দেয়ালে দেয়ালে পাহাড়, নদী, অরণ্য, সমুদ্রের রোমাঞ্চকর সব দেয়াল ছবির মেলা। এসব কিছুকেই ছাপিয়ে যায় এই পিক৬৯ অ্যাডভেঞ্চার আড্ডার কর্ণধার দুইজনের বন্ধুতা আর সত্যিকারের আতিথেয়তা আর অমায়িক আন্তরিকতা। যার মধ্যে একদম নেই ব্যবসায়িক কোন লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য।

শুধুমাত্র দুজন মানুষ আর তাদের খুব কাছের কিছু মানুষদের আন্তরিকতা, ইচ্ছা, পাহাড়ের প্রতি ভালোবাসা আর রোমাঞ্চকর নানা রকম অ্যাডভেঞ্চার নেশায়, শতভাগ প্যাশন নিয়ে গড়ে তুলেছে এই অ্যাডভেঞ্চার আড্ডার জায়গা, ভ্রমণ পাগলদের একটি মিলনস্থল, বিদেশী নানা রকম ব্র‍্যান্ডের ভ্রমণ অনুষঙ্গের সমাহার পিক৬৯।

অ্যাডভেঞ্চারের রোমাঞ্চের অনুষঙ্গ। ছবিঃ লেখক 

যেখানে একবার গেলেই পাওয়া যাবে একটি ভ্রমণের রোমাঞ্চকর স্বাদ, অন্য রকম অনুভূতি আর নিখাদ বন্ধুতার পাশাপাশি সত্যিকারের আন্তরিকতার উষ্ণতা। আর এখানের টান বা মায়া বা বাঁধনটা এমন যে একবার গেলে আর সহজে উঠে আসতে মন চায় না, চাইবে না। সেই সাথে যদি পকেটে থাকে কিছু টাকা পয়সা যেটা চাইলেই খরচ করতে পারবেন, তবে তো কথাই নেই আর। কিছু বাড়তি টাকা খরচ করে কিনে নিতে পারবেন মনের মতো ব্র‍্যান্ডের নানা রকম দরকারি ভ্রমণ অনুষঙ্গ ইচ্ছা হলেই। দাম একটু বেশি হলেও সেটা গায়ে লাগবে না যদি থাকে ভ্রমণে প্যাশন আর পকেটে কিছু টাকা। কারণ আমরা তো সবাই জানি, জিনিস যেটা ভালো, দাম তার একটু বেশিই। তাই না?

আয়েশি আড্ডার জন্য… ছবিঃ লেখক 

তবে হ্যাঁ, কোয়ালিটির ব্যাপারে থাকতে পারেন শতভাগ নিশ্চিন্ত। একথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি। আর যদি কিছু নাও কেনেন কেউ কোনো রকম আপত্তি করবে না সেও নিশ্চিত থাকতে পারেন। কমতি থাকবে না বন্ধুতা আর আন্তরিকতার এতটুকু। সাথে বাড়তি পাওয়া উষ্ণ চায়ের আপ্যায়ন আর বন্ধুতার আন্তরিকতা তো আছেই সবার জন্য। তাই ভাবছি এখন থেকে ভ্রমণের ইচ্ছা হলেই, কোথাও যেতে ছুটি ম্যানেজ করতে না পারলেই পিক৬৯ এর অ্যাডভেঞ্চার আড্ডায় চলে যাব, ভ্রমণ আর নিত্যনতুন রোমাঞ্চের স্বাদ তো পাওয়া যাবে ঢাকা শহরের এই ইট, পাথর, জ্যাম আর ধুলোর যন্ত্রণার মাঝেই।  

অ্যাডভেঞ্চারের আয়োজন। ছবিঃ লেখক 

পিক৬৯ ব্যস্ত নগরীর মাঝেই ভ্রমণের স্বাদ পাওয়ার অনন্য অভিজ্ঞতা আর রোমাঞ্চ।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সীতারাম রাজার প্রাসাদের উপাখ্যান

রাই রাইয়া উপাধিপ্রাপ্ত দেওয়ান দয়ারামের দয়ারামপুর রাজবাড়ি