রাঙামাটির পেদা টিং টিং: সাধারণের মাঝে এক অসাধারণ রেস্তোরাঁ!

DCIM100MEDIA

রাঙামাটির শুভলং আর সূর্য ঝর্ণা দেখার জন্যে বোটে করে কাপ্তাইয়ের বুকে ভেসে চলছি। কাপ্তাই আর চারপাশের প্রকৃতি সমানতালে মুগ্ধ করে চলেছে আমাদের। শুভলংয়ের কাছাকাছি আসতেই এখানকার বিখ্যাত পেদা টিং টিং রেস্তোরাঁর দেখা পেয়ে গেলাম। লেকের ওপর ছোট্ট একটা দ্বীপের মতো জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে এই রেস্তোরাঁটি।
ঝর্ণায় লাফঝাঁপ আর ভেজাভিজি শেষে পেট তো খালি হয়ে যাবেই। এর  ঠিক পরপর কোনো দানা-পানি না ফেললে পেটের বিদ্রোহ করে বসার একটি সমূহ সম্ভাবনা আছে! তাই ঝর্ণায় পৌঁছানোর আগেই এখানে দুপুরের খাবারের অর্ডার দিয়ে যাওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আমরা সেটাই করলাম। নিজেদের বোকাসোকা প্রমাণ করার কোনো মানেই হয় না!

কাপ্তাইয়ের রূপ সত্যিই অসাধারণ! ছবিঃ রওনক ইসলাম

ঝর্ণায় গিয়ে পুরোটা সময় খুবই উপভোগ করেছি। নেচে কুঁদে একেবারে একাকার অবস্থা! বোটে উঠে ফেরার পথ ধরতেই ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় হতে শুরু করল! সৌভাগ্যবশত কিছুক্ষণের মাঝেই পেদা টিং টিংয়ে পৌঁছে গেলাম।
খাবার অর্ডার করার সময় কিছুটা তাড়াহুড়ো থাকার কারণে সেভাবে লক্ষ্য করিনি চারপাশ। এবার বোট থেকে নেমেই সেদিকে মনোযোগ দিলাম। একতলা রেস্তোরাঁটার লেকমুখী ডাইনিং রুমটায় ঢুকে সামনে তাকালাম। এই রুমের ভিউ দেখে পৃথিবী গদ্য থেকে পদ্যময় হতে শুরু করল! এমন অসাধারণ ভিউয়ের জন্যেই হয়তো মোটামুটি অর্ধেক ক্ষুধা তৃষ্ণা হঠাৎ ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেল!
এটাই সেই ডাইনিং রুম! ছবিঃ রওনক ইসলাম

ডাইনিং টেবিলে বসে খেতে খেতেই আপনার চোখে পড়বে লেকের স্বচ্ছ পানি, দূরের পাহাড় আর পাহাড়ের পাদদেশে কংক্রিটের ঘরবাড়ি। একটু পরপর স্নিগ্ধ ঝিরিঝিরি বাতাস আপনার মনকে করবে প্রশান্ত। এমন একটা জায়গায় বসে আপনি যেটাই খান সেটাই অমৃত মনে হবে আপনার কাছে, নিঃসন্দেহে!
ডাইনিং রুম থেকে দেখা যায় এই চমৎকার ভিউ! ছবিঃ তানভীর কায়সার

রুমটা থেকে বেরিয়ে এবার বাইরে এলাম। আমাদের বোটটা যেখানে ভেড়ানো, তার একটু সামনেই আছে একটা হ্যামক আর দোলনা। হাতের বাঁয়ে আছে পুরুষ এবং নারীদের জন্যে আলাদা ওয়াশরুম।
গিয়ে দেখলাম হ্যামক আগেই দখল হয়ে গেছে! ছবিঃ রওনক ইসলাম

হ্যামকে দোলার সুযোগ পেলাম না। সেটা দখল করে এক বন্ধু আরামে দোল খাচ্ছেন! দোলনাটাও খালি নেই। আমাদের খাবার মোটামুটি প্রস্তুত। কিন্তু এমন অসাধারণ পরিবেশ পেয়ে কেউ খেতে যাচ্ছি না!
এই চেয়ারে বসে কিছু না করেই কাটিয়ে দেয়া যায় লম্বা সময়! ছবিঃ সুমাইয়া নিম্মি

হ্যামক আর দোলনা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় রিসেপশন হয়ে রেস্তোরাঁর সামনের খোলা জায়গাটায় চলে এলাম। দু তিন জন বসার মতো প্রশস্ত একটা চেয়ার আছে এখানে। এটায় বসে কোনো কিছু না করেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেয়া যায়! পানি আর পাহাড় দিয়ে ঘেরা এমন একটা জায়গায় বসলে আপনার জীবনের মধুরতম স্মৃতিগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠতে বাধ্য!
এটাই সেই ব্যাম্বু চিকেন! ছবিঃ রওনক ইসলাম

বেশ খানিকটা সময় বাইরে কাটিয়ে এবার আমরা সবাই খেতে বসলাম। ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, সবজি আর ডালের সাথে মেন্যুতে আছে এখানকার বিখ্যাত ব্যাম্বু চিকেন! বাঁশের ভেতরে মুরগীর মাংস ঢুকিয়ে একটা বিশেষ উপায়ে রান্না করা হয় এই আইটেমটি। খেতে বেশ! খিদেটা চাঙা হয়ে ওঠায় বেশ তৃপ্তি নিয়েই খাওয়াটা সারলাম।
রেস্তোরাঁর সামনের দিকটায় আমরা সবাই! ছবিঃ রিফাত রহমান

খাওয়া শেষ করে সামনের লেকের পাড়ে খোলা জায়গাটায় পাটি পেতে শুয়ে পড়লাম। রেস্তোরাঁ থেকেই পাটি সরবরাহ করা হলো। পেট পুরে খাওয়ার পর আরাম করার জন্যে আর কী চাই! বেশ অনেকটা সময় শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখেই কাটিয়ে দিলাম। এত সুন্দর জায়গাটা ছেড়ে উঠতেই ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু পরদিনই ধুপপানিতে ট্রেকিংয়ে যাচ্ছি আমরা। বিকেল থাকতে থাকতেই তাই উঠে পড়তে হলো। আবার কাপ্তাইয়ের বুকে ভেসে বেড়াতে হবে কিছুটা সময়।
শুভলংয়ে এলে অবশ্যই পেদা টিং টিংটা ঘুরে যাবেন। প্রকৃতির মাঝে এমন অসাধারণ রেস্তোরাঁ দেশে খুব একটা নেই!
যেভাবে যাবেন:
ঢাকা থেকে বাসে রাঙামাটি। রাঙামাটির রিজার্ভ ঘাট, পর্যটন ঘাট বা পুরনো বাস স্ট্যান্ডের তবলছড়ি বোটঘাট থেকে শুভলং যাওয়ার পথেই পড়বে পেদা টিং টিং। মাঝিকে বললেই তিনি নিয়ে যাবেন।
বোট বা ট্রলার ভেদে যাওয়া আসার ভাড়া পড়বে ১,২০০-১,৫০০ টাকা। ট্রলার বড় হলে একসাথে ২০-২৫ জন উঠতে পারবেন।
খুঁটিনাটি:
দেশীয় ভর্তা-ভাজি, শাক-সবজি আর নানা স্বাদের ছোট বড় মাছের পাশাপাশি এখানে পাবেন আদিবাসীদের বৈচিত্র্যময় এবং মুখরোচক বেশ কিছু আইটেম। ব্যাম্বু চিকেন ছাড়াও চেখে দেখতে পারেন কচি বাঁশের তরকারি, কেবাং অথবা ভর্তার সাথে বিগল বিচি।
ভাত, সবজি, ডাল আর ব্যাম্বু চিকেনের জন্যে জনপ্রতি ২০০ টাকার মতো খরচ হয়েছিল আমাদের।
মূল্য কিছুটা চড়া হলেও এখানকার ভিন্ন ধাঁচের আইটেমগুলোর স্বাদ নিয়ে দেখা উচিৎ!
একদম কিছুই না খেলেও এখানে এসে ঘুরে যেতে পারেন। কোনো বাধা নেই! কর্তৃপক্ষ খুবই অতিথিপরায়ণ!
থাকার জন্যে এখানে কটেজের ব্যবস্থাও আছে। চাইলে রাতও কাটানো যায়!
সতর্কতা:
কাপ্তাই লেকের পানিতে ভুলেও ময়লা ফেলবেন না। ধূমপায়ী হলে সিগারেটের ফিল্টার প্যাকেটে ঢুকিয়ে রাখবেন।
পেদা টিং টিংয়ে ময়লা ফেলার জন্যে ঝুড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেগুলোর সদ্বব্যবহার করবেন।
ফিচার ইমেজ- রিফাত রহমান 

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

হাজারিখিল ট্রি এক্টিভিটির আদ্যোপান্ত

স্লিপিং ব্যাগের আদ্যোপান্ত