অধরা-অরণ্যের ভালোবাসায় পাসপোর্ট ভিসা

অধরার সাথে অরণ্যর দেখা হয়েছিল অরণ্যরা তেতুলিয়া বেড়াতে গেলে। বাংলাদেশ আর ভারতের তারকাঁটা ঘেরা “নো ম্যান্স ল্যান্ড” এ! যেটা আসলে “সীমান্তে নয়, হয়েছে হৃদয়ের তারকাঁটা!” দুজনের মধ্যে তৈরি হওয়া এক অদ্ভুত ভালোবাসা, পাগল প্রেম আর অবাধ্য আবেগ। এরপর ঢাকায় অধরার সাথে দেখা করার জন্য অরণ্য আর ওর বন্ধুদের ভিসার জন্য কত না চেষ্টা প্রচেষ্টা, অপমান, অবমাননা, লাঞ্ছনা, গঞ্জনা আর যন্ত্রণা সইতে হয়েছে সে জানে শুধু অরণ্য আর ওর বন্ধুরা। আর জানে বিভিন্ন ট্রাভেল গ্রুপে ভিসার জন্য উপায় খুঁজে বেড়ানো হাজার আর লাখো ভ্রমণ প্রেমী বন্ধুরা! একবার তো পাসপোর্ট জমা দিতে গিয়ে কোনো কারণ ছাড়া জমা না রাখার কারণে পুলিশ পর্যন্ত ডাকতে হয়েছে দূতাবাসকে! সে আরেক হ্যাপা।

অরণ্য আর অধরার মতো আরও হাজার হাজার মানুষ ভারতীয় ভিসার জন্য দিনের পর দিন হয়রানির শিকার হয়ে অবশেষে একটি গ্রুপ গণ-মেইল কর্মসূচি হাতে নেয়। ওদের মেইলে যেতে থাকে হাজার হাজার মেইল একই সাথে! একই ইস্যু নিয়ে! যার প্রভাব পড়ে জাতীয় বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম সহ বিবিসির মতো আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে পর্যন্ত! বিস্তার ঘটে ভারতীয় গণমাধ্যম হয়ে দিল্লীতে গিয়ে পৌছায়। ফলাফল স্বরূপ ভারতীয় কর্মকর্তাগণ নতুন হাইকমিশনার আর আসন্ন ঈদ উপলক্ষে ভ্রমণ ভিসা সহজে পেতে বিশেষ ভিসা ক্যাম্পিং এর আয়োজন করে। যেখানে লাগবে না কোনো ই-টোকেন, কোনো দালাল বা নিতে হবে না কোনো সহায়তার আশ্রয়!

ঠিক তাই করে অরণ্য। পাসপোর্টের ফর্ম পূরণ করে, কাগজপত্র রেডি করে, ঠিকঠাকভাবে ছবি জমা দেয় ফর্মের সাথে। সবকিছু ঠিক আছে তবুও নার্ভাস লাগে বলে বার বার করে সবাইকে দেখাতে লাগলো যে সব ঠিকঠাক আছে কিনা? অথচ অন্যান্য সময় ওর কাছ থেকেই সবাই দেখে ও জেনে নেয়। সেই ওকেই মানসিক দুর্বলতার কারণে এর-ওর কাছে যেতে হচ্ছে সব ঠিক থাকা সত্বেও!

ধুসর সকাল। ছবিঃ সংগ্রহ 

জমা দিতে গেল নির্ধারিত তারিখে, যেদিন ঈদ ভিসার বিশেষ ক্যাম্পিং শুরু হয়েছে সেদিন। গিয়ে দেখে বিশাল লাইন পুরো এলাকা জুড়েই যেন ভারতীয় ভিসার জন্য মানুষের হাহাকার! শুধু মানুষ আর মানুষ! লাইন ভারতীয় হাইকমিশন ছাড়িয়ে রাস্তা ও পুরো এলাকা সয়লাব করে ফেলেছে।

অরণ্যও লাইনে দাঁড়ালো। কিন্তু মনের মধ্যে উসখুস কীভাবে একটু আগে আর সামনে গিয়ে লাইনে দাঁড়ানো যায় সেই ভাবনায়! একটু এদিক ওদিক করলেই কিছুটা সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারবে সেটা অরণ্য জানে। কিন্তু অনেক অনেক শুভাকাঙ্ক্ষীরা পই-পই করে বলে দিয়েছে এবার যেন আর কোনো ঝামেলা না করে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে ভদ্রভাবে নিজের সিরিয়াল অনুসারে যেন ঢোকে আর জমা দেয় পাসপোর্ট। তাই এবার অরণ্য চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে উত্তপ্ত উনুনের নিচে।

রোদে, ধুলায়, বালিতে, গরমে, ঘামে, মানুষের চাপে একাকার হয়ে যায় ঘামে ভিজে, ধুলা মেখে, ধোঁয়া খেয়ে আর রোদে পুড়ে! তবুও হয় না ধৈর্য হারা, শুধু অধরার জন্য… অধরার সাথে দেখা করবে, নো ম্যান্স ল্যান্ডের বাঁধা পেরোবে, ছুঁয়ে দেবে আলতো করে, ওর কোমলতাকে! শিহরিত হবে এক অদ্ভুত, অজানা আর অসীম আনন্দে।

এভাবে ধীরে-ধীরে পিঁপড়ার মতো ক্ষিপ্রগতিতে এগোতে এগোতে দুপুর ১২:৩০ মিনিটে হাইকমিশনের মূল গেটে প্রবেশ করে অরণ্য। মনে মনে বলে বাবা বাঁচলাম! কিন্তু একি হায়, ভেতরে যে মানুষে মানুষে গিজগিজ করছে! বাইরে যারা দাঁড়িয়ে আছে তাদের চেয়ে অন্তত দ্বিগুণ মানুষ আছে এই হাইকমিশনের ভেতরেই! কীভাবে এত এত মানুষের পাসপোর্ট জমা রাখবে দুপুর দুইটার মধ্যে? এ তো অসম্ভব! তাহলে কি ফিরে যেতে হবে আজকের এত এত কষ্ট সহ্য করেও?

ব্যস্ত সড়কে। ছবিঃ লেখক 

কিন্তু আশার আলো হয়ে এলেন, নতুন হাই কমিশনার নিজে। সবকিছু দেখে শুনে, ঘোষণা দিলেন আজ অন্তত চারটা পর্যন্ত পাসপোর্ট জমা নেয়া হবে আর দুপুর একটা পর্যন্ত যাদেরকে ঢুকতে দেয়া হবে তারা সবাই জমা দিতে পারবে অন্তত। সুতরাং আবারও শুরু হলো অপেক্ষা আর অপেক্ষা! এবার বাঁশের খাঁচার মতো করে! একটা লাইনকেই তিন বার পেঁচানো হয়েছে সাপের মতো করে! যে লাইন শেষ করে হাইকমিশনের মূল ফটকে ঢুকতে ঢুকতে বিকেল চারটা পেরিয়ে গেছে! এদিকে ক্ষুধা, পানির পিপাসা, পেটে ব্যথা আর মাথা ধরা নিয়ে অরণ্যর নাজেহাল অবস্থা। তবুও সব সইছে সে, “শুধুই অধরার জন্য!”

মূল ফটকে ঢুকতেই ভয়ে হিম হয়ে গেল অরণ্য! কারণ একেবারে সামনেই চেয়ারে বসে আছে চার মাস আগে ঝামেলা করা আর বিতণ্ডায় জড়িয়ে পুলিশী ঝামেলায় জড়ানো সেই কর্মকর্তা! নার্ভাস হয়ে পড়লো অরণ্য ভীষণভাবে, যদি ওকে দেখেই চিনে ফেলে সেই ভয়ে! আবার যদি আঁটকে দেয় ওর পাসপোর্ট! তবে কী হবে অধরার আর অধরার কাছে যাবার এত এত অপেক্ষার?

কিন্তু নাহ অরণ্য খুব সঙ্গপনে এড়িয়ে গেল তাকে। অন্য আরেকজনের কাছ থেকে কাগজপত্র চেক করে চেয়ারে গিয়ে বসলো দুরুদুরু বুকে! মনে এখনো শঙ্কা, জমা নেবে তো ওর পাসপোর্ট? আগের বারের ঝামেলার কারণে ওর পাসপোর্ট আবার ব্লক করে রাখেনি তো ওরা? কারণ অরণ্যকে তখন জিজ্ঞাসা করেছিল, “আর ভারত যাবেন না?” অরণ্য তখন জেদের বশে বলে এসেছিল যে আর যাবে না! যদি তেমন কিছু করে থাকে, ওর পাসপোর্ট এর কোনো তথ্য যদি এমন করে থাকে যেন জমা না রাখে তবে কী হবে? যা হয় হবে, কী আর করার? নিজেকে নিজেই প্রবোধ দেয় অরণ্য!

অনিশ্চয়তার কুয়াসা। ছবিঃ সংগ্রহ  

এক সময় ডাক আসে, কাঁপা কাঁপা হাতে জমাও দেয় সে তার পাসপোর্ট আর কাগজ পত্র! কোনো ঝামেলা ছাড়াই। উহ যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল এ যাত্রা। জমা তো অন্তত রেখেছে, ভিসা না দিলে কিই বা করার আছে। ডেলিভারি রিসিট হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলো হাইকমিশন থেকে। মনে প্রানে খুশির জোয়ার, জমা রাখা মোবাইল নিয়েই ছবি তুলল ডেলিভারি রিসিটের, আর ইনবক্স করলো অধরাকে! অধরাও এতক্ষণ অধীর অপেক্ষায় ছিল সেই ওপারে, শিলিগুড়িতে! অরণ্যর পাসপোর্ট জমা দেবার খবর শোনার অপেক্ষায়!

কোনোমতে বাসায় ফিরে, ফ্রেশ হয়ে একটু খেয়েই দিল ঘুম। সারাদিনের ক্লান্তিতে অবসন্ন হয়ে পড়েছে অরণ্য। এক ঘুমে রাত ১০টা। উঠেই শুরু হলো অধরার সাথে পরিকল্পনা… কী করবে, কবে যাবে, কীভাবে যাবে, কোথায় কোথায় ঘুরবে, কী কী দেখবে, আর কীভাবে সময় কাটাবে একে অন্যের সাথে? কিন্তু অরণ্য নিজেই বাঁধা দিল কোনো পরিকল্পনা করতে, কল্পনার রঙিন মেঘে ভেসে না বেড়াতে, রংধনু রঙের কোনো স্বপ্ন না দেখতে! পাছে আবার ভিসা না পায়, তখন কষ্ট হবে খুব খুব! সেই কারণে এবার আর কোনো আগাম পরিকল্পনা নয়। আগে ভিসা পাবে তারপর সব পরিকল্পনা করা যাবে।

(চলবে)

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নো ম্যান্স ল্যান্ডের সবুজের সমুদ্রে বর্ণিল আকর্ষণ!

দেরাদুনের অনিন্দ্য সুন্দর বন গবেষণা কেন্দ্র