দরিয়ানগরে প্যারাসেইলিং: পাখির মতো সমুদ্রের উপর ভেসে বেড়ানো

খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে বাকিরা চলে গেল সোনাদিয়া দ্বীপের পশ্চিম পাড়ে। একমাত্র আমিই ঘুম থেকে উঠতে পারিনি। তাই আর যাওয়া হয়নি। আনসার ভাইয়ের বাসা থেকে সকালের নাস্তা সেরে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসি। ওদিকে কক্সবাজার ফেরার ট্রলার এসে দাঁড়িয়ে আছে।

জিয়ন ভাই তাড়া দিচ্ছে তাড়াতাড়ি ক্যাম্প গুছিয়ে রওনা হতে। ঝাউ গাছে ঘেরা সবুজ এই দ্বীপ ছেড়ে যেতে মনটা কেমন করছিল। আরেকটা দিন বেশি থাকা গেলে মন্দ হতো না। কিন্তু কী আর করার! সময়ের হাতে বন্দী সবাই।

সোনাদিয়া দ্বীপ থেকে ফেরার পালা; ছবি- লেখক

কস্তূরী জেটি ঘাঁটে যখন পৌঁছাই সূর্য তখন মাথার উপর। দেনা পাওনা মিটিয়ে সোজা চলে যাই হোটেলে। পেট পূজা করে নেওয়াটা তখন ছিল মুখ্য কাজ। খাওয়া শেষ করে ভাবতে থাকি কী করা যায় এখন। কেননা রাতের বাসে করে ঢাকা ফিরবো আমরা। তাই হাতে এখনও বেশ সময় আছে।

সবাই মিলে সিদ্ধান্ত হলো হিমছড়ির দিকে যাওয়া যেতে পারে। সেখানে নাকি প্যারাসেইলিং করায়। আমাদের মধ্যে অনেকে আবার পাখির চোখে সমুদ্র দেখার ইচ্ছা পোষণ করল। তাই অটো ভাড়া করে চলে যাই হিমছড়ি।

পৃথিবীর দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ রোড; ছবি- অনুভ্রমণ থেকে নেওয়া

ঝকঝকা তকতকা রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছি আমরা। রাস্তা দেখে সন্দেহ হলো এটাই কি তবে মেরিন ড্রাইভের রাস্তা? দলের বাকিরা জানালো এটাই পৃথিবীর দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ রোড। বর্তমানে কক্সবাজারে বহুল আলোচিত এবং সুপরিচিত স্পট কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের রাস্তা। ৮০ কিলোমিটারের এই রোড কক্সবাজারের কলাতলি থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই রোডের একপাশে রয়েছে পৃথিবীর দীর্ঘতম উত্তাল সমুদ্র তট, অন্যপাশে আছে ছোটবড় পাহাড়ি টিলা। যাত্রা পথে দেখা মিলবে ছোট বড় মাছ ধরার ট্রলারের। রাস্তার দু’পাশে নয়ন জুড়ানো দৃশ্য দেখতে দেখতে পৌঁছে যাই হিমছড়ির দরিয়ানগরে।

শূন্যে ভেসে বেড়ানো; ছবি- মাজারুল জিয়ন

বর্তমানে বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম। সম্প্রতি এই ধারণার প্রসার ঘটেছে ব্যাপকভাবে। আসলে অ্যাডভেঞ্চার বলতে আমরা কী বুঝি এমন প্রশ্ন অনেকের মনে হতেই পারে। এক কথায় বলা যেতে পারে, রোমাঞ্চকর দুঃসাহসিক, প্রচলিত কর্মকাণ্ডের বাইরের কাজকেই অ্যাডভেঞ্চার বলে থাকে।

ফান ফেস্টের মাধ্যমে প্যারাসেইলিং করেছিলাম।

অ্যাডভেঞ্চার বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। ট্রেকিং, ক্লাইম্বিং, প্যারাগ্লাইডিং, প্যারাসেইলিং, বাঞ্জি জাম্প, স্কুবা ডাইভিং, কায়াকিং সহ আরও অনেক কিছু। এরই মধ্যে আমাদের দেশেও হাতে গোনা কিছু অ্যাডভেঞ্চার এক্টিভিটিস হয়ে থাকে। উল্লেখ্য ট্রেকিং, প্যারাসেইলিং, স্কুবা ডাইভিং এবং কায়াকিং।

প্যারাসেইলিংয়ের জন্য প্রস্তুতি চলছে; ছবি- রাসেল আহমেদ জয়

বিশ্বের প্রায় প্রত্যেকটি সমুদ্র সৈকতের অন্যতম আকর্ষণীয় রাইড হলো প্যারাসেইলিং। পাখির দৃষ্টিতে সমুদ্রের উপর দিয়ে দেখা যাবে প্যারাসেইলিংয়ের মাধ্যমে। গাঙচিলের মতো উড়ে উড়ে সমুদ্রও দেখার জন্য প্যারাসেইলিংয়ের জুড়ি নেই। একটি প্যারাসুট আর স্পীড বোটের মাধ্যমে এটি করা হয়। প্যারাসুটের মাধ্যমে আপনাকে উড়িয়ে দেওয়া হবে আর ঐ প্যারাসুটের দড়ি বাঁধা থাকে স্পীড বোটে।

এই দুইয়ের সমন্বয়ে কয়েক মিনিটের জন্য পাখির দৃষ্টি নিয়ে সমুদ্রের উপর ভেসে থাকতে পারেবেন। অনেকটা ঘুড়ি এবং নাটাইয়ের মতো। ঘুড়ি হাতে নিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার জন্য যেমন উঠানের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত দৌড়ান হয় ঠিক তেমনে স্পীড বোটের মাধ্যমে এক পাশ থেকে আরেক পাশে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। তবে এর নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও পরবর্তীতে তাদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে সেই সন্দেহ দূর হয়েছে।

অ্যাকশন ক্যামে কীভাবে ভিডিও করবো সেটা দেখিয়ে দিচ্ছে।

আমি, রাসেল ভাই ও ইমরান ভাই আপাতত এই তিনজন প্যারাসেইলিং করবো বলে ঠিক হলো। খরচ পার পারসন ১,৫০০ টাকা। যদি গাঙচিলের ন্যায় পানিতে হালকা পা ডুবাতে চাই তাহলে ২,০০০ টাকা লাগবে। আমরা ১,৫০০ টাকারটাই করলাম। প্রথমে রাসেল ভাই করল। লাইফ জ্যাকেট পরিয়ে প্যারাসুটের সাথে সেট করে দেওয়া হলো। এরপর আস্তে আস্তে প্যারাসুট উড়িয়ে দিয়ে স্পীড বোটের সাথে উপরের দিকে উড়তে শুরু করল।

প্রত্যেক জনের ১,৫০০ টাকা করে দিতে হয়েছে।

এবার আমার পালা। আমি হালকা পাতলা মানুষ। প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পাশ থেকে একজন ইন্সট্রাকটর বলে দিল কীভাবে কী করতে হবে। এও বলল আমার ওজন কম থাকায় আমি সব থেকে বেশি উপরে উঠবো এবং নামতেও আমার বেশি কষ্ট হবে। তখন এই কথার মানে না বুঝলেও পরে ঠিকই বুঝেছিলাম কেন বলেছিল।

ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠছি; ছবি- রাসেল আহমেদ জয়

দড়ির সাথে প্যারাসুট বেঁধে দিল আর দড়ি একটা স্পীড বোটের সাথে বাঁধা। স্পীড বোট চলতে শুরু করার সাথে সাথে আমি আস্তে আস্তে উপরের দিকে উঠতে থাকলাম। প্রায় চার শত ফুট উপরে উঠে গিয়েছি। পায়ের নিচে দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি, দূরে সবুজে ঘেরা পাহাড়। উপর থেকে সব কেমন ছোট ছোট লাগছে। বাতাসের প্রকোপে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইছে অজানা কোথাও। ঘোর লাগা চোখ নিয়ে কয়েক মিনিট ভেসে রইলাম শূন্যে।

একটু পর হুইসেলের শব্দে ডান হাত দিয়ে টেনে ধরি পাশের দড়ি। সর্বশক্তি দিয়ে দড়ি টানছি। কিন্তু নিচে নামতে পারছি না। বহু কষ্টে অবশেষে টের পাই ধীরে ধীরে নিচে নামছি। শক্তি কম থাকার কারণে অন্যদের থেকে একটু বেশি সময় ধরে আকাশে থাকতে পেরেছি। স্থলের খুব কাছাকাছি আসতেই পা ধরে টেনে আমায় নামানো হয়।

সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে সূর্যাস্ত দেখছি; ছবি- রাসেল আহমেদ জয়

এবার ফিরতে হবে। সূর্য ডুবিডুবি করছে। অটো নিয়ে সোজা সুগন্ধা পয়েন্টে চলে আসি। লাল টুকটুকে সূর্য নীল দিগন্ত জলরাশির মধ্যে একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে। শেষ বিকেলের আলো গায়ে মেখে যান্ত্রিকতার পানে আবারও ছুটে যাওয়া।

যেভাবে যাবেন

যেকোনো জায়গা থেকে আপনায় কক্সবাজার আসতে হবে। সেখান থেকে অটোতে ২০-২৫ টাকা ভাড়া দিয়ে দরিয়ানগর যেতে হবে। যাত্রা পথেই দেখবেন কেউ না কেউ প্যারাসেইলিং করছে। দরিয়ানগর যাওয়ার পথে হাতের ডান পাশে এই ধরনের এক্টিভিটিস আপনার নজরে পড়বে।

অবশ্যই মনে রাখবেন

*যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা থেকে দূরে থাকবেন।
*খেয়াল রাখবেন আপনার অতি উচ্ছ্বাসে প্রকৃতির যেন কোনো ক্ষতি না হয়।
*সঙ্গে নেওয়া পলি প্যাকেটগুলো সঙ্গে নিয়ে ফিরুন।
*সমুদ্রে নামার সময় অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট পরতে হবে।
*উচ্চ রক্তচাপ বা হার্টের কোনো সমস্যা থাকলে প্যারাসেইলিং করা থেকে দূরে থাকবেন।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পর্যটনকে কি আমরা নিজ হাতে ধ্বংস করছি?

মেক্সিকোর ক্যাবো সান লুকাসের যে ৭টি জায়গায় আপনার যাওয়া চাই