চীনের প্রতীক পান্ডা দেখতে সিচুয়ান

ভালুকের মতো দেখতে বিশালাকৃতির একটি প্রাণী। সাদাকালো গায়ের রঙ, সারাদিন বসে বসে বাঁশ চিবুচ্ছে। আদুরে এ প্রাণীটিই পান্ডা। বিপন্নপ্রায় পান্ডা চীনের জাতীয় প্রাণী, জাতীয় গৌরবও বটে। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইফ ফাউন্ডেশনের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের প্রতীকে পান্ডা ব্যবহার করেছে। চীনে যে কোনো বড় ধরনের আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে মাস্কট হিসেবে ব্যবহার করা হয় পান্ডার প্রতীক।

পুরো গায়ে বড় বড় লোম, মোটাসোটা আদুরে দেখতে, আর সাদা কালো রঙের সংমিশ্রণে গড়া পান্ডা পছন্দ করে না এমন লোক খুঁজে পাওয়াই দুস্কর। কুংফু পান্ডা তো বিশ্বব্যাপী অনেক জনপ্রিয় একটি চরিত্র, যেখানে এনিমেশনে তৈরী পান্ডাকে কুংফু লড়তে দেখা যায়। তবে বাস্তবে পান্ডার দেখা পাওয়াটা কিন্তু বেশ কঠিন।

চেংদু রিসার্চ সেন্টার ফর জায়ান্ট পান্ডা ব্রিডিংয়ের প্রবেশপথ; ছবি- ডিসকভারি চায়না

পান্ডা বা জায়ান্ট পান্ডা শুধুমাত্র চীনেই জন্মায়। এক দশক আগেও এদের সংখ্যা ১,০০০ এর কম ছিল। চীন সরকার তখন এদেরকে রক্ষা করার জন্য উঠে পড়ে লাগে। তাদের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে শেষ পর্যন্ত পান্ডা শুধু রক্ষায় পাইনি বরং সংখ্যায় বেড়েছেও। আইইউসিএনের হিসেব মতে এখন প্রায় ১,৮০০ পান্ডা আছে চীনে, সেই সাথে এ প্রাণী মহাবিপন্নের তালিকা থেকে সরে এসে বিপন্ন তালিকায় চলে এসেছে।

চীনে পান্ডা দেখার জন্য বেশ কয়েকটি জায়গা আছে, যার অধিকাংশই চিড়িয়াখানা। এত সুন্দর একটা প্রাণীকে চিড়িয়াখানায় দেখতে চান না অনেকেই। খোলা জায়গায় পান্ডা দেখার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা হচ্ছে সিচুয়ান প্রদেশ। সিচুয়ানের রাজধানী চেংদুর অদূরে “চেংদু রিসার্চ বেইজ অব জায়ান্ট পান্ডা ব্রিডিং”।

পরম যত্নে রাখা হয় পান্ডার বাচ্চাদের; ছবি- ডিসকভারি চায়না

চেংদুর ডাউনটাউন থেকে মাত্র ১০ কিমি দূরে গড়ে উঠেছে এ বিশাল গবেষণা কেন্দ্র। ২৪৭ একরের এই পান্ডা বেইজ ঘুরে দেখে অন্তত তিন ঘণ্টা সময়ের দরকার আছে। এ বিশাল এলাকায় রয়েছে জাদুঘর, পর্বত, লেক, বাঁধ, ফুলের বাগান, বন এবং বাঁশ বাগান। বর্তমানে প্রায় ১২৪টি পান্ডা আছে এখানে।

পান্ডাদের প্রায় সারাদিনই খেতে দেখা যায়। বাঁশ এদের প্রধান খাদ্য। এদের শক্তিশালী চোয়াল বাঁশ সহজেই চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু বাঁশের মধ্যে প্রোটিন খুব কম থাকে বলে এদের প্রচুর পরিমাণে খেতে হয়। খাওয়া ছাড়া বাকি সময় পান্ডাদের ঝিমুতে বা ঘুমাতে দেখা যায়।

চেংদুর এই রিসার্চ সেন্টার খোলা থাকে সকাল সাড়ে সাতটা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। আর প্রবেশ ফি ৫৮ আরএমবি বাংলাদেশি টাকায় ৮০০ টাকার মতো। চায়না ভাষা না জানলে চীনে আসলেই ভালোমতো ঝামেলায় পড়তে হয়। তাই বাসে ট্রেনে না এসে ট্যাক্সিতে আসতে পারেন। উই চ্যাট বলে একটা অ্যাপস আছে, এই অ্যাপস দিয়ে চায়না ভাষাকে ইংরেজীতে ভাষান্তর করে যোগাযোগ চালিয়ে যেতে পারবেন।

রিসার্চ স্টেশনে ভেতরে বাসের সুব্যবস্থাও আছে। পুরো পার্ক ঘুরে দেখার জন্য বাস ব্যবহার করতে পারেন এতে আপনার কষ্ট কম হবে। তবে বাসের জন্য অতিরিক্ত আরও ১০ আরএমবি দিতে হবে। কয়েকটি জায়গায় পান্ডার সাথে ছবি তোলারও ব্যবস্থা আছে। অনেক পর্যটককেই দেখা যায় পান্ডার সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে ছবি তোলেন। এমনকি কাঁধে হাত দিয়েও ছবি তুলতে দেখা যায়।

আসলে প্রাণী হিসেবেও পান্ডা খুবই শান্তিপ্রিয়। তাই সহজে তাদের দ্বারা ক্ষতি হবার সম্ভাবনা কম। তবে রেগে গেলে ভয়ংকর কাণ্ড ঘটাতে পারে তারা। সাধারণত বদ্ধ অবস্থায় রাখা কিছু নির্ধারিত পান্ডার সাথে ছবি তুলতে দেয়া হয়। সারাক্ষণ বাঁশ চিবুতে থাকা পান্ডা খাবারে কোনো বিরতি না দিয়েই ছবি তুলতে থাকে পর্যটকদের সাথে।

পান্ডার সাথে ছবি তুলছেন পর্যটকরা ছবি ডিসকভারি চায়না

তবে বদ্ধ অবস্থার চেয়ে পান্ডার জন্য করে রাখা বড় খোলামেলা জায়গাতেই একে দেখতে বেশি ভালো লাগে। বাঁশের জঙ্গলের মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ দেখা মেলে বড়সড় পান্ডাদের। সাদাকালো রঙ থাকায় খুঁজে পেতে কিছুটা কষ্ট হতে পারে। পান্ডাদের প্রতিটি পদক্ষেপই দেখার মতো। ঝোপের মধ্যে তাদের হাঁটতে দেখলেও ভালো লাগবে।

এছাড়া বাঁশ ও কাঠ দিয়ে কিছু স্থান তৈরী করে দেয়া থাকে। যেগুলোতে পান্ডারা তাদের বিভিন্ন কসরত দেখাতে থাকে। আদতে এত অলস প্রাণী এরা, কিছুদূর উঠে মনে হতে পারে আর উঠবে না, সেখানেই ঝিমাতে গিয়ে পড়ে যায় নীচে। আর বিভিন্ন জায়গায় ঘুমিয়ে পড়া তো আছেই। এর মধ্যে আবার নাদুস-নুদুস শরীর নিয়ে বিভিন্ন গাছে চড়াটাও দেখার মতোই একটা ব্যাপার বটে।

খুনসুটি চলে সারাদিন; ছবি- ডিসকভারি চায়না

তবে যাই করুক তারা, খাওয়া কিন্তু চলবেই। পান্ডাদের বংশ বিস্তারে তাদের অলসতা একটি অন্তরায় বটে। এছাড়া পান্ডারা মাত্র একটি ক্ষুদ্রাকৃতির বাচ্চা দেয় একেকবারে। ২২০ পাউন্ড ওজনের বিশাল পান্ডার বাচ্চার ওজন হয় মাত্র পাঁচ পাউন্ড। তারপর সে বাচ্চাও অনেক দুর্বল থাকে। তাই প্রকৃতিতে তাদের টিকে থাকতেও অনেক কষ্ট করতে হয়। তবে রিসার্চ সেন্টারে তারা সব সহযোগিতায় পেয়ে থাকে।

এখানকার কর্মীদের সাথে পান্ডাদের খুনসুটি দেখার মতো। প্রায় এরা কর্মীদের কোলে চড়ে বসতে চায়, তাদের পা জড়িয়ে ধরে রাখে, কখনো কখনো আবার তাদের জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করতে চায়। পান্ডার সাথে এ ধরনের খুনসুটির ভিডিও প্রায়শই ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়ে থাকে, একটু খুঁজলেই দেখতে পাবেন।

দেখা মেলে রেড পান্ডারও; ছবি- ডিসকভারি চায়না

পান্ডা ছাড়াও কিছু বিপন্ন বন্যপ্রাণীর দেখা মিলবে এখানে। যার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের লাল পান্ডা, বিভিন্ন ধরনের পাখি ইত্যাদি। আর পুরো জায়গাটাও অনেক সুন্দর ও সাজানো গুছানো। রয়েছে বেশ কয়েকটি রেঁস্তোরাও। এছাড়া রয়েছে স্যুভনিরের দোকান, যেখান থেকে পান্ডার বিভিন্ন ধরনের পুতুল কিনতে পারবেন।

সামনাসামনি পান্ডা দেখাটা সত্যিই সারাজীবন মনে রাখার মতো ব্যাপার। বর্তমানে বেঁচে থাকা পান্ডাদের প্রায় সত্তর ভাগই আছে সিচুয়ান প্রদেশে। তাই পান্ডা দেখতে যেতে পারেন সিচুয়ান। ঢাকা থেকে সরাসরি চেংদু ফ্লাইট নেই, কিন্তু কুনমিনে ট্রানজিট নিয়ে যেতে পারবেন। এছাড়া কুনমিনে থেকে ট্রেনেও যেতে পারবেন চেংদু।

ফিচার ছবি- ডিসকভারি চায়না

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

তেওতা জমিদার বাড়ি ভ্রমণ কথন

দুইটি মগের আত্মকাহিনী