পদ্মনাভ স্বামী মন্দির: যার ঐশ্বর্য পৃথিবীর সবকিছুকে ম্লান করে দেয়

ভারতের কেরালা রাজ্যের রাজধানী থিরু অনন্তপুরম শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি মন্দিরের নাম ভগবান পদ্মনাভ স্বামী মন্দির। ভগবান বিষ্ণুই এই মন্দিরে পদ্মনাভ স্বামী হিসেবে পূজিত হন। ঐতিহাসিক কাল থেকেই মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ছিল ট্রাভাঙ্কোর রাজপরিবারের হাতে।

মন্দিরের বিগ্রহ; ছবিঃ Quora

ট্রাভাঙ্কোর ছিল কেরালার মধ্য ও দক্ষিণ অংশ নিয়ে গঠিত একটি রাজ্য। ট্রাভাঙ্কোরের রাজা মার্তণ্ড বর্মার হাতেই মন্দিরটি বর্তমান রূপ পায়। ট্রাভাঙ্কোর রাজপরিবার ভগবান বিষ্ণুর প্রতি নিবেদিত। এখানে ভগবান বিষ্ণু অনন্য শয্যায় শায়িত অবস্থায় পূজিত হন। যে শহরে মন্দিরটি অবস্থিত অর্থাৎ থিরু অনন্তপুরম; একটি মালয়ালম শব্দ এর অর্থ ভগবান বিষ্ণুর শহর।
২০১১ সালে মন্দির অব্যবস্থাপনা নিয়ে কোর্টে একটি মামলা দায়ের করা হলে নির্দেশ আসে মন্দিরের সম্পদের হিসাব পুনরায় সম্পন্ন করতে। আর এই রায়ের কয়েকদিনের মধ্যে তুমুল আলোচনায় চলে আসে এই পদ্মনাভ স্বামী মন্দিরটি। এর কারণ আর কিছুই নয়, মন্দিরের বিপুল সম্পদই এর পেছনে দায়ী। ধারণা করা হয়, এই মন্দিরটি বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মন্দির তো বটেই, সবচেয়ে ধনী প্রতিষ্ঠানও বটে।
অপরূপ মন্দির; ছবিঃ বিজয় মোহন

শ্রী পদ্মনাভ স্বামী মন্দিরটি ষোল শতকে স্থাপিত হয়েছিল বলে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করলেও প্রামাণ্য সাক্ষ্য তা বলছে না। প্রাচীন তামিল সাহিত্য ‘সঙ্গম সাহিত্য’ থেকে এই মন্দিরের কথা জানা যায়। খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ সাল থেকে খ্রিস্টের জন্মের ৩০০ সালের মধ্যে এই সাহিত্য রচিত হয়েছিল।
শ্রী পদ্মনাভ স্বামী মন্দিরকে ‘স্বর্ণ মন্দির’ রূপে আখ্যায়িত করা হয়েছে। মন্দিরের রেকর্ডে বলা হয়েছে, কলিযুগের শুরুতে দিবাকর ঋষি এই মন্দিরটির নির্মাণকাজ শুরু করেন যা প্রায় ৯৬৪ দিন ধরে চলেছিল। হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ ব্রহ্ম পুরাণ, স্কন্দ পুরাণ, পদ্ম পুরাণ, বায়ু পুরাণ ও ভগবৎ পুরাণে এবং মহাভারতে এই স্থানের মন্দিরের উল্লেখ রয়েছে।
ভগবৎ পুরাণে উল্লেখ আছে, বলরাম একবার পদ্মনাভ স্বামী মন্দিরের এসেছিলেন। তিনি এখানে এসে পবিত্র সরোবর পদ্মতীর্থমে স্নান করে দশ হাজার গাভী দান করেছিলেন। সেই সাথে এটি বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের ১০৮টি পবিত্র ধামের একটি।
ষোড়শ শতাব্দীতে মন্দিরটি বড় রকম সংস্কার সাধন করা হয়। আর ১৭৩৩ সালে মন্দিরকে পুনরায় নব কলেবরে সাজান রাজা মার্তণ্ড বর্মা। তিনি ১৭৫০ সালে ট্রাভাঙ্কোর রাজ্যটি দেবতার চরণে অর্পণ করেন। সেই সাথে ঘোষণা দেন তার পরবর্তী বংশধরেরা ‘পদ্মনাভের দাস’ হিসেবে ট্রাভাঙ্কোর শাসন করবে।
সোনার মহাবিষ্ণূ; ছবিঃ 360 Degrees Hinduism

হিন্দুদের ভেতরে মন্দিরে স্বর্ণ দান করার একটি প্রথা প্রচলিত রয়েছে। তাছাড়া পদ্মনাভ স্বামী মন্দির রাজপরিবারের সরাসরি তত্ত্বাবধায়নে পরিচালিত হতো, তাই এই মন্দির শুরু থেকেই প্রচুর সম্পদের অধিকারী। তাছাড়া যত দিন এগিয়েছে মন্দিরের সম্পদ ততই বেড়েছে। শুধু ট্রাভাঙ্কোর রাজারাই নয়, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের রাজপরিবারগুলো এখানে দান করেছে। এমনকি মেসোপটেমিয়া, গ্রিস, রোম, জেরুজালেম থেকেও এই মন্দিরে এসেছে ভেট। বণিক সম্প্রদায় এখানে এসে তাদের সাফল্য কামনায় দেবতার উদ্দেশ্যে সম্পদ ভেট দিয়ে যেতো। টিপু সুলতানের হাতে পরাজিত ৮ জন হিন্দু রাজা তাদের সম্পদ এখানে দান করে দেন। সেই সমস্ত সম্পদই জমা হয়েছে এই মন্দিরের ভূগর্ভস্থ গুহাকক্ষগুলোতে।
পদ্মনাভ মন্দিরের গর্ভগৃহের নিচে ২০ ফুট গভীরে রয়েছে গুহাকক্ষগুলো। মন্দির কর্তৃপক্ষ ছয়টি ভল্টের কথাই সবাই জানতো। কিন্তু হাইকোর্টের নির্দেশ পাওয়ার পরে জরিপ করার সময় আরো দুটি গুহাকক্ষ আবিষ্কৃত  হয়েছে। সব মিলিয়ে মোট ৮টি গুহাকক্ষ আবিষ্কৃত হয়েছে শ্রী পদ্মনাভ স্বামী মন্দিরের অভ্যন্তরে।
হাইকোর্ট থেকে জরিপ করার সময় এই গুহাকক্ষগুলোকে A, B,‌ C, D, E , F , G  ও H নামে নামাঙ্কিত করা হয়। এর মধ্যে B গুহাকক্ষটি কয়েকশো বছর ধরেই বন্ধ রয়েছে। A গুহাকক্ষটি ১৯৩০ সালে শেষ খোলা হয়েছিল। C, D, E, F  গুহাকক্ষগুলো নিয়মিত খোলা হতো। সেগুলো মন্দিরের দুজন পুরোহিতদের জিম্মায় থাকে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে এগুলো থেকে দেবতার জন্য তৈজসপত্র, অলংকার, ব্যবহার্য বের করা হতো।
মুদ্রার স্তুপ; ছবিঃ Kanigas

জরিপের প্রয়োজনে ৫টি গুহাকক্ষ খোলা হয়েছে- C, D, E, F এবং A, আর বাকি গুহাকক্ষগুলো খোলা হয় পরে। তাতেই যা আবিষ্কৃত হয়েছে, মাথা ঘুরে গেছে সবার। রিপোর্ট থেকে জানা যায় গুহাকক্ষ-C  তে ১,৪৬৯ প্রকার, গুহাকক্ষ- D তে ৬১৭ প্রকার, গুহাকক্ষ-E ও গুহাকক্ষ-F এ ৪০ প্রকার আর কেবলমাত্র গুহাকক্ষ ‘এ’ তে রয়েছে ১ লক্ষ ২ হাজার প্রকার দ্রব্য। যার প্রত্যেকটিই মহামূল্যবান। এর মধ্যে কয়েকটি নমুনা দিলে আপনাদের বুঝতে সুবিধা হবে হয়তো-
*কয়েকশো মূল্যবান হিরা, রুবি এবং অন্যান্য মহামূল্যবান পাথরে সজ্জিত সাড়ে ৩ ফুট লম্বা নিখাদ সোনার তৈরি মহাবিষ্ণু মূর্তি।
*অগণিত হীরা, রুবি, পান্না, নীলা খচিত একটি সোনার সিংহাসন যাতে অন্তত সাড়ে ৫ মিটার দীর্ঘ একটি মূর্তি স্থাপন করা যায়।
*১৮ ফুট লম্বা সোনার চেইন, ৫০০ কেজি ওজনের সোনার স্তূপ, ৩৬ কেজি ওজনের ঝালর, রত্নখচিত ১,২০০টি সোনার চেইন প্রভৃতি।
*তিনটে সম্পূর্ণ সোনার মুকুট যাতে মূল্যবান পাথর বসানো।
*এছাড়া নেকলেস, মুকুট, থালা, গ্লাস, চামচ প্রভৃতি তো আছেই।
আর আছে সোনার মোহর। নানা সময়ের রাশি রাশি সোনার মোহর রয়েছে গুহাকক্ষগুলোতে। এর মধ্যে রোমান সাম্রাজ্যের কয়েক হাজার মুদ্রা, নেপোলিয়নের অজস্র মুদ্রা, আর খ্রিস্টপূর্ব ২০০ সালের ১,৯৫,০০০টি স্বর্ণমুদ্রা যেগুলোর ওজন সব মিলিয়ে ৮০০ কেজি। এতেও যদি আপনার হা যদি যথেষ্ট বড় না হয় তবে চলুন গুহাকক্ষ-B এর গল্পটা শুনে আসি।
বলরাম যে জায়গায় গাভী দান করেছিলেন, সেইখানেই গুহাকক্ষ- A ও B অবস্থিত এমনটিই ভক্ত এবং পুরোহিতদের বিশ্বাস। বলরাম ভগবান বিষ্ণুর একজন অবতার ছিলেন। তিনি যখন এখানে ভ্রমণে আসেন দেবতারা তাকে অনুরোধ করেন, তিনি যেন তাদেরকে ভগবানের আরাধনার সময় সেখানে থাকার অনুমতি দেয়।
গুহাকক্ষ-বি এর দরজা; ছবিঃ Ancient Origins

লোকশ্রুতি মতে, এরপরে তারা গুহাকক্ষতে আশ্রয় নেয়। এখানে সেইসাথে নাগেরাও আশ্রয় নেয়। রাজপরিবারের বিশ্বাস, এই গুহাকক্ষ খুললে ঘনিয়ে আসবে ভয়াবহ বিপদ। অবশ্য জরিপ কর্তৃপক্ষ এটি খোলার চেষ্টা করেছিল। তারা ২০১১ সালের প্রবেশ মুখের লোহার খুলে ভেতরে ঢোকেন। এরপরে পাওয়া যায় ভারী কাঠের দরজা। তারপরে আবার আসে লোহার দরজা। সেই লোহার দরজায় ভয়ানক গোখরো সাপের ছবি খোদাই করা।
এই ছবি দেখে ট্রাভাঙ্কোর রাজপরিবার, পুরোহিত এবং ভক্তরা দরজা না খোলার জন্য অনুরোধ করতে থাকে। ফলে জরিপ কমিটি এখনই দরজাটি না খুলে বিশেষজ্ঞের সাথে আলাপ করার সিদ্ধান্ত নেন। পরে তারা ধর্মীয় রীতিতে ‘অষ্টমঙ্গল দেবপ্রশ্নম’ করার পরে মন্দিরের দরজা খোলার সিদ্ধান্ত নেয়।
কিন্তু যিনি মন্দিরের বিষয়টি আদালতে এনেছিলেন সেই আইনজীবী পি টি সুন্দররাজন আচমকা মারা যান। তারপরে আর কখনোই এই গুহাকক্ষটি খোলা হয়নি। জানা হয়নি কী আছে এর ভেতরে!
Feature Image:  Forbes

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ দেখতে গিয়ে মৌমাছির কামড় খাওয়ার স্মৃতি

কালাপোখারির অস্থিরতায়: সান্দাকফুর পথে