পদ্মহেম ধাম: সাঁইজির বারামখানা

শীত আসলে ক্যাম্পিংয়ের আমেজ নিতে প্রতি বছর আয়োজনে কিছু না কিছু থাকে। শীতের উষ্ণতা অনুভব করতে একটা ক্যাম্পিং ট্রিপ বড় প্রয়োজন। সাধু সংঘের মতো ঘুরে ফিরে একই চক্রপাকে বন্দী হয়ে গেছি। নিজ গণ্ডির বাইরে আমার আর যাওয়া হয় না। আমার ভ্রমণ সংগী বদলায় কিন্তু তিনটা নাম সব সময় কমন থাকে যে কোনো ট্যুরে। ঈসমাইল হোসেন, চাঁন মিয়া, জুয়েল রানা ভাই। এবারও প্রশ্নটা কমন পড়েছে। কামলা দিয়ে অস্থির জুয়েল রানা ভাইয়ের ফোন পেলাম একদিন। প্ল্যান হলো নতুন একটা জায়গায় ক্যাম্পিংয়ের আয়োজন করবো। ভুলতায় নাকি খুঁজে পেয়েছে সেই অমূল্য রতন।

যথারীতি প্ল্যান হলো। ভুলতার স্থানীয় ছেলে আমাদের আয়োজক৷ আর আমরা গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরছি ফিরছি। একদিন আগে জুয়েল রানা শোনালেন আয়োজকের চাচা এক্সিডেন্ট করেছে তাই সেখানে আপাতত প্ল্যান বাদ৷ প্ল্যান বাদ হতে পারে কিন্তু ক্যাম্পিংয়ের প্লেন তো ছুটে যাবে না। তাই মশাই ক্যাম্পিং গ্রাউন্ড সুইচ করে নিয়ে আসলাম পদ্মহেম ধাম। সাঁইজির দর্শনের বারামখানা মনের দাওয়াই নিয়ে বসে ছিল। সব কিছু অনিশ্চিত। প্ল্যান ভন্ডুল হওয়ায় সবার মধ্যে গা ছাড়া ভাব। তবুও কীভাবে কীভাবে জানি সব কিছু মিলে গেল৷ তাহান ভাইও জুটে গেল আমাদের সাথে৷ আমরা ৫ জনের দল শুক্রবার সকাল ১১.৩০ এর দিকে গুলিস্তান থেকে রওনা হলাম সিরাজদিখানের পথে।

ছবি – আশিক সারওয়ার

বাস চলছে হেলে দুলে মনের আনন্দে যেন আজ তার কোনো কিছুতেই নেই তাড়া। নামাজ ছুটে যাওয়ার ভয় ছিল কিন্তু সিরাজদিখান বাজারে আসার পর জানতে পারলাম ১.৪৫ এ জামাত। বাস আমাদের নামিয়ে দিয়েছে ঠিক পাঁচ মিনিট আগে। কোনো রকম ওযু সেরে ২ রাকাত জুম্মার ফরজ আদায় করে নিলাম। এরপর দুপুরের খাবার খেতে ঢুকলাম বাজারের এক গরিবী হোটেলে। জেলা, উপজেলা শহরের গরীবি হোটেলেগুলো খাবারে যেন গভীর মমতা ঢেলে দেয়৷ ঢ্যাড়শ ভাজিটা এত ফ্রেশ ছিল মুখে যেন এখনও লেগে আছে৷ আর ঝাল ঝোলের সাথে মুরগী আর ডাল।

একটা তোফা খানা দিয়ে রওনা হলাম সাঁইজির বারামখানার উদ্দেশ্যে। আমাদের অটো নামিয়ে দিল রামানন্দ কবরস্থান নামক এক জায়গায়। ওপারে সাঁইজি ডাকে এপারের টান ছেড়ে। হেড়ে গলায় গান গাইতে ইচ্ছে করলেও তা গলা চাপা দিলাম। আশেপাশের প্রাণীকূল বা মানুষের কানের যন্ত্রণার কারণ হতে চাই না। বালুর চর থেকে নৌকা দিয়ে পার হয়ে পৌঁছে গেলাম সাধু সংঘের আখড়ায়। এখানে লালন সাঁইজির দর্শন আকাশে ভেসে বেড়ায়। কী সুন্দর চারপাশের পরিবেশ।

এই আমাদের পদ্মহেম ধাম। যে দিকে তাকাই সবুজ ঘাসের মাঠ, সামনে মায়াবতী ইছামতি নদী। আশ্রমের ভেতরে সবুজ প্রকৃতিতে ঘেরা, গাছগাছালির ফাঁকে ফাঁকে পাখিরা করছে খেলা। ঢোকার পথে দেখতে পেলাম একতারার ভিত্তিপ্রস্তর যাতে সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের নাম লেখা। আশ্রমের ভেতরে দোতলা একটা টিনের ঘর পরিলক্ষ করলাম যেথায় গানের আসর বসে। লালন গানের বিদ্যালয়ের পাশেই রয়েছে লালন সাঁইয়ের বটতলা।

আমাদের চাঁন মিয়া ছবি দেখে কবির ভাইকে চিনতে পারলো৷ তার কোনো বন্ধু ফটোগ্রাফির ওস্তাদ। বন্ধুকে ফোন দিয়ে জানালো হলো আমরা এসেছি আশ্রমে। সে জানালো কবির ভাইকে। একটু পর জালাল ভাই নামে আধা কাঁচা পাকা দাড়ির চল্লিশ ঊর্ধ্ব এক ব্যক্তি হাজির হলেন।

ছবি – আশিক সারওয়ার

পরিচয় পর্ব শেষে গাছে হ্যামক ঝুলিয়ে প্রকৃতির বুকে ঝুলন্ত দুলুনি খেতে খেতে দেখছি সাঁইজির বটতলা। কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম এই অঞ্চলে কি সাঁইজি আদৌ এসেছিলেন? প্রকৃতির বুকে বিছানা পেতে হাওয়ায় দোলায় আমাদের হ্যামক।

প্রকৃতির মাঝে শুয়ে আছে তার পুত্ররা। জল-জংগলের কাব্য শুনতেই তো শহর থেকে এতদূরে। দেখতে দেখতে সাড়ে চারটা বেজে গেল। এবার তাঁবু পিচ করার সময় হয়ে গেল। শেষ বিকেলে আকাশের হাল্কা সূর্যের গোলাপী আভা যখন কেবল আকাশ ছুঁয়েছে তখনই আমাদের তাবু পিচ করতে দেখে ভিড় হয়ে গেল উৎসুক জনতার।

ছবি – চাঁন মিয়া

আকাশটা তার নীলচে আভা হারিয়েছে, এ যেন পূর্ণিমার আগমনী বার্তা। ইংরেজীতে তার বলিহারি নাম ফুল মুন। আমাদের সাথে চাঁন মিয়া আছে। এক মুনকে সামলানো কঠিন আবার ফুল মুন। উনি ক্যাম্পিং করতে এসেছেন ট্যুরিস্ট সেজে৷ কাঁথা-বালিশ থেকে শুরু করে কিছুই আনেনি। রাতের বেলা হ্যামক জড়িয়ে উনি তাবু বাস করেছেন। আমি, তাহান, জুয়েল ভাই তাবু পিচ করছি আর আমাদের টাইম ল্যাপস ভিডিও তৈরি করে দিচ্ছেন চান মিয়া। কেসুয়ার ক্লিপ সিস্টেম তাবু হওয়ায় খুব সহজেই আমার আর জুয়েল ভাইয়ের তাঁবু দাঁড় হয়ে গেল।

ভেজাল বাঁধলো ঈসমাইল ভাইয়ের তাঁবু নিয়ে। সেই আদি কালের ফুটো সিস্টেম। ফুটোর ভেতর ডান্ডি ঢুকাও, এরপর খাঁড়া করাও। বেচারা ঈসমাইল ভাই একা খাঁড়া করতে পারলেন না। জুয়েল ভাইয়ের সাহায্যে দাঁড় হলো তার তাবু। উৎসুক জনতা ততক্ষণে আমাদের তাঁবুর আশেপাশে আরাম করে বসে পড়েছে৷ সময় চলে যায় তাদের সাথে গল্প গুজব করে৷

কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল, টের পেলাম না। এবার একে একে জনতা ফিরে যায় নিজ নীড়ে৷ আশ্রমে নেট লাইটের ব্যবস্থা করে ব্যাডমিন্টন খেলা হচ্ছে৷ হালকা আলোর ছটা এসে পড়ছে ক্যাম্প সাইটে। বারবিকিউ হবে কত স্বপ্ন ছিল। প্ল্যান চেঞ্জ হবার ফলে সব কিছুই ভজঘট হয়ে গেল। তবে আজ শুক্রবার বিধায় ধ্যান করতে শহর থেকে তকবির ভাই এসেছেন। ফকিরি লালনের বাণীর একনিষ্ঠ ভক্ত আমাদের তকবির ভাই৷ মাগরিবের পর পর এই আশ্রমে গানের আসর বসালেন।

দোতারা নিয়ে লালনের গানে তাল দিতে তকবির ভাইয়ের সাথে আমরা হাজির। গান হচ্ছে, আড্ডা হচ্ছে। সাথে সাথে কথা হচ্ছে মানব ধর্ম নিয়ে৷ সাঁই’জির কথাগুলো কত যে গভীর অর্থপূর্ণ তা ভেতর থেকে অনুভব করতে হয়। মানুষ ও মানবতার মুক্তির কথা বলে গেছেন সাঁইজি। আজ সেই মানবতা কোথায়? জলসার ফাঁকে তকবির ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এই অঞ্চলে কি কখনও লালন এসেছিল। তার মুখে এক চিলতে হাসি, রহস্য নিয়ে বললেন এখানে সাঁইজির দর্শন এসেছে।

ছবি – আশিক সারওয়ার

গানের জলসা ভাঙার পর তকবির ভাই জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা রাতে কী খাবেন। বালুর চর বাজারের চর নিয়ে গ্রামের দুই দলের মাঝে বিশাল মারপিটের ফলে ১৮ জন আহত হয়েছে বিধায় কেউ বাজারের দিকে যাবার সাহাস পাচ্ছে না। আমাদের কোনো খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। সমাধান পেয়ে গেলাম জালাল ভাইয়ের কাছে। সে বললো গ্রামের এক চাচীর কাছ থেকে রুটি হালুয়া বানিয়ে আনতে পারবেন।

আমরা আশ্রম থেকে বের হয়ে জালাল ভাইয়ের কাছে আবার ডিম কিনে ধরিয়ে দিলাম। যদি আন্ডা সিদ্ধ করে আনতে পারে মন্দ হয় না। ফিরে এলাম ক্যাম্প সাইটে। কুয়াশার কারণে মাঠের ঘাসে শিশির জমেছে। স্লিপিং ম্যাট হিসাবে এলুমিনিয়াম ফয়েল এনেছিলাম। তা বিছিয়ে শুয়ে বসে গল্প গুজবের আরেকটা আসর বসলো।

৮.৩০ টার দিকে ফিরে এলেন জালাল ভাই। রুটি, সুজির হালুয়া, ডিম ভাজা নিয়ে। রুটির সাইজ দেখে অবাক হয়ে নির্বাক। রুমালি রুটি সাইজে চারটা রুটির সমান। আর এগুলো বিক্রি হয় কেজি হিসাবে। বিশাল ঢাউস সাইজে রুমালি রুটি ভক্ষণ করছি ডিম ভাজা আর সুজির মিশ্রণে। আহ, জীবন অপূর্ব! খাওয়ার পর্ব শেষে জালাল ভাই বললেন আশ্রমে গানের আসর বসেছে আবার যাব কিনা। সবাই ক্লান্ত, গায়ে সবার আমেজী আলসামি। জালাল ভাইকে ধন্যবাদ দিয়ে আমরা সবাই থেকে গেলাম ক্যাম্প সাইটে৷ উনি বললেন উনি মজমা থেকে ১১টার মধ্যে ফিরে আসছেন।

ভরা চন্দ্রিমা পূর্ণ যৌবন নিয়ে পৃথিবীর বুকে নেমে এসেছেন। এক থালি চাঁদের সংস্পর্শে চন্দ্র স্নানে সিক্ত এই মন গাটা এলিয়ে দিল ঘাসের মাঠে৷ উপরে আকাশে নিচে শিশির ভেজা ঘাস। আমি নিস্তব্ধ হয়ে চেয়ে রই আকাশের দিকে৷ চন্দ্রলোকিত প্রকৃতি৷ চাঁদের আলোয় চারপাশ বড় অপার্থিব মনে হয়৷ পাশে বয়ে যাওয়া ইছামতি যেন এক কল্পনার নদী মনে হচ্ছে। নিঃস্বার্থ প্রকৃতি তার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দিয়ে থমকে দাঁড়ায় দৃষ্টির গভীরতা ছাড়িয়ে৷ জীবন যেন থমকে দাঁড়ায় এখানে৷

আমি এক যাযাবর প্রকৃতির মাঝে আজ বেঁধেছি আমার ঘর৷ তবে বদমাশ চাঁন মিয়ার জ্বালায় ফুল মুন উপভোগ করার জো নেই। খোঁচাখুঁচির উপর কোনো ডিগ্রি হলে উনি নিশ্চিত পি.এইড.ডি পর্যায়ের ছাত্র হতেন। জালাল ভাই আবার ফিরে এলেন। তবে ততক্ষণে ঈসমাইল ভাই ক্লান্ত হয়ে তাঁবুর ভিতর থেকে জাহাজ চালাচ্ছেন। মনে হয় কোনো ভয়াবহ জন্তু নেকড়ে মানব ফিরে এসেছে পৃথিবীর বুকে। উনি কি ঘুমের মাঝেও ন্যাচারাল ভিউ দেখেন?

ছবি – আশিক সারওয়ার

শীতে কাঁবু হয়ে বার‍োটা বাজার একটু আগেই সবাই তাঁবুর ভেতর ঢুকে গেলাম। একটু পর শোনা যাচ্ছে সবার অদ্ভূত নসিকা গর্জন। আমি বোধহয় মেশিন চালিয়েছিলাম মাঝ রাতে। তবে নিজের নাকের ডাক কি আর টের পাওয়া যায়? তাঁবুর ভেতর শুয়ে শুয়ে শিয়ালের ডাক শুনি, কাছে হয়তো ডাকছে কোনো হুতুম পেঁচা। তবে ক্যাম্প ফায়ার না করেও আমরা নিরাপদ৷ ঈসমাইল ভাইয়ের নসিকা গর্জনে শিয়াল ভয়ে পালিয়েছে৷ নেকড়ে মানবের সাথে কি আর লড়াই চলে? ক্লান্ত এই দেহ কিছুক্ষণ পরে চলে গেল ঘুমের রাজ্যে।

খুব ভোরে যখন ঘুম ভাঙলো প্রথমেই দেখলাম আমাদের ঈসমাইল ভাই ন্যাচারাল ভিউ পেয়ে গেছেন। ক্যামেরা নিয়ে এপাশ ওপাশ দৌড়াদৌড়ি করছেন। আমাদের তাঁবু থেকে খানিকটা দূরে এক প্রৌঢ় এই কুয়াশা ভেজা সকালে তৈরি করছেন ভাপা পিঠা৷ জীবনে আর কী চাই? গাপুস গুপুস হাত মুখ না ধুয়ে ভাপা পিঠা পেটে চালান দিচ্ছি৷ দূরে তাহান ভাই অসহায়ভাবে চেয়ে ছিল। সে আবার জল বিয়োগ করে হাত মুখ না ধুয়ে কিছু খেতে পারেন না৷

ইছামতি নদীর পাড়ে ছোট বাজার জমে গেল। বাজারে টাকি মাছ থেকে শুরু করে বোয়াল মাছ পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি৷ সবই এই নদীর মাছ৷ সকাল বেলা গ্রামের জনজীবন মানুষে মুখরিত৷ গ্রামের সকালগুলো শহরের মতো হয় না৷ তাদের সকাল শুরু হয় ফজর নামাজের পর থেকেই। সকালে ঘাসের ডগায় শিশির আর কুয়াশার মাঝে আমাদের ক্যাম্প সাইট গুটানোর কাজ শুরু হলো। প্রথমেই ময়লা পরিষ্কার এরপর তাঁবু গুটানো। শেষ হলো একটা মনমুগ্ধকর তাঁবু বাসের৷ আবার হয়তো ঘর বাঁধবো বাংলার বুকে অন্য কোনো প্রান্তে৷ এবার বিদায়ের পালা। ততক্ষণ পর্যন্ত না হয় গল্পগুলো জমে থাক৷

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ যেন স্বপ্নের ঘর!

দালাল বাজার: এক ইতিহাসের হাতছানি