অপার্থিব পাঁচটি দৃশ্যপট

অনেক কিছুই সব সময় দেখতে একরকম লাগে না। যদিও কিছু কিছু জায়গায় গেলে মনে হয় যেন কোনো সাই-ফাই মুভির সেটে দাঁড়িয়ে আছি। তবে অপার্থিব সৌন্দর্যমন্ডিত দৃশ্যপটের অঞ্চলগুলো কিন্তু আমাদের এই পৃথিবীরই। কিন্তু ওসব জায়গায় গেলে মনে হয় যেন অন্য কোনো পৃথিবীর মাটিতে দাঁড়িয়ে আছি। নিচে এমনই কিছু অপার্থিব দৃশ্যপট নিয়ে আলোচনা করা হলো।

সালার ডি ইউনি, বলিভিয়া

সমুদ্রপৃষ্ঠের ৩,৬৫০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত বলিভিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমের নির্জন আন্দিজে অবস্থিত সালার পৃথিবীর সবচেয়ে বড় লবণের খনি। ধবধবে সাদা এবং পুরোপুরি সমতল এই মরুভূমিটি দশ হাজার বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। কিছু কিছু জায়গায় পানিপূর্ণ লবণের ঢিবিগুলো ১২০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়ে থাকে। ঢিবির বাইরের পৃষ্ঠের মোটা পরতের কারণে ঢিবিগুলোকে তখন অনেকটা পিরামিডের মতো দেখায়।

সালার ডি ইউনি, বলিভিয়া; source – Peky

সাদা পৃষ্ঠের সারি সারি লবণের পিরামিড দেখলে পুরোই অপার্থিব একটা অনুভূতি পাওয়া যায়। পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর লবণগুলো এত দ্যুতি দেয় যে মনে হয় যেন বরফ বা তুষার জমে আছে মরুর বুকে। একদম কাছে গিয়ে না দেখলে বোঝার উপায়ই থাকে না যে ওগুলো শুকিয়ে যাওয়া লবণের স্তুপ। আবার ভারী বৃষ্টিপাত হলে ঢিবিগুলো ভেঙে ছড়িয়ে পড়ে মরুর বুকে। আর বর্ষণের পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর সালার পরিণত হয় প্রকাণ্ড এক আয়নার ভূমিতে।

চকোলেট হিলস, ফিলিপাইন্স

এই পরাবাস্তব চকোলেট ঢিবিগুলো পুরো ফিলিপাইনেই খুব বিখ্যাত। শুষ্ক মৌসুমে ঝোপঝাড়ের শুকনো পাতা এগুলোকে ঢেকে রাখে বলে এগুলোর এই নাম দেওয়া হয়েছে। ঢিবিগুলো দেখলে মনে হয় যেন সারি সারি এলাকা জুড়ে চকোলেটের টুকরো পড়ে রয়েছে।

চকোলেট হিলস; source – unusualplaces.org

এগুলো দেখলে প্রাগৈতিহাসিক আমলের অনুভূতি পাওয়া যায় যেন। তবে এগুলো কিন্তু সত্যি বাস্তব। ভৌগলিকদের মতে শতশত বছর ধরে পচনশীল কোরাল এবং চুনাপাথর জমে তৈরি হয়েছে এই চল্লিশ মিটার উঁচু ঢিবিগুলো। ধারণা করা হয়, ওখানে প্রায় এরকম ১,২৬৮টি ঢিবি রয়েছে। অবশ্য স্থানীয়দের গল্প অনুযায়ী, মনুষ্য প্রেয়সীর মৃত্যুতে ভগ্ন হৃদয়ের এক জায়ান্টের কান্নায় তৈরি হয়েছে এই ঢিবিগুলো। আবার অন্যদের মতে, এগুলো কোনো জায়ান্ট কারবাওয়ের (বড় আকৃতির জলহস্তীর) ফেলে যাওয়া বিষ্ঠায় তৈরি হয়েছে। ঢিবিগুলো দেখতে কেমন লাগবে সেটা আসলে নির্ভর করে দিনের কোন সময়ে দেখা হচ্ছে সেটার ওপর। দিনের কড়া আলোয় পড়া ছায়ায় দেখতে ঢিবিগুলোকে তেমন বিশেষ কিছু মনে হয় না। তবে সন্ধ্যায় বা ভোরের মৃদু আলোয় ঢিবিগুলোকে দেখে অন্য কোনো পৃথিবীর দৃশ্য বলে মনে হয়। বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে (ডিসেম্বর-মে মাস পর্যন্ত)।

সিঙ্গি’স ব্রেড-নাইফ ফরেস্ট, মাদাগাস্কার

মাদাগাস্কারের পশ্চিম দৃশ্যপট জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে খাঁজকাটা চুনাপাথরে তৈরি চাকুর মতো ধারালো সিঙ্গি’স ব্রেড-নাইফ ফরেস্ট। চুনাপাথরগুলো বনে তৈরি করেছে বেশ কিছু অদ্ভুত গুহা এবং শৃঙ্গের।

সিঙ্গি’স ব্রেড-নাইফ ফরেস্ট, মাদাগাস্কার; source – kensingtontours.com

বনটা দেখতে খুবই শুষ্ক এবং বাসের অযোগ্য মনে হয়। তারপরও এখানে খুবই অসাধারণ ওয়াইল্ডলাইফ গড়ে উঠেছে। এমনকি মোটা মোটা বোবাব গাছও স্থান করে নিয়েছে প্রায় অ্যালিয়েন এই পরিবেশে। খাঁজকাটা ধূসর পাথরের দৃশ্যপটে ক্ষুদ্রাকৃতির লাল পিঁপড়া এবং পাথরের খাঁজে গজানো অর্কিডগুলোকে দেখতে অসম্ভব রকমের সুন্দর দেখায়।

সিঙ্গি’স ব্রেড-নাইফ ফরেস্ট, মাদাগাস্কার; source – mikluha_maklai

ভ্যালি অফ দ্য মুন, চিলি

কাউকে যদি মঙ্গলগ্রহের ভূ-পৃষ্ঠ এবং ভ্যালি অফ দ্য মুনের দুটো ছবি দিয়ে বলা হয় দুটো একই জায়গার ছবি নাকি ভিন্ন জায়গার – তাহলে সে সেটা আলাদা করতে পারবে না। এটার জন্য অবশ্য কাউকে দোষও দেওয়া যায় না। চিলির আতাকামা মরুভূমিতে অবস্থিত এই উপত্যকাটি আসলেই অপার্থিব। অভূতপূর্ব চাঁদের দৃশ্যপটের জন্য উপত্যকাটার এই নাম দেওয়া হয়েছে। বাতাসে ক্ষয়ে যাওয়া বালিময় এই উপত্যকাটি সত্যিকার অর্থেই চিলির সবচেয়ে ব্যতিক্রমি এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি ট্যুরিস্ট স্পট। উপত্যকাটিতে ক্লাইম্বিংয়ের সুযোগও রয়েছে।

আরোহণ করে ওপরে উঠে বসে নিচের দৃশ্য দেখতে অস্বাভাবিক রকমের সুন্দর দেখায়। তবে উপত্যকার দৃশ্যটা সবচেয়ে সুন্দর দেখায় ভোর এবং সন্ধ্যার দিকে। এই সময়টায় উপত্যকার দৃশ্যপটটা দেখতে লালচে বর্ণের দেখায়। এজন্যেই মঙ্গল গ্রহের সাথে তুলনাটা চলে আসে। তাছাড়া উপত্যকার ভৌগলিক বৈশিষ্ট্যও ব্যতিক্রমি হওয়ায় নাসাও এই জায়গাটাকে মার্স রোভারের টেস্ট ফিল্ড হিসেবে বেছে নিয়েছে। সান পেদ্রোর ট্যুর অপারেটররা প্রতিদিনই এখানে সান্ধ্যকালীন ট্রিপের আয়োজন করে থাকে। এছাড়াও উপত্যকাটি সাইক্লিংয়ের জন্যও বেশ ভালো একটি জায়গা।

ভ্যালি অফ দ্য মুন; source – Jiann

সাই-ফাই প্ল্যান্টস অফ মাউন্ট কেনিয়া, কেনিয়া

কিকুয়ো জাতির মানুষেরা মাউন্ট কেনিয়াকে দেবতাদের বসতবাড়ি হিসেবে গণ্য করত। তাদের ধারণা ছিল দেবতারা তাদের আত্মিক অনুপ্রেরণার জন্য পর্বতের চূড়ায় ধ্যানমগ্ন থাকত। নারো মোরু ট্রেইল ধরে এগুলে তিনদিনের মাথায় আফ্রিকার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠলে তাদের ধারণাকে অতটা ভুলও মনে হবে না। চূড়ায় উঠলে প্রথমেই চোখে পড়বে পর্বতের চুড়ায় জন্মে থাকা অপার্থিব এক উদ্ভিদকুলের মেলা। জায়গাটা প্রথমে দেখলে মনে হবে যেন পঞ্চাশের দশকের কোনো কল্পবিজ্ঞান লেখক এটার ডিজাইন করেছে। কিন্তু এই সাজসজ্জার পুরোটাই প্রকৃতির তৈরি করা।

সাইফাই প্ল্যান্টস অফ মাউন্ট কেনিয়া, source – roughguides.com

প্রথম দেখায় ‘পানি ধরে রাখা বাঁধাকপি’ বা ‘উটপাখির পালকের মতো গাছ’ দেখতে অনেকটা অবিশ্বাস্য লাগতে পারে। তবে এই জায়গাটা জুড়েই ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য বিশালকৃতির গুল্ম ও আগাছা জাতীয় উদ্ভিদ। একমাত্র মাউন্ট কেনিয়ায় জন্মানো জায়ান্ট লোবেলিয়াই পৃথিবীর একমাত্র উদ্ভিদ যেটাকে ‘ফুটফুটে উদ্ভিদ’ হিসেবে বিশেষায়িত করা যায়। এছাড়াও রয়েছে জায়ান্ট হেদার, জায়ান্ট গ্রাউন্ডসেলের মতো আরো বিশাল বিশাল উদ্ভিদ।

feature image source : Jiann

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

দীননাথ চক্রবর্তীর গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির আদ্যোপান্ত

দেবতাখুম নামক স্বর্গীয় পথটির উপক্রমের খোঁজে