এক বিকেলে ইতিহাস ভ্রমণ: আর্মেনিয় গির্জা

আরমানিটোলা। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম এটি। এর ‘টোলা’ শব্দটি হিন্দী। মূলত আর্মেনিয় বণিকদের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত হওয়ায় জায়গাটির নামকরণ করা হয় আরমানিটোলা, যার অর্থ আর্মেনিয়রা যেখানে বাস করে।

অথচ আরমানিটোলায় গিয়ে লোকজনকে যদি জিজ্ঞাসা করেন, আর্মেনিয় চার্চ  কিংবা আর্মেনিয় গির্জাটা কোথায়, তেমন ভালো উত্তর পাবেন না। শুধু গির্জা কোথায় বললে যে কেউই দেখিয়ে দিতে পারে গির্জার অবস্থান। অন্যদিকে আর্মেনিয়রা হারিয়ে গেছেন স্মৃতির পাতায় কিংবা বিস্মৃত হয়েছেন এলাকার নামের মধ্যেই।

অট্টালিকার মাঝে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা আর্মেনিয় গির্জা; ছবি সূত্রঃ Zakar Iskandaryan

ভৌগোলিকভাবে আর্মেনিয়ার অবস্থান দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলে, ইরান ও তুরস্কের গা ঘেঁষে। ষোড়শ শতক থেকেই বাংলায় আর্মেনিয় ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি শুরু হয়। এই ব্যবসায়ী সম্প্রদায় মূলত আমদানী-রপ্তানী ব্যবসায় জড়িত ছিল। বলা হয়ে থাকে, ইংরেজদের শাসনামলে বাংলার সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মালামাল বিদেশ পাড়ি দেয় আর্মেনিয় বণিকদের হাত ধরেই।

ঢাকায় কবে আর্মেনিয় ব্যবসায়ীদের আগমন ঘটে তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি, তবে আর্মেনিয়দের কবরস্থানের শিলালিপি হতে ধারণা করা যায়, এই উপস্থিতির সূচনা অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ থেকে। সেই থেকে এই অঞ্চল আরমানিটোলা নামে পরিচিত।

বর্তমানে আরমানিটোলায় গিয়ে গির্জার সামনে দাঁড়ালে হঠাৎ বেশ অবাকই হতে হয়। আশেপাশে যে যেখানে যতটুকু জায়গা পাচ্ছে তার উপরই বানিয়ে ফেলছে উঁচু উঁচু বাড়িঘর, তার মাঝে হঠাৎ করেই বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গার মাঝে একাকী দাঁড়িয়ে আছে আর্মেনিয় গির্জা। গির্জার গেটের পাশে ইংরেজিতে লেখা ‘Armenian Church 1781’। এরকম চট করেই সোয়া দুইশ বছরেরও পুরনো নিদর্শনের সামনে দাঁড়িয়ে পড়লে কারই না রোমাঞ্চ অনুভূত হয় বলুন!

সোয়া দুইশ’ বছরেরও পুরনো নিদর্শনের সামনে দাঁড়িয়ে! ছবি সূত্রঃ লেখক

আমি আর আমার বন্ধু ক্যামেরা নিয়ে এসেছিলাম ছবি তোলার আশায়, কিন্তু তখনই ঢুকতে পারি না বরং কেয়ারটেকার সাহেব জানান, বর্তমানে ছবি তোলা সম্পূর্ণ নিষেধ। তাই কখন ভেতরে যেতে পারবো সেই আশায় গেইটের বাইরে দাঁড়িয়েই গির্জার যতটুকু যা দেখা সম্ভব সেগুলো দেখতে থাকি।

প্রথমেই নজরে আসে গির্জাটির কারুকাজখচিত গেইটটি। রোদের আলোয় স্বর্ণের মতো ঝিকিমিকি করছিল যেন।

কারুকাজখচিত গেইট, কেয়ারটেকার সাহেবের দেখভাল করা; ছবি সূত্রঃ লেখক

এরপরই একইরকম আলোকচ্ছটা টের পাই গির্জার চূড়ায়।

মিনিট বিশেক অপেক্ষার পর ক্যামেরা ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখা এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বেরিয়ে যাওয়ার শর্ত সাপেক্ষে কেয়ারটেকার সাহেব আমাদের গির্জার এলাকার ভেতরে যেতে দেন। আমাদের সাথে আরো কয়েকজন দর্শনার্থী ছিলেন আর প্রবেশপথেই ছিল এই বিশেষ সতর্কবার্তা।

সতর্কবার্তা! পবিত্রতা রক্ষার অনুরোধ; ছবি সূত্রঃ লেখক

গির্জার ভেতরে পা রেখেই যেন স্মৃতির সাগরে হারিয়ে যাওয়ার শুরু! আগেই বলেছি যে এই গির্জাটির নির্মাণকাল ১৭৮১ সালে, তবে খুব সম্ভবত এর আগে তাদের একটি ছোট উপাসনাগার ছিল। গির্জাটি যেখানে আছে, সেখানে আগে থেকেই ছিল আর্মেনিদের গোরস্থান।

গির্জা নির্মাণের জন্য গোরস্থানের আশেপাশে যে বিস্তৃত জমির প্রয়োজন ছিল তা দান করেন আগা মিনাস ক্যাটচিক। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, গির্জাটি নির্মাণে সহায়তা করেন চারজন- মাইকেল সার্কিস, অকোটাভাটাসেতুর সিভর্গ, আগা এমনিয়াস এবং মার্কার পোগোজ। 

গির্জাটি যেখানে আছে, সেখানে আগে থেকেই ছিল আর্মেনিদের গোরস্থান।  ছবি সূত্রঃ Sanjoy Ghosh

গির্জাটি লম্বায় সাড়ে সাতশ ফুট, চারটি দরজা, সাতাশটি জানালা সমৃদ্ধ। বলে রাখা ভালো, এটি কোনো ক্যাথলিক গির্জা নয়।

গির্জার পাশেই ছিল একটি ঘড়ি ঘর, যা নির্মাণ করে দিয়েছিলেন জোহানস কারুপিয়েত সার্কিস। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ভেঙে গিয়েছিল ঘড়ি ঘরটি। এখন কেবল অবশিষ্ট রয়ে গেছে সেই সূর্যঘড়ির ধ্বংসাবশেষ।

এই সূর্যঘড়িতে ছায়া দিয়ে নির্ধারণ করা হতো সময়; ছবি সূত্রঃ  Muhatashamon Nion

গির্জাটির গোটা প্রাঙ্গণ এমনকি বারান্দাতেও মেলে নানারকম কবরের এপিটাফ। বেশীরভাগ কবরের উপরই লেখা ছিল বাইবেলের নানা উদ্ধৃতি কিংবা শুভকামনা। এপিটাফগুলো পাথরের এবং এর বেশীরভাগই কিনে আনা হয়েছিল কলকাতার ওয়েলেসলি স্ট্রিট থেকে।

আমরা কবরগুলোর এপিটাফ দেখে বোঝার চেষ্টা করছিলাম সবচেয়ে পুরনো কিংবা সবচেয়ে কাছাকাছি সময়ের কবর রয়েছে কোনটি। খেয়াল করলাম এপিটাফে লেখা শুভেচ্ছা বাণীগুলোর বেশীরভাগই আর্মেনিয় ভাষায় লেখা, তবে অনেকগুলোর সাথেই ইংরেজি অনুবাদও দেওয়া ছিল।

পাথরের উপর নকশা করা এপিটাফ; ছবি সূত্রঃ Гаек Петросян

সেগুলো দেখতে দেখতেই চোখ পড়লো, অপূর্ব সুন্দর এক পাথরের মূর্তি। কেবল হাতটা ভাঙা, মূর্তিটার পায়ের কাছে একটা নোঙরের মতো বস্তুও ভাস্কর্যরূপে রয়েছে। নাম পড়ে দেখলাম, সমাধিটি ক্যাটচিক আভেটিক থমাস নামক এক ব্যক্তির।

এপিটাফে তাঁর স্ত্রী তাঁকে সম্মোধন করেছেন ‘Best of Husbands’ বলে। পরে জানলাম, মূর্তিটি সেই মৃত ব্যক্তির প্রিয়তমা স্ত্রী কলকাতা থেকে বানিয়ে এনেছেন। এখনো সেটা টিকে আছে, কেবল কোনো এক দুর্ঘটনায় মূর্তিটির ডান হাতটা ভাঙা।

ভাস্কর্যটি বানিয়ে আনা হয়েছিল কলকাতা থেকে; ছবিসূত্রঃ Dibbanjan Roy

গির্জার বারান্দা সংলগ্ন সমাধিগুলো দেখতে গিয়ে বন্ধ করে রাখা গির্জার জানালা দিয়ে ভেতরেও কিছুটা উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। সারি সারি বেঞ্চ আর পুরনো তৈলচিত্রের অংশবিশেষ দেখা গেল বলে মনে হলো। যেটি অংকন করেছিলেন পোগোজ স্কুলেরই সাবেক প্রধান শিক্ষক চার্লস পোট নামক এক অ্যাংলো ভদ্রলোক। তবে সেই তৈলচিত্রটি সামনাসামনি ভালোমতো দেখতে না পারার আক্ষেপ ছিল ঠিকই। 

মলিন হয়ে আসা পুরনো সেই তৈলচিত্র; ছবিসূত্রঃ Jacob Zwillinger

সেখান থেকেই ঘুরতে ঘুরতে চোখে পড়ে ছোট ছোট বেশ কিছু সমাধি। সমাধি ফলকে লেখা একই পরিবারের বিভিন্ন বয়সী পাঁচটি শিশু আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিল একইদিনে। প্রচণ্ড মন খারাপ নিয়ে আরো খেয়াল করি সেই সমাধিগুলোও প্রায় ১০০ বছরের পুরনো। এরকম ১৮০০-২০০৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সী আর্মেনিয়দের কবর দেখতে দেখতে গির্জা ঘুরে আবার গেইটের কাছে চলে যেতে যেতে লক্ষ্য করলাম আরেকটি সমাধি এবং তার এপিটাফের দিকে।

খুব সুন্দর করে পাথরের উপর নকশা করা সেই এপিটাফে দেখলাম খুব সুন্দর একটি কবিতা লেখা। যেকোনো বিখ্যাত কবির রোমান্টিক কবিতার চেয়ে কোনো অংশ কম নয় সেটি। সমাধিটি ম্যাক. এস. ম্যাকারটিক নামক এক যুবক আর্মেনিয়র, কিন্তু তাঁর জন্ম হয়েছিল পারস্যের কারমেনে আর মৃত্যু আমাদের বাংলাদেশের চাঁদপুরে।

এই যুবক ম্যাকারটিক প্রায় শতবর্ষ ধরে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন ঢাকার এই আরমানিটোলায়। তাঁর সমাধিটির এত সুন্দর সজ্জা করে দিয়েছিলেন তাঁরই হবু স্ত্রী। না জানি কতটা দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে এই শেষ স্মৃতিটুকু গেঁথে রেখেছিলেন তিনি। শাহজাহানের তাজমহল না হোক, সেই তরুণী হবু স্ত্রী করেছিলেন তাঁর যতটুকু যা সাধ্য ছিল তা থেকেই। তাতে ভালোবাসার কমতি ছিল না একটুও সেটাও তাঁর লেখা কবিতায় স্পষ্ট।

কবিতাটির ভাবানুবাদ-

“তাঁকে ভালোবাসতাম বলেই তাঁর অনুপস্থিতি আমার কাছে এতটা দুঃখের।
তবু স্মৃতিতে সে আছে ঠিক আমারই পাশে।
অজস্র নীরব অশ্রুর ভার নিয়ে
তাঁকে এখনো ভালোবাসি আমি,
তাঁকে স্মরণ করি,
পেতে চাই একান্ত আপন করে।”

চুপ করে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম এপিটাফের লেখাটার দিকে। আমার বন্ধুটি কেয়ারটেকারের কাছে গিয়ে সমাধিটির একটা ছবি তোলার অনুমতি চেয়েছিল। উল্টো জানানো হলো ছবি তোলা তো দূরের কথা; আমাদের সময় শেষ, এখন আমরা যেতে পারি। মাথা হেঁট করে চলে এলাম তাই।

দুর্ভাগ্যবশত সেই সমাধির ছবি পরে ইন্টারনেটেও খুঁজে পাইনি। গির্জা থেকে বের হয়ে কেয়ারটেকারের সাথে আলাপ জমানোর চেষ্টা করে জানা গেল, তার নাম শংকর। প্রায় ৩৫ বছর ধরে এই গির্জার দায়িত্বে আছেন। কিন্তু এই গির্জার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ কিংবা লোকবল পান না অভিযোগও করলেন আমাদের কাছে।

আমরাও কিছু করতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে বেরিয়ে এলাম স্মৃতির সমুদ্র পার হয়ে, বাস্তবে, বর্তমান ঢাকা শহরের অলিগলিতে।

যেভাবে যাবেন:

ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে সদরঘাটের বাসে করে নয়াটোলা বাসস্ট্যান্ড নেমে সেখান থেকে রিকশায় আরমানিটোলার গির্জা বললেই নিয়ে যাবে। এছাড়া ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে সিএনজি, পাঠাও কিংবা উবারে করেও সরাসরি যাওয়া যাবে এখানে।

দেখুন আর ঘুরে আসুন বহু বছরের সংরক্ষিত স্মৃতিমালা থেকে।

তথ্যসূত্র: 

১) https://goo.gl/6HSrde
২) https://goo.gl/k2AWLr
৩) ঢাকা সমগ্র ১, লেখকঃ মুনতাসির মামুন, পৃঃ নংঃ ১৯
৪) ঢাকা সমগ্র ১, লেখকঃ মুনতাসির মামুন, পৃঃ নংঃ ২০

ফিচার ছবি- মাহমুদ আবু নাসের

Loading...

2 Comments

Leave a Reply
  1. তথ্যসমৃধ্য সুন্দর লেখনী। এত বছরের পুরনো গীর্জা সম্পর্কে জানতে পারার সৌভাগ্য হলো, ঘুরে আসার ইচ্ছাও হলো। নিশ্চয়ই যাওয়া হবে।

    • নিশ্চয়ই! ঘুরে আসুন একদিন সময় করে। জাদুঘরের আড়ম্বরহীন এক জাদুঘর জায়গাটা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নাজিমগড়: পাহাড়ের পাদদেশে নান্দনিক এক রিসোর্ট

E T B এর ইভেন্ট: বোয়ালিয়া ঝর্ণা ভ্রমণ এবং মহামায়ায় কায়াকিং