ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের বিলাসী বিকেল

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে গিয়ে সময়টুকু উপভোগ করতে হলে আপনাকে একটু বিলাসী হতে হবে। অন্তত আমার তিনবারের ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দর্শনের অনুভূতি তেমনই। এলাম, দেখলাম, ছবি তুললাম আর ফেসবুকে আপলোড করে লাইক-কমেন্টে ভেসে গেলাম, সেটা আলাদা ব্যাপার। আপনি চাইলেই করতে পারেন। তবে তাতে করে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পুরো জায়গাটা জুড়ে যে নান্দনিকতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তার ছিটেফোঁটাও আপনি বুঝতে বা উপভোগ করতে পারবেন না।

আবার যারা হার্ডকোর ট্র্যাভেলার তাদের কাছেও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল অতটা আকর্ষণীয় নাও লাগতে পারে। সেজন্যই বলেছি এটা দর্শন আর সত্যিকারের উপভোগের জন্য আপনাকে বেশ কিছুটা বিলাসী হতে হবে আর যেতে হবে কোনো এক বিকেলে। যেটা হবে আপনার জন্য একটি “বিলাসী বিকেল”।

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের প্রবেশ দ্বার। ছবিঃ লেখক

কারণ এত মিহি একটা জায়গায় গিয়ে ওই পরিবেশ আর স্থাপনাটাকে ঠিকঠাক উপভোগ করতে চাইলে, লোকাল বাসে করে ৮/১২ টাকা দিয়ে গিয়ে, ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে, চেহারা সুরতের বারোটা বাজিয়ে গেলে শেষে নিজের কাছেই নিজের আক্ষেপে পুড়তে হবে। আর ছবি দেখে ভীষণ রকম মন খারাপ হয়ে যাবে, যে ইস এত সুন্দর একটা জায়গার এত চমৎকার একটা স্থাপনার মাঝে আপনার ছবিটা খুবই বেমানান লাগবে আপনার কাছেই।

আর সেই সাথে হবে মেজাজ খারাপ। তাই দরকার কী, সব সময়ই কম পয়সায় ঘোরার? মাঝে মাঝে পরিস্থিতি আর অবস্থান ভেদে ভ্রমণের খরচে কিছুটা ভিন্নতা আনা যেতেই পারে। তাতে মন্দ হবে না আদৌ।

তাই হোটেল থেকে দুপুরে একটা আরামের ভাত ঘুম দিয়ে, বেশ ফুরফুরে মেজাজে বের হোন, আরামদায়ক কাপড় পরে আর পায়ে জুতো নয় স্যান্ডেল গলিয়ে। আর নিয়ে নিন একটি ট্যাক্সি। যত গরমই হোক, যদি ট্যাক্সি চলতে শুরু করে, জানালা খুলে দিন, ফ্রেশ আর ফুরফুরে বাতাসে উড়তে মন চাইবে তখন।

বেশ অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে যাবেন সবুজের মাঝে, সাদার অপূর্ব নান্দনিকতায় সেজে থাকা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের প্রবেশদ্বারে। ২০ ভারতীয়দের জন্য আর ২০০ বিদেশীদের জন্য জন প্রতি টিকেট। আপনার সাধ্য আর বিবেচনা অনুযায়ী টিকেট কিনে ঢুকে পড়ুন।

গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ। ছবিঃ লেখক

প্রায় একই রকম ঝুরো পাথর বিছানো একটি অন্য রকম রাস্তা পাবেন শুরুতেই। তার পাশেই পাবেন ইট বেছানো আর একটি রাস্তা। একটু পিচ্ছিল অনুভূতির পাথুরে রাস্তায় নাকি ভদ্রস্থ ইটের? সেটা আপনার ব্যাপার। তবে যেটা দিয়েই হাঁটুন না কেন, বাম পাশের পুকুর পাড়ে যেতে যেন কিছুতেই ভুলবেন না। ওখান থেকেই দারুণ অনুভূতিগুলোর শুরু হবে আপনার জন্য।

একটি বকুল গাছের ছায়ায় বসে পড়ুন, মিহি সবুজ ঘাসের উপরে। চাইলে পুকুরের টলটলে পানিতে পা-ও ডোবাতে পারেন, একটু পানি ছিটিয়ে দিতেই পারেন প্রিয়জনের গায়ে, তবে আপনিও ভিজতে পারেন সেটা মাথায় রেখেই কিন্তু। দেখতে পারেন সবুজ ঘাসের উপরে ঝরে পড়া শুকনো রঙিন পাতা, ঝরা বকুল, পুকুরের স্বচ্ছ জলে শ্বেত পাথরের প্রতিচ্ছবি, গাছের ছায়া, নীল আকাশ, পুকুরের পানির আয়নায়। আর এখানে এইসব কিছুর সাথে কয়েকটি ছবি না তুললেই নয়। তাই ছবি তুলে ফেলুন ঝটপট।

পাতা ঝরার বেলায়। ছবিঃ লেখক

এরপর উঠে চলে যেতে পারেন সাদার মাঝে, শুভ্র আলিঙ্গনে। সময় নিয়ে, ধীরে ধীরে ঘুরে দেখতে পারেন পুরো ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের ভেতর-বাহির, উপরে-নিচে, সামনে-পিছনে আর এর চারপাশ। দারুণ কারুকাজের দেয়াল, আসবাব, ঘর-দরজা, জানালা-বারান্দা, কাঠের কারুকাজের বাঁকানো সিঁড়ি, অনেক অনেক চোখ ধাঁধানো সব চিত্রকর্ম, এক ফ্লোর থেকে আর এক ফ্লোরে যাবার রহস্যময়তা আর রোমাঞ্চ, আধুনিক স্থাপনার মাঝেই প্রাচীন একটা অনুভূতি। কলকাতা বা পুরো ভারতবর্ষ শাসনের নানা উল্লেখযোগ্য সংগ্রহ, সকল সময়ের গুণী মানুষদের ইতিহাস সহ আরও অনেক অনেক কিছুই পেতে পারেন।

আসলে মোট কথা এক এক জনের দেখার দৃষ্টি আর অনুভবের ব্যাপারটা এক এক রকম। তাই সবাই যে সব কিছুতেই আনন্দ খুঁজে পাবেন বা উপভোগ করবেন তেমনটা নাও হতে পারে। তাই যেখানে আপনার আগ্রহ নেই বা ঠিক নিজের মতো করে উপভোগ করতে পারছেন না, সেখানে সময় নষ্ট না করাই ভালো। তাহলে চলে যেতে পারেন, ভবনের পেছনে।

বকুল ছায়ায়, জলের ছোঁয়ায়। ছবিঃ লেখক

পেছনে রয়েছে বিশাল বিশাল আরও কয়েকটি দীঘি আর তার বাঁধানো পাড়ে বসে থাকতে পারেন শেষ সন্ধ্যা পর্যন্ত অনায়াসেই। রোদ পড়ে যাওয়া বিকেল, ঠাণ্ডা বাতাস দিয়ে যাওয়া সন্ধ্যা, দীঘির পানির কোমলতা আর সর্বোপরি ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন মাঠ, বর্ণীল বাগান, নানা রঙের ফুল, অচেনা-অজানা পাখির ডাক আপনাকে বিমোহিত করবেই।

তাই যদি হাতে সময় থাকে, আর ইচ্ছে থাকে কেনাকাটায় সময় নষ্ট না করে একটা অলস বিকেল কাটানোর অভিপ্রায়, তবে নির্দ্বিধায় আর নিশ্চিন্তে বেরিয়ে পড়তে পারেন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের উদ্দেশ্যে কাটাতে একটি বিলাসী বিকেল, কিছুটা অলস সময় আর পেতে পারেন ভ্রমণের এক অন্য রকম অনুভূতি।

পিছন থেকে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। ছবিঃ লেখক

আর ফেরার সময় ফিরতে পারেন ট্যাক্সি, ট্রাম বা বাসে করেই। তবে যেভাবেই ফিরুন না কেন, কাটিয়ে আসা অলস বিকেলটা কিন্তু ভুলতে পারবেন না চাইলেও। কারণ ওখানকার বিকেলটা এমনই। স্মৃতিতে রয়ে যাবে বহুকাল।

ঢাকা থেকে কলকাতা বাস বা ট্রেনে করে যাওয়া যায় খুব সহজেই। আর কলকাতার নানা জায়গায় ঘুরে দেখার পাশাপাশি এমন নান্দনিক একটা জায়গায় একটা বিলাসী বিকেল কাটানো যেতে পারে অনায়াসেই। শুধু কলকাতায় কয়েকদিন ঘুরে হেঁটে চলে বা বাসে ট্রামে ঘুরে দেখতে ১০০ ডলারের বেশী কিছুতেই খরচ হবে না, অবশ্যই কোনো রকম কেনাকাটা ছাড়া।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জল ও জঙ্গলের কাব্যে বৃত্তের সাথে একটি পুরো দিন

মুন্নারের কফি, মসলা ও আয়ুর্বেদিক বাগানের গল্প