রোজ গার্ডেন প্যালেসের সৌন্দর্য ছুঁয়ে দেখা

ঢাকার ভেতর ঘুরে দেখার মত কী কী জায়গা বাকি রয়েছে তা নিয়ে জানার চেষ্টা করছিলাম। গুগলে পাওয়া বেশ কিছু তালিকার অধিকাংশ জায়গাতেই ভ্রমণ করা হয়ে গিয়েছে। এবার চোখ আটকালো রোজ গার্ডেনের ছবিতে। কী চমৎকার একটি প্রাসাদ! ছবির সাথে থাকা লেখাটিতেও মনোযোগ দিলাম।
কয়েকটি লেখা পড়লাম জায়গাটি নিয়ে। দারুণ এই প্রাসাদটি পুরান ঢাকার টিকাটুলিতে অবস্থিত। পুরান ঢাকা শুনতেই খুশি বেড়ে গেল, সঙ্গে সঙ্গে কথা বললাম বাবার সাথে। বাবা জানালেন, তিনি চেনেন বাড়িটি।

রোজ গার্ডেন; source: লেখিকা

তবে রোজ গার্ডেন প্যালেসের চেয়ে বাড়িটিকে সবাই ‘হুমায়ূন সাহেবের বাড়ি’ হিসেবে বেশি ভালোভাবে চেনেন। প্রথমে রোজ গার্ডেন বলাতে বাবার চিনতে অসুবিধা হলো। তবে চিনতে পেরেই জানিয়ে দিলেন প্রাসাদটি ঘুরে আসার সহজ উপায়। যেই ভাবা সেই কাজ, বেড়িয়ে পড়লাম তখনই পুরান ঢাকার টিকাটুলির উদ্দেশ্যে।
বাসা থেকে গুলিস্তান অবধি যাওয়ার পথে পেয়ে গেলাম এক সাংবাদিক বন্ধুকে। কোথায় যাচ্ছি শুনে সে নিজেও আগ্রহবোধ করলো। দুজনে মিলে শুরু করলাম আমাদের যাত্রা।
অসাধারণ রোজ গার্ডেন প্যালেস; source: লেখিকা

গুলিস্তান পৌঁছে আমরা প্রথমেই এখানকার স্থানীয় দোকানীদের থেকে জেনে নিলাম তারা কেউ রোজ গার্ডেন কিংবা হুমায়ূন সাহেবের বাড়ির কথা শুনেছে কিনা, এখান থেকে রিক্সা ভাড়া কত হতে পারে। বাবার কথাই আসলে ঠিক ছিল। রোজ গার্ডেন অনেকেই চিনতে পারছিলেন না। তবে, সবাই রোজ গার্ডেন না চিনলেও হুমায়ূন সাহেবের বাড়ি ঠিক চিনলো। ভাড়া জানালো ৫০ থেকে ৬০ টাকা।
বেশি ঝামেলা পোহাতে হলো না আমাদের। দ্বিতীয়বার যে রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম হুমায়ূন সাহেবের বাড়ি যাবেন কিনা, সে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেল। রাস্তায় অনেক জ্যাম থাকে বলে ভাড়া চাইল ৬০ টাকা। আমরা রাজি হয়ে উঠে পড়লাম রিকশায়।
রোজ গার্ডেন প্যালেসের সৌন্দর্য; source: লেখিকা

গুলিস্তান থেকে জ্যাম পেরিয়ে হুমায়ূন সাহেবের বাড়ির গেটে পৌঁছাতে সময় লাগল প্রায় ২০ মিনিটের মতো। আমাদের প্রাসাদটির গেটে নামিয়ে দিলেন রিকশাওয়ালা। দুজনেই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। মাঝারি আকারের পুকুরটির ওপাশে কী সুন্দর একটি প্রাসাদ দাঁড়িয়ে আছে আকাশের মেঘ ছুঁয়ে!
আমরা ঘোরাঘুরি করে ভেতরে প্রবেশের গেট খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমাদের সামনে থাকা গেটটি থেকে ভেতরের সবই দেখা যাচ্ছিল, তবে এখান থেকে ঢোকার কোনো উপায় নেই। পাশের বাড়ির দারোয়ানের সাথে আমরা কথা বললাম। তিনি জানালেন, এটি আসলে মূল গেট নয়। মূল গেটটি সামনে থেকে ঘুরে যেতে হবে।
রোজ গার্ডেন প্যালেস; source: লেখিকা

সেই দারোয়ান চাচার দেখানো পথ অনুযায়ী আমরা এগিয়ে গেলাম। এখানটায় ছোট্ট একটি সাদা গেট চোখে পড়লো। পাশেই অনুমতি নেয়ার জায়গা। দারোয়ানের সেই ছোট্ট কক্ষটির থেকে কিছুটা এগিয়ে সাদা দেয়ালে লেখা রয়েছে ‘ Rose Garden’ নামটি।
আমরা দারোয়ানের সাথে কথা বলার চেষ্টা করি। কিন্তু তিনি জানান আমাদের বা কাউকেই ভেতরে ঢুকতে দেয়া যাবে না। এখন ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেয়া হয় না কাউকে। এ কথা শুনে অনেক বেশি মন খারাপ হয়ে গেল আমার। এত কিছু করে শেষমেশ গেট থেকেই ফিরে যাবো!
মেঘ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাসাদটি; source: লেখিকা

সাংবাদিক বন্ধুটি জানালো আমরা এখানে এসেছি জায়গাটি নিয়ে লেখা ও ছোট্ট একটি ভিডিও তৈরি করতে। তবুও তাদের মানানো গেল না। অবশেষে বন্ধু তার অফিসের কার্ড পাঠালো অনুমতি চাওয়ার জন্য। দারোয়ান চাচা কার্ডটি নিয়ে ভেতরে গেলেন আর প্রায় মিনিট সাতেক পর ফিরে আসলেন। তিনি গেট খুলে আমাদের ভেতরে ঢুকতে দিলেন আর বললেন আমরা যাতে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের ভেতর আমাদের কাজ শেষ করে ফেলি।
ভেতরে ঢুকতে পেরে আমার আনন্দের সীমা নেই। এতদূর এসে ভালোভাবে না দেখে ফিরে গেলে খুব খারাপ লাগতো। বাইরে থেকে দেখে যতটা মুগ্ধ হয়েছি, ভেতরে এসে সে মুগ্ধতা আরো বাড়লো। ভেতরটা বেশ গোছালো ও পরিচ্ছন্ন।
মুগ্ধ করা রোজ গার্ডেন প্যালেস; source: লেখিকা

১৯৩১ সালে ঋষিকেশ দাস নামে এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ২২ বিঘা জমির উপর এই বাগানবাড়িটি তৈরী করেছিলেন। সে সময় এই বাগানে প্রচুর গোলাপ গাছ থাকায় এর নাম দেয়া হয়েছিল রোজ গার্ডেন। সুন্দর এই প্রাসাদটি সে সূত্রেই রোজ গার্ডেন প্যালেস নামে পরিচিত হয়।
এই প্যালেসটিকে অনেকে হুমায়ূন সাহেবের বাড়ি নামেও চেনে। মূলত বাড়িটি খুঁজে বের করার সহজ উপায় ‘হুমায়ূন সাহেবের বাড়ি’ খোঁজা। রোজ গার্ডেন বললে অনেকেই চেনেন না।
কৃত্রিম পানির ফোয়ারা প্রাসাদটির সামনের মাঠে; source: লেখিকা

আমরা যখন রোজ গার্ডেন প্যালেসে তখন প্রায় দুপুর। কড়া রোদ। তার ভেতরেই আমরা ঘুরে দেখতে লাগলাম দারুণ এই বাড়িটি।
বাড়িটি সহজেই নজর কাড়বে যে কারোই। বাড়িটির বাম পাশে থাকা কৃষ্ণচূড়া গাছটি বাড়ির সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে রেখেছে। গাছটি কৃষ্ণচূড়ায় ছেঁয়ে লাল হয়ে আছে তখন। নিচে পড়ে থাকা ঝরা কৃষ্ণচূড়াগুলো আরো মনোমুগ্ধকর করে রেখেছে। সেই মুগ্ধতায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করে রেখেছে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে থাকা সাদা রঙের বেঞ্চটি।
প্রাসাদটি দোতলা বিশিষ্ট। প্রাসাদটির নীচতলায় একটি হলরুম, একটি কোরিনথিয়ান কলাম এবং আটটি কক্ষ রয়েছে। প্রাসাদের উপর তলার মাঝে নৃত্য করার জন্য হল ছাড়াও রয়েছে আরও পাঁচটি কক্ষ। এই কক্ষগুলো দেখা হয়নি আমাদের। দারোয়ান চাচার থেকে জেনে নেয়া তথ্যগুলো।
বাগান ও ভাস্কর্য; source: লেখিকা

প্রাসাদটির সামনে রয়েছে সবুজ ঘাসে ভরা একটি মাঠ। এ মাঠের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে মাঠের প্রায় মাঝামাঝি অংশে থাকা একটি কৃত্রিম পানির ফোয়ারা। প্রাসাদের বাগানে মার্বেলের তৈরি ৫টি ভাস্কর্য রয়েছে যা শিশু ও নারীর আদলে তৈরি। তবে স্থানটির নামকরণ যে গোলাপ বাগানের জন্য করা হয়েছে সেই গোলাপ বাগানটি এখন আর নেই।
প্রাসাদের পেছনে পূর্বদিকে একটি বারান্দা আছে যেখানে প্রবেশের জন্য ধনুকাকৃতির তিনস্তর বিশিষ্ট একটি প্রবেশপথ রয়েছে যেটি দিয়ে উপরে ওঠার সিঁড়িতে যাওয়া যায়। আর পেছনের দিকে, প্রাসাদটি থেকে কিছুটা দূরে একটি ছোট কারখানার মতো রয়েছে এখন। সে জায়গাগুলোতে প্রবেশ করতে নিষেধ করেন তারা বহিরাগতদের।
কৃষ্ণচূড়া ও অসাধারণ প্রাসাদটি; source: লেখিকা

প্রাসাদটির সামনে একটি পুকুর রয়েছে, যেটি আমরা প্রথমেই দেখেছিলাম রাস্তার ওপাশ থেকে। পুকুরটির ঘাটের মতো জায়গাটি টিন দিয়ে আটকে দেয়া, যাতে কেউ সেদিকটাতে না যেতে পারে। পুকুরের পাড় ঘিরে ও পুরো বাড়িটিতে বেশ গাছ রয়েছে। ফুল গাছ যদিও কম। তবে সব মিলিয়ে প্রাসাদটি দারুণ।

যেভাবে যাবেন:

সুন্দর এই প্রাসাদটি পুরান ঢাকার টিকাটুলিতে। আরো সহজ করে বললে গোপীবাগের আর.কে মিশন রোডে। গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজারের কাছ থেকে রিকশায় যেতে পারবেন। রিকশা কিংবা বাইক ছাড়া যাওয়ার উপায় নেই সেভাবে। রিকশাওয়ালাকে বলতে হবে ‘হুমায়ূন সাহেবের বাড়ি’ যাবেন। গুলিস্তান থেকে রোজ গার্ডেন প্যালেস বা হুমায়ূন সাহেবের বাড়ির ভাড়া পড়বে ৫০ থেকে ৬০ টাকা।
রিকশাওয়ালা যেখানে নামাবেন সে জায়গাটি আসলে মূল প্রবেশের অংশ না, তবে এখান থেকে পুরো প্রাসাদটি একবারে দেখতে পারবেন। যদি ভেতরে প্রবেশের অনুমতি না নিতে পারেন তবে এ অংশ থেকেই পুরো প্রাসাদটির সৌন্দর্য একবারে অবলোকন করে নেবেন।
যদি মূল গেটের কাছে যেতে চান তবে রিকশাওয়ালা আপনাকে যেখানে নামাবেন সেখান থেকে বাম দিকে কিছুটা এগিয়ে যাবেন, তারপর ডানে প্রথম যে গলিটা পাবেন তার ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়বে সাদা দেয়াল, সাদা গেট ও সাদা অংশে লেখা ‘Rose Garden’।
ফিচার ইমেজ- লেখিকা

Loading...

3 Comments

Leave a Reply
  1. আরো কিছু তথ্য থাকলে খুশি হতাম যেমন হৃষিকেশ দাশের পরবর্তী ইতিহাস এবং তার প্রতিষ্ঠিত বাড়ি কিভাবে হুমায়ূন সাহেবের বাড়ি নামে পরিচিতি পেল ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বান্দরবানের গোলাপি গোধূলি, রুপালী রাত ও সোনালী সকালের গল্প

কলকাতার গর্ব ঐতিহাসিক ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল