চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের স্মৃতি সংগ্রহশালায় একদিন

বাড়ি থেকে বের হলাম এস এম সুলতানের বাড়ির উদ্দেশ্যে। শুনেছি, সেখানে এস এম সুলতানের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে সুলতান মেলা চলছে। প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজ চত্বরে এই মেলার আয়োজন করেন নড়াইল জেলা প্রশাসক এবং এস এম সুলতান ফাউন্ডেশন।

চিত্র শিল্পী এস এম সুলতান; Source: swapno71.com

সাত দিন ব্যাপী এই মেলায় থাকে শিশুদের চিত্র অংকন প্রতিযোগিতা, নৃত্য প্রতিযোগিতা সহ নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন। এছাড়াও বাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলা, ঘোড়ার গাড়ির দৌড় প্রতিযোগিতা ও কুস্তি খেলা সহ থাকে নানা আয়োজন।
এস এম সুলতানের বাড়ি নড়াইলের মূল শহরের মাছিমদিয়া গ্রামে। আমাদের বাড়ি থেকে সেখানে যেতে ১ ঘণ্টার মতো সময় লাগে। কিছু দূর ভাড়ায় পাওয়া বাইকে আবার কিছু দূর বাসে করে যেতে হয়।
বাস থেকে নামলাম সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজ মোড়ে। জায়গাটি বাঁধা ঘাট নামেও পরিচিত। এই মোড় থেকে সোজা তাকালে চিত্রা নদীর পাড়ের একটি বড় ঘাট চোখে পড়ে, এটিই মূলত বাঁধা ঘাট নামে সুপরিচিত। নড়াইলের দৃষ্টিনন্দন এই ঘাটটি শত বছরের পুরনো। সে যাই হোক, এই ঘাট সম্পর্কে ইতিমধ্যেই আমার জনৈক বন্ধু অমিতাভ অরণ্য কিছু কথা লিখে ফেলেছেন। তাই আমি নতুন করে আর কিছু বলছি না। আমার এখনকার গন্তব্য সুলতান কমপ্লেক্স।
বাঁধা ঘাট; Source: Amitav Aronno

বাঁধা ঘাট মোড় থেকে একটা ভ্যান ভাড়া করলাম। সুলতানের বাড়ি যাবো বলতেই, ভ্যানওয়ালা ১০ টাকা ভাড়া চেয়ে লাফ দিয়ে সিটে বসলেন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি যেন এতক্ষণ আমার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু না; পরে তাঁর সাথে কথা বলে জানতে পারলাম- প্রতি বছর সুলতান মেলার সময় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষের আগমন ঘটে এই সুলতানের বাড়িতে। তাই এ সময় তাঁরা রেডি হয়েই থাকেন।
বাঁধা ঘাট থেকে কিছুটা এগিয়েই রয়েছে নিশিনাথ তলা মন্দির। এটি একটি ৪০০ বছরের পুরাতন মন্দির, যা সীতারাম রাজা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বর্তমানে প্রতি বছর দুর্গা পূজার সময় এখানে জমজমাট মেলা বসে। সেই মেলায় ঘোরার অভিজ্ঞতা না হয় আরেকদিন শেয়ার করব। এখন আসি এস এম সুলতানের বাড়িতে।
নিশিনাথ তলা মন্দির থেকে একটু সামনে গেলেই রাস্তার পাশে থাকা একটি দিক নির্দেশনামূলক বোর্ড চোখে পড়ে। সেখানে দেখানো হয়েছে, বিশ্ববরেণ্য চিত্র শিল্পী এস এম সুলতানের বাড়ির রাস্তা।
মূল রাস্তা থেকে বাঁ দিকে কিছু দূর যেতেই চোখে পড়ে সুলতান কমপ্লেক্সের মূল গেট, আর তাঁর ডান দিকেই রয়েছে এস এম সুলতানের প্রতিষ্ঠিত ‘শিশুস্বর্গ’ আর্ট স্কুল।
শিশুস্বর্গ; Source: অচিন্ত্য আসিফ

মূল গেটের সামনে গিয়ে দেখি সেটা বন্ধ, এখনো খোলেনি। গেটের সাইনবোর্ডে লেখা আছে-  সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। আমি যখন পৌঁছেছি তখন সাড়ে আটটা বাজে তাই আধ ঘণ্টা অপেক্ষা করলাম।
অপেক্ষার সময়টা সবসময়ই খারাপ যায়, কিন্তু এখানে সেটা হয়নি। কারণ সুলতান কমপ্লেক্সের পেছনের দিকেই রয়েছে চিত্রা নদী, আর সেই নদীর তীরে সযত্নে সংরক্ষিত আছে এস এম সুলতানের নৌকা। এই নৌকায় করে চিত্রা নদীতে ঘুরে ঘুরে শিশুদেরকে ছবি আঁকা শেখাতেন এস এম সুলতান।
নৌকার চারপাশে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। এটা দেখতে অনেকটা বাণিজ্যিক নৌকা তথা বজরার মতো হলেও আসলে ছিল একটা ভাসমান প্রতিষ্ঠান। ভাবতেই কেমন কল্পনায় হারিয়ে যায়। এস এম সুলতান এই বজরায় করে ঘুরে ঘুরে জ্ঞান আহরণ করতেন আর তা বিলিয়ে দিতেন নতুন প্রজন্মের কাছে।
চিত্রার পাড়ে রাখা এস এম সুলতানের বজরা; Source: অচিন্ত্য আসিফ

নদীর তীরে দাঁড়িয়ে এস এম সুলতানের কার্যক্রমগুলো কল্পনায় আনার চেষ্টা করছিলাম। এমন সময় পাতার ফাঁক দিয়ে খানিক দূরে দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়। ঐ দূরে চিত্রার বুকে একটা ব্রিজ দেখা যাচ্ছে। ব্রিজটা দেখে আমার বেশ ভালো লাগছিল।
এটাই সেই এস এম সুলতান ব্রিজ, ঢাকা থেকে নড়াইলে আসার সময় যার উপর দিয়ে সাঁ করে গাড়ি চলে এসেছিল। তখন এটাকে কাছ থেকে দেখেছিলাম, আর এখন দেখছি দূর থেকে। এখান থেকে ব্রিজটি দেখতে আরো সুন্দর মনে হচ্ছে।
চিত্রার সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে প্রায় এক ঘণ্টার মতো কেটে গেল। এতক্ষণে সুলতান কমপ্লেক্সের গেট খুলে দিয়েছে। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে সারি সারি বাহারি ফুলের মেলা। আর বিভিন্ন চেনা-অচেনা ফলের গাছ। এর মধ্যে কিছু ঔষধি গাছও রয়েছে যা সচরাচর পাওয়া যায় না।
এস এম সুলতানের সমাধি; Source: অচিন্ত্য আসিফ

এমন সুন্দর পরিবেশে থাকতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে হতো। আমার মতো ক্ষুদ্র মানুষ এর থেকে বেশি ভাবতে পারে না, কিন্তু এস এম সুলতান তো ক্ষুদ্র নয়! আমি মনে করি এই ফুল, নদী আর প্রকৃতির সৌন্দর্য আজ ধন্য হয়েছে এস এম সুলতানকে পেয়ে।
সুলতান কমপ্লেক্সের আঙ্গিনায় রয়েছে এস এম সুলতানের সমাধি। আর সমাধির সামনেই রয়েছে তাঁর একটি প্রতিকৃতি, একটি এক তলা ভবন ও একটি দ্বিতল ভবন, যেখানে রাখা আছে এস এম সুলতানের ব্যবহৃত নানা সামগ্রী ও চিত্র কর্ম। এখন এখানকার বেশ কিছু চিত্রকর্ম সুলতান মেলায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রতিবছর সুলতান মেলার সময় সুলতানের চিত্রকর্মের একটা প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।
সুলতানের প্রতিকৃতি; Source: অচিন্ত্য আসিফ

সুলতান কমপ্লেক্সের ভেতরে ছবি তোলা নিষিদ্ধ হওয়ায়, ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কোনো ছবি তুলতে পারলাম না। শুধু উপভোগ করতে লাগলাম অসাধারণ কিছু চিত্র কর্ম, আর ফিরে গেলাম বাংলার মাঠে-ঘাটে আর ইতিহাসে।

কীভাবে যাবেন:

যাত্রাবাড়ি টার্মিনাল থেকে অনেকগুলো পরিবহন নড়াইলের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। এখান থেকে যে কোনো পরিবহনে চড়ে আসতে পারবেন নড়াইল শহরে। নড়াইল শহর থেকে ইজি বাইক বা ভ্যানে (আঞ্চলিক বাহন) চড়ে যেতে পারবেন সুলতান কমপ্লেক্সে।
ঢাকা থেকে নড়াইলে যেতে ভাড়া পড়বে ৫৫০ টাকা আর নড়াইল বাসস্টান্ড থেকে সুলতান কমপ্লেক্সে যেতে ১০ টাকা।
বিশেষ সুযোগ: সুলতান কমপ্লেক্সে প্রবেশের জন্য কোনো টিকিট কিনতে হয় না।
Feature Image: Achinto Asif

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

হোয়াইট হাউজ (ভিডিও)

মিরিকের লেকে-পাহাড়ে মেঘের সনে মিতালী