আলীকদমে রহস্যে ঘেরা আলীর গুহায় একদিন

দল বেঁধে পাহাড়ের চূড়ায় ক্যাম্পিং করে থাকার মজা-ই অন্যরকম। হিম হিম হাওয়া আর মিলিয়ন তারার নিচে ক্যাম্পিংয়ের সাধ একবার পেয়েছে নাফাখুম ক্যাম্পিংয়ের সময়। এরপর আর কোথাও ক্যাম্পিং করা হয়নি। এবারের গল্প মারায়ন তংয়ের চূড়ায় ক্যাম্পিং, দামতুয়া ঝর্ণা আর রহস্যময় আলীর গুহাকে নিয়ে।

আলীকদম থেকে আলীরগুহা বা আলীর সুড়ঙ্গের পথে; ছবি- বিপু বিধান

সায়েদাবাদ থেকে রাতের বাসে রওনা হই চকরিয়ার উদ্দেশ্যে। কাক ডাকা ভোরে পৌঁছে যাই চকরিয়ায়। সকালের নাস্তা সেরে নেই এখানেই। ক্যাম্পিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় রশদ নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকি জীপের জন্য। আলীকদমের উদ্দেশ্যে যাত্রা আরম্ভ। দু’ধারে সবুজ গাছ আর পিচ ঢালা পাকা রাস্তা ধরে আমরা এগিয়ে চলেছি।

মাঝে মাঝে রাস্তার পাশে বড় বড় করে লেখা এখানে বন্য হাতির চলাফেরা আছে। রাতে নাকি বন্য হাতিরা এই পথে চলে আসে। সেই জন্য এই বাড়তি সতর্কতার ব্যবস্থা। পাহাড়ের উঁচু নিচু রাস্তা আর নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে দেখতে প্রায় দেড় ঘণ্টা পর পৌঁছে যাই আলীকদম বাজারে। ছোট ছিমছাম বাজার। দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা হয় এখানকার একটা হোটেলে। সেখানে ক্যাম্পিংয়ের রসদ আর ব্যাগপত্র রেখে রওনা হই আলীর গুহার দিকে।

মংচুপ্রু পাড়ার কাছে; ছবি- সাইমুন ইসলাম

নদীর বাঁক আর উঁচু নিচু পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে আবার পথ চলা শুরু। আলীকদম বাজার থেকে এভাবে আরও আধ ঘণ্টা ধরে জীপে করে যেতে হয়। বান্দরবানের আলীকদম উপজেলা থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। মাতামুহুরি এবং তৈন খাল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা দুই পাহাড়ের চূড়ায় প্রাকৃতিকভাবে তৈরি এই আলীর গুহা বা আলীর সুড়ঙ্গ। প্রকৃতির এই অপরূপ সৃষ্ট গুহাকে ঘিরে রহস্যের কোনো শেষ নেই।

এরই মধ্যে পৌঁছে গেছি মংচুপ্রু পাড়ায়। এই পাড়ার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে টোয়াইন খাল। টোয়াইন খাল পার হয়ে আলীর গুহায় যেতে হয়। ঘাটে ছোট ছোট ইঞ্জিন চালিত নৌকা বাধা আছে। ছোট ছোট ইঞ্জিন চালিত ডিঙি নৌকা করে পার হতে হয় এই খাল। একে একে পার হতে থাকি এই ইঞ্জিন চালিত নৌকায় করে। তখন খালের পানি বেশি না থাকলেও স্রোত ছিল ভালোই। আমাদের মধ্যে থেকে কয়েকজন নৌকায় পার না হয়ে সাঁতরে পার হয়। খালের দু’ধারে তামাক পাতার চাষ হচ্ছে পুরো দমে।

টোয়াইন খাল পাড়ি দিচ্ছে ইঞ্জিন চালিত নৌকায় করে; ছবি- বিপু বিধান

মূলত খাল পার হওয়ার পর শুরু হয় ট্রেকিং। তখন বর্ষাকাল আসি আসি করছে। অল্প বিস্তর বৃষ্টি বাদলাও হয়েছে। তার প্রমাণ পাওয়া যায় স্যাঁতস্যাঁতে পাহাড়ে। কোথাও কোথাও অল্পবিস্তর জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির পানির ছোঁয়া পেয়ে পাহাড়ি জঙ্গল ফুলে ফেঁপে উঠেছে। আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে উঠেছে জোঁকেরা। এরই মধ্যে দিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি আলির গুহার দিকে। দু’হাতে পথ আগলে রাখা জঙ্গলের লতাপাতা সরিয়ে সামনের দিকে চলেছি। কাদামাটিতে গড়াগড়ি খেতে খেতে হাচড়ে পাচড়ে পাহাড়ে ওঠায় ব্যস্ত সবাই।

আকাশ সমান দু’পাশে পাথুরে দেয়ালের মাঝে ঝিরি; ছবি- বিপু বিধান

জোঁকের কামড় খেয়ে আর কাদামাটিতে জড়িয়ে এসে পড়লাম পাহাড়ি ঝিরিতে। দু’পাশে আকাশ সমান পাথুরে দেয়াল। তার মধ্যে দিয়ে সূর্যের আলো ঢুকছে। দেখে মনে হয় বেশ কসরত করতে হয়েছে এখানে প্রবেশের জন্য। আলো আধারির খেলা চলছে চারপাশে। আরও কিছু দূর এগিয়ে যেতেই দেখা মিলল আলীর গুহার বা আলীর সুড়ঙ্গের। পাহাড়ি ঝিরি ধরে এ গুহায় উঠতে সবাইকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে।

পাথরে বেষ্টিত আলীর গুহা বা সুড়ঙ্গ। আলীর গুহার নামকরণের সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয়দের মতে, আলীকদম উপজেলা থেকে এর নামকরণ হয়েছে বলে মনে করেন।

গুহার সম্মুখে লোহার সিঁড়ি; ছবি- বিপু বিধান

বেশ কিছু দিন আগেও পাথরে ঘেরা এই গুহায় উঠতে গেলে লতাপাতা এবং দড়ির সাহায্যে বেয়ে উঠতে হতো। এতে করে পর্যটকদের বেশ অসুবিধা হতো। এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসেন আলীকদমের সেনারা। তাদের উদ্যোগে এখানে একটি লোহার সিঁড়ির ব্যবস্থা করা হয়। এতে করে সহজেই গুহা দর্শনে যেতে পারে সবাই।

গুহার সামনে দাঁড়িয়ে আড্ডা; ছবি- বিপু বিধান

পাহাড়ের মাঝখানে এই গুহাটি প্রায় ১০০ ফুট লম্বা। এরপাশে আরও গুহা রয়েছে। প্রথম গুহা থেকে পরের গুহায় যেতে প্রায় বিশ মিনিটের মতো সময় লাগে। গুহায় যাওয়ার পথটুকু বেশ পিচ্ছিল থাকায় খুব সাবধানে যেতে হয়। গুহার ভেতর ঘুটঘুটে অন্ধকার। টর্চ লাইট বা মশাল ছাড়া প্রবেশ করা অসম্ভব। গুহার ভেতরে রয়েছে নানা আকৃতির বাদুড়ের প্রাদুর্ভাব এবং উৎকট গন্ধ। হুট করে বাদুড়ের ওড়াউড়িতে বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।

গুহার প্রবেশ মুখে; মোহাম্মদ হোসেইন সবুজ

আলীর গুহা দেখা শেষে এবার ফেরার পালা। আলীর গুহায় যাওয়ার সময় আমি টোয়াইন খালে নামিনি। এখান থেকে সারা গায়ে কাদা ধুতে নেমে পড়ি খালে। প্রায় ১০/১৫ মিনিট খালের জলে জলকেলি খেলে পাড়ে উঠি। মংচুপ্রু পাড়া থেকে পোশাক পরিবর্তন করে হালকা চা নাস্তা খেয়ে আবার আলীকদম বাজারের দিকে রওনা হই।

আলীকদম বাজারে এসে দুপুরের খাবার খেয়ে নেই। সেখান থেকে ক্যাম্পিংয়ের জন্য আরও টুকিটাকি কিছু কেনাকাটা করে মারায়ন তংয়ের দিকে রওনা হই। আলীকদম আবাসিকের গ্রামের দিকে এগিয়ে যাই। গ্রামের রাস্তা শেষ হলে আদিবাসীদের পাড়ার সামনে জীপ নামিয়ে দেয়। এখান থেকেই মূলত আমাদের ট্রেকিং শুরু।

মিলিয়ন তারার নিচে শুয়ে আরেকটি রাত কাটানোর গল্প তৈরি হবে এই মারায়ন তং পাহাড়ের চূড়ায়…

মারায়ন তং চূড়ায়; ছবি- বিপু বিধান

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে বাসে চকরিয়া। জনপ্রতি নন এসি বাস ভাড়া ৭৫০ টাকা। চকরিয়া থেকে আলীকদম জিপ গাড়ি বা চাঁদের গাড়িতে আসতে পারেন। লোকাল ভাড়া জনপ্রতি ৬৫ টাকা। চাইলে রিজার্ভ করে যেতে পারেন।

থাকা খাওয়া

আলীকদম বাজারে খাবারের ছোটখাটো খাবার হোটেল আছে। তবে থাকার তেমন ভালো ব্যবস্থা নেই।

অবশ্যই মনে রাখবেন

*ভালো মানের টর্চ লাইট সাথে নিতে ভুলবেন না।
*যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা থেকে দূরে থাকবেন।
*খেয়াল রাখবেন আপনার অতি উচ্ছ্বাসে প্রকৃতির যেন কোনো ক্ষতি না হয়।
*সঙ্গে নেওয়া পলি প্যাকেটগুলো সঙ্গে নিয়ে ফিরুন।
*লেকে নামার সময় অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট পরতে হবে।

*** ফিচার ইমেজ- বিপু বিধান

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লাল-সবুজের অপেক্ষা!

ইউরোপের সেরা কিছু অজানা উৎসব