ধর্মসাগর নামক দীঘির পাড়ে

আজ বলতে এসেছি এমনই এক সাগরের কথা আদতে যা দীঘি। কুমিল্লা নগরীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ‘ধর্মসাগর’। নগরীর বাদুরতলা এলাকায় ঐতিহ্য-ইতিহাসের সাক্ষী এই দীঘিটি দখল করে আছে ২৩.১৮ একর স্থান।

আমিও কুমিল্লাতে থাকি। দেখা যায়, কখনো অলস সময় কাটছে কিংবা মন তেমন ভালো নেই বা ইচ্ছে হলো বন্ধুদের সাথে খানিকটা আড্ডায় মেতে উঠি কিংবা এও হতে পারে আমার পছন্দের ছোট খাবারগুলো খেতে ইচ্ছে হচ্ছে আমি সোজা হাঁটা দিই এই ধর্মসাগরের পথে।

শীতের এক পাতা ঝরা বিকালে; source: লেখিকা

ধর্মসাগর মূলত একটি কৃত্রিম জলাশয়। স্বচ্ছ টলমলে পানি আর নয়নাভিরাম সবুজের সারির স্পর্শ তো আছেই তাছাড়া এটির অবস্থানও এমন এক জায়গাতেই যেখানে দাঁড়ালে সাবলীল ভঙ্গিমাতেই মুখ থেকে বেরিয়ে আসে ‘প্রাণকেন্দ্র’। কারণ এটির পূর্বে কুমিল্লা স্টেডিয়াম ও কুমিল্লা জিলা স্কুল।

উত্তরাংশে সিটি কর্পোরেশনের উদ্যান ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, তার উত্তর কোণে রয়েছে রানীর কুঠির, নজরুল ইন্সটিটিউট, কুমিল্লা আর্ট কলেজ। তার ঠিক পাশেই নগর শিশু উদ্যান।

কুমিল্লাবাসীদের নিকট এই দীঘিটিই প্রধান বিনোদন কেন্দ্র। কেননা নগরের মধ্যবিন্দুতেই সতেজ বাতাসে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়া, এমনটি যেন আর নেই। সকালে আসলে দেখা যায় শহরের প্রায় সমস্ত স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ বা বয়স্কদের ভিড়। দেখা যায় নারীদেরও।

সন্ধ্যে হলেই ঝলমলে আলো নিয়ে আসে এই বাল্বগুলো; source: লেখিকা

শারীরিক ব্যায়াম বা জগিংয়ের জন্য তাদের কাছে এই দীঘির পাড় সর্বোত্তম জায়গা বলেই বিবেচিত। প্রভাত সূর্যের মোলায়েম আলোক রশ্মির ছটায় এই বিশাল ধর্মসাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশিতে যে আলোক পরিস্ফুটন হয় সে এক অপূর্ব দৃশ্য!

দুপুরে দেখা যায় আশেপাশের স্থানীয়রা গোসল সেরে নিচ্ছেন দীঘির স্বচ্ছ টলমলে জলে। কর্মব্যস্ত মানুষজন নিজের গন্তব্যস্থলেও যান এই সুন্দর পথ ধরে।

তবে বিকেলে পুরোপুরিই ভিন্ন চিত্র। যতই বেলা বাড়ে ততই মানুষের আনাগোনা বাড়তে থাকে। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা ভিড় জমায় এখানে। স্থানীয় মানুষ আর স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের আড্ডায় এই ধর্মসাগর পাড় সারাক্ষণ থাকে সরগরম।

এই পানিপুরিটা আমার ভীষণ পছন্দের; source: লেখিকা

দীঘির পাড়ে ক্রমান্বয়ে সাজানো বড় বড় গাছের সারির সবুজ বনানী ধর্মসাগরকে এনে দিয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা। পার্কের উত্তরদিকে মেহগনি, দেবদারু, শাল আর নানা রঙের পাতা বাহারের গাছের ফাঁকে ফাঁকে বর্ণালী পাখির কুঞ্জন ধর্মসাগরের সৌন্দর্যকে যেন আকর্ষণীয় করে তুলেছে আরো বহু গুনে।

এছাড়া আপনি চাইলে ভাড়া করতে পারেন পাড়ে বেঁধে রাখা নৌকা। দীঘিতে জলে ভেসে বেড়াতে পারেন গুনগুনিয়ে সুর তুলে। দীঘির পাড়ে খাবারের সমারোহও কম নয় বৈকি। পানিপুরি, ঝালমুড়ি, ফুচকা, বাদাম, হাওয়াই মিঠাই, পেয়ারা-কলার ভর্তা বা চায়ের দোকানে খেয়ে নিতে পারেন চা, যেখানে সব সময় মানুষের কোলাহল লেগেই থাকে।

পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা মানুষজন; source: লেখিকা

বাচ্চাদের জন্য হরেক রকমের পসরা সাজিয়ে বসে আছেন দোকানীগণ কিংবা হাতে নিয়ে ফেরি করে বেড়াচ্ছেন। পরিবার পরিজন নিয়ে মানুষ প্রতিদিন এখানে আসছেন, ঘুরছেন নিরিবিলি একটা বিকেল কাটিয়ে দেবার জন্যে। কোনো এক অনুষ্ঠান-পার্বণে যেন আরো জোয়ার নেমে যায় এই ধর্মসাগর পাড়ে।

বিশেষ করে ঈদের দিনগুলোতে, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, পূজা পার্বন, পহেলা বৈশাখের মতো দিনগুলোতে এখানে পা ফেলাই দায় হয়ে পড়ে। শুক্রবারেও ভিড় জমায় অসংখ্য মানুষ। বিকেলের পড়ন্ত সূর্যের আলো যখন মৃদু হয়ে আসে ঠিক তখনই শত শত দর্শনার্থীর পদভারে ধীরে ধীরে মুখরিত হতে থাকে ধর্মসাগর পাড়। এ যেন এক মিলন মেলা।

কায়াকিং করেও কাটিয়ে দিতে পারেন একটি সুন্দর বিকেল; source: লেখিকা

আর এখন চলছে শীতকাল। শীতের আমেজ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অতিথি পাখির কলতানে মুখরিত হতে শুরু করেছে ধর্মসাগরের এলাকা। প্রতিদিনই আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখি। সারাদিন পুরো এলাকায় মুক্ত ডানা মেলে ঝাঁক বেঁধে চক্রাকারে উড়ে বেড়াচ্ছে তারা। তবে শিকারীরা যেন এই অতিথি পাখিগুলোকে শিকার করার চেষ্টা না করেন সেই ব্যাপারে প্রশাসনের সুদৃষ্টি কাম্য।

অবশেষে বলবো, এই ধর্মসাগর এমন এক জায়গা যেখানে শচীন দেব বর্মণের ‘শোনো গো দখিনো হাওয়া, প্রেম করেছি আমি…’ গান ভাসে। যেখানে বসে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচনা করেছেন কবিতা। ত্রিপুরার রাজার আমন্ত্রণে রানীর কুঠিরে রাত্রিযাপন করেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর গেয়েছেন, ‘যদি তোর ডাক না শুনে কেউ না আসে….’

পাড় ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে দেখা পেয়ে যাবেন এই সুন্দর পুরাতন বাড়িটির; source: লেখিকা

ইতিহাস :

ধর্মসাগর নিয়ে ছড়িয়ে আছে নানান উপাখ্যান ও মতবাদ। এরূপ নামকরণটাও বেশ আকর্ষণীয়। সুদীর্ঘ ৩২ বৎসর রাজত্ব করেন (১৪৩১-৬২ খ্রি:) যে মহারাজা নাম তার ধর্মমাণিক্য। নিজের অঞ্চলের মানুষের জলের কষ্ট নিবারণ করাই ছিল ত্রিপুরার অধিপতি মহারাজা প্রথম ধর্মমাণিক্যের উদ্দেশ্য। তাই তিনি ১৪৫৮ সালে ধর্মসাগর খনন করেন।
১,৫০০ শ্রমিকের ৭০০ দিনের শ্রমে এটি খনন করান তিনি।

ধর্মসাগর উৎসর্গের সময় যে তাম্রলিপি প্রদান করা হয় তার মর্ম উদঘাটন করলে যেরূপ দাঁড়ায় :

“চন্দ্র বংশোদ্ভব মহা মাণিক্যের সুধীপুত্র শশধর সদৃশ শ্রী শ্রী ধর্ম মাণিক্য ১,৩৮০ মেষ সংক্রমণে (চৈত্র মাসের শেষ তারিখে) সোমবার শুক্ল ত্রয়োদশী তিথিতে কৌতুকাদি তাষ্ট বিপ্রকে শস্য-সমন্বিত ফল ও বৃক্ষাদি পূর্ণ উনত্রিশ দ্রোণ ভূমি দান করিলেন। আমার বংশ বিলুপ্ত হইলে যদি এই রাজ্য অন্য কোনো ভূপতির হস্তগত হয়। তিনি এই বৃহ্মবৃত্তি লোপ না করিলে আমি তাহার দাসানুদাস হইব।

আরো কিছু দীঘি:

প্রাচীন সমতট নামে খ্যাত কুমিল্লায় ছড়িয়ে আছে ছোট-বড় আরো অনেক ঐতিহ্যবাহী দীঘি। প্রাচীনকালের রাজা-রানী ও তাঁদের আপনজনের স্মৃতি জিইয়ে রাখার জন্য ও মানবতার কল্যাণে দীঘি খনন করে গেছেন। জেলা শহরে ‘নানুয়ার দীঘি’, ‘উজির দীঘি’, ‘লাউয়ার দীঘি’, ‘রানীর দীঘি’।

অবসরে বসে খেতে পারেন বাদাম আর দেখবেন প্রকৃতি; source: লেখিকা

সেনানিবাস এলাকায় ‘আনন্দ রাজার দীঘি’, ‘ভোজ রাজার দীঘি’। বরুড়ায় ‘কৃষ্ণসাগর দীঘি’, ‘কাজির দীঘি’, সদর দক্ষিণে ‘দুতিয়ার দীঘি’, চৌদ্দগ্রামে ‘জগন্নাথ দীঘি’, ‘শিবের দীঘি’ ও মনোহরগঞ্জে বিশাল আয়তনের ‘নাটেশ্বর দীঘি’ উল্লেখ করার মতো।

কীভাবে যাবেন:

দীঘিটি যেহেতু শহরের প্রাণকেন্দ্রেই অবস্থিত আপনি চাইলেই দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে খুব সহজেই পৌঁছাতে পারেন কুমিল্লায়।

ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে এশিয়া লাইন, তিশা, উপকূল কিংবা কমলাপুর থেকে বিআরটিসি বা এশিয়া লাইন পরিবহনে কুমিল্লার শাসনগাছা পৌঁছাবেন। প্রতিজনে ভাড়া পড়বে ২০০ থেকে ২৭০ টাকার মধ্যে। শাসনগাছা থেকে অটোরিকশা কিংবা সিএনজি করে সরাসরি বাদুরতলা/ধর্মসাগর। ভাড়া পড়বে ১৫/২০ টাকা।

কোথায় থাকবেন:

আপনি কুমিল্লাতে ঘুরতে আসলে নিশ্চয়ই ফিরতে পারবেন না একদিনেই। কারণ অসংখ্য দর্শনীয় স্থানের ধারক এই কুমিল্লা। থাকার জন্য কুমিল্লা ক্লাব, কুমিল্লা সিটি ক্লাব সহ বেশ কিছু হোটেল ও গেস্ট হাউজ পাবেন এখানে। ব্যবস্থা রয়েছে এসি কিংবা নন এসির। দুজনের কক্ষে প্রতি রাত্রি যাপন খরচ হবে ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা।

এছাড়া থাকার জন্য আছে হোটেল সোনালী, হোটেল চন্দ্রিমা, হোটেল শালবন, হোটেল নিদ্রাবাগ, আশীক রেস্ট হাউস ইত্যাদি। ভাড়া ২০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ল্যান্ডস্কেপ ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে ৭টি বিশেষ টিপস

গোমুখ অভিযান: শিবলিঙ্গ ও থমকে যাওয়া মুহূর্তে