হিম হিম শীতের হিমেল হাওয়ায় হিমাচল রিসোর্টে একদিন

সিলেট, এক স্মৃতি রোমন্থিত প্রিয়তার নাম। যখনই সুযোগ আসে এই শহরে শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার কখনই হাতছাড়া করি না। সে সুযোগ কেবল একদিনের জন্যই হোক না কেন! এবার উপলক্ষ ছিল এক বড় ভাইয়ের হলুদ সন্ধ্যা। রিসোর্টের নাম হিমাচল এবং তার অবস্থান  সিলেটের শ্রীমঙ্গলে।

যাত্রা শুরুর কাহিনী বলতে গেলে আরেক গল্প হয়ে যাবে তাই আর এই ব্যাপারে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করলাম না! শুধু এটুকু বলি, আমাদের যাত্রা শুরুর স্থান ছিল কমলাপুর স্টেশন। পথের সকল বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে আমরা ঠিক সময়মতো সবাই ট্রেনে উঠতে পেরেছিলাম। ভোর ৪টার দিকে পৌঁছে গিয়েছিলাম শ্রীমঙ্গলে। রিসোর্টে আগে থেকেই কথা বলা ছিল। উনারা আমাদের জন্য স্টেশনে সিএনজি পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন।

হিমাচল রিসোর্টের সামনে; ছবি – বিপু বিধান

শীতকালে ভোর ৪টা মানে পুরোই অন্ধকার। সিএনজির ভেতরে বসেই টের পাচ্ছিলাম শ্রীমঙ্গলের শীতের আধিক্য। দুই পাশের চা-বাগানগুলো তাদের হিমেল পরশ বুলিয়ে আমাদের স্বাগত জানাচ্ছিল। ৩০ মিনিটেই চলে গেলাম রিসোর্টে। এই শীতে রিসোর্টের নামটি যেন তার সার্থকতার জানান দিচ্ছিল আমাদের কাছে। হিমাচল রিসোর্টটি আকারে বেশ বড় না হলেও নান্দনিকতায় অপূর্ব।

হিমাচল রিসোর্ট

প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে গেল রিসোর্টের স্থাপত্য। ছিমছাম, গোছানো, খোলামেলা এবং আধুনিকতার মিশেল রয়েছে এখানে। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছিল। আমাদের জন্য দোতলায় থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠেই আরেকবার বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। রুমগুলোর পাশেই বেশ বড় একটা খোলা ছাদ। সেখানে বসার জন্য রয়েছে বেঞ্চ। এখানে বসে রাতের আকাশের তারার সাথে কিছুক্ষণ সময় কাটালাম। সেদিন আকাশ ছিল তারায় ভরা। এক এক করে দেখা পেলাম বেশ কিছু বিখ্যাত তারার।

সপ্তর্ষি মন্ডল; ছবি- বিপু বিধান

রিসোর্টটি সকালে উঠে ঘুরে দেখব ভেবেই একচোট ঘুমিয়ে নিলাম। উঠেই রুমের দরজা খুলে বাইরে। দোতলা একটা বিল্ডিং। দোতলায় খোলা ছাদের কথা আগেই বলেছি। হিম হিম শীতে রোদ পোহানোর জন্যই এই ব্যবস্থা, অন্তত এই সময়ে এই সকালে আমার সেটাই মনে হচ্ছিল। এরপরে মনে হল একটু হেঁটে আসি! যেই ভাবা সেই কাজ। বেরিয়ে পড়লাম প্রাতঃভ্রমণের উদ্দেশ্যে। গেটে সবসময় পাহারা থাকে এটা দেখে ভালো লাগল।

এক চিলতে উঠান; ছবি- বিপু বিধান

কিছু সময় এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ালাম। কোনো চিন্তা ছাড়া উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানোর মজাই আলাদা। খানিক পরেই ফিরে আসলাম রিসোর্টে। রিসোর্টে রয়েছে ডাইনিং রুম এবং সব খাবার গরম গরম পাবার নিশ্চয়তা। খাবার এতই বেশি সুস্বাদু ছিল যে সবাই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি করেই খাচ্ছিল প্রতি বেলাতেই। অতিথিদের চাহিদা অনুসারেই উনারা রান্নার ব্যবস্থা করতেন। ছোট-বড় হাওরের মাছ, হাঁসের মাংস, টাটকা শাক-সবজি সবই ছিল মেন্যুতে।

সুস্বাদু হাঁসের মাংস আর সবজি-ডাল দিয়ে পেট পূজা; ছবি- বিপু বিধান

রিসোর্টটিতে এসি-নন এসি দু ধরনের রুমই রয়েছে। প্রতিটি রুমে রয়েছে একটি ছোট আলমারি, সোফা এবং টেবিল। সাথে এটাচড ওয়াশরুম তো রয়েছেই। কোনোকিছুর বাহুল্য নেই কিন্তু প্রয়োজন মাফিক সবকিছুই যেন রয়েছে। এই ব্যাপারটাতেই বারবার মুগ্ধ হয়েছি। যেমন ধরুন লাইটিং এর ব্যাপারটাই। ছোট ছোট এনার্জি সেভিং লাইটগুলো একটু পর পর বিভিন্ন রঙের কাপড় দিয়ে গোল করে টাঙিয়ে রাখা হয়েছিল। রাতের বেলা এই আলোর কারণে যে অপার্থিব সুন্দর পরিবেশের সৃষ্টি হয় তা ভুলে যাওয়ার মতো নয়!

বিভিন্ন রঙয়ের আলোর খেলা

রিসোর্টটির অবস্থান ছিল এমন জায়গায় যে এখান থেকে সহজেই শ্রীমঙ্গলের দর্শনীয় স্থানগুলোতে যাওয়া যায়। তাদেরকে বললে তারাই যাতায়েতের সব ব্যবস্থা করে দেবেন। লাউয়াছড়া বন, মাধবপুর লেক এসব জায়গাগুলোতে সহজেই ঘুরে আসতে পারেন ইচ্ছা করলেই। আমরা গল্প-গুজব, গোসল সব সেরে বেরিয়ে পড়েছিলাম মাধবপুর লেকের দিকে। এই শীতেও সবুজের কোনো কমতি ছিল না চারপাশে। লেকে চলল বেশ কিছুক্ষণ ছবি তোলার প্রতিযোগিতা!

মাধবপুর লেক; ছবি- বিপু বিধান

এরপর রিসোর্টে ফিরেই জোরেশোরে চলতে লাগল হলুদ-সন্ধ্যার প্রস্তুতি। আমাদের হলুদের স্থান হচ্ছে দোতালার সেই খোলা উঠান। কিছু ফলমূল, মিষ্টি আর বাটা হলুদ, সাথে রঙ-বেরঙের আলো, উপরে ঝিকিমিকি তারার আকাশ এবং সাথে ৮-৯ জন মানুষ। এরচেয়ে সুন্দর হলুদ অনুষ্ঠান আগে পালন করেছি বলে মনে পড়ে না। সবাই মিলে অনেক অনেক হলুদ মাখালাম সেই বড় ভাইকে। নাচ-গান অনেক কিছু হলো, আর হলো খাওয়া-দাওয়া।

হিমাচল রিসোর্টে হলুদ সন্ধ্যায় আমরা

শহরের যান্ত্রিক জীবন ছেড়ে রিসোর্টে এসে ফিরে পেলাম আবার সামনে এগিয়ে চলার শক্তি। একটু সুস্থির নিঃশ্বাস ফেলার জায়গা পেয়ে মনটা যেন শান্তি পেল। হাতে একদিন সময় পেলে ঘুরে আসতে পারেন হিমাচল নামের এই রিসোর্টটিতে। হতাশ হওয়ার সুযোগ কম। এখনকার জটিল জীবনের সাথে এই ছিমছাম, গোছানো, বাহুল্যহীন রিসোর্ট একদম বিপরীত। ভ্রমণ এমনিতেই মানুষের মনে এনে দেয় প্রশান্তি, আর সাথে হিমাচল রিসোর্ট যোগ করবে হিম হিম ভালোবাসা।

যাওয়া-আসা: ঢাকা থেকে বাসে বা ট্রেনে করে শ্রীমঙ্গল। শ্রীমঙ্গল থেকে সিএনজি করে রাধানগর হিমাচল রিসোর্ট।

নান্দনিকতার ছোঁয়া রিসোর্ট জুড়ে।

খাওয়া-দাওয়া:

রিসোর্টে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। কী খেতে চান তা বলে দিলে তার ব্যবস্থা করা দেয়। চাইলে শ্রীমঙ্গল শহরে গিয়ে খেয়ে আসতে পারেন।

রুম, এসি/নন এসির ভাড়া

ডিলাক্স ডাবল রুম আছে ২টি। প্রতি রুম ভাড়া ৩,০০০ টাকা। ডিলাক্স কাপল রুম আছে ২টি। প্রতি রুম ২,৫০০ টাকা ভাড়া। ইকোনমি কাপল রুম আছে ৩টি। প্রতি রুম ১,৫০০ টাকা ভাড়া।

রিসোর্টের লিংক- https://www.facebook.com/Himacholresorts/
রিসোর্টের ফোন নাম্বারঃ 01835-115533

*** ফিচার ইমেজ- বিপু বিধান

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কালিম্পং হয়ে রিশপের পথে

নো ম্যান্স ল্যান্ডের মেঘ-পাহাড়ে ভালোবাসা