রিশপের টিফিন দাড়ার পথে পথে

আগেই বলছিলাম যে ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। আর আমরা রিলাক্স ট্যুরে গিয়ে কীভাবে ট্রেকিং করা যায় সেই চিন্তায় মগ্ন থাকি। তাই খুব বেশি চিন্তা ভাবনা না করতেই খুঁজে পাওয়া গেল টিফিন দাড়ার হদিস। সুনাখারি রিসোর্ট থেকে নাকি ৩০/৪৫ মিনিট হাঁটলে টিফিন দাড়ার দেখা পাওয়া যায়। তাই আর দেরি না করে সকাল সকাল নাস্তা সেরে হোটেল চেক আউট করে বেরিয়ে পড়ি টিফিন দাড়ার উদ্দেশ্যে।

টিফিন দাড়ার পথে; ছবি- সাইমুন ইসলাম

আমাদের প্রত্যকের সাথে আগে পিছে ভারী ভারী দুটো ব্যাগ নিয়ে হাঁটা শুরু করি। হাঁটা বললে মনে হয় ভুল হবে। পাহাড় বাওয়া শুরু। যত উপরে উঠছি তত শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বেড়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ দিন ট্রেকিং থেকে দূরে থাকায় অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে হাঁপিয়ে উঠি।

মধ্যাকর্ষণ শক্তি বিপরীতে জেনেও কোনোভাবেই আমাদেরকে উঠতে দেবে না বলে পণ করেছে। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হাচড়ে পাচড়ে উঠতে থাকি। জঙ্গল হাতড়ে পাঁচ মিনিট উঠলে ১০ মিনিট হাঁপ ছেড়ে জিরিয়ে নেই ১০ মিনিট। খাঁড়া পথ উঠে গেছে উপরের দিকে। কোথাও সমতলের কোনো বালাই নেই।

জঙ্গল হাতড়ে এগিয়ে চলেছি; ছবি- সাইমুন ইসলাম

আমাদের সাথে গাইড ছিল না। কটেজের দিদি বলেছিল এখানে যেতে নাকি গাইডের দরকার হয় নাই। নাক বরাবর এগিয়ে গেলেই পৌঁছে যাওয়া যায়। আর সাথে মোবাইলে লোকেশন থাকায় বেশি চিন্তা করতে হয়নি। তাছাড়া পথের মাঝে মাঝে বোর্ডে লেখা নির্দেশনা দেওয়া আছে কোন দিকে যেতে হবে।

পথের দিক নির্দেশনা; ছবি- সাইমুন ইসলাম

ঘন জঙ্গলের নীরবতা ভেঙে সবুজের অরণ্যের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছি। যত উপরের দিকে উঠছি তত বেশি ক্লান্তি ছেয়ে ধরছে। সূর্য তখন পাইন বন ভেদ করে আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। নাম জানা হাজারও জঙ্গলই ফুলে ছেয়ে আছে চারধারে।

পাখির মিষ্টি মধুর কিচিরমিচির শুনতে শুনতে পথিমধ্যে মাঝে মাঝে থেমে যাই। এরই ফাঁকে ফাঁকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পাইনের সারি। প্রকৃতির কী যে অপরূপ লীলাখেলা! আহা! চোখের নিমেষেই হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে এই সৌন্দর্যের মাঝে।

পথের বাঁকে এভাবে বসার ব্যবস্থা আছে; ছবি- সাইমুন ইসলাম

কাঠের উপর খোদাই করে লেখা আছে পথের নির্দেশনা। তারই নিচে কাঠের বেঞ্চে বসে পথিকের একটু জিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও করা আছে। পথিমধ্যে জিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাটা আমার বেশ মনে ধরেছে। আরও খানিকটা পথ এগিয়ে যেতেই সুউচ্চ পাইন গাছের দেয়াল। ঝাঁকড়া সে সবুজের ঘেরা দেয়াল মুগ্ধ করেছে আমাকে।

এরই মধ্যে পা ধরে এসেছে সবার। সাথে ক্লান্তিও ভর করেছে সকলের উপর। সাথে থাকা শুকনো খাবার খেয়ে কিছুটা শক্তি সঞ্চয় করে নেই। এরপর আরও বেশ কিছুটা সময় পাইন গাছের নিচে জিরিয়ে আবার সামনের দিকে এগিয়ে যাই।

আকাশ ছুঁতে নেই কো মানা; ছবি- সাইমুন ইসলাম

গুটি গুটি পায়ে আরও মিনিট দশেক এগিয়ে যেতেই দেখা মেলে টিফিন দাড়া ভিউ পয়েন্টর। এই জায়গা থেকে ১৮০ ডিগ্রী কোণে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। এমনিতেই রিশপ থেকে হিমকন্যাকে আরও কাছে বলে মনে হয়। এই ভিউ পয়েন্ট থেকে তো আরও বেশি কাছে বলে মনে হচ্ছে।

ঘেমে-নেয়ে উঠেছে সবাই। টিফিন দাড়া ভিউ পয়েন্ট উঠে সবাই হাত পা ছড়িয়ে বসে পড়ি। খাঁড়া পাহাড় বাইতে হবে জানলে সাথে পর্যাপ্ত পানি রাখতাম। তাই অগত্যা সাথে থাকা কোক দিয়ে আপাতত তৃষ্ণা নিবারণ করি।

অপলক নয়নে দেখছি তাকে; ছবি- সাইমুন ইসলাম

টিফিন দাড়ার চারিধারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পাইন বনের সবুজ চাদর ভেদ করে দূরে দাঁড়িয়ে হাতছানি দিচ্ছে হিমকন্যা। এক টুকরো মেঘ মাঝেসাঝে ঘিরে ফেলছে তার চূড়াকে। অন্যদিকে, সূর্যের সাথে মেঘের লুকোচুরি খেলা চলছে অবিরত।

এই ভিউ পয়েন্টের চূড়ায় ইট, বালি সিমেন্ট দিয়ে বেশ উঁচু করে বানিয়েছে একটা ঢিবি। যাতে পাইন বনের উঁচু মাথার আড়ালে ঢাকা না পড়ে যায় হিমকন্যার রূপ। চারিধারে ছেয়ে আছে জঙ্গলি গাছেরা। সেই সবুজের মধ্যে দিয়ে দূরে সফেদ সাদা চাদর গায়ে জড়িয়ে বসে আছে কাঞ্চনজঙ্ঘা।

আমি এক কোণে বসে দেখছি তার লীলাখেলা। আর মনে মনে আফসোস করছি সকালে কেন এখানে এলাম না সূর্যোদয় দেখতে। হয়তো সে কারণেই টিফিন দাড়ার চূড়ায় বসে বারবার একটা কথা মনে হচ্ছিল। আবার যদি কখন আসি তবে এই চূড়ায় একরাত অবশ্যই ক্যাম্পিং করবো।

মাথায় তুলে দেশে নিয়ে যাবো; ছবি- সাইমুন ইসলাম

বাকিরা তখন ক্যামেরায় স্মৃতি বন্দি করতে ব্যস্ত। নানা আঙ্গিকে, নানা ভঙ্গিতে ফ্রেমে বন্দি হচ্ছে মুহূর্ত। এরই ফাঁকে দুইজন ফটোগ্রাফারের মধ্যে বিরোধ লেগে গেল।। সাইমুন বলছে এইভাবে তুললে ছবি ভালো হবে। আর অন্যদিকে, সৌরভ ভাই বলছে না ঐভাবে তুললে ভালো হবে। এই দুজনের মধ্যে মধ্যস্থাকারি বা বাফার ষ্টেট হিসেবে মাসুদ ভাইয়ের আবির্ভাব হয়। বিরোধ মিটাতে মাসুদ ভাইয়ের জুড়ি নেই। শেষ পর্যন্ত বালকদ্বয় শান্ত হয়। বাকিরা তখন মজা নিচ্ছিল এদের ছেলেমানুষি দেখে।

এই পথ যদি শেষ না হয়; ছবি- সাইমুন ইসলাম

সূর্য তখন মাথার উপর। এবার ফিরতে হবে। টিফিন দাড়া থেকে আমরা এখন লাভা যাবো। পাইন বনের মধ্যে দিয়ে ঘণ্টা দুই হাঁটলেই পৌঁছে যাওয়া যায় লাভায়। রিশপ থেকে জীপে করেও লাভায় যাওয়া যায়। কিন্তু আমাদের পাইন বনের আলো আধারির পথ ধরে যাওয়ার ইচ্ছা থাকায় সিদ্ধান্ত হয় ট্রেকিং করে লাভায় যাবো। শুনেছে রিশপ থেকে লাভা যাওয়ার এই পায়ে হাঁটা পথ নাকি অসম্ভব সুন্দর। বিশাল বিশাল পাইন গাছেরা ঘিরে রাখে চারপাশ। পাইন গাছেরা প্রভাকরের উপর সদয় হলেই পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে আলো প্রবেশের অনুমতি মেলে। তাই এবার আমরা সেই পথই অনুসরণ করি।

*** ফিচার ইমেজ- সাইমুন ইসলাম

(চলবে)

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অ্যাডভেঞ্চার প্রেমীদের স্বপ্নের দোকান, হাওড়া ডিক্যাথলন

ফুল ও ফোয়ারার জয়পুর আমের গার্ডেন