ফুন্টসলিংয়ের পথে পথে

জয়গাঁও থেকেই ভুটানের দুটি রির্জাভ মিনি বাসে করে আমরা ফুন্টসলিংয়ে ভুটান ইমিগ্রেশন অফিসের সামনে আসি। আমাদের গাড়ির ড্রাইভার অন এরাইভাল ভিসা পেতে অনেক সহযোগিতা করে। মোট কথা, তার তত্ত্বাবধানে আমরা সবাই লাইন ধরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে সহজেই ভিসা পেয়ে যাই। যেহেতু এটা একটা বিশাল গ্রুপ ট্যুর ছিল, তাই একে একে আমরা সবাই ভিসা নিয়ে বেরিয়ে আসছিলাম। ভিসা হাতে পেয়েই আমার পরিবার সহ আশেপাশের ফুন্টসলিং শহরটা দেখে নেওয়ার জন্য বেরিয়ে পড়লাম।
এর ফাঁকে আমাদের গ্রুপ লিডার রেদোয়ান ভাই আমাদের সবাইকে পানি, বিস্কিট আর প্রাণের জুস খাওয়ালো এবং সেই সাথে জানতে পারলাম বাংলাদেশি প্রোডাক্ট ভুটানে পাওয়া যায়। বইতে পড়েছি জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হতে হয়, আমরা সবাই সেটাই করলাম। এবং রাস্তা যখন পার হচ্ছি আপনা আপনি গাড়িগুলো স্লো হয়ে যাচ্ছে। আরেকটা মজার জিনিস হচ্ছে, এখানে কোনো গাড়ি হর্ণ বাজায় না। এটাকে তারা বেয়াদবি মনে করে। ভুটানের আট দিনের ট্যুরে আমরা মাত্র তিনটা গাড়ীর হর্ণ শুনেছি যার মধ্যে দুটো আমাদের নিজেদের ভুলের জন্য।

ভুটান গেট যা ফুন্টসলিংয়ে ইমিগ্রেশন অফিসের সামনে। অপর পাশেই ইন্ডিয়ার জয়গাও বর্ডার; ছবিসূত্র: সুমাইয়া পারভীন

পাশ্চাত্যের যত নিয়ম কানুনের কথা শুনেছি তা সবই আপনি পাবেন ভুটানে। রাস্তা-ঘাট পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, বাড়িগুলোর জানালা সব একই ডিজাইনে করা। রাস্তায় কেউ থুতু ফেলে না এবং সিগারেট এখানে নিষিদ্ধ। আমাদের যাত্রাপথে বিভিন্ন কিছু আমরা আমাদের গ্রুপ লিডারের কাছে শুনেছি বা আমি বেশ কিছু বিষয় অন লাইন থেকে জেনেছি – ভুটান হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেটা কার্বন নেগেটিভ। মানে তারা যত পরিমাণ কার্বন উৎপন্ন করে তার চেয়ে বেশি শোষণ করে। তাদের সংবিধানে বলা আছে যে, ভুটানের ন্যুনতম ৬০ ভাগ জমিতে ফরেস্ট থাকতে হবে। অর্থাৎ তাদের সরকার থেকে গাছ লাগানো বাধ্যতামূলক করা আছে।
তারা আবার রিনিউএবল এনার্জির মাধ্যমে বিদ্যুৎ তৈরি করে কার্বন এমিসন আরও কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে। ভুটানের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, আর সে দেশের মানুষের ব্যবহার শিক্ষণীয় ব্যাপার আমাদের জন্য। খারাপ জিনিসটাই কী ভুটানিরা তা জানে না, আমার কাছে অনন্ত তাই মনে হয়েছে।
ফুন্টসলিং ঘোরার ফাঁকে গ্রুপ লিডারের সহায়তায় মোবাইলের জন্য সিম কিনে নিলাম। আমি আবার যে দেশে যাই সিম কিনি ঠিকই, কিন্তু দেশে যোগাযোগ করা হয়ে ওঠে না। এর মূল কারণ প্রতি ট্যুরে আমার পরিবার আমার সাথে থাকে। তাই আর দেশের অন্য কিছু নিয়ে টেনশন করি না। আর যেহেতু ঘুরতে যাচ্ছি, তাই শুধু ঘোরাটাই উপভোগ করার ইচ্ছা থাকে। ঘুরতে ঘুরতে কিছু চিপস, জুস আর কলা কিনে নিয়ে খেতে লাগলাম আর ফুন্টসলিংয়ের রাস্তার আশেপাশের কিছু ছবি তুললাম যা আপনাদের সাথে শেয়ার করব।
ফুন্টসলিংয়ের একটি বাড়ির ছবি। ওদের সব বাড়ি দেখতে একই রকম; ছবিসূত্র: লেখক

যেহেতু আমরা ফুন্টসলিং থেকে পারোতে যাব- প্রায় ১৬০ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হবে, যেতেও অনেক সময় লাগবে তাই ফুন্টসলিংয়ের একটি হোটেলে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। আমরা ৩৩ জন একটা হোটেলে ঢুকেছি, তাই হোটেল ম্যানেজারকে আমাদের খেতে বসার জায়গা দিতে একটু হিমশিম খেতে হয়েছে। তবুও তারা একটু সময় নিয়ে হলেও খুব শান্ত পরিবেশে আমাদের সবার খাবার পরিবেশন করতে পেরেছে।
ভুটানের যে জিনিসটা আপনাকে আকর্ষণ করবে তা হলো শান্ত পরিবেশ। ভুটানের প্রধান ধর্ম হচ্ছে বৌদ্ধ। ভুটান দেশটাই বিখ্যাত তাদের অসাধারণ ল্যান্ডস্কেপ আর মনেস্ট্রির জন্য। তিব্বতের কাছাকাছি হওয়ায় তাদের সংস্কৃতির সাথে তিব্বতিয়ান সংস্কৃতির মিল পাওয়া যায়। ভুটানে এখন আর রাজার শাসন বা রাজতন্ত্র নেই। এটা একসময় ছিল, কিন্তু ২০০৮ সালে তা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিবর্তিত হয়। ভুটানিদের কাছে তাদের দেশের নাম ড্রুকইউল অর্থাৎ বজ্র ড্রাগনের দেশ। ড্রুক বা বজ্র ড্রাগন তাদের জাতীয় প্রতীক। তাদের রাজাকে তারা স্থানীয় ভাষায় ডাকে ‘লর্ড অফ থান্ডার ড্রাগন’ নামে।
ফুন্টসলিংয়ের একটি মনেস্ট্রির ছবি; ছবিসূত্র: লেখক

খাওয়া দাওয়া সব কাজ শেষ করে আমরা সবাই গাড়িতে চড়ে বসলাম পারোতে যাওয়ার উদ্দ্যেশে। তখন ঘড়িতে সন্ধ্যা ৬.১৫ বাজে। কিছু সময় যাওয়ার পর অন্ধকার হয়ে আসে, আশেপাশে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু আমার কাছে বেশ থ্রিল লাগছিল। কারণ এর আগে লেহ লাদাখের পাহাড়ি রাস্তায় দিনের বেলায় ভ্রমণ করেছিলাম, এখানে রাতে ঘুরতে পেরে খুব ভালো লাগছিল। আমরা বুঝতে পারছিলাম যে আমরা ক্রমাগত উপরে উঠে যাচ্ছি। আমাদের সাথে কয়েকজনের সামান্য শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। পাহাড়ি রাস্তায় অন্ধাকারে গাড়িতে করে ভ্রমণ করার মজাই আলাদা।
আর যদি নিরাপত্তার কথা বলেন তাহলে বলব ভুটানে আমি দরজায় লক না করেই ঘুমিয়েছি। এবার বাকিটা বোঝার দায়িত্ব আপনাদের হাতেই ছেড়ে দিলাম। রাস্তায় বেশ কিছু জায়গায় নেমে হাঁটাহাঁটি করেছি ড্রাইভার আর নিজেদের ক্লান্তিভাব দূর করার জন্য। রাত ১টার দিকে আমরা পারোর হোটেল ড্রাগনে এসে নামি। আজ রাতে এখানেই থাকব। এটা একটা ইন্ডিয়ান হোটেল। মালিক খুব সম্ভবত কলকাতার। এখানে সব ধরনের বাঙালি খাবার পাওয়া যায়। সাদা ভাত, শুকনো মরিচ দিয়ে আলু ভর্তা, আলু ভাজি, সবজি, খাসির তরকারি, মুরগির তরকারি, ডিম- এক কথায় ষোল আনা বাঙালি খাবার। পুরোই বিন্দাস।
ফুন্টসলিংয়ের যে হোটেলে দুপুরে খাবার খেয়েছিলাম; ছবিসূত্র: লেখক

পারো হচ্ছে ওদের সব থেকে সুন্দর শহর। এই সুন্দর শহরের টাইগার নেস্টে আগামিকালের ট্রেকিং এলান দিলেন আমাদের গ্রুপ লিডার। সবাইকে সকাল ৭টায় ব্রেক ফাস্ট টেবিলে দেখা হবে বলে যার যার রুমে চলে যেতে বললেন। আমরাও গত দু’দিনের জার্নির পর একটু শোয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লাম। অনেক ঘুম পেয়েছে, যাই ভাই -আগামিকাল আবার কথা হবে।
ফিচার ইমেজ- touroffer.in

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কাশ্মীরের পাগল করা পেহেলগাম

নয়নাভিরাম দ্বীপস্বর্গ মালদ্বীপের দুর্দান্ত সব ভ্রমণস্থানের গল্প