অপার্থিব পথে, দার্জিলিং থেকে কালিম্পং

যতবার এই রাস্তা দিয়ে আমি যাওয়া-আসা করেছি, ততবার আমি এক অপার্থিব সুখে আচ্ছন্ন থেকেছি। আচ্ছন্ন না থেকে কোনোভাবেই নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে পারিনি। এই পুরো পথের দু’পাশে সবটুকু জুড়ে, এত এত মাধুর্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যে সেটা নিজের চোখে দেখে আর নিজের মতো করে উপলব্ধি করতে না পারলে লিখে বা বলে বোঝানো সম্ভব নয় কিছুতেই।

দার্জিলিংয়ের আঁকাবাঁকা পথে পথে বর্ণীল বাড়ি, টয় ট্রেনের সরু রেল লাইন, ঘুম স্টেশন ছাড়িয়ে গাড়ি বামে বাঁক নিতেই অপার্থিবতার শুরু। সারারাত বৃষ্টির মতো ঝরে পড়া শিশিরে পিচ ঢালা রাস্তা কালো হয়ে আছে। রাস্তার উপর দিয়ে শিশিরের পানি বয়ে চলেছে ধীরে ধীরে।

গাছের পাতায় পাতায় ঝুলে আছে শেষ শিশির বিন্দু, একটু বাতাস বা আলতো ছোঁয়ায় ঝরে পড়ার অপেক্ষায়, মেঘে আর কুয়াশার মিতালী ঢেকে রেখেছে কাছে দূরের পাহাড়ের সিঁড়িকে। যে পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে উঠে যাওয়া যাবে দূরে জ্বলজ্বল করে তাকিয়ে থাকা কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায়! এমনটাই মনে হবে।

বৃষ্টি ভেজা পথে। ছবিঃ http://makeandcatch.com

বেশ কয়েকটা পাহাড় আর কিছু বাঁক নেবার পরেই শহুরে বাড়ি ঘর দূরে সরে গেল, অনেক দূরে। সামনে-পিছনে, ডানে-বামে যতদূর চোখ যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়। সবুজ পাহাড়ের অনাবিল হাতছানি আপনাকে অভিভূত করে দেবে প্রতি মুহূর্তে। এক পাশে গাড়ির গা ছুঁয়ে ছুঁয়ে উঁচুতে উঠে গেছে পাহাড়ের পিঠ, অন্যপাশে পাহাড়ের সিঁড়ি নিচে নেমে গেছে তিস্তার আকর্ষণে, ভিজতে, ভাসতে অথবা সুখে ডুবে মরতে!

কয়েক মিনিট গাড়ি চলতেই হাতের বামে পাহাড়ের উপরে সূর্যের কিরণ মেখে হাসছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা! সবাই স্বাভাবিকভাবেই ভীষণ উল্লসিত। একটা ভিউ পয়েন্ট পেয়ে গাড়ি থামিয়ে সেখানে কিছুক্ষণ ফটো সেশন করা হলো ইচ্ছামতো। তারপর আবারো সামনের দিকে ছুটে চলা।

পরের পুরোটা পথের নানা জায়গা থেকে সব সময় কাঞ্চনজঙ্ঘা ছিল আমাদের সাথে সাথে। আরও প্রায় ৩০ মিনিট চলার পরে লামাহাটটা চলে এলাম। এখানের শুকনো ফুলের গাছ, ঝরে যাওয়া ফুলের অবশিষ্ট, আর রুক্ষ হয়ে যাওয়া গাছের ম্লান সবুজ অতটা আকর্ষণ না করায় একটু থেমেই আবারো দূরের পথে ধরলাম।

এবার গাড়ি যে পথে যাচ্ছিল, প্রথমবার এই পথটা আরও বেশী অপার্থিব ছিল। একপাশে পাহাড়ি পাইনের সারি পাহাড়ের পর পাহাড় জুড়ে, অন্যপাশে নাম না জানা গাছে গাছে আচ্ছাদিত পাহাড়ি অরণ্য, আর দূরের পাহাড়ের তো কাঞ্চনজঙ্ঘার হাসি রয়েছেই অবিরত।

ঝকঝকে প্রকৃতি। ছবিঃ http://telihotels.com

শীতের ঝরা পাতায় আচ্ছাদিত পিচ ঢালা রাস্তায়, একপাশে পাহাড় অন্যপাশে পাইনের অরণ্যের মাঝ দিয়ে আঁকাবাঁকা আর উঁচুনিচু রাস্তায় ছুটে চলেছে আমাদের গাড়ি। দূরে তিস্তার কলরব কানে এসে বাজছে ক্ষীণ সুরে। যে কোনো ভ্রমণেই নদী একটা বিশেষ আকর্ষণ।

আর সেটা যদি হয় তিস্তার মতো তেজী, স্রোতস্বিনী আর গভীর, উত্তাল কোনো নদী, তবে সেই নদীর কাছে ছুটে যাওয়ার রোমাঞ্চ অনেক বেশী করে রোমাঞ্চিত করে তোলে। অল্প কিছু সময়েই উঁচুনিচু আর আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়েই চলে এলাম লাভারস ভিউ পয়েন্টে। যেখানে তিস্তার সাথে আরও একটি নদী মিলিত হয়েছে চরম সুখ আস্বাদনে!

শীতের শেষে দার্জিলিং। ছবিঃ d27k8xmh3cuzik.cloudfront.net

এই জায়গাটা বেশ কোলাহলময় আর একটু বাজার প্রকৃতির হলেও আমার কাছে বেশ লাগে, পাহাড়ের চূড়ায় বসে বসে দূরে পাহাড়ের পরে পাহাড়ের সিঁড়ি দেখতে। একটা পাহাড়ের সাথে হেলান দিয়ে আছে আর একটা পাহাড়, পাহাড়ে পাহাড়ে দারুণ আলিঙ্গনের অনবদ্য দৃশ্য দেখা যায় এখানে। কোনো কোনো পাহাড় যেন মিশেছে গিয়ে দূরের ধুসর আকাশে, আকাশকে করে দিতে নীল পাহাড়ের আনন্দ মেখে! আবার কোনো কোনো পাহাড়ের আনন্দ যেন তিস্তার উত্তাল স্রোতে মিশে যেতে!

তাই ওরা আকাশ ছুঁতে না গিয়ে পানিতে মিশে যেতে পথ ধরেছে তিস্তার আলিঙ্গনে আবদ্ধ হতে। একই সাথে এত এত পাহাড়, নদী, অরণ্য, ঝরা পাতা, শীত, কুয়াশা, মেঘ পেয়ে একটা আচ্ছন্নতায় পেয়ে বসবে যে কাউকে। আর সেই সাথে যদি পাওয়া যায় কনকনে শীতে একটু মিষ্টি রোদের পরশ তবে তো ইচ্ছা হবে, অহর্নিশ বসে থাকি সেখানে। আমরাও রোদের আলিঙ্গনে উষ্ণতা পেয়ে বসেছিলাম সবাই মিলে। ড্রাইভারের ডাকে চেতনা ফিরে পেতেই গাড়িতে উঠে ছুটতে শুরু করলাম আবার।

তিস্তার নদী। ছবিঃ wikimedia.org

এবার গাড়ি নামতে শুরু করলো পাহাড় বেয়ে, একটার পর একটা নিচু বাঁকের রোমাঞ্চকর টার্ন, গুহা আর অরণ্যের অন্ধকার, কোথাও একটু রোদের লুকোচুরি দারুণ দ্রুততায় তিস্তার বুকে নেমে গেল যেন। কিন্তু না, তিস্তার পায়ের পাতায় পাতায় ভর করে অন্য পারে যাবার ব্রিজে উঠে পড়লাম তিস্তা বাজার পেরিয়ে উঁচু আর একটা রাস্তায় উঠেই।

তিস্তা ব্রিজে সবার খুব ইচ্ছা হয়েছিল নেমে ছবি তুলতে। কী নান্দনিক একটা জায়গা, বিশাল উঁচু ব্রিজের দুই পাশে গভীর আর খরস্রোতা বয়ে চলা তিস্তা, চারপাশে যতদূর চোখ যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়ের হাতছানি। বিশাল বিশাল সবুজ পাহাড়ের পাগল করা আহ্বান উপেক্ষা করেই পথ চলতে শুরু করেছিলাম ফেরার সময় থামবো বলে।

এরপরের রাস্তাটুকু শুধু চড়াই আর চড়াই। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে শুধু উঠে যাওয়া। একটার পর একটা পাহাড়ের চড়াই উঠতে উঠতেই দুটি বাচ্চা বেশ কাহিল হয়ে পড়ল। সকালের খাবার ধরে রাখতে না পেরে। তাই আবারো ক্ষণিকের থেমে যাওয়া। কিছু মান-অভিমানের পরে পাহাড় আর নদীর সাথে আড়ি দিয়ে শেষ পথটুকু শেষ করা।

কালিম্পংয়ের ডেলোতে ওঠার পথটুকু আরও বেশী খাড়া এবং বাঁকে বাঁকে পূর্ণ যেন। তবে এই পথটুকুর বিশেষ আকর্ষণ ছিল নীল আকাশে আকাশে উড়ে বেড়ানো প্যারাগ্লাইডিঙয়ের নানা রঙের সব বেলুন বা প্যারাসুটের বিশেষ দৃশ্য। বাচ্চারা নতুন আর অভিনব আকাশে এই ওড়াউড়ি দেখে বেশ মজা পেয়েছে।

প্যারাগ্লাইডিং। ছবিঃ লেখক

পাহাড় আর নদীর পরে রোদেলা, ঝলমলে নীল আকাশ জুড়ে এমন বর্ণীল খেলা দেখতে দেখতেই পৌঁছে গেলাম কালিম্পঙয়ের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের চূড়ার কাছে, যেখানে গাড়ি পার্ক করে সেখানে, ডেলোতে। তবে এই ডেলো সেই ডেলো ছিল না। যে ডেলোকে দেখে মুগ্ধতায় হারিয়ে গিয়েছিলাম আগে। এই ডেলো রুক্ষ, ধুসর আর মানুষে মানুষে জনাকীর্ণ একটা পিকনিক স্পট হয়ে গেছে!

ডেলো। ছবিঃ লেখক

কিন্তু যা পাবার পেয়ে গেছি, অন্তত আমার কাছে দার্জিলিং থেকে কালিম্পং আসার এই পথে, একই সাথে পাহাড়, নদী, মেঘ, কুয়াশা, পাইনের অরণ্যের মতো রোমাঞ্চকর সেই অপার্থিব পথে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ছাত্রদের নিয়ে হাওর বিলাস

চাঁদের আলোয় আমিয়াখুম অ্যাডভেঞ্চার