নড়াইলের পথে: চিত্রা নদীর পাড়ে চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের ব্রিজে

যারা মোটামুটি চিত্রকলা পছন্দ করেন তাঁরা হয়তো বিশ্ববরেণ্য চিত্র শিল্পী এস এম সুলতানের নাম শুনে থাকবেন। আমি আজ লিখতে বসেছি সেই এস এম সুলতানের শহর নড়াইলে ভ্রমণের গল্প।
এক সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কবিতা পড়েছিলাম,

বহু দিন ধ’রে বহু ক্রোশ দূরে
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা,
দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু।

কবিতার পাণ্ডুলিপি; Source: SAHITYA JAGAT – WordPress.com

এক দিন বসে বসে কবিতাটির সাথে নিজের মিল খুঁজছিলাম। আসলে আমিও এমনই, দেশের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছি কিন্তু বাড়ির পাশের এস এম সুলতানের বাড়িতে এখনো যাইনি। আমি জানি এই কথা শুনে ইতোমধ্যে হয়তো অনেকেই আমাকে দীন ভেবে নিয়েছেন। আসলে জীবনের তাগিদে আমি ছোটবেলা থেকেই অধিকাংশ সময় কাটিয়েছি দেশের নানা প্রান্তে। তাঁর মধ্যে থেকে জীবনের খুব অল্প সময় কাটিয়েছি নিজের জন্মভূমিতে, তাই জন্মভূমিটাকে এখনো ভালো করে চিনে উঠতে পারিনি।
আমার বাড়ি নড়াইলে আর এস এম সুলতানের বাড়িও সেখানেই। মনে মনে অনেক দিন ধরে ইচ্ছা পুষে রেখেছি, এবার বাড়ি গেলে অবশ্যই সুলতানের বাড়িতে যাবো। এমন সময় একদিন জানতে পারলাম নড়াইলে সুলতান মেলা চলছে। শুনতে দেরি হলো কিন্তু ব্যাগ গোছাতে দেরি হলো না। বেরিয়ে পড়লাম গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে।
ঢাকা থেকে রাতের গাড়িতে উঠেছি। গাড়ি রাতের আঁধার ছেঁদ করে এগুতে লাগলো নড়াইলের দিকে, আমার জন্মভূমির দিকে। এই নড়াইলেই জন্ম নিয়েছিলেন এস এম সুলতান, কবিয়াল বিজয় সরকার, উদয় শংকর, জারি সম্রাট মোসলেম উদ্দিন বয়াতি, বীর শ্রেষ্ঠ নূর মুহাম্মদ শেখ ও এ যুগের ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মর্তুজা সহ অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ। ভাবতেই গর্বে বুকটা ভরে ওঠে, আমিও এই জেলারই সন্তান!
মাশরাফি ভাই; Source: অচিন্ত্য আসিফ

দুই-তিন ঘণ্টার মধ্যে মাওয়া ফেরি ঘাটে এসে পৌঁছলাম, এখানে লম্বা সিরিয়াল। শুনেছি এই ঘাটে কম দামে পদ্মার ইলিশ পাওয়া যায়। তাই গাড়ি থেকে নেমে ইলিশের গন্ধ খুঁজতে লাগলাম।
প্রত্যেকটা খাবারের হোটেল থেকেই ইলিশের গন্ধ আসছে। কোনটায় ঢুকব বুঝতে পারছি না। গাড়ি থেকে বেশি দূরে যাওয়ার উপায় নেই, তাতে গাড়ি মিস হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আগে এমন ঘটনা অনেকবারই ঘটেছে। একবার চট্টগ্রাম যাওয়ার সময় কুমিল্লার এক রেস্টুরেন্টে অনেক সময় নিয়ে ফেলেছিলাম, সেদিন গাড়ি মিস করে অন্য গাড়িতে চট্টগ্রাম যেতে হয়েছিল। তাই আজ আর রিস্ক নিলাম না।
কয়েকটা ভাজা ইলিশ মুখে পুরে চিবোতে চিবোতেই পিছন দিক থেকে গাড়ি উধাও। হা করে বোকার মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম, তারপর গাড়ির নাম্বারটা মনে করার চেষ্টা করলাম। হ্যাঁ মনে পড়েছে, এবার শুরু হলো দৌড়।
পদ্মার ইলিশ; Source: আদার ব্যাপারী

আমি এত জোরে দৌড়াচ্ছি কিন্তু আশ্চর্য, কেউ আমার দিকে একটি বারও তাকাচ্ছিল না! অথচ আমি যখন স্কুলের দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতাম তখন শত শত মানুষ আমার দিকে তাকিয়ে থাকত। আসলে প্রতিটি জিনিসেরই মূল্যায়ন হয় স্থান, কাল, পাত্র ভেদে। এখানে সবাই জীবনের সাথে দৌড়-পাল্লা খেলছে আলাদা করে আমার দৌড় দেখার সময় কারো হাতে নেই।
অবশেষে ফেরীর উপরে এসে গাড়ির দেখা পেলাম। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে একটু জিরিয়ে নিলাম, তারপর উঠে গেলাম ফেরীর ছাদের দিকে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ফেরি ছেড়ে দিল আর আস্তে আস্তে পদ্মার বুক চিরে এগোতে লাগল। শীতল বাতাস এসে আমার শরীরে লাগছে আর চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে যাচ্ছে। চারদিকে উত্তাল ঢেউয়ের খেলা আর মাঝে মাঝে ঐ দূরে দেখা যাচ্ছে দু’একটা ফেরির আনাগোনা।
ফেরী ওপারে পৌঁছাতে প্রায় ৪০ মিনিট সময় লেগেছিল। তারপর আবার চড়ে বসলাম বাসের সিটে, গাড়ি এগিয়ে চলেছে গন্তব্যের দিকে।
আকাশটা একটু একটু করে ফর্সা হয়ে উঠছে, মনে হয় একটু পরেই সূর্য মামা উঁকি দেবে পূবের আকাশে। এমন সময় গাড়ি এসে থামল আরেকটি ফেরী ঘাটে; এটা কালনা ঘাট। এখানে বেশি সময় অপেক্ষা করতে হলো না। কিছুক্ষণ পরেই গাড়ি গিয়ে ফেরীতে উঠলো।
কালনা ঘাটের ফেরী; Source: অচিন্ত্য আসিফ

ফেরীতে বসে দেখতে পেলাম আকাশে রক্তিম সূর্য। তার রূপ দেখে মনে হলো, সে যেন আমাকে অভিবাদন জানাতে এসেছে। কত দিন এমন সূর্য দেখি না তার ঠিক নেই, তাই সূর্য দেখতে দেখতে কখন যে তীরে পৌঁছে গেছি বুঝতেই পারলাম না।
আবার গাড়ি ছুটতে লাগলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই নড়াইলের সীমান্তে পৌঁছে যাওয়ায় আমার মনের মধ্যে একটা উত্তেজনা কাজ করছিলো। তাই বাড়িতে গিয়ে যা যা করবো তার একটা খসড়া প্লান করতে লাগলাম।
সকাল হয়ে গেছে। রাস্তার দুই দিকে কৃষকের মাঠ। সোনালী রোদের আলোয় দূর থেকে দেখা যায় এস এম সুলতান ব্রিজটি। খুব দ্রুতই বাস পৌঁছে গেল ব্রিজের উপরে, আর সাঁ বেগে পারও হয়ে গেল। আমি জানালা দিয়ে মুখ বের করে পিছন দিকে তাকিয়ে রইলাম, যতক্ষণ না এটি দৃষ্টি সীমার আড়ালে লুকিয়ে গেল।
এস এম সুলতান ব্রিজ; Source: অচিন্ত্য আসিফ

এস এম সুলতান ব্রিজটি দেখলে আমার কাছে মনে হয়, এটি যেন স্বয়ং এস এম সুলতান চিত্রা নদীর বুকের উপর শুয়ে আছেন। এরকম মনে হওয়ার একটা মূল কারণ হতে পারে এই যে, নড়াইল মানেই আমি চিত্রা নদী বা তার তীরকেই বুঝি। আর নড়াইলের প্রতিটি মানুষের বুকে এস এম সুলতানের অবাধ বিচরণ রয়েছে। সেই সাথে নড়াইলের শিল্প-কলায় সর্বদা চর্চিত হয় এই মহান মনীষীরই আদর্শ।

কীভাবে যাবেন:

যাত্রাবাড়ী টার্মিনাল থেকে অনেকগুলো পরিবহন নড়াইলের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। এখান থেকে যে কোনো পরিবহনে চড়ে আসতে পারবেন নড়াইল শহরে। নড়াইল শহরের প্রবেশ পথেই রয়েছে এস, এম, সুলতান ব্রিজটি।
Feature Image: Achinto Asif

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এক নজরে একটি জেলা: খুলনার আনাচে-কানাচে

অস্ট্রেলিয়ায় আমার প্রিয় ৯টি হোটেল